ইসলামি ব্যাংকিং নিয়ে বিভ্রান্তি নিরসন

0
2134

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ কারো কারো মনে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিনিয়োগব্যবস্থা নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। কেউ বলেন, ইসলামি ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে শুধু লাভ নেয়; কিন্তু গ্রাহকের ব্যবসায় ক্ষতি হলে তা বহন করে না। আবার কেউ বলেন, ব্যাংক নির্দিষ্ট হারে বিনিয়োগের বিপরীতে লাভ নিয়ে থাকে, যা সুদের নামান্তর। ইসলামি বিনিয়োগপদ্ধতি সম্পর্কে স্বল্প ধারণা বা নিছক অনুমানের ভিত্তিতেই অনেকে এজাতীয় নানা মন্তব্য করে থাকেন।

ইসলামি ব্যাংকের বিনিয়োগপদ্ধতি প্রধানত তিনটি মূলনীতির ভিত্তিতে হয়ে থাকে। এগুলো হলো- ক্রয়-বিক্রয় নীতি, অংশীদারিত্বের নীতি এবং ভাড়াদান নীতি। ক্রয়-বিক্রয় নীতির আওতায় বাকি বিক্রি (বাই মুয়াজ্জাল), মুনাফার ভিত্তিতে বিক্রি (বাই মুরাবাহা), অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয় (বাই সালাম ও বাই ইস্তিসনা) ইত্যাদি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এই নীতির মূল কথা হলো, গ্রাহকের পক্ষে তার প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করে ক্রয়মূল্যের সাথে আনুষঙ্গিক খরচ, সেইসাথে যুক্তিসঙ্গত এবং ব্যাংক ও গ্রাহকের সম্মতির ভিত্তিতে নির্ধারিত মুনাফা যোগ করে বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে তা গ্রাহকের কাছে বিক্রয় করা হয়। একজন খুচরা ব্যবসায়ী যখন কোনো পণ্য পাইকারি বিক্রেতার কাছ থেকে বাকিতে ক্রয় করে, তখন টাকা পরিশোধের একটা সময় নির্ধারণ করে দেয়। পরে খুচরা ব্যবসায়ী ওই পণ্য বিক্রি করে যদি ক্ষতির সম্মুখীন হন, তাহলে পাইকারি বিক্রেতা ওই ক্ষতির অংশ নিতে মোটেও বাধ্য নন।

কারণ এখানে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে, লাভ-ক্ষতির অংশ নেয়ার কোনো চুক্তি সম্পাদিত হয়নি এবং ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথেই তাদের মধ্যে দেনাদার ও পাওনাদারের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেহেতু ব্যাংক এখানে ক্রয়-বিক্রয় নীতি মেনে গ্রাহকের সাথে পণ্য কেনাবেচা করে, তাই তা মোটেও শরিয়াহপরিপন্থী হতে পারে না। ভাড়া বা ইজারা পদ্ধতিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সম্পদের ভাড়া হিসেবে ব্যাংক মুনাফা নিয়ে থাকে বিধায় তা শরিয়াহপরিপন্থী নয়। শুধু অংশীদারিত্বের নীতিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে লাভ-ক্ষতি বণ্টন হয়ে থাকে; কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইসলামি ব্যাংকগুলো মুশারাকা বা মুদারাবা ব্যবসায়ে এখনো বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে শুরু করেনি বলা যায়।

ব্যাংকিং লেনদেনের ধারণা প্রাচীন হলেও আধুনিক ব্যাংকিং ধারণার উদ্ভব মূলত দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ১১৫৭ খ্রিষ্টাব্দে ভেনিসে প্রথম ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এই সময়ের অর্থব্যবস্থা মূলত সুদভিত্তিক হওয়ার কারণে সুদভিত্তিক ব্যাংকব্যবস্থা গড়ে ওঠে। অ্যাডাম স্মিথ, রিকার্ডো, উইলিয়াম সিনিয়রসহ বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদেরা সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন। বর্তমান বিশ্বে ব্যাংকব্যবস্থা ছাড়া আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা প্রায় অসম্ভব। প্রযুক্তির এ উৎকর্ষের যুগে অনলাইন ব্যাংকিং, প্লাস্টিক মানি, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের উদ্ভব হওয়ায় ব্যাংকব্যবস্থা ছাড়া বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অচল।

ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে সুদ সম্পূর্ণরূপে হারাম বা নিষিদ্ধ হওয়ায় মুসলমানেরা সুদভিত্তিক ব্যাংকব্যবস্থা মনেপ্রাণে কখনোই গ্রহণ করতে পারেনি। অপর দিকে, এর বিপরীতে শক্তিশালী কোনো বিকল্প তুলে ধরতেও পারেনি। বেশির ভাগ মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চল বা দেশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকার কারণে মূলত স্বাধীনতা দাবির আন্দোলন মুখ্য হয়ে ওঠে। তবে বিচ্ছিন্নভাবে ইসলামি ব্যাংকিংব্যবস্থার ধারণা মুসলিম পণ্ডিতেরা কল্পনা করতে থাকেন এবং বিশ শতকের প্রথম দিকে বিভিন্ন মুসলিম মনীষী ইসলামি ব্যাংকিংয়ের চিন্তা ও কাঠামোগত ধারণা পেশ করেন। ষাটের দশকে বেশির ভাগ মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকা বা দেশ স্বাধীনতা লাভ করায় ইসলামি ব্যাংকের কাঠামোগত ধারণা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভের পথে অগ্রসর হয়। এরই ধারাবাহিকতায় মিসরের ড. আহমাদ আল নাগগার প্রতিষ্ঠা করেন মিত্গামার ইসলামি সেভিংস ব্যাংক, মালয়েশিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় তাবুং হাজী। মিসরের ব্যাংকটি ১৯৬৭ সালে বন্ধ হয়ে গেলেও থেমে যায়নি ইসলামি ব্যাংকিং নিয়ে গবেষণা।

১৯৭৪ সালে ইসলামি সম্মেলন সংস্থাভুক্ত দেশগুলো শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সনদ স্বাক্ষর করেছিল এবং ওই সনদের ভিত্তিতেই ১৯৭৫ সালে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক যাত্রা শুরু করে। ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন দেশে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং ধারার প্রচলন শুরু হয় এবং দেশে বর্তমানে আটটি ব্যাংক পূর্ণাঙ্গরূপে ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

রিবা সম্পর্কিত, আল কুরআনের সূরা রুমের ৩৯ নম্বর আয়াতটি রাসূল সা:-এর হিজরতের পাঁচ বছর আগে মক্কায় নাজিল হয়- ‘মানুষের ধন সম্পদে তোমাদের ধন সম্পদ বৃদ্ধি পাবে, এই আশায় তোমরা সুদে যা কিছু দাও, আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায় না। পক্ষান্তরে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পবিত্র অন্তরে যারা দান করে থাকে, তারাই আল্লাহর সমীপে বর্ধিত করতে থাকবে।’

এখানে আল্লাহ তায়ালা শুধু বলেছেন, সুদের কারণে সম্পদের বৃদ্ধি হয় না, যদিও মানুষ তা মনে করে। মদিনায় হিজরত করার পর ইহুদিরা যে অন্যায়ভাবে সুদ খাচ্ছে, সে ব্যাপারে বর্ণনা করা হয়। ‘আর এ কারণে যে, তারা সুদ গ্রহণ করত, অথচ এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল এবং এ কারণে যে, তারা অপরের স¤পদ ভোগ করত অন্যায়ভাবে। বস্তুত, আমি কাফেরদের জন্য তৈরি করে রেখেছি বেদনাদায়ক আজাব’ (সূরা নিসা-১৬১)। উহুদ যুদ্ধের পর সুদ না খাওয়ার বিষয়ে প্রথম নির্দেশনা নাজিল হয়। ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাকো, যাতে তোমরা কল্যাণ অর্জন করতে পারো’ (সূরা আল ইমরান-১৩০)। চতুর্থ ধাপে এসে সূরা বাকারার ২৭৫ও ২৭৬ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে সুদকে সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।

ইসলামে দুই প্রকার রিবার কথা বলা হয়েছে। প্রথম প্রকার হলো, রিবা আন-নাসিয়াহ বা মেয়াদি সুদ। এটা হলো প্রকৃত সুদ বা প্রাথমিক সুদ। কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে এ ধরনের সুদকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইমাম আবু বকর জাসসাস ও আল রাজি রিবা আন নাসিয়ার যে সংজ্ঞা দিয়েছেন, তা হলো- যে ঋণ পরিশোধের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদ দেয়া থাকে এবং মূলধনের অতিরিক্ত প্রদানের শর্ত থাকে, সেটাই রিবা আন-নাসিয়াহ। রিবা আল ফজল হারাম হওয়ার বিষয়টি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।

প্রখ্যাত সাহাবি আবু সাঈদ খুদরি রা: বলেন, একদা বিলাল রা: রাসূলে করিম সা:-এর সমীপে উন্নত মানের কিছু খেজুর নিয়ে হাজির হলেন। রাসূলুল্লাহ সা: তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথা থেকে এ খেজুর আনলে? বিলাল রা: উত্তর দিলেন, আমাদের খেজুর নিকৃষ্ট মানের ছিল। আমি তার দুই সা’-এর বিনিময়ে এক সা’ উন্নত মানের বারমি খেজুর বদলিয়ে নিয়েছি। রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, ওহ! এত নির্ভেজাল সুদ। এরূপ কখনো করো না। তোমরা যদি উত্তম খেজুর পেতে চাও, তাহলে নিজের খেজুর বাজারে বিক্রি করবে, তারপর উন্নত মানের খেজুর কিনে নেবে। যেহেতু বর্তমান ব্যাংকিংয়ে ঋণের বিপরীতে সময় বেঁধে দিয়ে সুদ নেয়া হয়, সেহেতু তা রিবা আন-নাসিয়ার অন্তর্গত, যা কুরআনের আয়াত দ্বারা নিষিদ্ধ হয়েছে।

আবার অনেকে মনে করেন, কুরআন ও হাদিসে যে রিবার উল্লেখ আছে, তার অর্থ ব্যক্তিগত পর্যায়ে পারিবারিক প্রয়োজন পূরণের জন্য দেয়া ঋণ, যাকে প্রচলিত ভাষায় মহাজনী সুদ বা উসারি বলা হয়; কিন্তু আজকের দিনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কর্তৃক প্রদেয় ঋণ উৎপাদন ও মুনাফাভিত্তিক খাতে দেয়া হয়। এখানে ঋণগ্রহীতা ব্যাংকের টাকা দিয়ে ব্যবসায় করে নিজে লাভবান হন। তা ছাড়া এ জাতীয় সুদ হলো ব্যবসায়িক বা তেজারতি সুদ যা ব্যবসায়িক লেনদেনের মতোই উভয়ের সম্মতিক্রমে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে, কোনো জবরদস্তি থাকে না, সুদের হার যথেষ্ট কম, এর মাধ্যমে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়, অর্থনীতির চাকা হয় গতিশীল। তাই এ জাতীয় সুদ ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। তাদের এ যুক্তি একেবারেই অসার ও ভুল। কারণ, জাহেলি যুগে ব্যবসাবাণিজ্যের জন্য রীতিমতো পুঁজি লগ্নি করা হতো এবং সে জন্য সুদ আদায় করা হতো।

সে সময়ে অনেকেই আজকের মতো ফার্ম খুলে এজেন্ট নিয়োগ করে সুদে পুঁজি খাটাত। এদের মধ্যে রাসূল সা:-এর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব ও বনু মুগিরার বিশেষ প্রসিদ্ধি ছিল। তাদের আদায়কৃত সুদকে আরবিতে রিবা বলা হতো। রাসূল সা: তাঁর চাচার সুদি কারবার বন্ধ করে দেন এবং খাতকের কাছে প্রাপ্য বকেয়া সুদ রহিত করে দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং নিয়ে অনেকের মধ্যে আজো ভুল ধারণাই বেশি। বিশেষ করে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিরোধিতা করার জন্যই অনেক সময় অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিও দায়িত্বহীন মন্তব্য করে থাকেন। তারা এমন কথাও বলেছেন, ইসলামি ব্যাংকিং একটি প্রতারণা। প্রচলিত সুদ নাকি নিষিদ্ধ নয়, বরং চক্রবৃদ্ধি হারে যে সুদ হয়, তাই ইসলামে নিষিদ্ধ। আরবি ‘রিবা’ শব্দের অর্থ নাকি সুদ নয়। ইসলামি ব্যাংকিং হয়তো বা অনেকেই পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে পারছেন না।

তাই বলে একে প্রতারণা বলাটা শুধু হাস্যকর নয়, স্ববিরোধীও বটে। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ইতোমধ্যে ইসলামি ব্যাংকিং গাইডলাইন প্রকাশ করা হয়েছে এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে কোনো ব্যাংক কোম্পানি, উহাকে প্রদত্ত বা উহা কর্তৃক রক্ষিত জামানত আদায়ের ক্ষেত্র ছাড়া, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো পণ্যের ক্রয়, বিক্রয় বা বিনিময় ব্যবসা করিবে না, অথবা আদায় বা কারবারের জন্য প্রাপ্ত বিনিময় বিলসংক্রান্ত কারণ ব্যতীত, অন্যের জন্য কোনো ব্যবসায় বা কোনো পণ্য ক্রয়, বিক্রয় বা বিনিময়ে লিপ্ত হইতে পারিবে না, তবে শর্ত থাকে যে, ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক পরিচালিত ব্যাংক কোম্পানি কর্তৃক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে স্বীকৃত ইসলামিপদ্ধতি অনুসরণপূর্বক মালামাল বা পণ্য ক্রয়, বিক্রয় বা বিনিময়ের ক্ষেত্রে এই ধারার কোনো কিছুই প্রযোজ্য হইবে না। অর্থাৎ বর্তমান ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আইনের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ছাড়া বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সুদমুক্ত জীবন যাপন করা মোটেও সম্ভব নয়। তাই প্রত্যেক মুসলমানকেই ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করতে হবে।

লেখক: মোঃ মিজানুর রহমান
সিনিয়র ব্যাংকার, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লি:

Leave a Reply