ক্রেডিট কার্ড কি? ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা ও অসুবিধা সমূহ

0
2767

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ ক্রেডিট কার্ড হলো একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পর্যন্ত অর্থ ব্যবহার বা খরচ করতে পারবেন বা তুলতে পারবেন। নির্দিষ্ট সময় পর টাকা পরিশোধ করতে হবে। বিদ্যুৎ বিলের মত ধরে নিতে পারেন। ইহা পুরাই পোস্ট-পেইড সিমের মতো।

ক্রেডিট কার্ড (Credit Card)
ক্রেডিট কার্ড হচ্ছে এমন একটি মেথড যার সাহায্যে আপনি একটি ব্যাংক থেকে টাকা ধার করেন খরচ করার জন্য। এই ধার করা টাকার অ্যামাউন্টটিকেই মুলত ক্রেডিট কার্ডের “ক্রেডিট লিমিট” বলা হয়ে থাকে। আপনার মাসিক ইনকাম এর ওপরে বেজ করে আপনাকে ব্যাংক এই লিমিটটি দিয়ে থাকে। যেমন- আপনার মাসিক ইনকাম যদি হয় ৫০ হাজার টাকা, তাহলে আপনি সাধারনত ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত লিমিটের একটি ক্রেডিট কার্ড পেতে পারেন। তবে ক্রেডিট লিমিট কম-বেশি হতে পারে আপনি যে ব্যাংক থেকে ক্রেডিট কার্ড নিচ্ছেন সেই ব্যাংকের পলিসি অনুযায়ী। তবে আপনি ক্রেডিট কার্ডের জন্য এলিজিবল হবেন কি না সেটাই একটা বড় প্রশ্ন। কারন, সাধারনত আপনি যদি একজন মোটামুটি ভালো ইনকাম করা চাকুরিজীবী না হন, তাহলে ব্যাংক আপনাকে ক্রেডিট কার্ডের জন্য এলিজিবল করবে না। কারন ক্রেডিট লিমিটটি আপনি প্রতি মাসে যেমন স্যালারি পান, তার ওপরে ভিত্তি করেই দেওয়া হয়ে থাকে।

ক্রেডিট কার্ডটি পাওয়ার পরে সেটা আপনি যেকোনো জায়গায় পেমেন্ট করার জন্য ব্যবহার করতে পারেন যেখানে পেমেন্ট মেথড হিসেবে ক্রেডিট কার্ড অ্যাকসেপ্ট করা হয়। আপনি ক্রেডিট কার্ড ব্যাবহার করে সারা মাসে যত জায়গায় যত অ্যামাউন্টের (অবশ্যই লিমিটের মধ্যে) পেমেন্ট করবেন, মাস শেষে আপনার সেই সব অ্যামাউন্ট ব্যাংক থেকে একটি বিল হিসেবে ইস্যু করা হবে। তারপরে একটি নির্দিষ্ট টাইমের মধ্যে আপনাকে সেই বিলটি ব্যাংককে পরিশোধ করতে হবে। এই টাইম লিমিট বিভিন্ন ব্যাংকের পলিসি অনুযায়ী বিভিন্নরকম হতে পারে, তবে সাধারন ১০-১৫ দিন হয়ে থাকে। আর এই মাসিক বিল পরিশোধ করলেই আপনাকে আবার পরের মাসের ক্রেডিট লিমিট দেওয়া হবে। যেমন- আপনার ক্রেডিট লিমিট যদি হয় ৫০ হাজার টাকা, আর আপনি যদি ৩৫ হাজার টাকা খরচ করেন, তাহলে বিল ইস্যু হওয়ার নির্দিষ্ট টাইমের মধ্যে সেই ৩৫ হাজার টাকা পরিশোধ করলেই আবার পরবর্তী মাসের জন্য আরও ৫০ হাজার টাকা ক্রেডিট লিমিট পেয়ে যাবেন।

ক্রেডিট কার্ড সাধারনত অনলাইন এবং অফলাইন দুই জায়গাতেই কাজ করে। তবে আপনি যদি আপনার ক্রেডিট লিমিটটি বাংলাদেশের বাইরে গিয়ে ব্যাবহার করতে চান অর্থাৎ ইন্টারন্যাশনাল ট্রাঞ্জেকশন করতে চান, তখন আপনার অবশ্যই একটি ইন্টারন্যাশনাল পাসপোর্টের দরকার হবে। পাসপোর্ট না থাকলে আপনার যত লক্ষ লক্ষ টাকাই ক্রেডিট লিমিট থাকুক না কেন, আপনি বাংলাদেশের বাইরে কোনরকম পেমেন্ট বা লেনদেন করতে পারবেন না ক্রেডিট কার্ডের সাহায্যে।

আপনার পাসপোর্ট থাকলে আপনি আপনার ক্রেডিট কার্ডটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রাঞ্জেকশনের জন্য এনাবল করে নিতে পারবেন এবং আপনার ক্রেডিট লিমিটের নির্দিষ্ট একটি অংশ বৈদেশিক মুদ্রায় কনভার্ট করে নিতে পারবেন, যাতে আপনি বাংলাদেশের বাইরে গেলে বৈদেশিক কারেন্সিতে পেমেন্ট করতে পারেন। তাছাড়া অনলাইনেও ইন্টারন্যাশনাল ট্রাঞ্জেকশনগুলো করতে পারবেন। যেমন- গুগল প্লে স্টোর থেকে কোন অ্যাপ/গেমস পারচেজ করা, কিংবা ফরেইন ই-কমার্স সাইটগুলো থেকে প্রোডাক্ট পারচেজ করা, কিংবা ফেসবুক বুস্ট বা গুগল অ্যাডসে খরচ করা ইত্যাদি।

ক্রেডিট কার্ডের সুবিধাসমূহ (Benefits of Credit Card)
আর্থিক লেনদেনে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। বড় ধরনের কেনাকাটায় সঙ্গে থাকা ক্রেডিট কার্ডটি বেশ কাজে আসে। তবে অনেকের মধ্যে ক্রেডিট কার্ড নিয়ে একধরনের ভীতি কাজ করে। তারা ভাবে, এটা শেষে ব্যয়ের ফাঁদই হয়ে দাঁড়ায় কি না! ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের সুবিধাসমূহ সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-

• দ্রুত লেনদেন (Fast transaction)
ধরুন, বেশ দামি কোনো জিনিস কিনতে চাইছেন। একসঙ্গে এত টাকা জোগাড় করতে পারছেন না। কারও কাছে ধারও করতে পারছেন না। এসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে কাজে দেয় ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার। এর মাধ্যমে পণ্যটি চট করে কিনে কয়েক মাস ধরে মূল্য পরিশোধ করা যায়। এতে ঋণের বোঝা খুব বেশি মনে হয় না। এ ক্ষেত্রেও নিজের বিচার-বুদ্ধিকে কাজে লাগাতে হবে। সময়সীমা অনুযায়ী মূল্য পরিশোধ করতে হবে। তা না হলে হয়তো জরিমানা গুনতে হতে পারে।

• পুরস্কার পয়েন্ট (Reward points)
মূল্য ফেরত পয়েন্ট, আকাশপথে বিনামূল্যে ভ্রমণ বা বাড়তি পুরস্কার পয়েন্ট হচ্ছে ক্রেডিট কার্ডের অন্যতম কিছু প্রলুব্ধকর বিষয় যা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন করলে পাওয়া যায়। এসব পুরস্কার পয়েন্ট চাইলে পরে খালাস করা যায় বা কাজে লাগানো যায়।

• ক্রেডিট স্কোর বাড়ানো (Increase credit score)
যদি আপনার লেনদেনের ইতিহাস খুব একটা সুখকর না হয়, তবে ক্রেডিট স্কোর বাড়ানোর অন্যতম কৌশলী উপায় হচ্ছে নিয়মিত ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা। নিয়মিত ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সময়মত বিল পরিশোধ করলে আপনার ক্রেডিট স্কোর দ্রুত বাড়তে থাকবে।

• অধিকতর নিরাপত্তা (More security)
প্রতারণা, চুরি বা একই খরচ একাধিকবার হতে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ডের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক বেশী। এছাড়াও যদি ক্রেডিট কার্ড চুরি যায়, ওই কার্ড দিয়ে কোন কেনাকাটা হলে সেক্ষেত্রে আপনার দায়দায়িত্ব একেবারেই নেই।

• সুরক্ষা (Protection)
বলা হয় নগদ, ডেবিট কার্ড ও চেক ব্যবহারের চেয়ে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেশি নিরাপদ। আপনার কার্ডটির ভুলত্রুটি বা জালিয়াতি হলে কিংবা চুরি হলে আপনি আপনার অর্থ ফেরত পাবেন।

ধরুন, আপনার কার্ডটি চুরি হয়ে গেল। কেউ টাকা তুলে নিল। এসব ক্ষেত্রে অভিযোগ করলে কার্ড প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান পুরো অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য থাকে। যথাযথ প্রমাণ দিয়ে দ্রুত অর্থ ফেরত পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে একটি ছোট সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কার্ডের পিন নম্বরটি মনে রাখতে হবে। নম্বরটি লিখে নিজের কাছে কখনো রাখা যাবে না।

• ঋণের সুবিধা (Loan facility)
কিছু ক্রেডিট কার্ড, বিশেষ করে বিদেশে শূন্য শতাংশ সুদে ঋণ দেয়। এসব ক্ষেত্রে মাসে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ মূল্য পরিশোধ করতে হয়, যা বেশ সুবিধাজনক। আবার কোনো কোন কার্ডে ঋণে সুদের হার অনেক থাকে। এ ক্ষেত্রেও একটা সুবিধা আছে। বোঝা এড়াতে দ্রুত ঋণ পরিশোধ করা হয়। নিজস্ব ঋণ থাকে না।

• ব্যয়ের সঙ্গে আয় (Revenue with expenditure)
ক্রেডিট কার্ডে বিভিন্ন অফার দেওয়া হয়। যেমন: ‘ক্যাশ ব্যাক অফার’, ‘স্পেশাল ডিসকাউন্ট’। দেশের বাইরে বেড়াতে গেলে, হোটেলে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারে অনেক সময়ই মূল্যছাড় দেওয়া হয়। প্লেনের টিকিট কাটতেও অনেক সময় পাওয়া যায় বিশেষ মূল্যছাড়।

• পরিবর্তনযোগ্য (Changeable)
ধরুন, আপনি একটি অফারের ক্রেডিট কার্ড নিয়েছেন। কার্ডটি ব্যবহারে ঋণের বোঝা বেশি মনে হলে এটি পরিবর্তন করে অন্য অফারের কার্ড নেওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে হয়তো সামান্য অর্থ বেশি লাগতে পারে। তবে তা লাভজনকই হয়।

ক্রেডিট কার্ডের অসুবিধাসমূহ (Disadvantages of Credit Card)
নিম্নে ক্রেডিট কার্ডের অসুবিধাসমূহ তুলে ধরা হলো-

• অতি খরচ (High cost)
ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কেনাকাটার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে – খরচের দিকে নজর রাখা। হয়ত দেখা যাবে কেনাকাটায় গিয়ে আপনি বেশী খরচ করে ফেলছেন এই ভাবে যে পরবর্তী তারিখে তো পরিশোধ করাই যাবে – অথচ ভুলে যাচ্ছেন যে বাড়তি সুদও গুণতে হবে।

• বার্ষিক ফি ও অন্যান্য (Annual Fee and Other)
বেশীরভাগ ক্রেডিট কার্ডের বার্ষিক একটা ফি আছে এছাড়াও কিছু চাঁদা বিভিন্নভাবে প্রযোজ্য হয় যেমন, দেরীতে পরিশোধের ফি, ব্যালান্স ট্রান্সফার ফি, ওভারড্রাফট ফি ইত্যাদি।

• ক্রেডিট স্কোর সক্রান্ত জটিলতা (Credit Score Complications)
ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কেনাকাটায় মাসিক কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে এটা আপনার ক্রেডিট স্কোরের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এছাড়াও যদি সমস্ত দেনাপাওনা পরিশোধ না করেই কোন ক্রেডিট কার্ড বন্ধ করে দেন, তবে সেটি ক্রেডিট স্কোরের উপর ঝড় বইয়ে দিবে।

• উচ্চমূল্যের লেনদেন ফি (High Value Transaction Fee)
ডেবিট কার্ডে যেমন কেনাকাটায় তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ফি নেই বাড়তি, ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে ব্যপারটা তেমন নয়। এক্ষেত্রে বেশ উচ্চমূল্যের ফি প্রযোজ্য হয়। তাই হয়ত দেখা যাবে ডেবিট কার্ডের বদলে ক্রেডিট কার্ডে কেনাকাটায় অধিক পরিমাণ পরিষেবা কর দিতে হবে।

• ঋণের ফাঁদ (Debt trap)
ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার সব সময়ই একটি ঋণ নেওয়ার মাধ্যম। আপনি এখন কিনছেন, পরে অর্থ পরিশোধ করতেই হবে। একটা ঝুঁকি থেকেই যায়। আপনি সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করলে ঋণ বাড়তেই থাকবে।

• লুক্কায়িত ব্যয় (Hidden costs)
সুদের হার পরিশোধই ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের একমাত্র ব্যয় নয়। সময়মতো মাসিক মূল্য পরিশোধ না করলে আপনাকে জরিমানা গুনতে হতে পারে। ক্রেডিটে যে ব্যবহারের সীমা থাকে, সেটা অতিক্রম করলেও একটা নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করতে হয়। অর্থাৎ, সময়জ্ঞান না থাকলে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেশ বিপজ্জনক। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে নগদ অর্থ তুলতে এর জন্য নির্দিষ্ট হারে ফি দিতে হতে পারে।

• সঠিক কার্ডটি চেনা (Identify the correct card)
সঠিক কার্ডটি বেছে নেওয়া জরুরি। আপনার জন্য যা সুবিধাজনক। একটি ভুল কার্ড দিনের পর দিন ব্যবহার করলে ঋণের বোঝা কেবল বাড়তেই থাকবে। তবে এটা বুঝতে পুরো শর্তাবলি মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে। কোনটা নিজের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা বেছে নিতে হবে।

সত্যি বলতে সবকিছুর মতোই ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা ও অসুবিধা দুটই আছে। এখন এটা সম্পূর্ণ আপনার উপর নির্ভর করে আপনি কিভাবে তা ব্যবহার করবেন। খরচের ব্যক্তিগত অভ্যেস, মাসিক চাহিদা ইত্যাদির উপর নির্ভর করে আপনার জন্য যা উপযুক্ত হয় তাই ব্যবহার করতে পারেন।

Leave a Reply