শেয়ার বাজার কী? কখন শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করবেন?

0
226

“শেয়ার বাজার? এটি তো জুয়াখেলা ছাড়া আর কিছুই নয়! বরং আইনত বৈধ জুয়াখেলা! আন্দাজের উপর একটি ভালো কোম্পানি দেখে শেয়ার কিনে নিন। যদি শেয়ারের দাম বেড়ে যায়, তাহলে আপনি জিতে গেলেন! আর কমে গেলে যাবেন হেরে! শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে কত কত লোকই না নিমিষের মধ্যে বড়োলোক হয়ে গেল! আবার কেউ তার সর্বস্ব খোয়ালো। সব আসলে ভাগ্যেরই খেলা। কপালে না থাকলে শেয়ার বাজার আপনার জন্য নয়।”

বাইরের অধিকাংশ মানুষের কাছে শেয়ার বাজার অনেকটা এরকমই দেখায়। এমনকি অধিকাংশ নতুন বিনিয়োগকারীরাও এমন ধারণা নিয়েই শেয়ার বাজারে প্রবেশ করেন। অনেকে মনে করেন, শেয়ার বাজার হল এমন একটি প্লাটফর্ম, যা হয় আপনাকে প্রচুর মুনাফা এনে দিবে, নয়ত মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন করবে। কিন্তু বাস্তবেও কি তাই? একদমই না! মুনাফা কতটুকু আসবে বা আসবে না সেটা বলতে না পারলেও, শেয়ার বাজার যে কেন জুয়াখেলা নয় সেটা আপনি নিজেই বলে দিতে পারবেন এই লেখাটি পড়ে ফেলার পর।

শেয়ার বাজার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে গেলে প্রাথমিক কিছু ব্যাপারে ধারণা থাকা চাই। প্রথমের শেয়ার কী তা জেনে নেওয়া যাক। ‘শেয়ার’ হল একটি কোম্পানির মালিকানার অংশীদারিত্ব। যখন আপনি কোনো কোম্পানির একটি শেয়ার কিনে নিচ্ছেন, আপনি মূলত ঐ কোম্পানির সম্পত্তি ও আয়ে ভাগ বসাচ্ছেন। বলা যায়, আপনি একটি তাদের সম্পত্তির ক্ষুদ্র একটি অংশ কিনে নিচ্ছেন। কোম্পানির মালিকানায় যা কিছু আছে তা হল ‘কোম্পানির সম্পত্তি’; যেমন, যন্ত্রপাতি, বিল্ডিং, জমিজমা ইত্যাদি। আর ‘কোম্পানির আয়’ হল অর্থ, যা কোম্পানি পণ্য বিক্রির মাধ্যমে অর্জন করেছে।

কেন একটি কোম্পানি শেয়ার বিক্রয় করে?
এখন প্রশ্ন হল, একটি কোম্পানি কেনই বা তাদের মালিকানা সাধারণ জনগণের সাথে ভাগ করবে? কারণ, কোম্পানির টাকার প্রয়োজন! প্রাথমিক বিনিয়োগের টাকা তোলার জন্যই হোক কিংবা ব্যবসা বড় করার জন্যই হোক; একটি কোম্পানির টাকার প্রয়োজন পড়বে। অর্থের পরিমাণ তারা বাড়াতে পারে দু’ভাবে। হয় তাদেরকে কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ধার নিতে হবে, নয়ত তাদের মালিকানার কিছু অংশ বিক্রি করতে হবে। তাহলে কোনটা একটি কোম্পানির জন্য বেশি সুবিধাজনক?

একটি সহজ উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করা যাক। মনে করুন, আপনি চাইনিজ খাবারের একটি রেস্টুরেন্ট করতে চাচ্ছেন। ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রাথমিক খরচের একটি খসড়াও তৈরি করেছেন। জায়গা কেনা, যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, কর্মী নিয়োগ দেওয়া ইত্যাদি মিলিয়ে আপনার সর্বমোট ২০ লক্ষ টাকার প্রয়োজন। কিন্তু মূল সমস্যা হলো, এত টাকা আপনার কাছে নেই। আপনি হয়ত কোনো ব্যাংক থেকে লোন নিতে পারবেন, কিন্তু সেক্ষেত্রে আবার আপনাকে উচ্চ হারে সুদ দিতে হতে পারে। তাহলে এটা করলে কেমন হয়, আপনি কয়েকজন বিনিয়োগকারীর সাথে দেখা করলেন এবং টাকার বিনিময়ে আপনার রেস্টুরেন্টের মালিকানার অংশ দেওয়ার প্রস্তাব করলেন? ঠিক এই ব্যাপারটাই একটি কোম্পানি চিন্তা করে যখন তারা মালিকানার অংশ বিক্রয় করতে চায়। যখন তাদের অর্থের প্রয়োজন হয়, তারা অনেকসময় মালিকানার অংশ বিক্রয় করতে চায়। অর্থাৎ শেয়ার বিক্রয় করতে চায়। কারণ ব্যাংক থেকে ধার নিলে সুদ দিতে হবে। কিন্তু শেয়ার বিক্রয় করলে সেখানে এই সমস্যা থাকছে না।

স্টক এক্সচেঞ্জ কী?
আবারো সেই চাইনিজ রেস্টুরেন্টের গল্পে ফিরে যাওয়া যাক। আপনি যদি এরকম একটি রেস্টুরেন্ট চালু করতে যান, তাহলে ব্যাংকের কাছ থেকে ধার না করে বিনিয়োগকারী খোঁজাটা আপনার জন্য বেশি ভালো হবে। কিন্তু আপনি হঠাৎ করে বিনিয়োগকারী পাবেন কোথা থেকে? আপনি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে পারেন কিংবা বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আপাতত হয় আপনার কোনো এক বন্ধু শেয়ার কিনে নিলেন। কিন্তু ঐ বন্ধুটিই যখন বছরখানেক পরে তার অংশ বিক্রয় করে দিতে চাইবেন, তখন কী হবে? বিশেষ করে যদি আপনার রেস্টুরেন্টের অবস্থা খুব ভালো না হয় তাহলে ক্রেতা পাওয়া নিঃসন্দেহে বেশ কষ্টদায়ক হবে।

স্টক এক্সচেঞ্জ মূলত এই সমস্যাটাই দূর করে। কোম্পানিগুলোর স্টক বা শেয়ার কেনাবেচা হয় স্টক এক্সচেঞ্জে (যা স্টক মার্কেট নামেও পরিচিত)। এটি মূলত একটি প্লাটফর্ম। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ হল এরকমই একটি মার্কেট। অনেকগুলো পণ্য একসাথে পাবার জন্য আমরা যেমন সুপারমার্কেটে যাই, তেমনি একটি স্টক এক্সচেঞ্জ হল স্টকের বা শেয়ারের সুপারমার্কেট, যেখানে ইচ্ছুক ক্রেতা বিক্রেতারা শেয়ার কেনাবেচা করতে পারেন। বাংলাদেশে বর্তমানে দুটি স্টক এক্সচেঞ্জ রয়েছে। একটি হলো ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং অপরটি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE)।

শেয়ারহোল্ডার
যারা একটি কোম্পানির শেয়ার কিনেছেন তাদেরকে বলা হয় শেয়ারহোল্ডার। সোজা কথায়, শেয়ারহোল্ডাররাই হলেন কোম্পানির মালিক। শেয়ারহোল্ডাররা কোম্পানি পরিচালনার জন্য একটি বোর্ড অব ডিরেক্টরস গঠন করেন। এই বোর্ডের সদস্যরা হলেন কোম্পানির নীতিনির্ধারক। একটি কর্পোরেশন তাদের শেয়ারহোল্ডার প্রাইভেট ও পাবলিক- এই দু’ভাবেই নিতে পারে। Privately held কোম্পানির শেয়ারহোল্ডাররা একে অপরকে চেনেন এবং নিজেদের মধ্যেই শেয়ার কেনাবেচা করেন। এসব কোম্পানির শেয়ার কিনে থাকেন হাতে গোনা গুটিকয়েক মানুষ। অন্যদিকে একটি Publicly Held কোম্পানি তাদের শেয়ার কেনাবেচা করে স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে। হাজার হাজার মানুষ এসব কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা করতে পারেন, একে অপরের সাথে দেখা না করেও! আমরা সাধারণভাবে শেয়ার কেনাবেচা বলতে যা বুঝি তা আসলে Publicly Held কোম্পানির শেয়ার।

শেয়ারের মূল্য কেন পরিবর্তিত হয়?
শেয়ারের মূল্য কখনো স্থির থাকে না। ঠিক যে সময়ে একটি কোম্পানির শেয়ার সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রয় হয়, তখন থেকেই Free Market Forces এর উপর ভিত্তি করে শেয়ার মূল্যের হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে। সাধারণত, বাজারের কোনো পণ্যের দাম বাড়ে কমে এর চাহিদা (Demand) ও যোগান (Supply) এই দুটোর উপর ভিত্তি করে। স্টক মার্কেটও এর ব্যতিক্রম নয়। একটি Free Market System এ কোনো পণ্যের চাহিদা বেড়ে গেলে সেটার দামও বেড়ে যায়। একই ব্যাপার স্টক মার্কেটের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যদি শেয়ার বাজারে কোনো কোম্পানির নির্দিষ্ট সংখ্যক শেয়ার থাকে, তাহলে মানুষ যত ঐ কোম্পানির শেয়ার কিনতে চাইবে ততই সেটার দাম বাড়তে থাকবে। আর বেশি সংখ্যক মানুষ যদি ঐ কোম্পানির শেয়ার বিক্রয় করে দিতে চায়, অর্থাৎ যদি সে কোম্পানির শেয়ারের চাহিদা কমে যায়, তাহলে সেটার দামও কমতে থাকবে।

তবে এই চাহিদা আর যোগানের সহজ তত্ত্বের উর্ধ্বেও শেয়ারের দাম পরিবর্তিত হওয়ার পেছনে আরও কিছু মারপ্যাঁচ তো রয়েছেই। সাধারণত স্টক মার্কেটে থাকা একটি কোম্পানির শেয়ার সংখ্যা নির্দিষ্ট করা থাকে। তাই চাহিদা কীভাবে পরিবর্তিত হয় তা বের করা আদতে এতটাও সহজ নয়। তবে দাম বাড়ার এবং কমার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে কোম্পানির উপার্জন ও মুনাফার পরিমাণ। আপনার সেই চাইনিজ রেস্টুরেন্টের কথাই ধরা যাক। রেস্টুরেন্টটি যদি বেশ জনপ্রিয়তা পায় এবং বেশি মুনাফা করা শুরু করে তাহলে নিঃসন্দেহে আপনার এই প্রতিষ্ঠান অনেক বিনিয়োগকারী পাবে। আপনার প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে ভালো মুনাফা পাবার আশায় সবাই সেখানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে। ফলে আপনার রেস্টুরেন্টের শেয়ার মূল্য বেড়ে যাবে অনেক।

তবে শুধু মুনাফা বেশি হলেই আপনার রেস্টুরেন্টের শেয়ারের মূল্য বেড়ে যাবে সেটা ভাবা ঠিক হবে না। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ব্যাপারটাও মাথায় রাখতে হবে। কিংবা আপনার চাইনিজ রেস্টুরেন্টের কাঁচামালের দাম বেড়ে গেলে সেটাও আপনার রেস্টুরেন্টের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীদেরকে চিন্তায় ফেলে দিতে পারে। যার ফলে আপনার রেস্টুরেন্টে বিনিয়োগ করার আগ্রহ হারাতে পারেন বিনিয়োগকারীরা। পেশাদার স্টক বিশ্লেষক ও ব্রোকাররা যখন কোনো শেয়ারের মূল্যের ভবিষ্যৎ অনুমান করতে যান, তখন এসব খুঁটিনাটির সবকিছুই তাদেরকে মাথায় রাখতে হয়। তাই শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের অন্যতম নিরাপদ একটি উপায় হলো একটি ভালো ব্রোকার কোম্পানি খুঁজে বের করা, যারা আপনার বিনিয়োগের কৌশল বুঝে আপনাকে সাহায্য করতে পারবে।

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার জন্য আপনি কি প্রস্তুত?
শেয়ার বাজারে আয়ের কোনো নিশ্চয়তা আপনাকে কেউ দিতে পারবে না। এই মার্কেটটাই হচ্ছে ঝুঁকি নিতে চাওয়া মানুষের জন্য! প্রতি শেয়ার কেনাবেচার সময় ঝুঁকি, লাভ-লোকসান থাকবেই। আপনার যদি প্রতি মাসে নির্দিষ্ট আয়ের একটা উৎস থাকে, তাহলে সেটার তুলনায় শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই অন্যান্য চাকরি বা ব্যবসার সাথে শেয়ার বাজারকে মিলিয়ে ফেললে চলবে না। বিশেষ করে ঝুঁকি আরও বেশি বেড়ে যায় যখন কেউ পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। অল্প সময়ে বেশি লাভের আশা কে ছাড়তে পারে বলুন! বলতে গেলে অধিকাংশ সময়ই এমনটাই ঘটে। কিন্তু শেয়ার বাজারে টিকে থাকার অন্যতম দুটি চাবিকাঠি হল জ্ঞান ও ধৈর্য। এই দুটো না থাকলে শেয়ার বাজার আপনার জন্য নয়। আর এই দুটোর ভালো সমন্বয়ের সাথে আর যে জিনিসটা চাই সেটা হল ঝুঁকি সামলানোর ক্ষমতা। এই তিনটি ব্যাপারে যখন নিজেকে প্রস্তুত করে তুলতে পারবেন তখনই আপনার উচিত হবে শেয়ার বাজারের দিকে পা-বাড়ানো!

সোর্সঃ রোয়ার মিডিয়া

Leave a Reply