MICR চেকের সংজ্ঞা, MICR চেকের বৈশিষ্ট্য এবং MICR চেকের সুবিধা ও অসুবিধা সমূহ

2
28469

ব্যাংক ক্লিয়ারিং-এর জন্য MICR চেককে নিরাপদ এবং সময় সাশ্রয়ী মনে করা হয়। MICR চেকের ব্যবহার ব্যাংকের কার্যক্রমকে গতিশীল করে। মূলত এ চেক ব্যাংকের আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়ার একটি অংশ।

• MICR চেক
MICR হলো Magnetic Ink Character Recognition। “MICR” শব্দটিকে কখনো কখনো “micker” বলা হয়। MICR চেক ব্যাংক লেনদেনের জন্য নিরাপদ এবং সময় সাশ্রয়ী। MICR চেকের ব্যবহার ব্যাংকের কার্যক্রমে গতিশীলতা নিয়ে আসে। মূলত MICR চেক ব্যাংক আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়ার অন্যতম একটি অংশ।

• MICR চেক ১৯৫০ এর দশকের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রে সর্ব প্রথম উদ্ভব হয়। ১৯৫৯ সালের শেষের দিকে প্রথম MICR চেকের ব্যবহার শুরু হয়। বাংলাদেশে এর প্রচলন শুরু হয় ২০১০ সালের ১ নভেম্বর থেকে। MICR চেকের প্রচলন বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে বিশেষ করে ব্যাংক ক্লিয়ারিং এর ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা করেছে।

• MICR একটি প্রযুক্তি যার মাধ্যমে চেকের বৈধতা যাচাই করা যায়। MICR চেকে চুম্বকীয় কালি (Magnetic Ink) ব্যবহার করা হয়। এ চেক স্ক্যান করার সময় এর চুম্বকীয় ডিজিট কম্পিউটার নির্দিষ্ট সফটওয়্যারের মাধ্যমে পড়ে নেয় এবং ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করে।

Wikipedia-তে বলা হয়েছে-
MICR code is a character-recognition technology used mainly by the banking industry to ease the processing and clearance of cheques and other documents.
অর্থাৎ MICR চেক এবং অন্যান্য নথি প্রক্রিয়াকরণ এবং ক্লিয়ারিং এর জন্য ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রি কর্তৃক ব্যবহৃত একটি অক্ষর-স্বীকৃতি প্রযুক্তি।

• MICR এনকোডিং কে সাধারণত MICR লাইন বলা হয়। চেকের নীচে সাধারণত ডকুমেন্ট-টাইপ ইঙ্গিতকারী, ব্যাংক কোড, ব্যাংক একাউন্ট নম্বর, চেক নম্বর এবং একটি নিয়ন্ত্রণ সূচক বহন করে। প্রযুক্তিটি MICR পাঠকদেরকে তথ্য সংগ্রহ ডিভাইসে সরাসরি স্ক্যান করতে এবং তথ্য পড়তে দেয়। MICR এর ফন্ট E-13B ISO 1004 ১৯৯৫ সালে আন্তর্জাতিক মান হিসাবে গৃহীত হয়েছে। তবে কোন কোন দেশে CMC-7 ফন্ট ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এই ফন্টগুলো সাধারণত চেক জালিয়াতি সনাক্ত করতে সাহায্য করে।

• কেউ যদি MICR চেকের ফটোকপি করে ব্যাংকে ক্লিয়ারিং-এর জন্য জমা দেয় তবে উক্ত চেক সহজেই জাল হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ফটোকপি করা জাল চেকে চুম্বকীয় কালি (Magnetic Ink) থাকতে পারে না। এ চেকে ব্যবহৃত সংখ্যাভিত্তিক কোড মানুষ সহজেই পড়তে ও বুঝতে পারে। এ চেকের নিচের দিকে ৪ টি অংশে চুম্বকীয় কালি ডিজিট থাকে। এ চেকে ডিজিটের পাশাপাশি কিছু চিহ্ন ব্যবহার করা হয়।
– প্রথম অংশে থাকে চেক নম্বর যা ৭ ডিজিটের হয়ে থাকে।
– দ্বিতীয় অংশে থাকে রাউটিং নং যা ৯ ডিজিটের হয়ে থাকে।
– তৃতীয় অংশে থাকে হিসাব নম্বর যা ১৩ ডিজিটের হয়ে থাকে।
– চতুর্থ অংশে থাকে ট্রানজ্যাকশন কোড যা ২ ডিজিটের হয়ে থাকে।
– একটি MICR চেকে মোট ডিজিটের সংখ্যা (৭+৯+১৩+২)=৩১ টি।

• রাউটিং নম্বরে ব্যবহৃত হয় ৯ টি ডিজিট। যার প্রথম ৩ টি ডিজিট উক্ত ব্যাংকের, দ্বিতীয় ২ টি ডিজিট জেলার এবং শেষের ৪ টি ডিজিট উক্ত শাখার পরিচয় তুলে ধরে। চেক স্ক্যান করার সময় ৩১ টি ডিজিটের কোন একটি ডিজিট ভুল বা মিসিং হলে উক্ত চেক পাশ হবে না। রাউটিং নং-এ ব্যবহৃত হয় ৯ টি ডিজিটের কোন একটি ডিজিট ভুল হলে চেক সঠিক শাখায় না যেয়ে অন্য শাখায় চলে যেতে পারে। আবার অন্য ব্যাংকেও চলে যেতে পারে। তাই প্রতিটি পর্যায়ে সাবধানতা অবলম্বনের প্রয়োজন রয়েছে।

• উদাহরণ স্বরূপ, যদি আপনার ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড এ একটি অ্যাকাউন্ট থাকে তবে তার নয় সংখ্যার MICR কোড হবে 125101792 যেখানে-
– প্রথম তিনটি সংখ্যা 125, ব্যাংক (IBBL) কোড;
– পরবর্তী দুইটি সংখ্যা 10, জেলার (বগুড়া) কোড; এবং
– শেষ চারটি সংখ্যা 1792, ব্যাংক শাখা (মহাস্থানগড়) কোড।

• MICR Cheque এর বৈশিষ্ট্য সমূহ
MICR চেকে নিম্নলিখিত Feature বা বৈশিষ্ট্য সমূহ থাকে-
* একোয়া নিরাপত্তা কালি- পানি ভিত্তিক নিরাপত্তা কালি যা জলছাপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যা শুধুমাত্র অনুমোদিত চেক প্রিন্টার্স এ পাওয়া যায়।
* দ্রাবক নিরাপত্তা কালি- দ্রাবক ভিত্তিক নিরাপত্তা কালি যা রং পরিবর্তন করার জন্য ব্যবহার করা হয়, যার মধ্যে আয়রন অক্সাইডের কণা মেশানো থাকে।
* অদৃশ্য অতিবেগুনী জটিল প্যাটার্ন- এমন প্যাটার্ন যা শুধুমাত্র অতিবেগুনী আলোর অধীনে দেখা যাবে।
* স্ট্যান্ডার্ড নিরাপত্তা ব্যাকগ্রাউন্ড নকশা- স্ট্যান্ডার্ড ডিজাইন জটিল হতে হবে। কিন্তু গ্রাহকদের ব্যক্তিগত লোগোর সাথে নয়।
* MICR ব্যান্ড- MICR কোড লাইন চৌম্বক কালি হতে হবে।
* মাইক্রো টেক্সট প্রিন্টিং- খালি চোখে লাইনগুলো সহজে বোধগম্য নয়। কিন্তু টেক্সট ম্যাগ্নিফিকেশন এর অধীনে ভাল ভাবে দেখা যায়।
* অকার্যকর প্যান্টোগ্রাফ- লুকানো/ এম্বেডকৃত “VOID” বৈশিষ্ট্য সহ প্যানটোগ্রাফ চেকগুলোতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যা একটি চেক এর রঙিন ফটোকপি বা স্ক্যান করা রঙের চিত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে।
* হলোগ্রাম- যা অপসারণ বা ফটোকপি করা অসম্ভব এবং যা করলেও অনেক খরচ হবে।
* বিভক্ত নমনীয় প্রিন্টিং- প্রিন্টিং প্রক্রিয়াটি এমন হবে যেখানে রংগুলো একে অপরের থেকে বিবর্ণ হবে।
* থেরোমোক্রোমিক কালি- তাপ দিলে রং পরিবর্তন হবে।
* নিজস্ব নিরাপত্তা পটভূমি নকশা- গ্রাহকের লোগো এবং কোম্পানির নাম ব্যবহার করে জটিল নকশা থাকবে।

এছাড়াও MICR চেকে নিম্নলিখিত Feature বা বৈশিষ্ট্য সমূহ থাকতে হবে-
– Cheque নম্বর এবং তারিখ এরিয়া থাকবে।
– পেয়ি এবং এমাউন্ট এরিয়া থাকবে।
– হিসাব শিরোনাম এরিয়া থাকবে।
– স্বাক্ষর এরিয়া থাকবে।
– MICR এরিয়া (MICR Line Code) থাকবে।

• কাগজ স্ট্যান্ডার্ড
যে কাগজটিতে MICR চেক মুদ্রিত হবে সেটি অবশ্যই CBS1 (Clearing Bank Specification 1 Or Clearing Bank standard 1) হতে হবে।

• স্পেসিফিকেশন
নিম্নে MICR চেকের আকার ও সাইজ কি রকম হবে তা তুলে ধরা হলো-
– স্ট্যান্ডার্ড আকার: ৭.৫” X ৩.৫”
– ওজন: ৯৫.০ গ্রাম/ এম২ (± ৫%)
– ঘনত্ব: মিনিমাম ১০৫ মাইক্রো মিটার, সর্বোচ্চ ১৩০ মাইক্রো মিটার।

• MICR Cheque এর সুবিধা ও অসুবিধা সমূহ
MICR একটি প্রযুক্তি যার মাধ্যমে চেকের বৈধতা সুবিধা, যাচাই করা যায়। MICR চেকে চুম্বকীয় কালি (Magnetic Ink) ব্যবহার করা হয়। এ চেক স্ক্যান করার সময় এর চুম্বকীয় ডিজিট কম্পিউটার নির্দিষ্ট সফটওয়্যারের মাধ্যমে পড়ে নেয় এবং ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করে। কেউ যদি MICR চেকের ফটোকপি করে ব্যাংকে ক্লিয়ারিং-এর জন্য জমা দেয় তবে উক্ত চেক সহজেই জাল হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

• MICR Cheque এর সুবিধা সমূহ
MICR Cheque এনকোডেড চেক বইয়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে। যা নিম্নে তুলে ধরা হলো-
– মানুষ সহজেই চৌম্বক কালির অক্ষরগুলো দ্বারা ছাপানো চেক পড়তে পারে।
– এই Cheque দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ হয় এবং চেক ক্লিয়ারিং সময় হ্রাস করে।
– চেক প্রতারণামূলক কার্যক্রম হ্রাস করে।
– প্রাক প্রিন্ট চেক স্টক সরিয়ে ফেলা (Non-MICR Cheque)।
– অন-ডিমান্ড চেক মুদ্রণ একটি নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
– চেক রিজেকশন হ্রাস করন।
– উন্নত গ্রাহক সেবা।

• MICR Cheque এর অসুবিধা সমূহ
এই চেকের প্রধান অসুবিধা হচ্ছে ব্যাংক প্রক্রিয়াকরণের জন্য শুধুমাত্র ১০ টি সংখ্যা এবং ৪ টি বিশেষ অক্ষর ব্যবহার করা হয়।
– এই চেকে কোন বর্ণানুক্রমিক অক্ষর থাকেনা।
– কেবলমাত্র নির্দিষ্ট কিছু অক্ষর পড়া যায়।
– এটি ডাটা এন্ট্রির একটি ব্যয়বহুল পদ্ধতি।

লেখকঃ মোহাম্মদ শামসুদ্দীন আকন্দ, ব্যাংকার।

2 মন্তব্যসমূহ

Leave a Reply