একজন ব্যাংকারের যে সকল গুণাবলী থাকা জরুরী

4
8850

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ ব্যাংকার বলতে তাদেরকে বুঝায় যারা মূলত ব্যাংকিং পেশায় নিজেদেরকে মনে প্রাণে শপে দিয়েছেন। তারা অন্যান্য পেশার লোকদের থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম। এটা এ জন্যই যে, এ পেশায় নিয়োজিতদের কাজের ধরণ যেমন আলাদা তেমনি কাজের কঠোরতাও অন্যদের চেয়ে বেশী। এখানকার কাজে মানসিক চাপ থাকে প্রচন্ড। কেন না এ পেশার প্রতি মূহুতের কাজে অর্থের সংযাগ থাকে বিধায় অত্যন্ত সজাগ থাকতে হয় সব সময়। জাতীয অর্থনীতির উন্নয়নে ব্যাংকারের অবদান অনস্বীকার্য।

তাছাড়া দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ও দারিদ্র বিমোচনে একজন ব্যাংকারের ভূমিকা অতুলনীয়। এজন্য উন্নত বিশ্বে ব্যাংকাররা সমাজের অন্যতম সম্মানিত ব্যক্তি হিসাবে স্বীকৃত। সামাজিকভাবে তাদের অবদানকে সম্মানের চোখে দেখা হয়। দূর্ভাগ্যর বিষয় যেভাবে তাদেরকে সম্মান করা উচিৎ বাংলদেশী সংস্কৃতিতে তা এখনও গড়ে উঠে নি। ব্যাংকারদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট ও পেশাগত উন্নতির লক্ষ্যে অনুসরণীয় ও শিক্ষনীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করব।

প্রকৃত শিক্ষা অর্জনে ব্রতী হওয়াঃ
মহান আল্লাহর দরবারে নির্দ্বিধায়-নিংসংকোচে তথা শর্তহীনভাবে আত্মসমর্পণ করা (Unconditional Surrender to Almighty Allah) তা ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক প্রত্যেক মানুষের জন্যই বাধ্যতামূলক। এখানে স্বেচ্ছাচারিতার কোন স্থান নেই । এক কথায় অনুগত বান্দাহ্ হতে হবে। নিজের ধর্ম সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণ প্রত্যেকের জন্য জরুরী। আমরা জানি,মানুষের জীবন সংগ্রাম নির্ভর । এক কথায় ” “Life is full of action and exploration) জীবনের এই সংঘাতে তথা জীবন যুদ্ধে প্রকৃত অর্থে জয়ী হতে হলে চাই একটি ঐশী ব্যবস্থার অনুসরন এবং অনুশীলন আর যথার্থ ইসলামী শিক্ষাই মানবীয় মূল্যবোধকে শাণিত ও পরিশীলিত করে। অনৈতিকতার উচ্ছেদ সাধনের মাধ্যমে কর্মচারীদের নৈতিক ভিত্তিকে সমৃদ্ধ করে একটি সুখী-সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণ সম্ভব। এটা জোর দিয়ে বলা যায়।

মানুষ আত্মাহীন জড় পদার্থ নয়। বরং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও আত্মা সর্বস্ব নৈতিক জীব। অতএব দেহের দাবীকে অস্বীকার করে আত্মার পরিশুদ্ধিতে প্রবৃত্ত না হয়ে এককভাবে প্রবৃত্তির গোলামে পরিণত হওয়া কোনক্রমেই ইসলামে গ্রাহ্য নয়। সুতরাং দেহ ও মনের সুসামঞ্জস্য কল্যাণ বিধানে ধর্মের আহবান চিরন্তন। আর এ কারণেই ধর্মীয় শিক্ষা হৃদয় বৃত্তিকে জাগিয়ে তোলে। দুনিয়াদারীর এই ঘূর্ণিপাকে নিছক পরকালীন মুক্তির লক্ষ্যকে বিশেষভাবে সমীহ করে, দেহ ও মনের উৎকর্ষ সাধন ও মননশীলতা সৃষ্টিতে সচেষ্ট। সুতরাং আমাদের সুপ্রিয় ব্যাংকার ভাইয়েরা এ বিষয়কে মাথায় রেখে নিজেদের কর্ম পরিকল্পনা সাজাবেন এটাই কাম্য। নিজেদের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়তে হবে আর এটিই জীবনের বড় স্বার্থকতা আর প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষা ব্যতিরেকে একজন মানুষের পক্ষে কোনোক্রমেই দুনিয়ার শান্তি ও পরকালীন মুক্তি অর্জন সম্ভব নয়।

কর্তব্যনিষ্ঠা ও দায়িত্ব সচেতনতাঃ
একজন ব্যাংকার তার উপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। কেন না তিনি একজন পেশাজীবি হিসাবে তার পেশা কি সে বিষয়ে ওয়াকিবহাল হবেন, সাথে সাথে করণীয় বিষয়ও ঠিক করে নিবেন। ব্যাংকারের জীবন অত্যন্ত শৃংখলাপূর্ণ হবে ও দায়িত্ববান হবে এটাই সকলের কাম্য। এখানে তার কর্ম পরিকল্পনা ও তার দৃষ্টিভঙ্গি তার সামগ্রিক সফলতার নিয়ামক শক্তি হিসাবে কাজ করবে। তিনি যাদি আন্তরিকভাবে কাজ করেন , যদি পরিশ্রমী হোন ও ব্যাংকের প্রয়োজনে নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করার দৃপ্ত শপথ গ্রহণ করেন তাহলে তার প্রতিষ্ঠান তার এ কর্মযজ্ঞকে ভালো চোখে দেখবে এটাই সত্য। তাকে সব সময় Positive attitude (দৃঢ়প্রত্যয় সম্পন্ন হ্যাঁ সূচক মনোভাব) প্রদর্শন করতে হবে। মনে রাখতে হবে দৃষ্টিভঙ্গিতে স্বচ্ছতা তার জীবনের জন্য অনেক কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতাসম্পন্ন ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোক হবেন। বেছে বেছে মানুষকে সার্ভিস দেয়ার পরিবর্তে সকল মানুষকে প্রয়োজন অনুপাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেবা প্রদান করবেন এটাই কর্তৃপক্ষ আশা করে। কেন না আন্তরিকতা ছাড়া মানুষের পক্ষে কঠিন পরিশ্রম ও মহৎ কাজ সম্পন্ন করা কোনো ক্রমেই সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই কেবল একটি প্রতিষ্ঠানকে তার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারে। তিনি ব্যাংকের একজন সম্মানিত সদস্য হিসাবে নিঃসন্দেহে প্রতিষ্ঠানের উন্নতি ও অগ্রগতির ধারক-বাহক হতে পারেন।

তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক বিষয়ে দক্ষতা:
তাকে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। কেন না তিনি যা করবেন তাতে যদি তার জ্ঞান না থাকে তাহলে তিনি ভুল করবেন, সমস্যার মধ্যে হাবু-ডুবু খাবেন। ইংরেজীতে একটি কথা আছে ” “
A bad workman quarrels with his tools” অর্থাৎ নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা। সুতরাং তাদেরকে নিজেদের ভেতরকার অফুরন্ত শক্তিকে জাগ্রত করার জন্য কর্ম দক্ষতা অর্জন করতে হবে। কি করবেন, কেন করবেন, কিভাবে করবেন তার সম্পর্কে সুষ্পষ্ট ধারণা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। তিনি Practical field এ যেমন কাজ করবেন তেমনি ঐ সব বিষয়ের তাত্বিক বিধানের জ্ঞানও সমভাবে অর্জন করবেন এটাই বাস্তবতা। তার মধ্যে পরকালীন ভীতি কাজ করবে সবসময় এটাই কাম্য। কেন না তিনি নিজেকে মুসলমান হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন আর একটি প্রতিষ্ঠানের সুনির্দ্দিষ্ট বিষয়ে দায়িত্ব নিয়েছেন। তাকে মনে রাখতে হবে দুনিয়ার জীবনই শেষ নয় পরকালে প্রত্যেকটি মানুষকে ভাল মন্দের জাররা-জাররা হিসাব দিতে হবে।

পরকালীন জীবনের ভীত রচনা করা:
সুতরাং দুনিয়াবী জীবনের কৃতিত্বের সাথে সাথে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত বিধিবিধান মান্য করার মাধ্যমে পরকালীন জীবনের সুন্দর ভিতও রচনা করবেন তিনি। মনে রাখতে হবে দুনিয়ায় নিজের আচার-আচরণ ও চলা-ফেরার উপর পরকালে পুরস্কার ও তিরস্কারের ব্যবস্থা নির্ধারিত হবে। সুতরাং দুনিয়ার জীবনকে যেমন সুশোভিত করার জন্য সৎ প্রচেষ্টা থাকবে তেমনি পরকালীন জীবনেও যাতে সর্বোচ্চ সফলতা অর্জিত হয় তার জন্য প্রানান্তকর প্রচেষ্টা চালাতে হবে আর এটাই বুদ্ধিমানের কাজ। বিশেষত যে প্রতিষ্ঠানে তিনি চাকুরী করেন সে প্রতিষ্ঠানের আইন কানুন নিয়মনীতি সম্পর্কে ভালভাবে জ্ঞান অর্জন করবেন ও তা পরিপালনের শপথ নিবেন। নিজের মর্জি খাটিয়ে ভাল মন্দ নির্ধারনের প্রবণতা চিরতরে পরিত্যাগ করতে হবে। মনে রাখতে হবে নিজের ভুলের কারণে জীবন বিপন্ন হয়ে উঠতে পারে।

গ্রাহক সেবাঃ
মনে রাখতে হবে গ্রাহকরা হলো ব্যাংকের মূল চালিকা শক্তি। গ্রাহক নাই ব্যাংক নাই, আমি আপনারও তখন দরকার নাই। সুতরাং গ্রাহকদের সমস্যাগুলোকে সবসময় অগ্রাধিকার দিতে হবে। মানবসেবা কিভাবে করতে হয় তা সকলের নিকট জন্মগতভাবে কিছু না কিছু জানা থাকে। গ্রাহক সেবার ক্ষেত্রে নিজের জ্ঞান বুদ্ধির সাথে প্রতিষ্ঠানের নিয়ম কানুন ও স্বীয় প্রজ্ঞা খাটিয়ে তা নির্ধারণ করতে হয়। এ জন্য মিশনারী মনোবৃত্তি নিয়ে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে ব্যাংকের কর্মচারীরা শুধু টাকার বিনিময়ে কাজ করে না। উপরন্ত আল্লাহকে সন্তষ্ট করার মানসে দেশবাসীকে সার্বিস দেয়ার তাগিদেও তারা প্রাণপণ কাজ করে। এটাই বাস্তবতা,এটাই স্মরণ রাখতে হবে সব সময়।

সেবার বিষয়টি অত্যন্ত ব্যাপক তবে সর্বাগ্রে তার উপর ন্যস্ত দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করতে হবে। অতপর কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী অন্যান্য দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে ব্রতী হতে হবে। তিনিও ব্যাংকের একজন এমবেসেডর। সেই হিসাবে তার সালাম বিনিময় অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়। একজন আগত গ্রাহক ব্যাংকের সার্ভিস ডেস্ক এ অবস্থানরত ব্যক্তির প্রাথমিক সম্ভাষণে অনেক বেশী প্রীত হবেন ও ব্যাংকের সম্পর্কে ভাল ধারণা পোষণ করবেন এ বিষয়টি তাদের মাথায় রাখতে হবে। তাছাড়া তাদেরকে শাখা কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা সাজিয়ে গ্রাহক সেবা বৃদ্ধির কাজে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করতে হবে। ‘Peak hour’ এর সময় প্রয়োজনে ক্যাশ কাউন্টারে অথবা ভীড় যেখানে বেশী পরিলক্ষিত হয় সেখানে কর্মী প্রেরণ করে উপস্থিত সমস্যার সমাধান করতে হবে।

ঠান্ডা মাথায় কাজ করা:
একজন ব্যাংকারকে ঠান্ডা মাথায় কাজ করতে হবে সব সময়। অনেক সময় গ্রাহক কিংবা শাখার কেউ অপছন্দনীয় কোন আচরণ করতে পারেন। সে সময় ধৈর্য্যরে সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। মাথা গরম করে কিছু করা কোন অবস্থাতেই সঠিক হিসাবে বিবেচিত হয় না। সুতরাং বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। কম কথা বলতে হবে তবে প্রয়োজনীয় কথা বলার অভ্যাস করতে হবে। মনে রাখতে হবে ধৈর্য (সবর) মানব জীবনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নেয়ামত। আল্লাহ বলেন “নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন”। গ্রাহকদের ভালবাসতে হবে, কেন না তাদের বদৌলতেই আমাদের চাকুরি আর তার সুবাদে বেতন-ভাতা ইত্যাদি। তাই তাদেরকে শুভাকাঙ্খী হিসাবে মনে করতে হবে। গ্রাহকদের শুভ কামনা করতে হবে সব সময়। কারণ গ্রাহকরাই ব্যাংকের দূত হিসাবে পরবর্তীতে ব্যাংকের পক্ষে অসাধারণ কাজ করে থাকেন। বলা বাহুল্য তারাই ব্যাংকের উন্নতি অগ্রগতির জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে থাকে।

মার্জিত ব্যবহার:
ওরা এরকম লোক তাদের আছে সহানুভূতি ও সহমর্মিতা। অন্যদের জন্য তাদের রয়েছে সুবিবেচনা। তাদের কোন গর্ব নেই। তারা হৃদয়বান এবং ক্ষমাশীল। সৎ ব্যবহার মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যে বিষয়টি আল্লাহর নজর পর্যন্ত এড়ায়নি। রাসুল (সাঃ) কে লক্ষ্য করে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ ٱللَّهِ لِنتَ لَهُمْ ۖ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ ٱلْقَلْبِ لَٱنفَضُّوا۟ مِنْ حَوْلِكَ ۖ فَٱعْفُ عَنْهُمْ وَٱسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِى ٱلْأَمْرِ ۖ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى ٱللَّهِ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلْمُتَوَكِّلِينَ

আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগ ও কঠিন হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফেরাত কামনা করুন এবং কাজে কর্মে তাদের পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোন কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তা’আলার উপর ভরসা করুন আল্লাহ তাওয়াক্কুল কারীদের ভালবাসেন।(সুরা আল ইমরান-১৫৯)”।

ইংরেজীতে একটি প্রবাদ আছে “A tree is known by its fruits”. সংস্কৃতিতে এটাকে বলা হয় ”ফলেন পরিচিয়তে”। বাংলায় বলে ”ব্যবহারে বংশের পরিচয়”। জনৈক ইংরেজ লেখক বলেন “If you like to justify a person please give him the power”. অর্থাৎ ক্ষমতার মাধ্যমে ব্যক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন ”মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর রাসুল। তিনি কাফেরদের প্রতি কঠোর আর নিজেদের মধ্যে রহম দিল”। অর্থাৎ মুসলিম ভাইদের প্রতি দরদী ও কাফেরদের প্রতি কঠোর হওয়া মুমিন চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। সুতরাং একজন নেতা তার অমায়িক ব্যবহারে মানুষের মন জয় করবেন। সকলে মিলে দ্বীনের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌছতে একত্রে কাজ করবেন এটাই স্বাভিাবিক। তাদের ব্যবহার হবে মার্জিত ও শালীনতাবোধসম্পন্ন। সালাম-কালাম বিনিময়ের মাধ্যমে প্রত্যেকটি গ্রাহককে বরণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে সালাম দেয়া সুন্নত হলেও সালামের জবাব দেয়া ওয়াজিব। সালাম বিনিময়ের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে ও গ্রাহকের সাথে আন্তরিকতা সৃষ্টি হয় এটা স্মরণ রাখতে হবে। এজন্য বেশী বেশী সালামের প্রচলন শুরু করতে হবে। আল্লাহর নবীর (ছ.) সাহাবীরা একবার সালাম দেয়ার পর পিছন থেকে ঘুরে মুখোমুখি হয়ে আবার সালাম দিতেন আর এভাবে বার বার সালাম দেয়া-নেয়া করতেন। আগে সালামদানকারী উত্তম আর তাই তো আমাদের প্রিয় নবীকে কেউ আগে সালাম দিতে পারেন নি। এরকম সালাম বিনিময়ের মাধ্যমে একটি পূতঃপবিত্র পরিবেশ সৃষ্টি হয় আর তার সূচনাকারী হবেন আপনি এটাই কর্তৃপক্ষ আশা পোষন করে।

সচেতনতা ও জ্ঞানদীপ্ততা:
সতত সতর্ক ও জ্ঞানে পারদর্শী হওয়া চাই নেতাদের। এখানে ধর্মীয় জ্ঞানসহ বিবিধ জ্ঞানের সমন্বয় সাধন জরুরী। জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ও দিতে পারঙ্গম। ব্যাংকারকে সমস্যা সমাধানে কুশলী হওয়া চাই। কুরআনে বলা হয়েছে, ”যারা জ্ঞানী, আর যারা জ্ঞানী নয় তারা উভয় কি সমান হতে পারে”? সমস্যার গভীরে অবগাহন করার মত ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এজন্য গভীর জ্ঞানদীপ্ততা দরকার।

চারিত্রিক বলিষ্ঠতা:
আল্লাহতায়ালা রাসুল (সাঃ) কে ’হুলকিন আজিম’ বা ’উত্তম চরিত্র’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ব্যাংকারকে হতে হবে নৈতিকমান সমৃদ্ধ, ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন, Committed, সহিষ্ণু, সহমর্মি, সমবেদনায় উদ্দীপ্ত, শান্ত সম্মোহিত, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, সততায় বলিষ্ঠ, ন্যায়নিষ্ঠ ও কর্মক্ষম। তাদের Private Life I Public Life এর মধ্যে কোন পার্থক্য থাকবেনা। নেতৃবৃন্দ জাতীয় স্বার্থে একদেশদর্শী হবেন না। নিজের খেয়াল খুশি মত চলতে প্রলুব্ধ হবেন না। এক্ষেত্রে তাঁর কিছু সুনির্দিষ্ট দায় দায়িত্ব রয়েছে। যার ভিত্তিতে তিনি সংগঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন।

উগ্র পন্থা পরিহার:
আল্লাহ বলেন “ তোমরা লোকসকলকে আল্লাহর পথে ডাক হিকমত ও উত্তম যুক্তির মাধ্যমে। অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই ধৈর্য্য হারানো যাবেনা। জোর জবরদস্তি মূলক কিছুই করা চলবেনা। আল্লাহ বলেন “লা ইকরাহা ফিদ দ্বীন”। অর্থাৎ ইসলামে কোন জোর জবরদস্তি নেই। মনে রাখবেন উগ্রতা ধ্বংস ডেকে আনে। ব্যাংকারের আগমন সৃষ্টির জন্য। গঠনমূলক আলোচনার পথ সবসময় উন্মুক্ত রাখতে হবে। পরমতসহিসনুতা বড় শিক্ষা।

আচার আচরণ ও শিষ্টাচারঃ
ভাল ব্যবহারে মানুষের মন জয় করা যায় আর এতে কোন টাকা পয়সা খরচ হয় না। মনে রাখতে হবে মানুষের আচার-ব্যবহার সামাজিক শান্তি শৃংখলার জন্য অত্যন্ত জরুরী বিষয়। অনেক বিখ্যাত লোকও শুধু অসুন্দর ব্যবহারের কারণে গণ ধিকৃত হয়। আমাদের প্রিয় নবী (ছ.) অনিন্দ্যসুন্দর ব্যবহারের যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা আমাদেরকে জানতে হবে এবং তা অনুসরন করতে হবে। মানুষ নয় একটি পাখি কিংবা একটি হরিণের সাথে পর্যন্ত নবীজীর সুহৃদ আচরণ আমাদেরকে উদ্দীপ্ত করে। নবীজি তাঁর দুশমনদের সাথে পর্যন্ত ভাল ব্যবহার করেছেন। যে বুড়ি দীর্ঘদিন ধরে নবীজীর যাতায়াতের পথে কাঁটা বিছিয়ে দিতেন সে বুড়ির অসুখের সময় নবীজী তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। এটি কত বড় মহত্বের লক্ষন তা সহজেই বুঝা যায়। আমাদেরকেও নবীজীর মত উদার সহনশীল ও পরোপকারী হতে হবে।

বড়দের প্রতি সম্মান ও ছোটদের প্রতি আদর:
বড়দের প্রতি সম্মান ও ছোটদের প্রতি মমতাময়ী আচরণের নজরানা পেশ করতে হবে। সম্মানীয় ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য সম্মান প্রদান করা শরীয়ত বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে। কেন না অপর মানুষের সম্মানের উপর আঘাত আসে এ রকম কাজকে ইসলাম হারাম করে দিয়েছে । প্রত্যেককে প্রকৃত অর্থে ইনসানিয়াত ও ইহসানিয়াত অর্জন করতে হবে। সকলকে জীবনের উদ্দেশ্য কি তা ঠিক করে নিতে হবে সাথে সাথে মানবাধিকারের প্রতি সজাগ থাকতে হবে ও সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। ছোট চাকুরে বলে কাউকে কোন অবস্থাতেই অসম্মান করা যাবেনা আবার বড় চাকুরেদেরও হিংসা করা যাবে না কেননা হিংসা বিদ্বেষ হারাম। মানুষের মন ভাঙ্গা মানে আল্লাহর ঘর কাবা ভাঙ্গারই সামিল। সুতরাং শুধু শুধু কষ্ট দেয়ার আনন্দ ত্যাগ করতে হবে । পরচর্চা ও পরনিন্দা চিরতরে বন্ধ করতে হবে। এটি করা কবিরা গুনাহ আর কবিরা গুনাহ স্বেচ্ছায় করা যায় না তবে সে সকর লোকদের ঈমান চলে যায়। সুতারাং এ বিষযে সাবধান হওয়া উচিৎ।

অন্যান্য প্রয়োজনীয় নৈতিক গুনাবলীঃ
নিজেদেরকে সততার বলে বলিয়ান হতে হবে। মনে রাখতে হবে ইসলাম আল্লাহর মনোনিত একমাত্র জীবন বিধান। নিজেদের মধ্যে যোগ্যতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এজন্য মানসিক ও দৈহিক জড়তামুক্ত জীবন গঠন করতে হবে। একজন মানুষ একজন ব্যাংকের কর্মচারী কোন অবস্থাতেই অলসতা করতে পারে না। এতে তারও ক্ষতি প্রতিষ্ঠানেরও ক্ষতি। তিনি অলস ব্যক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠানে চিহ্নিত হবেন আর এই অলস লোকদের কারণে জরুরী অনেক কাজে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে ও তাতে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি সাধন হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। সুতরাং একজন ব্যাংকার অত্যন্ত টিপটপ চলবেন, সবসময় সজাগ-সতর্ক থাকবেন, পরিশ্রমী হবেন,সৎ ও সত্যনিষ্ঠ হবেন এটাই কতৃপক্ষের প্রত্যাশা ও অন্য সকলের কামনা। মুনাফেকী চরিত্র বর্জন করতে হবে। সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। মিথ্যা বলা চিরতরে বন্ধ করতে হবে। পরচর্চা-পরনিন্দা ও গীবত পরিহার করতে হবে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও পুতঃ পবিত্র জীবন যাপনের অভ্যাস করতে হবে।

নফসানিয়াতকে শক্ত ভাবে রুখা:
নিজের মধ্যে সৃষ্ট অসৎ প্রবণতা তথা নফসানিয়াতকে শক্ত ভাবে রুখতে হবে। অহংকার ত্যাগ করতে হবে। কেন না অহংকার আল্লাহর চাদর। একে নিয়ে টানাটানি করলে ধ্বংস অনিবার্য। মাটির মানুষের মত ভাই ভাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে কাজ করতে হবে। একজন ব্যাংকার অন্য একজন ব্যাংকারের ক্ষতির চিন্তা করতে পারেন না। মনে রাখতে হবে অন্য মানুষের রক্ত, সম্মান ও সহায় সম্পদ নিজেদের জন্য হারাম করে দিয়েছেন আল্লাহর রাসুল ( ছ.)। সাহস ও হিম্মতের সাথে সৎকাজে সহযোগিতা ও অসৎ কাজের প্রতিরোধ করতে হবে। কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে সব সময়। সকলের সাথে ভাল ব্যবহারের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে হবে। নতুন নতুন সৃষ্ট সমস্যা বুদ্ধিমত্তার সাথে মোকাবিলা করতে হবে। আপনি কষ্টসহিষ্ণু হবেন ও অপরকে অগ্রাধিকার দিবেন এটাই উত্তম। সুতরাং আমাদের সকলের বলা উচিৎ ভোগে নয় দূর্ভোগে থাকুন,ভোগ কি জানুন।

মোদ্দা কথা:
মোদ্দা কথা ব্যাংকের অভ্যন্তরে কোন প্রকারের রাজনৈতিক বিতর্ক , আলোচনা-সমালোচনা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করতে হবে। তাছাড়া রাগ- বিরাগ, মান-অভিমান একেবারেই বন্ধ করতে হবে। এটি ব্যাংকের স্বার্থে, বাস্তবতার স্বার্থে নিজের স্বার্থে তথা সকলের স্বার্থে জরুরী। পরস্পর পরস্পরের জন্য দোয়া করতে হবে। মনে রাখতে হবে দোয়ার অপর নাম সত্য ও সুন্দরের পথে আত্মশক্তির উদ্বোধন। মানবতার কলাণে নিজেকে নিয়োজিত ও নিবেদিত করাই বড় দোআ। এছাড়া নামাজের মাধ্যমে পরস্পর পরস্পরের জন্য দোআর নজরানা পেশ করতে হবে।

শেষ কথা:
এতক্ষণের আলোচনার মাধ্যমে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেল যে, ব্যাংকারদের সুন্দর ও সাবলীল জীবন যাপনের জন্য কতগুলো নীতিমালা অনুসরণ করা বাঞ্চনীয়। তাদের অধিকার সম্পর্কে কতৃপক্ষের সতর্ক থাকা একান্ত দরকার। কর্মকর্তা কর্মচারীরাও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সতর্ক থাকবেন। উপরে বর্ণিত বিষয়গুলো তারা গভীরভাবে অনুধাবন করবেন,মেনে চলবেন ও সে হিসাবে ব্যক্তিগত ও চাকুরী জীবনকে সাজাবেন আর এভাবে একটি সুন্দর ও শান্তিময় পরিবেশ সৃষ্টি হবে ও সকলে মিলে ব্যাংকের উন্নতি অগ্রগতির জন্য অসাধারণ কাজ করার দৃপ্ত শপথ গ্রহণ করবে এ আশাবাদ ব্যক্ত করছি।

সূত্র: ইন্টারনেট

4 মন্তব্যসমূহ

Leave a Reply