দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্রঋণ: ভূমিকা, বিতর্ক ও বিকল্প ভাবনা

0
329

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ সুদভিত্তিক প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে দারিদ্রতা নিয়ে ব্যবসা করা সম্ভব কিন্তু দারিদ্র হ্রাস করা অসম্ভব তা প্রমানিত হয়েছে। চক্রবৃদ্ধি হারে অধিক মাত্রায় সুদ দিতে দিতে সাধারন দরিদ্র কৃষক শ্রমিক নি:স্ব হয়েছে। অনেকে শেষ সম্বল ভিটে মাটি বিক্রি করে গৃহহীন হয়েছে। ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প ও তাতে গ্রামীণ নারীর অর্ন্তভূক্তি সামন্ত যুগীয় উৎপাদন পদ্ধতির মহাজনী সুদি কারবারের নামান্তর। ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পে নারীর অর্ন্তভূক্তি ও তার ক্ষমতায়ন তথা সমতার প্রত্যাশা তাকে নিপতিত করে পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রিক স্ববিরোধীতার শিকারে। তাই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প কার্যক্রম বা মডেলের পরিবর্তন আনা সময়ের অপরিহার্য দাবি। কোন একটি মডেলে চিরস্থায়ী বা অনড় নয় তা সে যতই প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হউক না কেন। প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণ গ্রহনের আগের দারিদ্র ও অসহায় নারী ঋণ গ্রহনের পরেও দারিদ্র ও অসহায় থেকে যায়, প্রতিনিয়ত আরও ঋণের চক্রে জড়িয়ে নিজেকে আরো বেশি অসহায় করে ফেলে। সেহেতু প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণের অন্তনিহিত ক্রটি গুলো চিহ্নিত করে সে গুলো দুর করাও জরুরি। ক্ষুদ্রঋণ বা ক্ষুদ্র বিনিয়োগ দ্বারা দরিদ্র জনগোষ্ঠির প্রকৃত উন্নয়ন ঘটাতে বা দরিদ্র বিমোচন করতে হলে বর্তমানে প্রচলিত কৌশল ও পদ্ধতির ব্যপক পরিবর্তন প্রয়োজন । তৃনমূল পর্যায়ে সত্যিকার বিত্তহীন মানুষ বা Hard core poor দের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হলে শুধু সদিচ্ছাই যথেষ্ট হবেনা। টেকসই উন্নয়নের জন্যে চাই প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণের বিকল্প বাস্তবসম্মত ও শোষনহীন কর্মকৌশল।

ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম কোন রকম জামানত ছাড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঋণ বিতরন ব্যবস্থা। ১৯৭৩-৭৪ এই সময়কালে প্রফেসর মুহম্মদ ইউনুস ক্ষুদ্রঋণ তথা মাইক্রোকেডট ধারনাটির বিকাশ ঘটান। ১৯৭৬ সালে ইউনুস চট্রগ্রামের জোবরা গ্র্রামে পরিক্ষামূলক প্রথম কার্যক্রম হাতে নেন। ইউনুস মনে করেন প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থায় লিঙ্গীয় বৈষম্য বিরাজমান। ১৯৮৩ সালে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানিক রূপ পায়। তৎকালিন সরকার ড. ইউনুসের ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পকে একটি পৃথক আথির্ক প্রতিষ্ঠানভূক্ত করার অনুমোদন দেন। মূলত পাচ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকার ঋণকে ক্ষুদ্রঋণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যারা দরিদ্র কোনভাবেই তারা অর্থ সহায়তা পায়না তাদের জন্য এই ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থা। ক্ষুদ্রঋণ হল উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নারী কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সহযোগীতা। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পরপরই বিশ শতকের মাঝামাঝিতে সর্বপ্রথম ক্ষুদ্রঋণ ধারনা তৈরী হয়। এমনকি ১৮ শতকের নিউইর্য়ক Providence Fund-এ এই ক্ষুদ্রঋণ ধারনাটি ক্রিয়াশীল ছিল বলে মনে করা হয়। ১৯৭০ এর পর হতে এটি সফলভাবে বিভিন্ন সংগঠন এর কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে সক্রিয় করে তোলা হয়েছে। M icro শব্দের অর্থ হল ছোট বা ক্ষুদ্র আর credit বলতে কোন ব্যাংক, আর্থিক প্রষ্ঠিান বা NGO কর্তৃক প্রদেয় কিছু কিন্তু নির্দিষ্ট পরিমান অর্থকে বুঝায়। M icro credit কর্মসূচী এমন একটি পরিকল্পনা যার মাধ্যমে গরীব দুস্থ বা সুবিধা বঞ্চিতদের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ক্ষুদ্রঋণ সেবা প্রদান করা হয়। ফরাসি অর্থনীতিবিদ Antoine Burest ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দের গোড়ার দিকে দরিদ্রদের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের জন্যে ক্ষুদ্রঋণ পদ্ধতি প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে লেখালেখি করেন।

ক্ষুদ্রঋণের কিছু নেতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। প্রথমদিকে প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতারা পারিবারিক সামাজিক মানসিক সমস্যার সম্মুখিন হত।যেমন: স্বামীর অপছন্দ, আত্মীয় স্বজনের অপছন্দ, মৌলভীদের বিরোধীতা, জানাজা পড়বেনা বলা, খ্রীষ্টান হয়ে যাবে বলে প্রচার, পর্দা সম্পর্কে হুমকি, চরিত্র নিয়ে সামাজিক রটনা, সংসার ভেঙ্গে যেতে পারে বলে দুশ্চিন্তা, নারী হয়ে একা এলাকার বাইরে গিয়ে ঋণের টাকা আনা নিয়ে সমস্যা। ঋণগ্রহীতাদের সামাজিক সমস্যাগুলি তাদের সাংস্কৃতিক গঠন ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে উদ্ভূত। ঋণ কার্যক্রমে যুক্ত হবার পর ঋণ গ্রহীতার নতুন এক মানসিক দুশ্চিন্তার মুখোমুখি হন। ঋণের টাকা যেই ব্যবহার করুক না কেন নারীকেই ঋণের কিস্তি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। এ নিয়ে তাদের কে বেশি দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। কিস্তি সময়মত পরিশোধ করতে না পারলে ঋণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অথবা সে ঋণ পরিশোধ নাও হতে পারে। ঋণখেলাপী হলে এমন উদাহরন ও আছে ঘরের টিন খুলে রিয়ে গেছে ব্রাক কমির্রা। গরু, ছাগল প্রভৃতি যে কোন কিছুর বিনিময়ে ঋণের টাকা ফেরৎ পেতে কর্মিদেও তৎপরতা মানবতা ছাড়িয়ে যায়। ঋণ গ্রহনের এক সপ্তাহ পর থেকেই কিস্তি পরিশোধ করতে হয় বলে তাদেরকে অন্যান্য আয়ের উপর নির্ভর করতে হয়। সাপ্তাহিক কিস্তির টাকা নিয়ে অনেকের স্বামী ও শ্বাশুড়ীরা তাদের সাথে ঝগড়াও করেন।

ঋণকে ‘মানুষের অধিকার’ হিসেবে চিহ্নিত করে যুক্তি দেখানো হয় যে বন্ধকহীন স্বল্প পরিমান ঋণ মানুষের দরজার গোড়ায় পৌছে দিলে তা মানুষ ব্যবহার করে স্বাবলম্বি হবে, দারিদ্রসীমা ডিঙ্গাতে পারবে, ক্ষমতায়িত হবে। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে ক্ষমতায়নের এই ব্যখ্যা দুর্বল হয়ে পড়ে যখন নারীদের পাওয়া ঋণের টাকা বেশীরভাগ ক্ষেএেই পরিবারের পুরুষ সদস্যরা ব্যবহার করেন। এ প্রসঙ্গে কবীর (১৯৯৫) তার গবেষনায় দেখান যে, নিজের চাইতে নারীরা তার পরিবারের উন্নতির জন্যই ঋণের অর্থ ব্যবহার করে বেশি। তাই তো ‘ঋণ’ কে মানুষের অধিকার হিসেবে চিহ্নিত করার চাইতে ‘কাজ’ কে মানুষের অধিকার হিসেবে চিহ্নিত করাটা জরুরী।

নাহার (১৯৯৯) তার গবেষনার মাধ্যমে দেখান ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে অর্জিত অর্থনৈতিক সমতা,লিঙ্গীয় সমতা নির্ধারনে সর্বদা কার্যকর নয়। তিনি এক্ষেএে Goetz ও Sen Gupta (১৯৯৫:৪৫) তার উদ্ধৃতি তুলে ধরেন‘নারীদের পাওয়া ঋণের টাকার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ তাদের পুরুষ আত্মীয়রা খাটায়,যদিও ঋণ শোধ করার দায়ভার নারীকেই নিতে হয়।’ ক্ষুদ্রঋণের জনক ড.ইউনুসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীন ব্যাংকের বিভিন্ন সমালোচনা রয়েছে। যেমন- গ্রামীন ব্যাংকের মাধ্যমে দারিদ্র দুরীকরন সম্ভব নয়। গ্রমীন ব্যাংকের সুদেও হার অত্যন্ত বেশি।ঋণ আদায়ের হার যা দেখানো হয় তা সঠিক নয়।ঋণ আদায়ের ক্ষেএে জোর জবরদস্তি করা হয়। গ্রামীন ব্যাংক থেকে একবার ঋণ নিলে পরিতোষিক চক্রে আবদ্ধ হয়ে যায়।গ্রামীন ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নেয়ার ফলে যে বা ঋণবগ্রহীতকে সাহায্য প্রাপ্ত পরিবার বলা যায়। যাদের সে সাহায্য প্রত্যাহার করলে অবস্থা আবারও পূর্বের অবস্থায় ফেরা যাবে।

কতিপয় কারনে গ্রামীন লোকেরা গ্রামীন ব্যাংকের বিরুদ্ধে সেচ্চার যেমন -একই গ্রামের সকল দরিদ্র লোক গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ঋণ পায়নি। মহিলারা যে হারে ঋণ পেয়েছে দুস্থ পুরুষেরা সে হারে ঋণ পায়নি। গ্রামের অনেক গরিব কৃষক যারা কোন ব্যাংক থেকে জামানত বা তদ্বিরের অভাবে ঋণ পায়নি তারা মনে করে গ্রামীন ব্যাংকের তাদেরকে ঋণ প্রদান করা উচিৎ ছিল। ঘরের নারীকে ঋণ দেওয়ার ফলে পুরুষ অনেক সময় অপমান বোধ করেছে বা হেয় প্রতিপন্ন হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। অর্থের এবং বিত্তের ব্যাপারে মহিলাদের কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। খ্রীষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করার ব্যাপাটি অনেকেকে বিভ্রান্ত করছে। গ্রামীন ব্যাংক কোথা থেকে টাকা পায় সে বিষয়ে নানা ধরনের জল্পনা রয়েছে বলে কোন কোন গ্রামবাসী উল্লেখ করেন। (Alamgi, MK 1978)

প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণ বাংলাদেশের গ্রামীন অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এনজিও গুলো ক্ষুদ্রঋণ প্রদানের নামে যে উচ্চহারে সুদ আদায় করছে তা মহাজন দেরকেও হার মানায়। এরা নব্য মহাজন হিসাবে আর্বিভূত হয়েছে। আর্থ সামাজিক উন্নয়নে ক্ষুদ্রঋণ কেমন অবদান রাখছে? ঋণ গ্রহীদের বেশির ভাগই মনে করেন এক্ষেএে ক্ষুদ্রঋণ তেমন অবদান রাখছেনা ঋণ গ্রহনের পরও অনেক ক্ষেএেই খারাপ অবস্থানে রয়েছেন তাদের কেউ কেউ। এনজিওদের প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে জমজমাট ব্যবসা দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যর্থ হয়েছে। ব্রাকে সুদের হার সমষ্টি গত ঋণের জন্য ২০% এবং ব্যক্তির জন্য ১৮% থেকে ২৪% ব্যবসার জন্য ৫০০ টাকার বেশি ঋণ দেয়া হলে সেক্ষেএে পুরুষের জন্য সুদের হার ২৫% আর মহিলাদের জন্য ১৫% । ব্রাক এ পর্যন্ত বিদেশি দাতা সংস্থার কাছ থেকে ৬০০ কোটি টাকা বৈদেশিক অনুদান গ্রহন করেছে।

গ্রামীন ব্যাংক ঋণকেই দারিদ্র্য বিমোচনের প্রধান উপাকরন বলে মনে করে। লেখক সংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের একটা বিরাট অংশ ব্যাংকটির কার্যক্রমকে শোষন মূলক আখ্যায়িত করেছেন। ব্যাংকের তরফ থেকে এর সাধারন ঋণের সুদের হার Reclining Balance পদ্ধতিতে ২০% দাবী করা হলেও ঋণ ও অর্থ বিশেজ্ঞরা এই হার ৩৯ শতাংশ থেকে ৮৭ শতাংশ বলে জানিয়েছেন। দরিদ্র মানুষদের সংগঠিত করে ঋণ দিয়ে তার কিস্তি আদায়ের জন্য তাদের বাড়িঘর সহায় সম্পত্তি বিক্রি করতে বাধ্য করার ন্যায় হ্নদয় বিদারক ঘটনারও উল্লেখ করেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক আনিসুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষনায় প্রমানিত হয়েছে যে গ্রামীন ব্যাংকের সুদের হার ২০% থেকে ৪৪% পর্যন্ত বিস্তৃত। গ্রামীন ব্যাংক থেকে যারা ঋণ নেননি এবং যারা ঋণ নিয়েছেন তাদের উভয়ের আয়ের অবস্থা প্রায় একই রকম।

ঢাকার হোটেল শেরাটনে অনুষ্ঠিত ৪৪ জাতি ক্ষুদ্রঋণ সম্মেলনে এম সাইফুর রহমান ক্ষুদ্রঋণের উচ্চসুদের হারের কঠোর সমালোচনা করে বলেছিলেন, দারিদ্র্যকে পুজি করে এনজিও গুলো নিজেদের ব্যবসা বানিজ্যের প্রসার ঘটাচ্ছে। দারিদ্র হ্রাস পেলে তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। এ কারনেই এরা দারিদ্র্যকে লালন করছে। বিদেশ থেকে বিনা সুদে অর্থ এনে বাংলাদেশে চড়াসুদে বন্টন করছে। ১৯৯৭ সালের শেষ দিকে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্যর বিরূদ্ধে সংগ্রাম গ্রন্থে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে যে এনজিও সমূহের সর্বচেষ্টা সত্ত্বেও সর্বসাকুল্যে বাংলদেশে প্রতিব্ছর শতকরা দশমিক আট ভাগ হারে নিট দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে। গ্রামের অসহায় গরীব মানুষেরা ঋণ পাওয়ার আশায় নিজেদের সঞ্চয় জমা দেয় এনজিও গুলো এই সঞ্চয় ফান্ড হতে তাদের সদস্যদেরকে তুলনামূলক উচ্চসুদে ঋণ দেয়। ঋণের টাকা হতে শুরুতেই বিভিন্ন ফান্ডের নামে টাকা কেটে রাখে। কোন কোন এনজিও ঋণের টাকা থেকে সদস্যদেরকে তাদের চাহিদা ছাড়াই মুরগীর বাচ্চা, গাছের চারা, বীজ ইত্যাদি কিনতে বাধ্য করে। এত কিছু কাটার পরও ঋণের অবশিষ্ট টাকা দিয়ে প্রস্তাবিত আয় বৃদ্ধি কার্যক্রম অনেক ক্ষেএেই সফল হয়না বলে তারা সময়মত ঋণের টাকা ফেরৎ দিতে ব্যর্থ হয়ে ক্রমেই ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে এবং সর্বসান্ত হয়।

স্বামীর কাছ থেকে কিস্তি নিয়ে এনজিওতে প্রদান করতে না পারার কারনে অনেক মহিলা সদস্য আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। অনেক সদস্যের পারিবারিক বন্ধন ভেঙ্গে যায়। ফলস্বরূপ এদের ছেলে মেয়েরা যাযাবরের মত বড় হতে থাকে এবং অনেকেই পরবর্তীতে সন্ত্রাসী অথবা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। এনজিও গুলো ঋণের বিপরীতে অধিক হারে সুদ আদায়ের ফলে গ্রামের গরীব মানুষ গুলো নানা রকম ঋণের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে । ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহীতাদের কাছথেকে উচ্চসুদ আদোয়ের ফলে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচী প্রকৃত সুফল আনতে পাছেনা। সদযুক্ত ঋণ চরম দারিদ্র্যতা কমাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে। সুদের সাথে স্বার্থপরতা জড়িত বলে মানবিকতা চরমভাবে উপেক্ষিত হয়। তাই ঝগড়া বিবাদ কলহ বৃদ্ধি পায়। সুদ দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি হয়। প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাকে ঋণের জালে আটকে ফেলে মনসিক দুবর্ল করে ফেলে। সুদ ভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থায় কেউ হচ্ছে বিলাসী। কেউ হচ্ছে পথের ভিখারী। মানুষের রক্ত চুষে অর্জিত অর্থ সম্পদেও অধিকারীরা স্থায়ী ও স্থিতিশীল কিছুর পরিবর্তে ক্ষন ভঙ্গুরকে আকড়ে ধরে নানা সমস্যা বাড়াচ্ছে।

প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণ গ্রামীন অর্থনীতিকে নানা সমস্যায় জর্জরিত অবস্থা থেকে উত্তেরন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে। অর্থনীতির দীর্ঘ দিনের ক্ষত গুলো সারাতে গৃহিত সংস্কার কর্মসূচীর ফলে ক্ষত উন্মুক্ত হয়ে অর্থনীতির রক্ত ক্ষরন আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। সুদ যুক্ত এই ঋণ ব্যবস্থা মানুষের মধ্যে নির্মমতা, সংকীর্নতা, স্বার্থপরতা, কৃপনতা, নৃশংসতা ও নিষ্ঠুরতার জন্ম দেয়। মানুষকে কর্মবিমুখ করে। পরস্পরের প্রতি উদার হবার পরিবর্তে অত্যাচারী হতে শিক্ষা দেয়। হিতাহিত জ্ঞানকে হ্রাস করে। মানুষকে দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে রেখে তার কর্মক্ষমতা হ্রাস করে । সুদভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণ ব্যবসায়ীদের কোন বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতি দয়ার্দ্র হবার পরিবর্তে বিপদ ও অসহায়ত্ত্বের সুযোগে অধিক সুদ উপার্জনের চেষ্টায় মত্ত থাকে। অধিক অর্থ পাবার লালসা সীমাহীনভাবে বেড়ে যাওয়ায় দানশীলতার মহানুভবতা উদারতা সহানুভূতি ও হ্নদ্যতাকে হ্রাস করে দেয়। এটি পরস্পরের মধ্যে হানাহানি মারামারি হিংসা বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। ফলে ঋণগ্রহীতাদের স্বার্থে অনেকে নির্মম এবং অমানবিক আচরন করছে। সাধারন মানুষকে ক্রমান্বয়ে নি:স্ব ও সর্বহারা শ্রেনীতে পরিনত করছে। ক্ষুদ্রঋণের সুদের মধ্যে তিনটি নীতি কার্যকর। ১.এক পক্ষের স্বত:স্ফুত সম্মতি এবং অপর পক্ষের বাধ্যবাধকতা ও আহাজারী। ২.পারস্পরিক সাহায্য সহযোগীতার অনুপস্থিতি। এমনকি ব্যবসায়িক উন্নতির জন্য অপরের দুরবস্থার প্রচেষ্টা। ৩.এক পক্ষের মুনাফা নির্ভর করছে আর এক পক্ষের ক্ষতির উপর।

প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণ পরনির্ভরশীলতা বাড়াচ্ছে। পুজিপতিরা ঋণ গ্রহীতাদের দরিদ্র অসহায় ও সর্বহারা করে রাখার এক জঘন্য ইচ্ছায় মেতে উঠেছে। নইলে তারা আপন স্বার্থ পুরন করতে পারে না। ম্যনডেভিলের ভাষায়- গরীবদের থেকে কাজ নেওয়ার একটি মাএই পথ আর তা হল এদেরকে দরিদ্র থাকতে দাও। এদেরকে পরনির্ভশীল করে তোল। এদের প্রয়োজন খুব অল্প করেই পূরন করা দরকার। আপন প্রয়োজন পূরনে এদেরকে স্বাবলম্বি করে তোলা চরম বোকামী।প্রচারনায় যায় বলা হোক মাঠ পর্যায়ের গবেষনায় দেখা যায় ব্রাক তাদেরকেই ঋণ দিয়ে থাকে যারা পরিশোধ করতে সক্ষম। এক্ষেএে ভুমিহীনদেরকে ঋণ দেয়া হয় না। ব্রাকের সুদের পরিমান অত্যন্ত বেশি। ব্রাক সঞ্চয়ের ক্ষেএেও ঝামেলা করে। তারা ১০০০০ টাকা ঋণ দিলেও ঋণ উঠানোর সময়ই ৫০০ টাকা কেটে রাখে সঞ্চয় খাতে। অন্য দিকে দেখা যায় যে, ব্রাক সঞ্চয় টাকা ফেরৎ দিতে চাই না। তার কিস্তি পরিশোধ করতে না পারলে তারা মানসিক ভাবে নির্যাতন করে। এমনকি তারা ঘর থেকে মালামাল নিয়ে যায়। ব্রাক প্রথম দিকে সাহায্য দাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও বর্তমানে তারা বানিজ্য কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। তারা এখন জনগনের সুবিধা অসুবিধাকে প্রাধান্য দেয় না।

ফলে এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণের বিকল্প হতে পারে সুদ মুক্ত ঋণ তথা কর্জে হাসানা। কেননা এর মাধ্যমে দরিদ্র,অসহায়, নি:স্ব, অভাবী লোকদেরকে নি:স্বার্থভাবে ঋণ দিলে দায়িত্বানুভূতি বিকশিত হবে। ফলে সুদ ছাড়াই ছাড়াই ঘুড়বে অর্থনীতির চাকা।প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে অভাবী লোকদেরও জোকের মত শোষন করা হচ্ছে। মি: এইচ উলফ এর কথায় সমগ্র দেশ সুদখোরদের উদগ্র গ্রামের মধ্যে বন্দী হয়ে আছে। ঋণের লৌহ শলাকা দেশের শৈল্পিক ও কৃষ্টি ক্ষেএের সর্বপ্রকার উন্নতির পথ রূদ্ধ করে দাড়ায়ে আছে। অথচ কোন মানুষেরই এমন সমাজ ব্যবস্থা কিছুতেই বরদাশত করতে পারেনা। যাতে অধিকাংশ লোকই ঋনী হয়ে জন্মগ্রহন করে। ঋনী হয়ে তিক্ত জীবনযাপন করে এবং ঋণগ্রস্ত হয়েই মৃত্যু মুখে পতিত হয়। শুধু তাই নয়। মৃত্যুর পরও এ ঋণের জাল ছিন্ন হয়না। নিজের সন্তানদের কেউ তারা এ ঋণভারে জর্জরিত করে রেখে যায়।

প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থা মুষ্টিমেয় কিছু লোকদের সম্পদের পাহাড় গড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। সম্পদ বন্টনে চরম বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। লাভের অধিকাংশ অর্থই সুদের আকারে পুজিপতির হাতে চলে যাচ্ছে। সমাজের অভাবগ্রস্ত জনগনের নানা সময়ে ও নানা কারনে সাময়িক ভাবে ঋণ গ্রহনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা ফিরিয়ে দেয়ার সামর্থ নাও হতে পারে। সামাজিক সুস্থতা বা জনগনের নিরাপত্তার সুষ্ঠ সমাধানে প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণ যেখানে ব্যর্থ, কর্জে হাসানা সেখানে সফল হতে পারে। দরিদ্র অভাব গ্রস্ত মানুষ প্রয়োজনের সময় সাহায্যের কোন দরজা খোলা না পেয়ে উপায়ন্তর না দেখে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। সুদযুক্ত ঋণ ধনীকে আরো ধনী করে ক্রমে ক্রমে নি:শেষ হয়ে যায় দরিদ্র।

প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থায় অনেক ঋণ গ্রহীতা শেষ সম্বল ভিটেমাটিটুকু বিক্রি করেও ঋণের বোঝা থেকে রেহায় পায় না। কখনও কখনও বংশানুক্রমে ঋণের বোঝা চলতে থাকে। স্বল্প আয়ের লোকদের দুবেলা পেটপুরে আহার করার মতো অর্থও থাকেনা । তারা অর্ধাহারে থাকতে বাধ্য হয়। ফলে ঋণের ভারে জর্জরিত বিরাট এক জনগোষ্ঠী সর্বদাই ঋণ উত্তোলনকারীদের চাপের মুখে নিদারুন অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকতে বাধ্য হয়। প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন নারীকে ক্ষমতায়িত করার নামে যেভাবে বানিজ্য করা হচ্ছে এবং বহু অকল্যান বয়ে আনছে । সেখানে কর্জে হাসানার মাধ্যমে অভাবীদের অভাব মোচন হবে। কৃষকদের কল্যান বয়ে আসবে। পুজিহীনদের পুঁজি সৃষ্টি করবে। বানিজ্যিক ও শৈল্পিক কায় কারবারে ইতিবাচক ভুমিকা রাখাবে । সামাজিক পরিবেশের উন্নয়ন ঘটাবে বেকারত্ব হ্রাস করবে। স্ব-উদ্যোগে ও আত্বকর্মসংস্থানের ফর্মে নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করবে সামাজিক বৈষম্যের অবসান ঘটাবে শহরাঞ্চল এবং পল্লী এলাকার দারিদ্র হ্রাস করবে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করবে কর্জে হাসানার ফলে উৎপাদনমুলক কাজে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণ হবে,ব্যবসায়িক উন্নতি বিধান হবে, কৃষি কাজের উন্নতি বিধান হবে ,বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের দ্বারা পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার ঘটাবে।

প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণের বহুবিধ ব্যথতা প্রমানিত হয়েছে। পক্ষান্তরে কর্জে হাসানার বিধান সমাজে প্রয়োজন পুরনের জন্যে অর্থ লেনদেনের এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সুযোগ করে দিতে সক্ষম। কর্জে হাসানা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ন উদ্দেশ্য সাধনে সহায়ক । যথা: ক) বেসরকারী খাতে সল্প মেয়াদী বিনিয়োগ কার্যক্রমে সহায়তা। খ) বিত্ত সালিদের ব্যয় প্রবনতা সাময়িক হ্রাস । গ) সুদ ভিত্তিক ঋণের উচ্ছেদ সহ মূল্য স্তরে স্থিতিশিলতা আনায়ন। আমিনুর রহমান ১৯৯৮ দেখিয়েছেন ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে শুরু হওয়া মহিলাদের ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়ার প্রভাব কতটুকু স্থায়ি ও সুদুর প্রসারি হবে তা আশঙ্কাজনক। মহিলাদের দেয়া ঋণের ৬০ শতাংশ পুরুষরাই ব্যবহার করে। এই ঋণ কর্যক্রমের ফলে পরিবারে দন্দ্ব কলহ ও মহিলাদের উপর নির্যাতন বেড়েছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন । একজন দরিদ্র মানুষকে ঋণ দেয়ার পরে এনজিও গুলো কৌশলের সাথে সুদের হার বাড়িয়ে দেয়। ঋণ দেয়ার সময় একটা অংশ কেটে রাখে। সুদের উচ্চহার এনজিও রা যেভাবে ঋণের টাকা উদ্ধার করে তার ব্যপারে জনগনের ভিতরে একটা সাধারন অসন্তোষ রয়েছে।

ঋণ পাওয়ায় সহায়তা করার জন্যে গ্রামের টাউটদেরও সুযোগ তৈরী হয়। মহিলারা ঋণের টাকা এনে উচ্চহারে অন্যদের সুদ দেয়। প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণের অন্যতম প্রবক্তা ড. ইউনুস বলেছেন গ্রামীন ব্যাংক একটা ব্যাংক যা দরিদ্র মানুষকে ঋণ দেয় এটার মালিক গরীব মানুষ। যারা ঋণ নেয় তারাই যদি মালিক হয় তাহলে অন্য বনিজ্যিক ব্যাংক গুলো থেকে যারা ঋণ নেয় তারা ঐ ব্যাংকগুলোর মালিক। প্রকৃত অর্থে তিনি মুনাফা সংগঠিত করার চেষ্টায় নারী মুক্তির নামে গ্রামে মজুদ (বেকার) নারী শ্রমীকদেরকে ব্যবহার করেই নিজের লক্ষ্য উদ্দেশ্য হাসিল করেছেন। কৃষকের বিশেষত: নারী কৃষি শ্রমিকের ঋণলাভের অধিকারকে মানবাধিকার বলে দেয়া ইউনুসের তত্ত্ব নতুন হলেও মহাজনেরা শত শত বছর ধরে এই অধিকারকে স্বীকৃতি দান করে চড়া হারে কৃষকদেরকে ঋণ দিয়ে এসেছে এখনও দিচ্ছে। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে বিশাল আকারে এক সুদি কারবারের পত্তন করা হয়েছে গরিবদের রক্ত নিংড়ে এই ঋণের সুদ ও আসল আদায় করা হয়। ফলে লাখ লাখ মানুষ দূর্দশাগ্রস্ত হন এবং সুদি কারবার দিন দিন স্ফীত হয়। ঋণ শোধ করতে গিয়ে অসংখ্য কৃষকের ঘটিবাটি, ভিটেবাড়ি পর্যন্ত বিক্রি হয়ে যায়। পরিবারে চরম অশান্তি দেখা দেয়। পরিবারে ভাঙন ধরে। গ্রাহকদের আত্মহত্যার খবর সংবাদপত্রে পাওয়া যায়। চট্টগ্রামের জোবরা গ্রামে গ্রামীণ ব্যাংকের আদি পর্বের প্রধান কার্যালয়ের কুঁড়েঘর এখন যে মিরপুরে গ্রামীণ ব্যাংকের পাহাড়ের মতো কেন্দ্রীয় অফিস হতে পেরেছে সেটা সম্ভব হয়েছে এই গ্রামীণ গরিবদের শ্রমশক্তি থেকে উদ্বৃত্ত অপহরণ করেই। গ্রামীন ব্যাংকেরই কার্যক্রম যখন এমন ক্ষুদ্রঋণ দানকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোও যে প্রতিযোগীতায় পিছিয়ে নেই তা সবারই জানা ।

ক্ষুদ্রঋণদাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৃহত্তর স্বার্থে আপন স্বার্থ বিসর্র্জন দিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। কিছু মানুষের কাছে সম্পদ কুক্ষীগত থাকবে আর বাকিরা বিপদ ও বিপন্নে থাকবে এটা হতে দেয়া যৌক্তিকতা নয়। করনীয় হচ্ছে-সামাজিক আন্দোলন সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণে উচ্চসুদের ক্ষতিকর দিকগুলোর ব্যাপারে জনগনকে সচেতন করে তুলতে ব্যাপক প্রচার চালানো। ধর্মে সুদ নিষিদ্ধ এবং এর সাথে ধর্মীয় আবেগ অনুভূতি ও নৈতিক চেতনা জড়িত । তাই ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার আলো চারপাশে ছড়িয়ে দেয়া।ঋণগ্রহীতা নিষ্ঠুর আচরনের শিকার হলে অপরাধীকে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দেয়া।উচ্চসুদ বন্ধ করে দারিদ্র্যের বিরূদ্ধে কার্যতকর পদক্ষেপ নেয়া। সুদভিত্তিক লেনদেন ঋণের ফলে শোষন সার্বিক সামষ্টিক, দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক হওয়ার সুযোগ পায়। তাই ব্যাক্তিগত উদ্যেগের পাশাপাশি যৌথ উদ্যগে ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যাপক কর্জে হাসানা চালু করা। যাকাতের ব্যাপক প্রচলন করলে বৃদ্ধ, কর্মক্ষমতাহীন, অসুস্থ, প্রতিবন্ধি, ও অসহায়দের ভিক্ষাবৃত্তির আশ্রয় নিতে হবেনা। সুদখোররা ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধে উঠে পরের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে পারেনা। ক্ষুদ্রঋণের উচ্চসুদের হারের কারনে সংশ্লিষ্ট মানুষগুলোর জীবনের নূন্যতম স্বার্থকতা কিছু থাকে না। তাদের চিত্তাকর্ষক রঙ্গীন জীবনের অন্তরালে লুকিয়ে আছে চোরাবালির ন্যায় এক র্দুর্ধষ মরন ফাদঁ।

অনেক গবেষকই মনে করেন, শুধু ঋণ সরবরাহ করলেই নারীদের অথনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়। ঋণ গ্রহনের ফলে তাদের মান মর্যাদা বাড়বে এরকম ধারনার সাথে সবাই একমত না। হক (১৯৯৬) মনে করেন, দারিদ্র বিমোচন একটি কঠিন কাজ এ কাজ শুধু ঋণ দিয়ে হবে না সৈয়দ হাসেমী (১৯৯১) মনে করেন, ক্ষুদ্রঋণ সম্পর্কে বাংলাদেশ বিশেষ করে উন্নয়ন চিন্তাধারার ক্ষেএে যে সাধারন প্রশংসা রয়েছে তা কোন যথাপোযক্ত বিশ্লেষন ও বাস্তব তথ্য প্রমান ভিত্তিক নয়। সত্যিকার অর্থে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দুরদ্র মানুষের অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হলে- সবচেয়ে গরীবদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। গরীবদের সংখ্যানুপাতে মোট ঋণের একটি অংশ আগে থেকেই আলাদা করে বরাদ্দ করা বাঞ্চনীয়।সুদ মুক্ত করতে হবে। গরীবদের জন্য স্বতন্ত্র ঋণ কর্মসূচী চালুর পাশাপাশি স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করতে হবে। সঞ্চয় উপকর্মসুচী সহ জরূরী অবস্থার মোকাবেলার জন্য বীমা উপকর্মসূচীও গুরূত্বপূর্ন। অবলোকন ও মূল্যায়ন গুরুত্বের দাবী রাখে। বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সকল পর্যায়ে তত্ত্বাবধান কার্যকরী করা প্রয়োজন।

সুদভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে গ্রামীন ব্যাংক সুদী শোষনের প্রতিষ্ঠানিক কাঠামোয় পরিনত হয়েছে। মহবুব হোসেন দেখিয়েছেন, অকৃষি খাতে রিপিট ঋণের ব্যাপক প্রয়োগের ফলে ঋণের অংক যে হারে বাড়ছে আয় সে হারে বাড়ছেনা। ড. আতিউর রহমান লিখেছেন, ব্যবহার সঠিক না হলে উৎপাদনশীলতা বিনষ্ট হয়। ব্রাকারের পুরুষ সমিতির একজন সক্রিয় কমী মন্তব্য করেছেন, ব্রাক এর শিক্ষা আমরা নিলাম সমিতি করলাম, খাসজমি দখলের ঝগড়া বাধালাম, মারপিট করলাম, মামলা বাধলো জমি বিক্রি করলাম, গরু বেচলাম, ঘর বেচলাম, যার যা ছিল হলাম সর্বসান্ত। ব্রাক শুধুই দেখলো আমরা এখন সর্বহারা। শুধু ব্রাক নয় অন্যান্য ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোরও গঠন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ব্যক্তিতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ । যিনি প্রতিষ্ঠাতা তিনি তাঁর আজ্ঞাবহ ব্যক্তিদের নিয়ে কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করেন। প্রতিষ্ঠাতাই হয়ে যান এনজিও মালিক এবং একচ্ছত্র অধিপতি। ফলে এখানেও সৃষ্টি হয় পরিবারতন্ত্রের অপচ্ছায়া। এনজিওগুলো সমাজের সবচেয়ে নিম্ন আয়ের মানুষদের নিয়ে সবচেয়ে উচ্চ মুনাফার ব্যবসা করেন। অথচ এজন্য তাদের দিতে হয়না ভ্যাট, ট্যাক্স।

নরসীংদীর শিবপুরে ব্রাক থেকে ঋণ নেয়ার পর নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় শবেবরাতের রাএে দুই জন পুলিশ সহ ব্রাক কর্মী স্ত্রীর উপর পুলিশি নির্যাতন করে। মসজিদ থেকে স্বামীকে বেধেঁ খুটির সাথে নির্যাতন করে। ব্রাক কর্মী দেড় কেজি চাল এবং ঋণগ্রহীতার স্ত্রীর প্রায় নতুন একটি শাড়ি নিয়ে কেন্দ্রে যায়। বিবেকের তাড়নায় কর্মীটি ব্রাকের চাকুরী পরের দিন ছেড়ে দেয়। ব্রাক থেকে এক বিধবাকে ঋণ দেয়া হয় ৩ হাজার টাকা প্রথম কয়েক কিস্তি মোটামুটি শোধ করতে পারলেও বিভিন্ন অসুবিধার কারনে অনিয়ম শুরু হয় চাপের মুখে দুটো ছাগল বিক্রি করে। আবার চাপ, বাড়ির একটি আম গাছ বিক্রি করে এতেও শোধ দিতে পারে না কিস্তি। বিধবা ভয়ে পালিয়ে থাকে কদিন। একদিন ধরা পড়ে যান, কর্মীটি রাগে মহিলার চুলের মুঠি ধরে রাস্তায় ফেলে গলার উপর পা তুলে বলে, টাকা না দিলে মেরেই ফেলব। মাএ চারশত টাকার জন্য এ বর্বর অত্যাচার । অবশেষে ঘরের চালের টিন বিক্রি করে রেহায় পেয়েছে মহিলাটি। অথচ এ মহিলার কাছ থেকে সুদে আসলে ৪৫৫০ টাকা আদায় করা হয়েছে। ১৩ আগষ্ট ২০০৫ নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ব্রাকের আরেকটি নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ পায়, ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় গৃহবধু জেলে” শিরনামে। গ্রামীন ব্যাংক, ব্রাক সহ ক্ষুদ্রঋণদাকারী প্রতিষ্ঠান গুলো এ ধরনের কার্যক্রম যখন অহরহ ঘটছে।

মীর হাসান মোহাঃ জাহিদ প্রবাহ এনজিওর পাশবই থেকে দেখিয়েছেন, একজন ঋণগ্রহীতা ১০,০০০/= টাকা ঋণ গ্রহন করলে সার্ভিস চার্জসহ তাকে ৪৮টি সাপ্তাহিক কিস্তিতে ২৫০/= টাকা হারে সর্বমোট ১২০০০/= টাকা পরিশোধ করতে হয়। সেক্ষেত্রে প্রকৃত সুদের হার (Effective Interest Rate ) হয় ৩৯.১৮%। এছাড়াও ঋণ গ্রহীতা প্রতি সপ্তাহে সঞ্চয় হিসাবে ২০/= টাকা করে জমা প্রদান করে। গ্রামীণ ব্যাংকের সহজ ঋণের পাশবই থেকে দেখা যায় যে, ঋণ গ্রহীতা ১০,০০০/=টাকা ঋণ গ্রহণ করলে তাকে ২০০/= টাকার ৫০টি সাপ্তাহিক কিস্তিতে ১১,৫০০/=পরিশোধ করতে হয়। এক্ষেত্রে Effective Interest Rate হয় ২৮.৩০%। এক্ষেত্রেও ঋণ গ্রহীতাকে প্রতি সপ্তাহে ২০/= টাকা হারে সঞ্চয় হিসাবে জমা দিতে হয়। সুতরাং এনজিওগুলো তাদের সুদের হার ১৫% কিংবা ২০% যায়ই বলুক না কেন প্রকৃত সুদের হার তার চেয়ে অনেক বেশী। আর বাংলাদেশে এমন কোন ব্যবসা কিংবা উৎপাদন খাত নেই যেখানে থেকে ৩০%-৪০% লাভ অর্জন করা সম্ভব। তাই সঙ্গত কারণেই এনজিও খেকে ঋণ গ্রহণ করে ক্ষণিকের জন্য একজন মানুষের স্ব-কর্মসংস্থানের (Self-Employment ) সুযোগ সৃষ্টি হলেও স্বাবলম্বী হওয়া একেবারেই দূরহ ব্যপার বটে।

দারিদ্য পিড়ীত মানুষকে স্বাবলম্বী করা, তাদের স্ব-কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা তথা দারিদ্য মুক্ত সমাজ গড়ে তোলাই এনজিও গুলোর মূল শ্লোগান। কিন্তু শুধুমাত্র ঋণ প্রদানের মাধ্যমেই কোন ব্যক্তি স্বাবলম্বী হতে পারে, এ কথা সর্বদায় সত্য নয়। ঋণের পাশাপাশি চাই উদ্যোক্তাকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষিত করা, বিপননের ক্ষেত্রে সহায়তা করা, সর্বপরি ঋণ গ্রহীতার ব্যবসাকে লাভবান করার লক্ষ্যে সার্বিক সহযোগীতা করা। কিন্তু বাস্তবে এ অবস্থাটি কতিপয় ক্ষেত্রে উদাহরণ স্বরূপ দেখা গেলেও বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই এনজিও গুলো ঋণ বিপনন (Loan Marketing) প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। কোন্ খাতে কি কারনে ঋণ দেওয়া হচ্ছে কার্যত: তাদের কাছে সেটি মূখ্য বিষয় নয় । মূলত: ঋণ প্রদান আর সাপ্তাহিক কিস্তি আদায় এ দুয়ের মাঝেই এনজিও গুলোর কর্মকান্ড সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সরচেয়ে বেশি সংখ্যক এনজিও এর কার্যক্রম কুড়িগ্রামে। অথচ সবচেয়ে বেশি দারিদ্রতায় নিপতিত মানুষই আজ সেখানে বাস করে। অথচ প্রতি বছরই সেখানে মঙ্গাঁ হয়। এনজিও গুলো সেখানে নিজেদের উন্নতি ঘটালেও দরিদ্র মানুষের ভাগ্যের উন্নতি ঘটাতে পারেনি। তবুও কি তারা বলবেন, শুধুমাত্র মাইক্রো ক্রেডিট এর মাধ্যমে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটানো যায়।

বেশ কিছু বড় এনজিও রয়েছে যারা আড়ং, গ্রামীন চেক ইত্যাদির মত মধ্যস্বত্ত্ব ভোগী বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে শ্রমিকদেরকে নামমাত্র মজুরী দিয়ে উৎপাদিত পন্য অনেক বেশী মূল্যে বিক্রয় করে অতি মুনাফা লাভ করছে। এতে করে এনজিও দের ঐ সমস্ত প্রতিষ্ঠান অতি মুনাফা অর্জন করলেও তারা দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে সস্তা শ্রমের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর শ্রমিকদের মতই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে মাত্র। শ্রমের বিনিময়ে তারা যে নূন্যতম মজুরী পায় তা দিয়ে কোন রকমে দু’এক বেলা অন্নের সংস্থান হলেও তাদের সন্তানদের চিকিৎসা, লেখাপড়া করানোর সামর্থ্য তৈরী হয় না। ফলে এনজিও গুলোর সম্পদ বাড়লেও শ্রমিক শ্রেণী গরীব শ্রেণীরই প্রসার ঘটায় এবং সামাজিক বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পায়। মুনাফাই প্রধান লক্ষ্য হওয়ায় আশা, ব্র্যাক প্রভৃতি এনজিও গুলো শিক্ষা বানিজ্যের লক্ষ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। আর এক্ষেত্রে তাদের দ্বিমূখী শিক্ষানীতিরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে এনজিও গুলো ভূমিকা রাখলেও তারা তাদের শিক্ষা কার্যক্রমকে এমন ভাবে এগিয়ে নিয়ে যায় না যাতে করে গরীব ছাত্র-ছাত্রীরা তাদেরই প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে পড়া-লেখার সুযোগ পায়। অর্থাৎ গরীব ছাত্র-ছাত্রীদের সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যতীত দারিদ্র বিমোচনে ব্রত এনজিও গুলোর বিশ্ববিদ্যালয়/ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্চ শিক্ষা লাভের তেমন কোন সুযোগ থাকে না। বরং অর্থের অভাবে ঝরে পড়া মেধার বিকাশ এর সুযোগ সৃষ্টির পরির্বতে এনজিও গুলো বিত্তবানের সন্তানদের উচ্চ শিক্ষা লাভের সুযোগ সৃষ্টি করছে মাত্র। বিনিময়ে অর্জন করছে অতি মুনাফা। ইতোমধ্যে তারা ব্যাংকিং খাতেও অনুপ্রবেশ করেছে। গরীব মানুষের নিকট থেকে লুণ্ঠিত সুদের মাধ্যমে অর্জিত উদ্ধৃত্ত মুনাফা কে ক্রমেই তারা বহুমূখী লাভজনক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাঝে সম্প্রসারণ করে চলেছে। এবং অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূলচালিকা শক্তিই তাদের নিয়ন্ত্রনে চলে যাবে। অবশ্য গ্রামীণ ব্যাংকের আজীবন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডঃ ইউনূস বেশ জোর গলায় বলে থাকেন তাদের গ্রাহকরাই গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক। তবে কি সত্যিই গ্রামীণ ব্যাংকের অর্জিত মূনাফা গ্রাহকদের মাঝেই বন্টিত হয়? যদি হয় তবে তা কিভাবে হয় ? তাদের শেয়ারই বা কতটুকু? এ নিয়ে সন্দেহের প্রশ্ন থেকেই যায়। যা হউক বর্তমানে যেভাবে মাইক্রো ক্রেডিট, মধ্যস্বত্ত্বভোগী প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা, শিক্ষা-বাণিজ্য ব্যাংক সহ বিভিন্ন ব্যবসার মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান হারে ব্যক্তি নিয়ন্ত্রিত এনজিও পুজির বিকাশ ঘটছে তাতে এক সময় তারা সমান্তরাল সরকার হিসাবে আর্বিভূত হবে। তখন এনজিও গুলোই হবে সরকারের নিয়ন্ত্রক।

দারিদ্রতার দুষ্টচক্র থেকে মুক্তি পেতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারী-পুরুষরা আশ্রয় নেয় এনজিওগুলোতে। কিন্তু এনজিওগুলোর ক্ষু্দ্র ঋণের ফাঁদে আটকা পড়তে থাকে গ্রামের মানুষগুলো। আসবাবপত্র, ঘরের হাড়ি-পাতিল ও ঘরের টিন বিক্রি করে ঋণের টাকা পরিশোধের চেষ্টা চালায় তারা। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয় না। আশ্রয় নিতে হয় নিজের শরীরের। কিডনি বা লিভার বিক্রি করে মেটাতে হয় এনজিও থেকে নেওয়া ঋণ।তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যখন ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচীর বিস্তারে ব্যস্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, তখন ক্ষুদ্র ঋণের আতুরঘর বাংলাদেশের মানুষরা ঋণ পরিশোধে কিডনি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান ও পরিশোধকে কেন্দ্র গড়ে উঠেছে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চোরাচালানকারীর বিরাট চক্র। সিঙ্গাপুর, কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সম্পদশালীরা নিজের শরীরে কিডনি-লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য চেয়ে থাকছে বাংলাদেশের দিকে। দেশীয় একশ্রেণীর দালাল খুঁজে বের করছে ঋণের ফাঁদে আটকা পরাদের। তারপর বিশাল অংকের অর্থের অঙ্গীকার করে হাতিয়ে নিচ্ছে কিডনি, লিভার। বিসিসির সংবাদমতে, বগুড়ার কালাই উপজেলার ২০০ জন বাসিন্দা ঋণের টাকা পরিশোধে নিজেদের অঙ্গ-প্রতঙ্গ বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। তবে এই দশা কেবল কালাই উপজেলার নয়, সমগ্র বাংলাদেশের। আবার অনেক জায়গায় ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে আত্মহত্যার পথও বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে ঋণগ্রহীতারা। অবশ্য মৃত্যুর পরে মুক্তি মেলে না। অভিযোগ আছে, ঋণের টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত লাশ সৎকার করতে দেয় না সংশ্লিষ্ট এনজিও কর্মীরা। সিডনির ওয়েস্টমুড হাসপাতালের অধ্যাপক ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন সোসাইটির সভাপতি জেরেমি চ্যাপমান বাংলাদেশকে দেখেছেন কিডনির বিক্রির অন্যমত প্রধান বাজার হিসেবে। কিডনি বিক্রির কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষ কিডনি বিক্রি করে কারণ তারা যেকোন মূল্যে ঋণ পরিশোধ করতে চায়। যে কারণে ক্ষুদ্র ঋণের দায়গ্রস্থরা তাদের সবচেয়ে মূল্যবান অঙ্গটি অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশের গরীব মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রির জন্য এনজিওগুলোর ক্ষুদ্র ঋণই দায়ী বলে মনে করেন এই অধ্যাপক।

দাতা দেশসমূহ এবং এনজিওগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পুষ্টি বৃদ্ধিকে দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার পক্ষপাতি। তারা চায়, শিশুরা স্কুলে যাক, কাজ না করুক প্রতিদিন বিশুদ্ধ পানি এবং এক গ্লাস দুধ পান করুন। এ লক্ষ্যে তারা মজুরী বা সাহায্যের আবরণে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বা প্রকল্প অর্থায়ন করে থাকে। তাদের এ সকল কর্মসূচি কল্যাণমূলক এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এ সকল কর্মসূচি টেকসই দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য পর্যাপ্ত নয়। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় এনে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। গ্রামের শিশুরা গরু চরায়, লাকড়ি সংগ্রহ করে, টিউবওয়েল থেকে খাবার পানি আনে। এ সকল কাজের ফলে তারা নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না। প্রায়শ স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভোগে। পুষ্টিজনিত সমস্যাতো লেগেই আছে। দাতা সংস্থার অনুদানের উপর স্থায়ীভাবে এ সকল কর্মসূচির জন্য নির্ভর করা যাবে না।। দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য সম্পদ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি অপরিহার্য এবং এ লক্ষ্যে গৃহীত ব্যবস্থা হতে হবে স্বাবলম্বী। আত্ম-অর্থায়নের (Self-financing ) মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অন্যের দানের উপর দীর্ঘকাল স্থায়ীভাবে নির্ভর করা যায় না।

২০০১ থেকে ২০০৫ সাল নাগাদ দারিদ্র্য হ্রাসের হার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক পরিচালিত গৃহস্থালী জরীপ (Household surve) অনুযায়ী ২০০১ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮.৯ শতাংশ। ক্ষুদ্রঋণ একটি মহাজনি ব্যবসা, সুদসহ আসল না পেলে মহাজন যেমন জমি ও বসতভিটা ক্রোক করে নেয়, তেমনি গ্রামীনব্যাংক কর্মকর্তারা ঠিক সময়ে সুদসহ আসল না পেলে জমিজমা-বসতবাড়ি-টিনের চালা, হাঁসমুরগী-গরুবাছুর, হাঁড়িপাতিল-আসবাবপত্র, নাক-ফুল-অলংকারাদি জোরপূর্বক নিয়ে যায়। এমনি অত্যাচারের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন দোহার থানার অভাগী রাবেয়া, দারিদ্রের দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়ে ক্ষুদ্রঋণে সর্বস্বান্ত হয়ে মারা যান সুফিয়া, এরকম ভুরিভুরি উদাহরণ আমাদের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। এসব শোকগাঁথার সামাণ্যতম ছিটেফোটা তুলে ধরেছেন ডেনমার্কের নামকরা সাংবাদিক টম হেইনম্যান তার বহুল আলোচিত ‘Caught in micro debt ’ প্রামাণ্যচিত্রে। প্রকৃতপক্ষে, ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে গ্রামজনতার দারিদ্র যদি আসলেই বিমোচিত হতো, তাহলে তাদের পরনে নোংরা মলিন ছিন্ন পোশাক থাকতো না, ছেঁড়া গেঞ্জি লুঙ্গি ছেড়ে তারা প্যান্ট শার্ট ধরত, ছেলেমেয়েদের স্কুল-কামাই করে আর বাবার সঙ্গে ক্ষেতে-খামারে হালচাষ করতে হতো না, কৃষিপ্রধান বাংলাদেশ এতদিনে ব্যবসাকেন্দ্রিক শিল্পপ্রধান দেশে পরিণত হতো।

রাজশাহী মহানগর থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সড়কের পাশেই হরিপুর। পদ্মা নদীর তীর ঘেষা এ জনপদে অভাবি মানুষের বসবাস। নদী ভাঙ্গনের কারণে বেশিরভাগ পরিবারই বিপন্ন প্রায়, কর্মসংস্থানের নিশ্চিত কোনো উপায় নেই। ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় হরিপুর ইউনিয়নের কিছু সংখ্যক লোক চোরাকারবারে জড়িত থাকলেও বাকিরা কঠোর পরিশ্রম করে কোনোরকমে দু’মুঠো আহার জোটান। স্থানীয় বাসিন্দা ফিরোজ কবীর জানান, মাত্রাতিরিক্ত এ অভাবের সুযোগ নিয়ে হরিপুরের গ্রামগুলোতে ১০/১২ বছর আগেই গ্রামীণ ব্যাংক ঢুকে পড়ে। পাশাপাশি ভাগ্য পরিবর্তনের প্রলোভন দিয়ে আশা, ব্র্যাক, ঠেঙ্গামারা মহিলা সমিতিসহ প্রায় এক ডজন এনজিও ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম নিয়ে মাঠে নামে। গ্রামীণ ব্যাংক সর্বপ্রথম গ্রামে গ্রামে নারীদের সমন্বয়ে গ্রুপ গঠন ও তাদের মাঝে ঋণ বিতরণ শুরু করে। হরিপুরের ঋণ গ্রহিতা আছিয়া বেগম (২৬), তানজিলা (২৮), আদিনা (৩৪), সুফিয়া খাতুন (৩৫) সহ কয়েকজন গণমাধ্যমকে জানান, চড়া সুদসহ গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে বেশিরভাগ সদস্যাই ব্যর্থ হন। কিন্তু কিস্তির টাকা আদায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কমচারীদের বেপরোয়া আচরণের মুখে ঋণ গ্রহিতারা অন্য কোনো এনজিও বা গ্রামীণ ব্যাংক থেকেই আরও বেশি পরিমাণ ঋণ নিয়ে বকেয়া পরিশোধে বাধ্য হন। গ্রামীণের মহিলা গ্রুপের সদস্য সেলিনা বেগম (৩৮) বলেন, ‘অতিরিক্ত সুদ শোধের লাগ্যা বেশি বেশি কিস্তি (ঋণ) লিয়ে ঠ্যালায় পইর্যােছি।‘ তিনি এখন গ্রামছাড়া। গ্রামছাড়া শুধু এক নাসিমা নন, কিস্তি পরিশোধের ব্যর্থতা ও ব্যাংক কর্মচারীদের অব্যাহত চাপের মুখে দিশেহারা অবস্থায় ঘরবাড়ি ফেলে পালিয়ে গেছেন বেড়পাড়া গ্রামের ফুলী বেগম (৩৫)| স্বামী ভাদু মিয়া। গ্রামীণ ব্যাংকের কিস্তি আদায়কারী কর্মকর্তারা পাওনা আদায়ের জন্য ফুলী বেগমের বাড়ি চড়াও হন এবং অন্য সদস্যদের সহযোগিতায় তার ঘরের টিনের চালা খুলে নিয়ে ৬ হাজার টাকা বিক্রি করে দেন। সোনাইকান্দি গ্রামের মৃত টুকু মিয়ার স্ত্রী লতিফা বেগম (৩০), সালেক মিয়ার স্ত্রী জরিনা খাতুন (৩২), হরিপুরের রীতা বেগম (২৫), পিতা আশরাফ আলী, ববিতা আক্তার (১৬) পিতা বকুল মিয়া। কিস্তি ঋণ নিয়ে ঝুট-ঝামেলার কারণে বকুল মিয়া তার স্ত্রী সেলিনা বেগম (৪০) কে পিটিয়ে বাড়িছাড়া করে তালাক দেন। হরিপুরের ব্যবসায়ি মামুন মিয়া, ইউপি সদস্য মেকাইল হোসেন, স্কুল শিক্ষক তবিবুর রহমানসহ কয়েকজন জানান, প্রতিটা গ্রামেই কিস্তি নেওয়া ৫/৭ টা করে পরিবার গ্রাম ছেড়ে পালানোর নজির আছে। কিস্তি-সুদের ঋণ তাদের জন্য এখন গলায় ফাঁস। শুধু গ্রামীণব্যাংক নয়, অন্যান্য এনজিওগুলোও একই কায়দায় সবাইকে সর্বশান্ত করে চলেছে।

রাজশাহীর বেড়পাড়া সীমান্ত এলাকায় খাটাপাড়া গ্রামের টুলু বেগম। গ্রামীণ ব্যাংকের নথিপত্রে আছে-‘টুলু বেগম (৫২) এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে গবাদিপশুর চমৎকার একটি খামার গড়েছেন, তিনি এখন পুরোপুরি স্বনির্ভর নারী।‘ তাকে সফল খামারি ও ভাগ্য পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত বলেও গর্ব করেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। কিন্তু বাস্তবে খাটাপাড়া গ্রামে টুলু বেগমের বাড়ি পৌঁছে গর্ব করা তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়না। বণ্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সুনামি, টর্নোডোর মতো প্রলয়ংকরী দুর্যোগে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যায় আমার দেশের খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষ। প্রকৃতির রুদ্ররোষ তাদেরকে দমিয়ে রাখতে পারে না। কিন্তু মনুষ্যসৃষ্ট মহাজনি ঋণজালের কারাগার থেকে আমার দেশের গরীবের মুক্তি মেলে না। এ জাল ছিড়ে বের হতে পারে না তারা। এ বড় কঠিন জাল। এ চক্র বড় কঠিন।

দারিদ্র দূরীকরনে দেয়া ক্ষুদ্রঋণের ইসলামী বিকল্পের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার করতে হবে। ঢাকায় আন্তর্জাতিক মানের একটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ সংস্থা ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পর্যালোচনা করবে এবং দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্রের বিরূদ্ধে র্নিদেশনা প্রদান করবে। ইসলামী নীতিমালায় ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইসলামী গ্রামীন ব্যাংক চালু করা যেতে পারে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্রবিনিয়োগ কার্যক্রম ও দারিদ্র দূরিকরনের লক্ষ্যে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা যেতে পারে। এছাড়া- প্রথমত, উদ্যোগ নেয়া উচিৎ এমন কর্মসূচীর । যে পদ্ধতিতে অর্জিত মুনাফার একটা অংশ পাবে সংশ্লিষ্ট এনজিও বাকিটা উদ্যোক্তা। দ্বিতীয়ত, প্রদত্ত বিনিয়োগ হতে হবে যুক্তি সঙ্গত সময়ভিত্তিক। তৃতীযত, স্ত্রী প্রাপ্ত ঋণ তুলে দেয় স্বামীর হতে। এর চেয়ে স্বামীকেই সদস্য করে বিনিয়োগ দিলে সে তখন জবাবদিহিতার জন্য বাধ্য থাকবে। চতুর্থত,কৃষিকে ক্ষুদ্রবিনিয়োগের আওতাভূক্ত করা অর্থকারী শস্য উৎপাদনের জন্য ঋণ প্রদান সময়ের দাবি। পঞ্চমত, প্রকৃত যারা দরিদ্র তাদের ক্ষুদ্রঋণ বলয়ে আনতে হবে। ষষ্ঠত, শহরতলী ও গ্রামঞ্চলের দোকানদার, ব্যবসায় সৃজনশীল ক্ষমতাসম্পন্ন উদ্যেক্তাদের আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। সপ্তমত, ক্ষুদ্রঋণ এত ক্ষুদ্র হওয়া উচিৎ নয় যে, গ্রহীতা উদ্যেশ্য পূরনে তা পর্যাপ্ত বিবেচিত না হয়। অষ্টমত, ক্ষেএ বিশেষে বা মৌসুম বিশেষে বিশেষ ধরনের আর্থিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণের নানাবিধ সীমাবদ্ধতা এর বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে চিন্তাশীল মানবতাবাদী মানুষকে ভাবতে বাধ্য করেছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের রিপোর্টে (এ/৫৩/২২৩) বলা হয়েছে, দারিদ্র বিমোচনের হাতিয়ার হিসেবে ক্ষুদ্রঋণ ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ঋণ পরিশোধের উচ্চহার বা ঋণ গ্রহীতাদের জীবনযাত্রার মানে স্থীতিশীল উন্নতি সম্পর্কে অনেক দাবিই সঙ্গতি পূর্ন বা প্রত্যয়ব্যঞ্জক নয়। রিপোর্টে কৃষি অবকাঠামো স্বস্থ্য স্যানিটেশন ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ন খাত থেকে অপ্রতুল উন্নয়ন সহায়তা ভিন্নখাতে সরিয়ে নেয়ার বিরুদ্ধেও সতর্কবানী উচ্চরন করা হয়েছে। সুদের উচ্চহারসহ লেনদেন ব্যয়ে যদি এমন চাহিদা থাকে যে, সংশ্লিষ্ট ঋণ পরিচালনা থেকে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ লভ্যাংশ আসতে হবে, তাহলে তা অর্থনৈতিক দিক থেকে যথেষ্ট ফলপ্রসূ নয়। স্বল্পতম শর্তযুক্ত উদ্যোগের ঝুকি হলো গৃহীতারা পুজিঁ বিনিয়োগের পরিবর্তে তা খেয়ে ফেলবে।

ক্রেডিট এন্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম ( সিডিএফ) ২০০৫ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, এনজিওদের বিনিয়োগকৃত অর্থের দ্বারা যে সব স্কিম পরিচালিত হচ্ছে তন্মধ্যে মাএ ৩২.৪% স্কিম হচ্ছে উৎপাদনশীল খাতে। এটি নি:সন্দেহে একটি দূর্বল দিক। ২০০৭ সালের মে –জুনে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় এ তথ্য প্রকাশ করা হয় যে, এখন গ্রামঞ্চলে ১৯ শতাংশ পরিবারের প্রত্যেহ খাবার সংস্থান হয়না। ১০ শতাংশ প্রত্যেহ দুবেলাই আহার যোগাড় করতে পারেনা। চরম দারিদ্র জনগোষ্ঠির অন্তত: শতকরা ১৭ শতাংশ পরিবার যারা দারিদ্র্য চক্রের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। বৃত্তভেদ করে বের হওয়ার কৌশল তাদের জানা নেই। বড় অংকের ঋণের পাশাপাশি সমাজের হত দরিদ্র বিশেষ করে কৃষকদেরকে ক্ষুদ্রাকারের ঋণ প্রদানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার বিভিন্ন কর্মসূচী আমাদের দেশে চালু থাকলেও তা আশির দশকের মাঝামাঝি হতে নব্বইয়ের দশকে এসে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচী সাফল্যের নতুন মাএা লাভ করে।

ক্ষুদ্রঋণের প্রয়োজনীয়তা আগেও ছিল এখনও আছে। এটিকে বেশি অর্থপূর্ন, ফলপ্রসূ করতে হলে বিছু পরিবর্তন প্রয়োজন। ক্ষুদ্রঋণ বিতরনে অবৈধ লেনদেন কঠোরভাবে বন্ধ করা উচিৎ । আর সুদমুক্ত হওয়া প্রয়োজন। সারা পৃথিবীতে কিছুকাল যাবৎ মাইক্রোক্রেডিট যে পদ্ধতিতে দারিদ্র বিমোচনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচেছ তার প্রকৃত রূপ হচ্ছে আধুনিক পদ্ধতিতে দাদন ব্যবসা। ১৯৯৭ সালের শেষভাগে বিশ্বব্যাংক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলে, বাংলাদেশের সরকার ও এনজিও সমূহের সবচেষ্টা সত্ত্বেও সর্বসাকুল্যে প্রতিবছর শতকরা দশমিক আটভাগ হারে দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেতেই থাকবে। এই ধরনের পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্ষুদ্রঋণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। কেননা পল্লীর মহিলারা বা মধ্যম ধরনের শহরের অধিবাসীরা এসব ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে ছোট খাট ব্যবসা করতে পারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের দ্বারা পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র বিমোচন মানুষের জীবন মানের উন্নয়ন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায় নি। সমস্যা গুলো চিহ্নিত করে যদি সমাধান করা হয়, ক্ষুদ্রঋণ সংক্রান্ত ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি লোভাতুর মানসিকতা পরিহার করে তবে এটিকে কল্যানকর ফলাফল বয়ে আনতে দেখা যাবে। যেমন-

মালয়শিয়ায় বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষুদ্রঋণ পরিশোধের ক্ষেএে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তাতে দেখা যায়, গ্রামীন ব্যাংকের মতই তারা গরীব লোকদের গ্রুপে বিভক্ত করে এবং গ্রুপগুলোই প্রস্তাবিত ঋণ, তার ব্যয়, ঋণগ্রহীতা ও তার সমস্যা ও গ্রুপের সদস্যদের সাধারন কল্যানের বিষয়ে তদারকি করে। এসব ঋণের জন্য কোন জামিন, জামিন দাতা, সুদ বা মামলা করার প্রয়োজন হয়না। সেখানকার অধিকাংশ ক্ষুদ্রঅর্থসংস্থান প্রতিষ্ঠান স্বনির্ভর নয়। এর কারন হচ্ছে, তাদের কমিশন আয় ব্যায় নির্বাহের জন্য পর্যাপ্ত নয়।

জামাইকাতে যৌথ কর্মসূচীর আওতায় ক্ষুদ্রঋণ সরবরাহের কর্মকাঠামোয় আত্মকর্মসংস্থান কর্মসূচীতে নিয়োজিতদের অধিকাংশই নারী এবং তরূন জনগোষ্ঠি যারা তাদের ব্যবসায়ের উন্নতির জন্য ওই ঋণ ব্যবহার করে। কিন্তু কর্মসূচী সফল হয়নি। কারন হচ্ছে, প্রদত্ত ঋণের ব্যাপারে ভাল তত্ত্বাবধানের অভাব। যোগ্যতা ও বিশেষায়িত জনের অভাব এবং অভিজ্ঞ জনশক্তির অনুপস্থিতি, জনগনের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে দৈন্যতা এবং ঋণের অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থতা।

ইরানে কর্জে হাসানার মধ্যে রয়েছে বাড়ি মেরামত ও বাসা তৈরীর মত পারিবারিক প্রয়োজন মেটানোর ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যায়, পরিশোধে সাহায্য,চিকিৎসা পরিচর্যা ব্যয়,বিবাহের ব্যয় এবং ভোগের দৃষ্টি থেকে অন্যান্য প্রয়োজনীয় ঋণ প্রদান। স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় পুজিঁ ও কর্মেও উপকরন সরবরাহ ক্ষুদ্র উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের আবর্তনশীল পুজিঁ প্রদান এবং অপ্রত্যাশিত প্রাকৃতিক দৃর্যোগে যারা দূর্ভোগের শিকার হয়েছে তাদের প্রয়োজন পূরন করা। ইরানে দারিদ্র হ্রাস করতে গরিব প্রদেশসমূহ ও বঞ্চিত অঞ্চলগুলোর ঋণ ব্যবস্থায় ঋণের বর্ধিত শেয়ারে প্রয়োজনীয় পারিপর্শিক অবস্থা সৃষ্টিাতে সক্ষম হয়েছে। এ থেকে এভাবার সুযোগ নেই শুধুমাএ ক্ষুদ্র ঋণের কর্মকাঠামোয় (কর্জে হাসানা) ঋণ প্রদানের দ্বারাই পুরোপুরি দারিদ্র বিমোচন হতে পারে।

Micro Credit Programme এর মাধ্যমে জনকল্যাণকর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ডঃ ইউনূস ও তাঁর প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। ব্র্যাক পেয়েছে স্বাধীনতা পদক সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরষ্কার। এতসব সম্মাননার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে তাদের কর্মকান্ডের কারণে হত-দরিদ্র জনগোষ্ঠী কিভাবে শোষিত হচ্ছে, আর এনজিও মালিক তথা এনজিও ব্যবসায়ীরা কিভাবে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে । দারিদ্র বিমোচনের নামে রমরমা সুদের ব্যবসা করে অতি মুনাফা অর্জন করাটাকে কখনই সমর্থন করা যায়না।প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে গ্রামীন ব্যাংকের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য নগন্য হলেও গ্রামের লজ্জাবতী নারীদের বের করে আনা এবং পুরুষদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তুলতে সাফল্যতা রয়েছে। এই সাফল্য আমাদের আবহমানকালের মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক আচারের কারনে সুদের প্রতি এদেশের মানুষের স্বাভাবিক একটা ঘৃনা বোধ ছিল। সুদখোরদের সাথে অনেকে আত্মিয়তার সম্পর্ক গড়তে অপছন্দ করতেন। অথচ প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণদারী প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজের রন্দ্রে অনানুষ্ঠানিক মহাজনী প্রথা ছড়িয়ে দিয়ে এ মূল্যবোধকে শেষ করে দিয়েছে। নারী স্বাধীনতার পাশ্চাত্য ধ্যান ধারনা প্রচলনের লক্ষ্যে ক্ষেএ প্রস্তুতের এ অবস্থা তৈরিতে দারুন সাফল্য দেখিয়েছে। প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অযোক্তিক অমানবিক নানান অপতৎপরতা ও জঘন্য কর্মকান্ড একটি উত্তম বিকল্পের প্রয়োজনীয়তাকে বাড়িয়ে তুলেছে। আর প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণের বিকল্প পদ্ধতি হিসাবে ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিভিন্ন সিস্টেম উত্তম হবে এটা নি:সন্দেহে বলা যায়।

ক্ষুদ্রঋণের বানিজ্যিক সাফল্য এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। বাংলাদেশ ছাড়িয়ে এখন বহুদেশে এখন ক্ষুদ্রঋণের বানিজ্যিক তৎপরতা নতুন এক অর্থনৈতিক ক্ষেত্র হিসাবে ক্রমান্বয়ে বিস্তৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন ক্ষুদ্রঋণের মডেল হিসাবে উন্নয়ন অর্থশাস্ত্রেও এবং উন্নয়ন আলোচনায় বিশেষ মনোযোগ লাভ করেছে। ক্ষুদ্রঋণ এখন বিশাল শিল্প,যা মূলধারার অর্থবানিজ্য তৎপরতার অংশ হয়ে গেছে। গ্রামীন ব্যাংক ও মুহাম্মদ ইউনুস পুজিঁ বিনিয়োগের উচ্চমুনাফার এই খরারকাঠ গরিব জনগোষ্ঠীকে বৃহৎ বাজার হিসাবে ব্যবহারের উপায়ের দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠার জন্য কৃতিত্বের দাবিদার। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে যখন ইউনুসের হতে নোবেল প্রথম ঋণ গ্রহীতা সুফিয়ার কবর চাঁদার টাকায়। চরম দারিদ্র্যেও মধ্যে চিকিৎসার অভাবে ধুকেঁ ধুকেঁ মারা গেছেন সুফিয়া। সুফিয়ার এক নাতনিও বিনাচিকিৎসায় মারা গেছেন। টাকার অভাবে বিয়ে হচ্ছে না আর এক নাতনীর। জীর্ন কুটিরে তার দুই মেয়ে হালিমা(৫৫) ও নূর নাহারের (৫০) দিন কাটে অর্ধাহারে,অনাহারে। সুফিয়াদের কল্যানে ড. ইউনুস নোবেল পুরুস্কার পেয়েছেন। অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। অথচ একটি টিউবওয়েল হবার সে সপ্ন আজও পূরন হয়নি। রিষি পল্লী থেকে যে পাড়ার নাম হিলারী আদর্শ পল্লী হয়েছে; সেখান থেকে হিলারী ক্লিনটন চলে গেছেন কিন্তু পড়ে আছে ঋণের বোঝা। নেই কোন টেলিভিশন, নেই কোন বিদ্যুৎ। এই যখন চিত্র, তখন আর বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণের বিকল্প দরকার। প্রতিটি মানবতা কর্মী , দয়া মায়া যুক্ত হ্নদয়ের অধিকারী সচেতন মানুষ গরীবের রক্ত চুষে পাষান মনের কিছু মানুষের কল্যান মেনে নিতে পারে না। দারিদ্র ও অসহায়ত্ব কারো লোভ লালসা পূরন ও স্বার্থ হাসিলের সহায়ক হবে না এটি অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন, বিকেকবান, সচেতন মানুষের প্রত্যাশা।

কার্টেসিঃ আনিসুর রহমান এরশাদ

Leave a Reply