ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা রাখা জরুরি

0
1927

সম্প্রতি ঋণ শ্রেণিকরণের সময় বাড়িয়ে পরিপত্র জারি করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ব্যাপারে ব্যাংকটি কিছুটা উদারতা অবলম্বন করেছে। এতে করে ব্যাংকিং বিষয়ের পণ্ডিত ব্যক্তি থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদ ও জ্যেষ্ঠ ব্যাংক কর্মকর্তারা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তকে বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞই সমালোচনা করছেন। তাই শ্রেণিকরণের বিষয়টি ব্যাংকারদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। এ বিষয়ে অনেকের মধ্যেই অস্পষ্টতা লক্ষ করলাম। তাই এ বিষয়ে একটু বিশদ আলোকপাতের প্রয়োজন অনুভব করছি।

আমানতকারীদের আমানতের সুরক্ষাকল্পে এবং ব্যাংকের আগ্রাসী বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণে তথা ঋণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে ঋণ প্রদান ও আদায়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিপালনীয় বিধানের আওতায় নিয়ে আসে। তারই একটি ‘ঋণ শ্রেণিকরণ’ ও তদানুসারে ‘প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি/সংস্থান)’ সংরক্ষণ। ঋণ প্রদানকালে ব্যাংক যেন যাচাই-বাছাই করে সঠিক খাতে, সঠিক ব্যক্তিকে, সঠিক পদ্ধতিতে ঋণ প্রদান করে এবং বিতরণ করা ঋণ আদায়কল্পে নির্দিষ্ট কাঠামো ও পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে ব্যাংক যেন ত্বরিতকর্মা থাকে সে কারণে ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। একই কারণে ঋণখেলাপের স্ট্যাটাস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে প্রভিশন সংরক্ষণের হারও। ফলে অনাদায়ী ঋণের অনাদায়ী অবস্থার উল্লম্ফলন ও পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে প্রভিশনের পরিমাণও, যা চাপ তৈরি করে ব্যাংকের আয়ের ওপর, ঋণ সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ সক্ষমতার ওপরও। কারণ, প্রভিশন সংরক্ষণের কারণে ব্যাংকের আয়ের একটি বড় অংশ অলস অর্থ হিসেবে পড়ে থাকে ‘প্রভিশন রিজার্ভ’ হিসেবে, যা ব্যাংক ভোগ বা খরচ করতে পারে না, লভ্যাংশ হিসাবে বণ্টন করে দিতে পারে না শেয়ারহোল্ডারদের মাঝে, নিতে পারে না রিটেইল্ড আর্নিংস হিসেবে মূলধন খাতে, এমনকি তা ঋণ হিসেবেও দিতে পারে না কাউকে, করতে পারে না লাভজনক কোনো খাতে (ট্রেজারি বিল, বন্ড) বিনিয়োগ। উল্টো আয় বিবেচনায় এই প্রভিশনের ওপরও ৪০ শতাংশ হারে কর গুনতে হয় ব্যাংকগুলোকে (পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে সাড়ে ৩৭ শতাংশ)! তাই প্রভিশন সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা যেন অনেকটাই ব্যাংকের মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়ার শামিল।

ব্যাংক খাতের আর্থিক সক্ষমতা পঙ্গুকরণে খেলাপি ঋণের বিধ্বংসী ভূমিকা বুঝতে বর্তমান সময়ে সব শ্রেণির ব্যাংকারকেই ঋণের শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা রাখা উচিত। তা না হলে ঋণের অসুখ অনুযায়ী চিকিৎসা তথা আদায় কার্যক্রম উপেক্ষিত হবে। অন্যদিকে সঠিক নিয়মে ও হারে প্রভিশন সংরক্ষণ না করার কারণে জরিমানা ও শাস্তিও গুনতে হতে পারে। একইভাবে ভুল হিসাবায়নের জন্য বেড়ে যেতে পারে প্রভিশনের পরিমাণ, যা কমিয়ে দিতে পারে ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা। তাই প্রভিশনের হিসাবায়ন বুঝতেই হবে ব্যাংকারকে। তবে প্রভিশনিং বুঝতে প্রথমেই বুঝতে হবে ঋণের শ্রেণিকরণ।

যে কোনো ঋণ মঞ্জুরির আগে অথবা পরে সংশ্লিষ্ট ঋণের জামানত (জামানতযুক্ত/জামানতবিহীন), খাত (কৃষি/এসএমই), মেয়াদ (স্বল্পমেয়াদি/দীর্ঘমেয়াদি), লেনদেনের ধরন (চলতি/ওডি), ঋণগ্রহীতা (চাকরিজীবী/ব্যবসায়ী), পরিশোধ পদ্ধতি (চাহিবামাত্র/এককালীন/নির্ধারিত কিস্তিভিত্তিক/অনির্ধারিত কিস্তিভিত্তিক), উদ্যোগের আকার (ক্ষুদ্র/মাঝারি), উদ্যোগের ধরন (ব্যবসা/সেবা/শিল্প), উদ্যোক্তার লিঙ্গ (নারী উদ্যোক্তা/পুরুষ উদ্যোক্তা), ঋণের উদ্দেশ্য (স্থায়ী মূলধন/চলতি মূলধন) প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় ঋণটিকে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিভুক্ত করতে হয়। এই শ্রেণিভুক্তির ওপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্ট ঋণটি একটি নির্দিষ্ট ঋণপণ্যের আওতাভুক্ত হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে ঋণের সুদ, পরিমাণ, পরিশোধের সময়, অন্যান্য শর্তাবলি নির্দিষ্ট হয় এবং বিতরণ পরবর্তী সময়ে প্রভিশনের হারও নির্ধারিত হয়। তবে ব্যাংকভেদে ঋণের ধরনে অভিন্নতা আনয়নের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সব ব্যাংক ঋণ ও অগ্রিমকে চারটি ভাগে ভাগ করেছে যথা: ‘চলতি’, ‘তলবি’, ‘স্থায়ী মেয়াদি’, ‘স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্রঋণ’। অর্থাৎ কোনো ব্যাংক একটি ঋণ অনুমোদন করতে চাইলে ওই ঋণটিকে ওই চার ধরনের ঋণের যে কোনো একটিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এটি এক ধরনের ঋণ শ্রেণিকরণ, যা সাধারণত ঋণ মঞ্জুরির আগেই ব্যাংকারকে নির্ধারণ করে ফেলতে হয়। আবার মঞ্জুরি-পরবর্তী সময়ে বিতরণ করা সব ঋণ ও অগ্রিমকে তাদের মেয়াদ-উত্তীর্ণের কাল, আদায়ের গুণগত মান এবং অন্তর্নিহিত প্রাসঙ্গিক ঝুঁকি (জামানত, ডকুমেন্টেশন, লেনদেন, মুনাফা, তারল্য, নগদ প্রবাহ প্রভৃতি) বিবেচনায় বিভিন্ন শ্রেণিভুক্ত (যথা: স্ট্যান্ডার্ড, এসএমএ, সাব-স্ট্যান্ডার্ড, ডাউটফুল, ব্যাড/লস) করার প্রক্রিয়াও এক ধরনের ঋণ শ্রেণিকরণ বা ঋণ শ্রেণিবিন্যাসকরণ (লোন ক্লাসিফিকেশন)। ঋণ শ্রেণিকরণ বলতে পরবর্তী আলোচনায় আমরা ঋণ বিতরণ-পরবর্তী এই বিভাজনগুলোকেই বুঝব।

ঋণ শ্রেণিকরণ এবং প্রভিশনিং বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বশেষ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে মাস্টার সার্কুলার (বিআরপিডি সার্কুলার নং-১৪/২০১২) জারি করে। ওই মাস্টার সার্কুলারের পর আরও ১১টি সার্কুলারের (বিআরপিডি সার্কুলার নং-১৯/২০১২, ০৫/২০১৩, ১৬/২০১৪, ০৮/২০১৫, ১২/২০১৭, ১৫/২০১৭, ০১/২০১৮, ০৭/২০১৮, ১৩/২০১৮, ০৩/২০১৯ এসিএফআইডি সার্কুলার লেটার নং ০১/২০১৩) মাধ্যমে ওই মাস্টার সার্কুলারের বিভিন্ন ধারা ও উপধারায় সংশোধনী আনা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকের ঋণ শ্রেণিকরণ প্রভিশনিং-সংক্রান্ত বিষয়ে সম্পূর্ণ এবং সর্বশেষ বিধান জানতে একজন ব্যাংকারকে এই ১২টি সার্কুলারের প্রায় সবগুলোই ঘেঁটে দেখতে হয়; ফলে সর্বশেষ কার্যকর বিধান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে গিয়ে অনেক সময় ব্যাংকারকে কিছুটা দ্বন্দ্বের মধ্যেও পড়ে যেতে হয়। কিন্তু শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিংয়ের এ বিষয়টি অত্যন্ত সহজ করে দেওয়া যেত, যদি সবগুলো সার্কুলার সমন্বিত করে সর্বশেষ সার্কুলারটি প্রকাশ করা হতো।

ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিংয়ের মাস্টার সার্কুলারে সব ঋণ ও অগ্রিমকে তাদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য (যা নিবন্ধনের শুরুতেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে) বিবেচনায় চার ভাগে চলতি ঋণ, তলবি ঋণ, স্থায়ী মেয়াদি ঋণ, স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণে ভাগ করা হয়েছে। বিতরণের পূর্বেই ঋণের এই বিভাজন করে ফেলা হয়। নিন্মে এই চার ধরনের ঋণের কিছুটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

চলতি ঋণ
চলতি ঋণে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে (এক্সপায়ারি ডেট) অনুমোদিত সীমার (লিমিট) মধ্যে ইচ্ছেমত লেনদেন (যতবার খুশি টাকা জমা বা উত্তোলন) করা যায়। যেমন: ক্যাশ ক্রেডিট (সিসি) ও ওভারড্রাফট (ওডি) ঋণ। নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে (সাধারণত এক বছর) ঋণটি সুদসহ পরিশোধ করে বন্ধ করে দিতে হয় অথবা ঋণের শর্ত পরিপালনসাপেক্ষে নতুন মেয়াদে নবায়ন করে নেওয়ার সুযোগ থাকে।

তলবি ঋণ
যেসব স্বল্পমেয়াদি ঋণ নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে (কয়েকদিন বা কয়েক মাস, যেমন ৯০ দিন, ১২০ দিন, ১৮০ দিন) অথবা ব্যাংক কর্তৃক দাবিমাত্র পরিশোধযোগ্য, সেসব ঋণকে তলবি ঋণ বলে। প্রচ্ছন্ন দায় বা সম্ভাব্য দায় (কন্টিনজেন্ট লায়াবিলিটি) অথবা অন্য কোনো দায়ের বিপরীতে সৃষ্ট বাধ্যতামূলক ঋণও (নিয়মিত ঋণ হিসেবে পূর্বানুমোদন ব্যতীত সৃষ্ট ঋণ) তলবি ঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে। যেমন: ফোর্সড লোন অ্যাগেইনস্ট মার্চেন্ডাইজ, পেমেন্ট অ্যাগেইনস্ট ডকুমেন্ট, ফরেন বিলস পারচেজড, ইনল্যান্ড বিলস পারচেজড প্রভৃতি। যেসব ঋণ পরিশোধের জন্য কোনো নির্ধারিত কিস্তি (ফিক্সড ইনস্টলমেন্ট সাইজ) বা নির্ধারিত পরিশোধসূচি (ফিক্সড রি-পেমেন্ট শিডিউল) থাকে না; অর্থাৎ ঋণগ্রহীতা ঋণের মেয়াদকালে সময় সময় যে কোনো অঙ্ক জমা দিয়ে (টোকেন পেমেন্টস পিরিয়ডিক্যালি) অথবা মেয়াদান্তে সুদসহ এককালীন পরিশোধ (পেমেন্ট ইন অ্যা সিঙ্গেল গো) করতে পারেন, সেসব ঋণও তলবি ঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে। টাইম লোন (বুলেট লোন) ও ফাইন্যান্সিয়াল অবলিগেশনের বিপরীতে এককালীন বিতরণ করা নবায়ন-অযোগ্য ওভারড্রাফট ঋণও তলবি ঋণ।

স্থায়ী মেয়াদি ঋণ
দীর্ঘ মেয়াদে (সাধারণত কয়েক বছর) একটি নির্দিষ্ট পরিশোধসূচি অনুযায়ী (যেমন: ৬০টি সমান মাসিক কিস্তিতে বা ১২টি সমান ত্রৈমাসিক কিস্তিতে) পরিশোধযোগ্য ঋণ স্থায়ী মেয়াদি ঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে, যেমন- হাউজিং ঋণ।

স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের এগ্রিকালচারাল ক্রেডিট অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ডিপার্টমেন্টের (এসিএফআইডি) বার্ষিক ঋণ প্রকল্পের তালিকাভুক্ত স্বল্পমেয়াদি ঋণ কিংবা কৃষি খাতে বিনিয়োজিত অনধিক ১২ মাসে পরিশোধযোগ্য ঋণ স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ ১২ মাস মেয়াদে পরিশোধযোগ্য অনধিক ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত যে কোনো ক্ষুদ্রঋণ স্বল্পমেয়াদি ক্ষুদ্র ঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

ঋণ মঞ্জুর হলো, ডকুমেন্টেশন সম্পাদন হলো, সর্বশেষে বিতরণও হয়ে গেল। ব্যাংকারের জন্য এবার অপেক্ষা করছে ঋণ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কার্যবিতরণকৃত ঋণের মনিটরিং ও আদায় কার্যক্রম। আদায় প্রক্রিয়ার এক পর্যায়ে ব্যাংকার লক্ষ করে দেখতে পান, তার বিতরণ করা কিছু ঋণ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আদায় হচ্ছে, কিছু ঋণ আদায়ে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, কিছু ঋণ নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও আদায় হচ্ছে না। তাই এ পর্যায়ে ব্যাংকারকে তার বিতরণ করা ঋণগুলোর স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবতে হয়। অর্থাৎ কে সুস্থ, কে অসুস্থ এবং যারা অসুস্থ, তাদের কার কি অসুখ, তা এবার প্যাথলজিক্যাল টেস্টিং করিয়ে ডায়াগনোসিস করতে হয়। শেষে কার কী দাওয়াই তা প্রেসক্রাইব করতে হয়। এ প্রক্রিয়াটিই হচ্ছে ব্যাংক ঋণের প্রচলিত শ্রেণিকরণ। এ পর্যায়ে বিতরণ করা সব ঋণকে তাদের মেয়াদোত্তীর্ণের কাল বিবেচনায় পাঁচটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়; যথা: স্ট্যান্ডার্ড, এসএমএ, সাব-স্ট্যান্ডার্ড, ডাউটফুল, ব্যাড/লস। আয় উৎসারী (যেসব ঋণ হতে ব্যাংকের সুদ আয় হয়) স্ট্যান্ডার্ড ও এসএমএ মানের ঋণগুলোকে ‘অশ্রেণিকৃত ঋণ বা পারফর্মিং লোন’ আর যেসব ঋণ হতে ব্যাংকের সুদ আয় হয় না, অর্থাৎ সাব-স্ট্যান্ডার্ড, ডাউটফুল ও ব্যাড/লস মানের ঋণগুলোকে ‘শ্রেণিকৃত ঋণ বা নন-পারফর্মিং লোন’ হিসেবে বিভাজিত করা হয়। তবে এই শ্রেণিকরণের সুবিধার্থে শুরুতেই ঋণটির পাস্ট ডিও বা ওভারডিও স্ট্যাটাস নির্ণয় করে নিতে হবে।

পাস্ট ডিও/ওভারডিও
ঋণের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া আর ওভারডিও/পাস্ট ডিও হওয়াকে একই অর্থ বহন করে মনে করলে ভুল হবে। কারণ শ্রেণিকরণ-সংক্রান্ত সর্বশেষ বিআরপিডি সার্কুলার নং ০৩/২০১৯ মতে, কোনো ঋণ মেয়াদ উত্তীর্ণ হলেই কিংবা মাসিক কোনো কিস্তি অনাদায়ী হলেই তাকে ‘পাস্ট ডিও’ বা ‘ওভারডিও’ বলা যাবে না। শ্রেণিকরণের জন্য প্রথমে ঋণের মেয়াদোত্তীর্ণের পরবর্তী সময়কাল (কত মাসের মেয়াদোত্তীর্ণ) বা অনাদায়ী মাসিক কিস্তি সংখ্যা বিবেচনায় ঋণের ওভারডিও বা পাস্ট ডিও স্ট্যাটাস নির্ধারণ করা হয়। এরপর ওভারডিও/পাস্ট ডিও হওয়ার পরবর্তী সময়কাল (কত মাসের ওভারডিও/পাস্ট ডিও) বিবেচনায় এসএমএ, সাব-স্ট্যান্ডার্ড, ডাউটফুল, ব্যাড/লস স্ট্যাটাস নির্ধারণ করা হয়। ‘চলতি ঋণ’ ও ‘তলবি ঋণ’ মেয়াদোত্তীর্ণের পরদিন থেকেই ওভারডিও হিসেবে বিবেচিত হবে; অন্যদিকে ‘স্থায়ী মেয়াদি ঋণ’ ও ‘স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ’ ওভারডিউ হবে মেয়াদোত্তীর্ণের পর ছয় মাস অতিবাহিত হওয়ার পর। স্থায়ী মেয়াদি ঋণে সম্পূর্ণ ঋণকে ওভারডিও না ধরে অনাদায়ী কিস্তির অংশই কেবল ওভারডিও হিসেবে বিবেচিত হবে; তবে শ্রেণিকৃত হলে সম্পূর্ণ ঋণের স্থিতিই শ্রেণিকৃত হিসেবে বিবেচ্য হবে।

স্ট্যান্ডার্ড
সব নিয়মিত ঋণই (এসএমএ বা শ্রেণিকৃত নয় এমন ঋণ) স্ট্যান্ডার্ড ঋণ।

এসএমএ
‘স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ’ ব্যতীত যে কোনো ঋণ দুই মাস ওভারডিও/পাস্ট ডিও থাকলে (অর্থাৎ ওভারডিও হওয়ার পর আরও দুই মাস অতিবাহিত হলে) তা এসএমএ হিসেবে বিবেচিত হবে। মেয়াদ (এক্সপাইরি) বিবেচনায় ‘চলতি ঋণ’ ও ‘তলবি ঋণ’ এসএমএ হবে মেয়াদোত্তীর্ণের দুই মাস পর, ‘স্থায়ী মেয়াদি ঋণ’ এসএমএ হবে আট মাস পর। ‘স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণে’ এসএমএ শ্রেণিমান প্রযোজ্য নয়।

সাব-স্ট্যান্ডার্ড
‘স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ’ ব্যতীত অন্যান্য ঋণ তিন মাস বা ততোধিক সময়; তবে ৯ মাসের কম সময় ওভারডিও থাকলে সাব-স্ট্যান্ডার্ড মানে শ্রেণিকৃত হবে। মেয়াদ বিবেচনায় ‘চলতি ঋণ’ ও ‘তলবি ঋণ’ সাব-স্ট্যান্ডার্ড হবে মেয়াদোত্তীর্ণের তিন মাস পর, ‘স্থায়ী মেয়াদি ঋণ’ সাব-স্ট্যান্ডার্ড হবে ৯ মাস পর এবং ‘স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ’ সাব-স্ট্যান্ডার্ড হবে ১২ মাস পর।

ডাউটফুল
‘স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ’ ব্যতীত অন্যান্য ঋণ ৯ মাস বা ততোধিক সময়, তবে ১২ মাসের কম সময় ওভারডিও থাকলে ডাউটফুল মানে শ্রেণিকৃত হবে। মেয়াদ বিবেচনায় ‘চলতি ঋণ’ ও ‘তলবি ঋণ’ ডাউটফুল হবে মেয়াদোত্তীর্ণের ৯ মাস পর, ‘স্থায়ী মেয়াদি ঋণ’ ডাউটফুল হবে ১৫ মাস পর এবং ‘স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ’ ডাউটফুল হবে ৩৬ মাস পর।

ব্যাড/লস
‘স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ’ ব্যতীত অন্যান্য ঋণ ১২ মাস বা ততোধিক সময় ওভারডিও থাকলে ব্যাড/লস মানে শ্রেণিকৃত হবে। মেয়াদ বিবেচনায় ‘চলতি ঋণ’ ও ‘তলবি ঋণ’ ব্যাড/লস হবে মেয়াদোত্তীর্ণের ১২ মাস পর, ‘স্থায়ী মেয়াদি ঋণ’ ব্যাড/লস হবে ১৮ মাস পর এবং ‘স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষদ্র ঋণ’ ব্যাড/লস হবে ৬০ মাস পর।

বিতরণ করা সব ঋণ ও অগ্রিমকে দুটি ভিত্তি/মাপকাঠি বিবেচনায় শ্রেণিকরণ করা হয়, যথা-
এক. বস্তুগত ভিত্তি (অবজেকটিভ ক্রাইটেরিয়া) এবং
দুই. গুণগত ভিত্তি (কোয়ালিটেটিভ জাজমেন্ট)।
ওপরের আলোচনায় বস্তুগত ভিত্তির আলোকে শ্রেণিকরণ দেখানো হয়েছে, যেখানে শ্রেণিকরণে ওভারডিও হওয়ার পরবর্তী মাসসংখ্যা বিবেচনা করা হয়েছে। যেকোনো দুটি শ্রেণিমানের মধ্যবর্তী সময়ের জন্য পূর্ববর্তী শ্রেণিমান বহাল থাকবে। যেমন, ‘এসএমএ’ হওয়ার আগ পর্যন্ত সব ঋণই ‘স্ট্যান্ডার্ড’ বলে বিবেচিত হবে। একইভাবে কোনো চলতি ঋণ তিন মাস কিংবা ততোধিক সময় (যেমন সাত মাস), কিন্তু ৯ মাসের কম মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও ‘সন্দেহজনক’ হওয়ার আগ পর্যন্ত তা ‘নিম্নমান’ হিসেবেই বিবেচিত হবে।

অবশ্য মেয়াদোত্তীর্ণের বা ওভারডিওর কাল বিবেচনায়ই যে কেবল ঋণ শ্রেণিকরণ করা যায় তা নয়, ঋণের গুণগত মান বিচারেও ঋণ শ্রেণিকরণ করা যায়। বস্তুগত ভিত্তিতে কোনো ঋণ নিয়মিত হলেও গুণগত ভিত্তির আলোকে নিন্মোক্ত বিষয় বিবেচনায় যেকোনো ঋণ (স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ বাদে) শ্রেণিকৃত হতে পারে। যেমন কোনো ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা সম্পর্কে যদি কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা বা সন্দেহ দেখা দেয়, সেই ঋণকে গুণগত মান বিচারে শ্রেণিকৃত করতে হবে, এমনকি মেয়াদোত্তীর্ণ বা ওভারডিও না হলেও। ঋণের কোনো শর্ত যদি লঙ্ঘিত হয়, ঋণগ্রহীতার মূলধন যদি বিলুপ্ত হয়ে যায়, কিংবা ঋণের বিপরীতে রাখা জামানতের মূল্য যদি কোনো বিরূপ কারণে মারাত্মকভাবে হ্রাস পায় এবং তাতে ঋণ পরিশোধে গ্রহীতার সক্ষমতা সম্পর্কে যদি কোনো সন্দেহ দেখা দেয়, তাহলেও সেই ঋণকে শ্রেণিকৃত করতে হবে।

ঋণ শ্রেণিকরণের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিপত্রে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়নি, তা হচ্ছে অনাদায়ী কিস্তি সংখ্যা এবং ঋণের মেয়াদোত্তীর্ণের দ্বৈত প্রভাব। ধরা যাক, কোনো একটি মাসিক কিস্তিভিত্তিক মেয়াদি ঋণের মেয়াদ ৩০ জুন ২০১৮ পর্যন্ত। এই ঋণের সর্বশেষ আটটি মাসিক কিস্তি অনাদায়ী হয়ে গেল। যথারীতি ৩০ জুন ২০১৮ ঋণের মেয়াদ উত্তীর্ণ হলো এবং ঋণটি দুই মাসের ওভারডিও বিবেচনায় ‘এসএমএ’ হিসাবে শ্রেণিকৃত করা হলো। মেয়াদোত্তীর্ণের পর আরও এক মাস অতিবাহিত হয়ে গেল, কিন্তু শেষ আটটি কিস্তি তখনও অনাদায়ী থেকে গেল। তাহলে ৩১ জুলাই ২০১৮ শেষে ঋণটির শ্রেণিমান কী হবে? শাখা পর্যায়ে সিএল প্রস্তুত করতে গিয়ে দেখা যায়, এসব ক্ষেত্রে ঋণ শ্রেণিকরণে অনাদায়ী মাস সংখ্যা ৯টি (অনাদায়ী মাসিক কিস্তি সংখ্যা + মেয়াদোত্তীর্ণের পরবর্তী মাস সংখ্যা) ধরে ঋণটি শ্রেণিকৃত হচ্ছে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে ৩১ জুলাই ২০১৮ শেষে অনাদায়ী মাসিক কিস্তি সংখ্যা আটটি হলেও এক মাসের উত্তীর্ণ মেয়াদ বিবেচনায় ঋণটিকে ৯ মাসের মেয়াদোত্তীর্ণ/অনাদায়ী (অর্থাৎ পরিপত্রমতে তিন মাসের ওভারডিও) ধরে ‘নিন্মমান’ হিসেবে শ্রেণিকৃত করা হয়েছে।

ব্যাংকারদের কাছে যা শ্রেণিকৃত ঋণ, সাধারণ মানুষের কাছে তা-ই খেলাপি ঋণ। কিন্তু আইনানুসারে কোনো ঋণ শ্রেণিকৃত হওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতাকে খেলাপি (ডিফল্টার) বলা যাবে না, কারণ সব খেলাপি ঋণই শ্রেণিকৃত ঋণ, কিন্তু সব শ্রেণিকৃত ঋণই খেলাপি নয়। তাই সব শ্রেণিকৃত ঋণগ্রহীতাই ঋণখেলাপি নয়। ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধনী) আইন, ২০১৩-এর ৫(গগ) মতে, কোনো ঋণগ্রহীতার অনুকূলে প্রদত্ত অগ্রিম, ঋণ বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা বা তার অংশ বা তার ওপর অর্জিত সুদ বা তার মুনাফা ছয় মাস ওভারডিও হলে, সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতা খেলাপি হিসাবে বিবেচিত হবে। তাই কোনো ঋণ ছয় মাস বা ততোধিক সময় ওভারডিও বা পাস্ট ডিও থাকলে তার ঋণগ্রহীতা খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হবে। এর ফলে সাব-স্ট্যান্ডার্ড ঋণের একটি অংশ (যেগুলো ছয় মাস বা ততোধিক সময়ের জন্য ওভারডিও) এবং ডাউটফুল ও ব্যাড/লস মানের সব ঋণকেই খেলাপি হিসেবে রিপোর্ট করতে হবে। খেলাপি হওয়ার আগ পর্যন্ত শ্রেণিকৃত ঋণগ্রহীতারাও ঋণ পাওযার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

ব্যাংকারকে মনে রাখতে হবে, ঋণের সুদ মানেই ব্যাংকের আয় নয়। স্ট্যান্ডার্ড ও এসএমএ মানের ঋণে সুদ আরোপ করা যাবে এবং আয় খাতে নেওয়া যাবে। সাবস্ট্যান্ডার্ড ও ডাউটফুল মানের ঋণে সুদ আরোপ করা যাবে, তবে আরোপিত সুদ আয় খাতে না নিয়ে স্থগিত সুদ (ইন্টারেস্ট সাসপেন্স) খাতে রাখতে হবে। কোনো ঋণ মন্দ/ক্ষতি শ্রেণিমানে শ্রেণিকৃত হওয়ার পর ওই ঋণে কোনো সুদ আরোপ করা যাবে না। মামলা কিংবা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে সুদ আরোপ করলেও তা স্থগিত সুদ খাতে রাখতে হবে।

শ্রেণিমান অনুযায়ী অশ্রেণিকৃত (আনক্লাসিফায়েড বা ইউসি) এবং শ্রেণিকৃত (ক্লাসিফায়েড) উভয় ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতেই নির্দিষ্ট হারে আলাদা হিসাবে নিরাপত্তা সঞ্চিতি/সংস্থান (প্রভিশন) জমা রাখতে হয়। ব্যাংকের অর্জিত মুনাফা থেকে এ অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক যদিও ব্যাংকগুলোকে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে শ্রেণিকরণ ও সঞ্চিতি সংরক্ষণ কার্য সম্পাদন করতে নির্দেশনা দিয়েছে, ব্যাংকগুলো শাখা পর্যায়ে সাধারণত মাসিক ভিত্তিতেই ঋণ শ্রেণিকরণ করে থাকে। শাখা কর্তৃক ঋণের শ্রেণিকরণের পর সমগ্র ব্যাংকের ঋণের সঞ্চিতি প্রধান কার্যালয় সংরক্ষণ করে থাকে। তবে বিভিন্ন ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় সঞ্চিতি সংরক্ষণের ত্রৈমাসিক বাধ্যবাধকতা শিথিল করতেও দেখা যায়।

ঋণ শ্রেণিকরণ এবং তার বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণের অবশ্যই কিছু যৌক্তিক কারণ আছে, যেমন-
এক. ব্যাংক কর্তৃক বিনিয়োগকৃত সম্পদের মান নির্ণয়;
দুই. পারফর্মিং এবং নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) চিহ্নিতকরণ;
তিন. ঋণ শৃঙ্খলা এবং নজরদারি জোরদার করে আদায় পরিস্থিতির উন্নয়ন;
চার. কোনো ঋণ আদায় না হলে ব্যাংক যেন আর্থিকভাবে ঝুঁকিতে না পড়ে সেজন্য সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে সঞ্চিতির ব্যবস্থা;
পাঁচ. আমানতকারীদের সুরক্ষা;
ছয়. অনাদায়ী কিংবা আদায়ের সম্ভাবনাহীন বিনিয়োগের বিপরীতে সুদারোপের মাধ্যমে ব্যাংকের সম্পদ (স্থিতিপত্র) এবং আয়ের (আয়বিবরণী) অবাস্তব স্ফীতি প্রদর্শনের প্রবণতা নিরুৎসাহিতকরণ;
সাত. প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি সংরক্ষণ না করে এবং ঋণের অনাদায়ী সুদকে ‘স্থগিত সুদ’ খাতে না নিয়ে আয় হিসেবে ধরে অতিরিক্ত মুনাফা প্রদর্শন এবং এই ধরনের ভুয়া মুনাফার ওপর আয়কর, লভ্যাংশ (ডিভিডেন্ড), বোনাস প্রদানের মাধ্যমে মূলধন ও সম্পদের যে ক্ষয়সাধন হতো তা রোধ করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জোগানের মাধ্যমে মূলধনের পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন;
আট. বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশিত সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে না পারলে ব্যাংক তার পরিচালক তথা শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড প্রদান করতে পারে না;
নয়. সঞ্চিতির বাধ্যবাধকতা ব্যাংককে আয় উৎসারী খাতে বিনিয়োগে উৎসাহী করে এবং মন্দ খাতে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করে;
দশ. ব্যাংকের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা করা;
এগারো. ব্যাংকের মালিকপক্ষ, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করে নীতিনির্ধারণে সহযোগিতা করা;
বারো. সঞ্চিতি সংরক্ষণের সক্ষমতা যেকোনো ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তিরও পরিচায়ক, যা অর্থ বাজারে ব্যাংকের পজিশন ও ইমেজের উন্নয়ন ও অবনয়ন উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শ্রেণিমান বিবেচনায় ঋণের দুই ধরনের সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হয়-
এক. সাধারণ সঞ্চিতি (জেনারেল প্রভিশন); এবং
দুই. নির্দিষ্ট সঞ্চিতি (স্পেসিফিক প্রভিশন)। অশ্রেণিকৃত (স্ট্যান্ডার্ড এবং এসএমএ) ঋণের বিপরীতে সাধারণ সঞ্চিতি সংরক্ষণ করা হয়, আর শ্রেণিকৃত (নিন্মমান, সন্দেহজনক, মন্দ/ক্ষতি) ঋণের বিপরীতে নির্দিষ্ট সঞ্চিতি সংরক্ষণ করা হয়। শ্রেণিমান অনুসারে নির্দিষ্ট হারে সঞ্চিতি হিসাবায়ন হবে; তবে ঋণের খাত বিবেচনায় একই শ্রেণিমানসম্পন্ন ঋণের সঞ্চিতির হার ভিন্ন হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকের অশ্রেণিকৃত ‘মানসম্পন্ন (স্ট্যান্ডার্ড)’ ও ‘বিশেষ চিহ্নিত হিসাব (স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট বা এমএমএ))’ ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ থেকে পাঁচ শতাংশ হারে; শ্রেণিকৃত ‘নিন্মমান (সাবস্ট্যান্ডার্ড বা এসএস)’ ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ (স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রে পাঁচ শতাংশ), ‘সন্দেহজনক (ডাউটফুল)’ ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ (স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রে পাঁচ শতাংশ) এবং ‘মন্দ/ক্ষতি (ব্যাড-লস)’ ঋণের বিপরীতে শতভাগ সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হয়। প্রভিশনের এই হার সর্বনিন্ম হার, বাংলাদেশ ব্যাংক তফসিলি ব্যাংকগুলোকে প্রত্যাশিত ঋণ-ক্ষতি বিবেচনায় আরও বেশি হারে প্রভিশন সংরক্ষণের জন্য উৎসাহিত করেছে। স্ট্যান্ডার্ড ও এসএমএ ঋণের প্রভিশনের হার একই হবে।

স্থিতিপত্রবহির্ভূত উপাদানের (অফ-ব্যালান্স শিট এক্সপোজারস) ক্ষেত্রে এক শতাংশ হারে জেনারেল প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। তবে ‘বিলস ফর কালেকশন’-এর বিপরীতে কোনো প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে না। একইভাবে যেসব ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে মাল্টিলেটার‌্যাল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এমডিবি) বা আন্তর্জাতিক ব্যাংকের কোনো কাউন্টার গ্যারান্টি থাকবে, সেসব গ্যারান্টির ক্ষেত্রে কাউন্টার গ্যারান্টিদাতা ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের রেটিং গ্রেড বিবেচনায় ‘শূন্য’ থেকে ‘এক’ শতাংশ হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। তবে এই জেনারেল প্রভিশন মোট এক্সপোজারের ওপর হিসাব করতে হবে; ক্যাশ মার্জিন এবং উপযুক্ত জামানতের মূল্য বাদ দেওয়া যাবে না। অন্যদিকে ভোক্তা ঋণের অধীন সব অশ্রেণিকৃত ক্রেডিট কার্ড ঋণে পাঁচ শতাংশের পরিবর্তে দুই শতাংশ হারে জেনারেল প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, প্রভিশন বা সঞ্চিতি সংরক্ষণের এই হার কীসের ওপর প্রয়োগ করে প্রভিশনের পরিমাণ নির্ণয় করতে হয়? অশ্রেণিকৃত (স্ট্যান্ডার্ড ও এসএমএ) ঋণের ক্ষেত্রে ঋণের স্থিতির ওপরই এই হার প্রয়োগ করে জেনারেল প্রভিশনের পরিমাণ নির্ণয় করা হয়। জেনারেল প্রভিশনের ক্ষেত্রে কোন ঋণ হিসাবকে এককভাবে বিবেচনায় না এনে একই শ্রেণির ঋণগুলোর স্থিতির ওপর একযোগে প্রভিশনের প্রযোজ্য হার প্রয়োগ করে প্রভিশন নির্ণয় করা হয়। যেমন একটি ব্যাংকের মোট স্ট্যান্ডার্ড এসএমই ঋণ হচ্ছে ১০ হাজার কোটি টাকা। তাহলে ১০ হাজার কোটি টাকার দশমিক ২৫ শতাংশ হারে জেনারেল প্রভিশনের পরিমাণ হবে ২৫ কোটি টাকা।

অন্যদিকে বিরূপ শ্রেণিকৃত (নিন্মমান, সন্দেহজনক, মন্দ/ক্ষতি) ঋণের নির্দিষ্ট প্রভিশন হিসাবায়ন করতে প্রথমেই প্রভিশনের ‘ভিত্তি’ নির্ধারণ করতে হয়, যার ওপর প্রভিশনের প্রযোজ্য হার প্রয়োগ করে প্রভিশনের পরিমাণ নির্ণয় করা হয়। এক্ষেত্রে প্রতিটি বিরূপ শ্রেণিকৃত ঋণকে আলাদা আলাদা বিবেচনা করতে হয়। উপযুক্ত জামানত (ইলিজিবল কোলোটেরল) বিবেচনায় বিরূপ শ্রেণিকৃত ঋণের নির্দিষ্ট প্রভিশনের ‘ভিত্তি’ দুভাবে নির্ধারণ করা হয়। উপযুক্ত জামানত হচ্ছে জামানতের মূল্যের একটি আনুপাতিক অংশ।

প্রথমত, নিন্মোক্ত তিন ধরনের উপযুক্ত জামানতের বিপরীতে শ্রেণিকৃত ঋণের ‘স্থিতি’ থেকে ‘স্থগিত সুদ’ এবং ‘উপযুক্ত জামানতের মূল্য’ বাদ দিয়ে ভিত্তি নির্ধারণ করা হয়। উপযুক্ত এই তিন ধরনের জামানত হচ্ছে-
এক. ঋণের বিপরীতে একই ব্যাংকে লিয়েনকৃত আমানতের ১০০ শতাংশ;
দুই. লিয়েনকৃত সরকারি বন্ড/সেভিংস সার্টিফিকেট মূল্যের ১০০ শতাংশ;
তিন. সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক প্রদত্ত গ্যারান্টির ১০০ শতাংশ।

দ্বিতীয়ত, অন্যান্য উপযুক্ত জামানতের ক্ষেত্রে প্রভিশনের ভিত্তি হবে নিন্মোক্তভাবে নির্ণীত দুটি স্থিতির সর্বোচ্চটি-
এক. শ্রেণিকৃত ঋণের ‘স্থিতি’ বিয়োগ ‘স্থগিত সুদ’ বিয়োগ ‘উপযুক্ত জামানতের মূল্য’;
দুই. শ্রেণিকৃত ঋণের স্থিতির ১৫ শতাংশ। অন্যান্য উপযুক্ত জামানত বলতে নিন্মোক্ত চার ধরনের জামানতকে বোঝানো হয়েছে-
এক. ব্যাংকের কাছে বন্ধককৃত স্বর্ণ অথবা স্বর্ণালঙ্কারের বাজারমূল্যের ১০০ শতাংশ;
দুই. ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে রক্ষিত সহজে বিপণনযোগ্য পণ্যের বাজারমূল্যের (মার্কেট ভ্যালু ৫০ শতাংশ);
তিন. ব্যাংকে বন্ধককৃত ভূমি এবং ইমারতের বাজারমূল্যের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ;
চার. স্টক এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত যেকোনো শেয়ার সিকিউরিটিজের ছয় মাসের গড় বাজারমূল্যের ৫০ শতাংশ, অথবা অভিহিত মূল্যের (ফেস ভ্যালু) ৫০ শতাংশের মধ্যে যেটি কম।

ধরা যাক, একটি ‘মন্দ/ক্ষতি’ মানের এসএমই ঋণের স্থিতি ৩৬ লাখ টাকা, স্থগিত সুদ হিসাবে রক্ষিত সুদের পরিমাণ তিন লাখ টাকা, ব্যাংকে বন্ধক রাখা ভূমি ও ভবনের বাজারমূল্য ৬০ লাখ টাকা (অর্থাৎ ৬০ লাখ টাকার ৫০ শতাংশ হারে উপযুক্ত জামানতের মূল্য হবে ৩০ লাখ টাকা)। তাহলে এক্ষেত্রে সঞ্চিতির ভিত্তি১ দাঁড়াবে তিন লাখ টাকা (৩৬ লাখ টাকা বিয়োগ তিন লাখ টাকা বিয়োগ ৩০ লাখ টাকা)। আবার ঋণের স্থিতির ১৫ শতাংশ হারে ভিত্তি২-এর মান দাঁড়াবে পাঁচ লাখ ৪০ হাজার টাকা। অতএব, দুই ভিত্তির সর্বোচ্চ ভিত্তি (ভিত্তি২) পাঁচ লাখ ৪০ হাজার টাকার শতভাগ হারে সঞ্চিতির পরিমাণ হবে পাঁচ লাখ ৪০ হাজার টাকা। যদি ঋণের স্থিতি থেকে স্থগিত সুদ এবং উপযুক্ত জামানতের মূল্য বাদ দেওয়ার পর ভিত্তির ঋণাত্মক মান বের হয়, কিংবা ভিত্তির মান শূন্য হয়, তাহলে স্বাভাবিক গাণিতিক নীতি অনুসারে ঋণের স্থিতির ১৫ শতাংশকেই সর্বোচ্চ ভিত্তি ধরে প্রভিশন হিসাব করতে হবে।

জামানতের মূল্য বেশি হলে প্রভিশনের ভিত্তি তথা প্রভিশনের পরিমাণ কমে আসে। তবে দ্বিতীয় প্রকারের জামানতের (স্বর্ণ, স্থাবর সম্পত্তি, স্টক, শেয়ার) ক্ষেত্রে প্রভিশনের ভিত্তি অন্তত ঋণের স্থিতির ১৫ শতাংশের কম হবে না বলে ‘মন্দ/ক্ষতি’ মানের ঋণের বিপরীতে প্রভিশনের পরিমাণ ঋণের স্থিতির ১৫ শতাংশের কম হওয়ার সুযোগ নেই। ফলে অধিক জামানত থাকা সত্ত্বেও মন্দ/ক্ষতি মানের ঋণের প্রভিশনের পরিমাণ কমপক্ষে ঋণের স্থিতির ১৫ শতাংশ বা তার চেয়ে বেশি হবে। একই কারণে ঋণের বিপরীতে জামানত না থাকলে প্রভিশনের পরিমাণ বেড়ে যাবে। যেমন ওপরের প্রথম উদাহরণে জামানতের মূল্য শূন্য ধরলে ভিত্তি১-এর মান হবে ৩৩ লাখ টাকা। ভিত্তি২-এর মান পাঁচ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তখন ৩৩ লাখের শতভাগ হারে প্রভিশন হবে ৩৩ লাখ টাকা। তাই সঞ্চিতি সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা জামানতবিহীন ঋণ প্রদানের অন্যতম প্রতিবন্ধকও বটে।

সঞ্চিতি সংরক্ষণের চাপ কখনও কখনও ব্যাংককে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করে, কারণ বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ বাড়ার যেমন সম্ভাবনা থেকে যায়, ঠিক তেমনিভাবে সঞ্চিতি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও বেড়ে যায়। এর ফলে প্রান্তিক মুনাফাধারী কিংবা সঞ্চিতির ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত সঞ্চিতির দুশ্চিন্তায় বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হয়। এর ফলে ব্যাংকের আমানতের একটা অংশ অলস পড়ে থাকে। একইভাবে খেলাপি ঋণ এবং তার বিপরীতে সঞ্চিতি সংরক্ষণের চাপ ব্যাংকঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার অন্যতম প্রতিবন্ধক বটে।

মোশারফ হোসেন, ব্যাংক কর্মকর্তা
[email protected]

Leave a Reply