সফট স্কিল কি? সফট স্কিলের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

0
999

আপনি যখন কোন চাকরী খুজছেন, বা ইন্টার্ভিউ দিতে যাচ্ছেন বা কোন প্রতিষ্ঠানে চাকরী করছেন, তখন ২ ধরনের স্কিল বা দক্ষতা খুবই গুরুত্তপূর্ন; ‘হার্ড স্কিল’ এবং ‘সফট স্কিল’। হার্ড স্কিল হলো আপনার পেশাগত দক্ষতা যেটা পরিমাপ করা যায় কিন্তু দেখা যায়। যেমন আপনি যদি একজন গ্রাফিক্স ডিজাইনার হন, তাহলে বিভিন্ন সফটওয়ার ব্যবহার করে ডিজাইন করাটা আপনার হার্ড স্কিল। আর সফট স্কিল হলো আপনি কাজটা করতে গিয়ে কত সৃজনশীলভাবে চিন্তা করতে পেরেছেন, একটি দলে থেকে কিভাবে দলবদ্ধভাবে কাজটি করেছেন বা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আপনার কাজ সম্পর্কে আপনার ক্লায়েন্ট বা বসকে আপনি কতটুকু সাবলীল এবং সঠিকভাবে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন, আপনি কিভাবে মানুষের মতামত গ্রহন করেছেন, কোন সমস্যা হলে সেটা কিভাবে সমাধান করেছেন ইত্যাদি। এখনকার অনেক প্রতিষ্ঠান হার্ড স্কিলের থেকে সফট স্কিলকে গুরুত্ব দিচ্ছে। আসুন চাকরিতে উন্নতি করা কিম্বা চাকরির ইন্টার্ভিউ দেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ন কিছু সফট স্কিল সম্পর্কে জেনে নেই।

যোগাযোগ দক্ষতা
আপনার অবস্থা যদি হয় ‘বুক ফাটে তো মুখ ফাটেনা’ টাইপ, আপনি হার্ড স্কিলে যতই দক্ষ হন না কেন, দিন শেষে ‘অমুকের বসের সাথে ভালো সম্পর্ক তাই তার বেতন বাড়ছে, প্রমোশন হইছে, আর আমার কিছু হইলো না’ সান্ত্বনা নিয়ে ঘরে ফিরতে হবে। বলার থেকে শুনুন এবং বুঝুন, নন-ভার্বাল কমিউনিকেশন, বডি ল্যাংগুয়েজ মানে শারীরিক ভাষার দক্ষতা বাড়ান, গল্প বলতে শিখুন, উপস্থাপনা দক্ষতা বাড়ান, সঠিকভাবে লিখতে শিখুন, সাবলীলভাবে কথা বলুন, হাসতে শিখুন। শেষেরটা খুব গুরুত্বপূর্ন, ‘হাস গায়া তো ফাঁস গায়া’। কোন আলোচনা সাবলীল হাসির মাধ্যমে শুরু করা এবং সেটা ধরে রাখা মানে ধরে নিন আপনার কথা মানুষ খাবে।

ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং
কুটিল চিন্তা ভেবে ভুল বুঝবেন না। একটি কোমল পানীয়র বিলবোর্ডের একটি দৃশ্যের কথা বলি। যেখানে কয়েকটি চিত্র পাশাপাশি দেখানো হয়েছে। প্রথম চিত্রে একজন নিস্তেজ যুবক মরুভূমি দিয়ে হেটে যাচ্ছে, পিপাসায় কাতর। দ্বিতীয় চিত্রে দেখা যাচ্ছে সে পেপসির একটি ক্যান খুজে পায় মরুভূমিতে। তৃতীয় চিত্রে দেখা যায় যুবক এখন সতেজ, কারন সে পেপসি খেয়েছে। একই বিলবোর্ড ইউরোপিয়ান দেশ এবং আরব দেশে স্থাপন করা হলো। দেখা গেলো, ইউরোপিয়ান দেশগুলোতে পেপসির বিক্রি হূহূ করে বাড়ছে কিন্তু আরব দেশগুলোতে বিক্রি হূহূ করে কমছে! কারন আরব দেশের লোকেরা উল্টো দিক থেকে পড়া বা লেখা শুরু করে! তার মানে তারা তৃতীয় চিত্র থেকে শুরু করেছে। আপনার বস যদি আপনাকে বলে এটা কেনো হলো? এইখানে হলো ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং বা বিশ্লেষণমূলক চিন্তার জায়গা। আপনাকে পুরো সমস্যাটা বিশ্লেষণ করতে হবে, সমস্যাটা সমাধানের জন্য গবেষণা করতে হবে, আপনার শেখার আগ্রহ থাকতে হবে, আপনার চিন্তাগুলো যৌক্তিক হতে হবে এবং আপনাকে গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়েও চিন্তা করতে হবে।

লিডারশীপ বা নেতৃত্বদান
ধরুন একটি অফিসে দুইজন সহকর্মীর মাঝে ঝগড়া হয়েছে। খেয়াল করে দেখবেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তৃতীয় একজন এসে ব্যাপারটা মিটমাট করে দেয়। ওই একই ব্যক্তি দেখবেন অফিসের বিভিন্ন কমিটিতে আছে। কোন প্রোগ্রাম হলে দেখবেন তাকে খোজা হচ্ছে। কখনো ‘ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং’ করে দেখেছেন কেনো ওই নির্দিষ্ট ব্যক্তি সব জায়গায় প্রাধান্য পাচ্ছেন? যদি বিশ্লেষণ করা শুরু করেন তাহলে খেয়াল করবেন তার ভিতরে এই গুনগুলো আছে; কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্ট এবং নেগোসিয়েসন, মানুষকে বোঝানো, গুরুত্বপূর্ন সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া, কোন কাজের সমন্বয় করা, সঠিক পরামর্শ দেয়া, আশেপাশের সবাইকে অনুপ্রানিত করা, ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে কাজ করা, পর্যবেক্ষন করা, বিপদে পাশে এসে দাঁড়ানো, সবার সাথে বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক করা ইত্যাদি। কেও নেতা হয়ে জন্মায় না, এটা শিখে নিতে হয়।

ইতিবাচক মনোভাব
ধরেন অফিসের বস কোন একটা কারনে আপনার উপরে রেগে আছে, আপনার ডাক পড়েছে। আপনি রুমে গেলেন, বাকিটুকু ওয়াশিং মেশিনের আত্মকথা! ধোলাই খেয়ে কেবল সিটে বসেছেন, এমন সময় আপনার সহকর্মী এসে বলল, ভাই দেখেন ফেসবুকে আমার এই ছবিটা হেভভি হিট হইছে, ২৬১টা লাইক পড়ছে। অবশ্য কয়েকজন হা হা রিয়্যাক্ট দিছে, লাভ ও কিন্তু দিছে অনেকে। আপনার মনে যেটা আসবে- উনার কানের এক ইঞ্চি নিচে বসিয়ে একটা চটকনা আর মুখে যেটা আসবে-খুব ব্যাস্ত আছি, এইসব ফালতু জিনিশ দেখার আমার টাইম নাই। আপনি ভুল করছেন। আপনি যদি তার ছবিটি দেখতে আগ্রহ বোধ না করেন তাহলে তাকে সেটা ইতিবাচকভাবে বোঝান। যেমন, আপনি বলতে পারেন চলেন আমি আর আপনি মিলে একদিন একটা সেলফি তুলে আপ্লোড দেই, তারপরে দেখি কোন ছবিটে লাইক বেশি। আপনার টা না আমাদের দুইজনেরটা। এক ঢিলে কয়েক ডজন পাখি মারা হয়ে গেলো। একজন দক্ষ কর্মী হিসেবে আপনার ভিতরে যেইসব ইতিবাচক গুনগুলো থাকা বাঞ্ছনীয় এবং অপরিহার্য্য সেগুলো হলো; আত্মবিশ্বাস, সহযোগিতার মনোভাব, ভদ্রতা, আগ্রহ, উৎফুল্লতা, বন্ধুসুলভ আচরণ, সততা, সম্মান দেখানো, হাস্যরসবোধ ইত্যাদি।

দলগতভাবে কাজ করা
চাকরির ইন্টার্ভিউ দিতে যেয়ে দেখেছি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন কমন পাওয়া যায়-আপনার টিম ওয়ার্ক অভিজ্ঞতার উদাহরণ দিন বা টিমে সমস্যা দেখা দিলে কিভাবে সমাধান করবেন? উনি কি আমার থেকে বেশি জানেন বা উনি কি আমার থেকে বেশি পারেন ধারনা থেকে বেরিয়ে আসুন। ধরুন একটি ঠেলাগাড়ি ঠেলে ফার্মগেট থেকে গুলিস্থানে নেবেন। ৬ জন মানুষ নিয়োজিত করা হলো ঠেলার জন্য। ৩ জন মিলে সামনের দিকে ঠেললেন আর ৩ জন মিলে পিছনের দিকে। জায়গার মাল জায়গায় থাকবে। বা ধরুন ৪ জন মিলে সামনের দিকে ঠেললেন আর ২ জন মিলে পিছনে। যেই সময়ে আপনাদের লক্ষ্যে পৌছানোর কথা তার থেকে দেরিতে পৌছাবেন। ৬ জন মিলে দলগতভাবে কাজ করলেই সঠিক সময়ে সঠিক লক্ষ্যে পৌছাবেন। দলগতভাবে কাজ করতে হলে একজন টিম মেম্বার হিসেবে আপনার যে গুনগুলো থাকা প্রয়োজন তা হলো; অপরের মতামত গ্রহন করার ক্ষমতা, সহযোগিতার মনোভাব, অপরের প্রতি সহানুভূতি, ধর্ম, বর্ন বা কালচারের ভিত্তিতে বিভাজন না করা ইত্যাদি।

আরো কিছু গুরুত্বপূর্ন সফট স্কিল হলো- প্রেসার নিয়ে কাজ করা, নমনীয়তা, সময় ব্যবস্থাপনা, দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা, প্রো-অ্যাক্টিভ হয়ে কাজ করা এবং ইমোশনাল ইন্টিলিজেন্সি। এই লেখাটি লিখতে গিয়ে আমাকে দুয়েকটি বই পড়তে হয়েছে, ইন্টারনেটে অনেকগুলো লেখা পড়তে হয়েছে, কয়েকটি গবেষণাপত্র পড়তে হয়েছে। মূল কথা আমাকে প্রথমে শিখতে হয়েছে। শেখার আগ্রহ থাকা আরো একটি সফট স্কিল। আপনার প্রশ্ন হতে পারে ভাই, আমি অমুক দক্ষ্যতা কিভাবে বাড়াবো? আমি যে কাজগুলো করেছি সেগুলোই আপাতত করুন। আপনি ভাবতে পারেন, আমার ভিতরে তো অমুক সফট স্কিল নাই। সফট স্কিল নিয়ে কেও জন্মায়না, এটা প্রতিদিনের অভ্যাস, চর্চা আর শেখার আগ্রহ থেকে তৈরি হয়।

Country: Masud Rana

Leave a Reply