হুন্ডির ঐতিহাসিক পটভূমি

0
588

হুন্ডি (Hundi) মুগল অর্থনীতির অধীনে বিকশিত একটি অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থ লেনদেন পত্র। হুন্ডি বলতে বাণিজ্য ও ঋণ লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যবহূত আর্থিক দলিলসমূহকে বোঝায়। অর্থ প্রেরণের উপায়, ঋণ প্রদান (অর্থ ধার) এবং বাণিজ্যিক লেনদেন বিনিময় বিল হিসেবে হুন্ডি ব্যবহূত হতো। কৌশলগতভাবে, হুন্ডি (Hundi) হলো এমন একটি লিখিত শর্তহীন আদেশ যা এক ব্যক্তির নির্দেশ অনুযায়ী অন্য এক ব্যক্তি লিপিবদ্ধ করেন এবং নির্দেশনামায় উল্লেখিত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করা হয়।

হুন্ডি অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অংশ হওয়ার কারণে এর আইনগত অবস্থান নেই এবং সরকারের আওতাধীন আলোচনার কোন বিধিও নেই। হুন্ডি সাধারণত বিনিময় বিল হিসেবে বিবেচিত হলেও তা প্রায়শ দেশজ ব্যাংকার্স দ্বারা ইস্যুকৃত পে-অর্ডার চেকের সমমান হিসেবে ব্যবহূত হয়। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলিতে শাখা অফিস অথবা প্রধান ব্যাংকিং হাউসগুলিতে কুঠির মাধ্যমে হুন্ডি ব্যবসা চলত। বলা হয়, বাণিজ্যিক ভারতের সকল অংশে জগৎ শেঠের ব্যাংকের শাখা অফিস ছিল। কিন্তু বাংলায় উপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার প্রভাবে তাঁদের আর্থিক শক্তির পতন শুরু হয় এবং আঠারো শতকের শেষে দেউলিয়া হয়ে পড়ে।

হুন্ডি একস্থান থেকে অন্যস্থানে অর্থ প্রেরণের একটি ব্যক্তিগত পর্যায়ের কৌশল, যা আজও প্রচলিত আছে। এটি স্বল্পকালীন বাণিজ্যিক ঋণপত্র হিসেবেও কাজ করে। হুন্ডি ব্যক্তি পর্যায়ে অর্থ প্রেরণের একটি কৌশল হলেও মুগল সাম্রাজ্যের রাজস্ব কর্মকর্তারা এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে অর্থ প্রেরণের জন্য প্রায়ই হুন্ডি ব্যবহার করতেন। রাজন্য ব্যক্তিবর্গ ও প্রাদেশিক মনসবদারগণ তাঁদের জায়গির থেকে হুন্ডি ব্যবহার করতো।

অর্থনীতির মুদ্রাকরণ প্রক্রিয়ায় মুগল সরকার ঋণ ব্যবস্থাকে একটি বৃহৎ পারিসারিক কাঠামোয় উন্নীত করে। এ ঋণ কাঠামোর বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের পতন ঘটে হুন্ডি পদ্ধতির মধ্যে। বৃহৎ পরিমাণে অর্থ লেনদেনের জন্য হুন্ডি প্রধান মাধ্যম ছিল। তারপর মুদ্রা অর্থ লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। একস্থান থেকে অন্যস্থানে বিপুল পরিমাণ মুদ্রা প্রেরণ অসম্ভব ও ঝুকিপূর্ণ হওয়ায় দূরবর্তীস্থানে বাণিজ্যের জন্য হুন্ডি ছিল খুবই নির্ভরযোগ্য এবং নিরাপদ পদ্ধতি।

শতের শতকে বাংলা থেকে দিল্লিতে ভূমি রাজস্ব পাঠানো হত কফিল অথবা গরুর গাড়ি দিয়ে। এ পদ্ধতি ব্যয়বহুল এবং অনিরাপদ ছিল। এছাড়া রাজকীয় অর্থ প্রেরণের জন্য স্থানীয় অর্থনীতি মুদ্রা সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। হুন্ডি ব্যবস্থা দ্বারা এ সমস্যার সমাধান হয়। এ সময়ের মধ্যে হুন্ডি বাজার বিকশিত হয়। বণিকরা বাণিজ্যের জন্য হুন্ডিকে অধিক ব্যবহার করে। মুগল আমলের পরবর্তী সময়ে ঐসব বণিকদের মধ্যে জগৎ শেঠ ও মাহতাব চাঁদের হুন্ডি গৃহ খুব সুবিদিত ছিল। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে হুন্ডি ব্যবসা খুবই পরিচিত ছিল এবং তা পরিচালনা করত মফস্বল ব্যাংকার্স বা সরফগণ। তারা হুন্ডি প্রদানের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমান কমিশন বা অর্থ দাবি করত। চাহিবামাত্র পরিশোধযোগ্য আমানত হিসেবে সরফগণ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ গচ্ছিত রাখত এবং সরফগণ আমানতকারীদের কিছু সুদ প্রদান করত। মুগল সাম্রাজ্যের সর্বত্র হুন্ডি ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল।

হুন্ডি ব্যবস্থা শুধু মুদ্রা অর্থনীতির উত্থানেই অবদান রাখেনি, সামরিক অভিযান এবং দূরবর্তী বাণিজ্যের ক্ষেত্রেই সহায়ক ছিল। কিন্তু বিদেশিদের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন ছিল হুন্ডি ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। আঠারো শতকের মধ্যে ইউরোপের উপকূলবর্তী প্রায় সকল দেশের বণিকগণ বাংলায় ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য আসে। স্থানীয় বণিকদের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের পর হুন্ডি ব্যবস্থা তাদের ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করে। আঠারো শতকের মধ্যবর্তী সময়ে জগৎ শেঠ সর্ববৃহৎ হুন্ডি ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি হুন্ডি প্রদান এবং গ্রহণ করতেন। আঠারো শতকের শেষার্ধে বাংলায় আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার উৎপত্তির ফলে উনিশ শতকের প্রথমার্ধে হুন্ডি ব্যবস্থার পতন শুরু হয়। দর্শনী হুন্ডি ছিল অত্যন্ত জরুরী অর্থাৎ এ হুন্ডি প্রদানের সাথে সাথে পরিশোধ করা হতো। আঠারো শতকে সুদের বাজারে হুন্ডিওয়ালা নামে এক শ্রেণির ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটে। এমনকি এখনও অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থ বাজারে হুন্ডি ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। অবৈধ ব্যবসায়িক লেনদেন এবং অর্থ প্রেরণের জন্য হুন্ডি প্রায়ই প্রধান অবলম্বন।

উদাহরণ
একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি খোলাসা করা যায়। ধরা যাক রহিম আর করিম দুই ভাই। রহিম থাকে সৌদি আরবে, করিম থাকে বাংলাদেশে। রহিম -করিমের পাশের বাড়ির সালাম সেও সৌদিতে থাকে। তো সালাম কিছু টাকা বাংলাদেশে তার পরিবারের কাছে পাঠাতে চায়। সে ব্যাংকে গেল ব্যাংকে গিয়ে শুনলো যে সে যদি এক লক্ষ টাকা পাঠাতে চায় তবে সৌদির ব্যাংক, বাংলাদেশের ব্যাংক ও শুল্ক সবসহ তার খরচ হবে বিশ হাজার টাকা। অর্থাৎ সালামকে দিতে হবে এক লক্ষ বিশ হাজার টাকা আর বাড়িতে পাবে এক লক্ষ টাকা।

তাই সালাম টাকা না পাঠিয়ে বাসায় ফেরত আসে। ঘটনা শুনে সৌদিতে থাকা রহিম তাকে প্রস্তাব দেয় যে সালাম যদি তাকে এক লক্ষ পাঁচ হাজার দেয়, তো রহিম সালামের বাড়িতে এক লক্ষ টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। সালাম চিন্তা করে দেখলো এতে সে ১৫ হাজার টাকা বেঁচে যায়। সালাম তাই রহিমকেই এক লক্ষ পাঁচ হাজার টাকা দেয়। রহিম বাংলাদেশে তার ভাই করিমকে ফোন দিয়ে সালামের বাড়িতে এক লক্ষ টাকা পৌঁছে দিতে বলল।

এতে রহিম করিমের লাভ হল পাঁচ হাজার টাকা সালামেরও পনেরো হাজার টাকা বেঁচে গেল। এই হল হুন্ডি ব্যবস্থা। ব্যবসায়ীরা হুন্ডির মাধ্যমে টাকা লেন্দেন করে যাতে আমদানি খরচ কম হয়। ফলে লাভ ও বেশি করে করতে পারে।

হুন্ডি ব্যবস্থায় সরকার অনেক টাকার শুল্ক থেকে বঞ্চিত হয়। শুল্ক ফাঁকির কারনে উন্নয়ন ব্যহত হয়। তাছাড়া- সালাম না হয় রহিম করিমের প্রতিবেশী ছিল। সবাই তো আর প্রতিবেশী নয়। কেউ টাকা মেরে দিলে? কিছুই করার থাকবে না। কেননা হুন্ডি ব্যবস্থাই বেআইনি। তাই সে কোন আইনি ব্যবহস্থা নিতে পারবে না। তাই বৈধ উপায়ে নিরাপদে টাকা পাঠানো উচিৎ।

দর্শনী হুন্ডির একটি নমুনা
(বিশ শতকের গোড়ার দিকের সময়)

Nisani Hamare Gharu khate nam mandna.
Dastkhat Brijkishore Bhargava ke hundi likhe mujib sikar desi.

SRI RAMJI
Sidh sri Patna subhastane chiranjeeva bhai Rikhabchand Bridhichan yog sri Jaipur se likhi Brijkishore Bhargava kee asis banchna, apranch hundi aik rupia 2,000 akshare rupia do hazar ke nime rupia aik hazar ka duna yahan rakha sah Sri Punamchandji Harakchandji pas miti Mangsir bad baras (12th) puga turat sah-jog rupia chalan ka dena. Sambat 1990, Miti Mangsir bad baras, Rs. 2,000.

Neme Neme rupia panchsau ka chauguna pura do hazar kardejo.
‘1’ Chiranjeeva Rikhabchand Bridhichand, Patna.

অর্থাৎ

এটি আমাদের হিসাবের দেনার/ঋণের খাতায় লিখে রাখা হোক
স্বাক্ষর: মহান হুন্ডি রচয়িতা ব্রিজকিশোর ভার্গবা

মেসার্সকে (সর্বজনাব) সম্ভাষণ। জয়পুরের ব্রিজকিশোর ভার্গবা কর্তৃক রচিত পাটনার সুন্দর শহরের পুত্র (অধিবাসী) রিকহাবচাঁদ ব্রিদিচাঁদের ২,০০০ রূপি (কথায় দুই হাজার রূপি মাত্র) মূল্যমানের হুন্ডি। এক হাজার রূপির দ্বিগুণ হুন্ডির মূল্য। মেসার্স এর পক্ষে এখান থেকে হুন্ডি লিখিত হয়েছে। ১২ মাংশির ১৯৯০, শ্রী পুনম চাঁদ জি হারাকচাঁদ জি চলতি মুদ্রায় নিবেদন করবে।

৫০০ রূপির চারগুণ ২,০০০ রূপির হুন্ডি লিখিত হলো।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের অর্থনীতিবিদদের নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে তাদের পরামর্শক্রমে ১৯৭৪ সালে ‘ওয়েজ আর্নার্স স্কিম’ চালু করা হয় এবং তখন থেকে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসার প্রবণতা বাড়তে থাকে।
সহজে বাড়িতে টাকা পৌঁছে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে থাকে প্রবাসীদের। বিদেশের যেসব শহরে বাংলাদেশিদের অবস্থান বেশি, সেসব স্থানে তারা ব্যাংকের মতোই বুথ খুলে বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশিদের কাছ থেকে নিয়ে তার বিপরীতে সাংকেতিক চিহ্নসংবলিত ‘টুকা’ ইস্যু করার কাজ করে। এ টুকাই বাংলাদেশে তাদের টাকা পাওয়ার নিশ্চয়তা প্রদানের নিদর্শন হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এভাবে নন-ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাচারের প্রধান একটি উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয় হুন্ডি। সাম্প্রতিক বিভিন্ন তথ্যমতে, হুন্ডি ক্রমেই ব্যাপক হচ্ছে। হুন্ডি এখন অর্থ পাচারের একটি ভয়ংকর মাধ্যম। হুন্ডিতে মূলত এজেন্টের মাধ্যমে টাকা লেনদেন হয়। এটি পুরোপুরি চলে বিশ্বাসের ওপর। এখানে কোনো কাগজপত্রের লেনদেন হয় না। এ প্রক্রিয়ায় টাকা পাচার হওয়ায় পাচারকারীদের শনাক্ত করা খুবই কঠিন কাজ। এছাড়া হুন্ডির মাধ্যমে টাকা স্থানান্তরে খরচও আবার তুলনামূলক কম। এ কারণেই পাচারকারীরা হুন্ডিকেই পছন্দ করে বেশি। তবে এখানে ঝুঁকি অনেক বেশি।

কোনো কারণে টাকা আত্মসাৎ করা হলে তা আর ফেরত পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। আমাদের দেশের অনেক সাধারণ মানুষ, যারা হুন্ডি ব্যবসায়ীদের কবলে পড়ে অনেক সময় সর্বস্বান্ত হচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগ অংশই হুন্ডি সম্পর্কে তেমন কিছুই বোঝেন না। ফলে দেখা যায়, একটি অংশ না বুঝে নিজেদের অগোচরেই জড়িয়ে পড়ছেন এ অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে। তাই হুন্ডি ব্যবসা বন্ধ করতে জনসাধারণের সচেতনতা বাড়ানো একান্ত প্রয়োজন।

সোর্সঃ বাংলাপিডিয়া ও অনলাইন

Leave a Reply