আগামীর ডিজিটাল ব্যাংকিং কেমন হবে

0
304

ইন্টারনেট ও প্রযুক্তি খুব দ্রুত এগুচ্ছে। এখন এ প্রশ্ন খুব স্বাভাবিক যে ভবিষ্যতে ব্যাংক বা অন্যান্য ফিন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলির গ্রাহক সেবার ধরন কেমন হবে। প্রতিষ্ঠানগুলি কীভাবে বদলে যাওয়া টেকনোলজিতে খাপ খাইয়ে নিবে তার উপর এ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে। ব্যাংক বা অর্থনৈতিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলি কীভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করবে তাই নির্ধারণ করবে ১০ বছর পরে ব্যাংকিং এর চেহারা কেমন হবে।

বিল গেটস একবার বলেছিলেন, পরের দু’ বছরে যে বদলগুলি ঘটতে যাচ্ছে আমরা সবসময় তাতে অতি গুরুত্ব দেই, এবং যে পরিবর্তন আগামি দশ বছর পরে ঘটবে সেগুলিকে প্রয়োজনের চাইতে কম গুরুত্ব দিয়ে থাকি। বিল গেটসের এই উপলব্ধি ব্যাংকিং ইন্ড্রাস্ট্রি’র ক্ষেত্রে খুব ভালোভাবেই খাটে। আগামি বছর বা দুই বছর পরে হয়ত ব্যাংকিং ইন্ড্রাস্ট্রির চেহারা এখনকার মতই থাকবে। তবে ভবিষ্যতে যে নাটকীয় পরিবর্তনগুলি ঘটবে সেটার ক্ষেত্র মোটামুটি প্রস্তুত।

সারা বিশ্বের কথা বিবেচনা করে, দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের কথা বলতেই হয়। এক, প্রায় সবকিছুর মোবাইলাইজেশন এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাপক প্রয়োগ। এই দুটি জিনিস আগামি বছরগুলিতে ভোক্তা সেবা ও চাহিদাকে এমন জায়গায় নিয়ে যাবে যে সেটা পুরো ব্যাংকিং ইন্ড্রাস্ট্রির চিত্র বদলে দিবে।

এ পরিবর্তনে তাল মিলাতে ব্যাংকিং ও ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরের তিনটা জিনিস মাথায় রাখা উচিৎ।
১. ভোক্তা ও গ্রাহকদের প্রত্যাশার সাথে তাল মিলাতে হবে।
২. সার্ভিস ও লেনদেনের ক্ষেত্রে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সম্ভাবনাগুলিকে গ্রহণ করতে হবে।
৩. ব্যাংকিং সেক্টরের ভিতরে এবং বাইরে বড় বড় ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানগুলি কনজ্যুমার এক্সপেরিয়েন্সের ক্ষেত্রে কোন পদ্ধতিতে চলছে সেটা খেয়াল করতে হবে। এবং প্রয়োজনে অনুসরণ করতে হবে।

ব্যাংকিং-এ আগামি দিনের ভোক্তাদের সন্তুষ্ট করা
ব্যাংকিং সেক্টরকে স্বীকার করতেই হবে যে ভোক্তাদের আচরণে খুব বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে এবং এটা খুব দ্রুতই ঘটছে। ভোক্তাদের কাছে নিজের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে হলে ব্যাংকিং সেক্টরকে এই জিনিসটা ভালোভাবে আমলে নিতে হবে। গ্রাহক বা ভোক্তাদের একটা বড় অংশের বয়স (যারা ১৯৭৯ থেকে ১৯৯৫ এর ভিতর জন্মেছে) আগামি দশ বছরে ৪০ পরবর্তী স্টেজে প্রবেশ করবে। আগামি কয়েক বছরে এরাই হবে জনসংখ্যার সবচেয়ে বড় অংশ। এখন রিটেইল ব্যাংকিং এই অংশের বা এই জেনারেশনের আচরণকে গুরুত্ব দিয়ে দেখলে ভাল হবে। কারণ, এরা যখন মধ্য বয়সে প্রবেশ করবে তখন এদের খরচ করার ক্ষমতাও বাড়বে। এরাই হবে ব্যাংকিং ভোক্তাদের সবচেয়ে বড় অংশ।

এই জেনারেশন তাদের প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের শুরু থেকেই স্মার্টফোন ব্যবহার করছে। এর পরের জেনারেশন আবার আরো বেশি প্রযুক্তি নির্ভর, তারা এই পকেট সাইজের ডিজিটাল ডিভাইস ছাড়া জীবনের কথা কল্পনাও করতে পারেনা। মোবাইল টেকনোলজির সাথে এই জেনারেশন এতটা সাবলীল যে সারা বিশ্বে কয়েকশ মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল অ্যাপ্লিকেশন প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং ভালোভাবে চলছে। যেমন, ভেনমো, ক্রেডিট কার্মা, অ্যাকর্নস, মিন্ট ইত্যাদি। আমাদের বাংলাদেশেও বেশ কয়েকটা মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ভিত্তিক ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এই তরুণ প্রজন্ম বিখ্যাত কোনো ব্র্যান্ডের প্রতি যতটা আস্থা রাখে তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেয় নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্য বা সুবিধার প্রতি। তারা আসলে ‘ডু ইট ফর মি’ কালচারে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তারা আশা করে প্রযুক্তি তাদের জীবন যাপনকে সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলবে। এমনকি আগের জেনারেশনগুলিও টেকনোলজির উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। তারাও এখন ‘ডু ইট ফর মি’ কালচারে অভ্যস্ত হচ্ছে। তাদের জন্যও শপিং করা থেকে ট্যাক্সি ভাড়া করা হয়ে উঠেছে দুই-একটা ক্লিক এর ব্যাপার।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যুগ
সেলফ-ড্রাইভিং গাড়ি, ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট সহ অন্যান্য স্মার্ট ডিভাইস প্রতিদিনই অগ্রসর হচ্ছে। এবং সেটা কল্পনাতীত দ্রুতগতিতে। ব্যাংকিং এক্সপেরিয়েন্সকে আরো স্মার্ট করার জন্য বা আগামি দিনের জন্য প্রস্তুত করতে ব্যাংকিং ও ফিন্যান্স সেক্টরেরও এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগানো উচিৎ। ভোক্তারাও এখন তাদের জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে স্বাগত জানিয়েছে। এটা জোর দিয়ে বলা যায় যে ভবিষ্যতে ব্যাংকিং ইন্টার্যাকশনের ক্ষেত্রেও তারা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার প্রত্যাশা করবে।

ব্যাংকিং সেক্টরের প্র্যাক্টিক্যাল কিছু কাজে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা আছে। বিশ্বের অনেক জায়গায়ই ইতোমধ্যে পেমেন্ট ফ্রড বা জালিয়াতি সনাক্তকরণের জন্য, গ্রাহকদেরকে সার্ভিস দেওয়ার জন্য এআই ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি ইনভেস্টমেন্ট বা অন্যান্য ফিন্যান্সিয়াল সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য গ্রাহককে সহায়তা করছে এআই, এমন উদাহরণও আছে। ব্যাংক ও ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরের উচিৎ তাদের নিজেদের ক্ষেত্রেও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের এই বিপ্লবকে স্বাগত জানানো। কনজ্যুমার ইন্ড্রাস্ট্রিতে তাদের নিজেদের শক্তি টিকিয়ে রাখার খাতিরেই এটা প্রয়োজন।

বিশ্বের অনেক বড় বড় ব্যাংক এরই মধ্যে এই রাস্তায় হাঁটতে শুরু করেছে। ব্যাংকের কাছে গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট রেকর্ড থেকে শুরু করে ট্র্যানজ্যাকশন হিস্টোরির মত মূল্যবান ডাটা বা তথ্য আছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ফুয়েল বা জ্বালানি হচ্ছে এই ডাটা বা তথ্য। সোজা কথায়, এগুলি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কাঁচামাল। এগুলি থেকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অনেক ডিভাইস ও ব্যাংকিং সার্ভিস তৈরি করা সম্ভব।

তবে এই ডাটা বা তথ্য সম্পদ ব্যবহার করার ক্ষেত্রেও ব্যাংকের কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। যেমন, প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা। অন্যদিকে নতুন ফিনটেক স্টার্টআপ বা টেকনোলজি নির্ভর ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসগুলির এই সমস্যা নাই। তবে তারা এই দিক থেকে অনেক পিছিয়ে যে অত বেশি গ্রাহক না থাকার কারণে তাদের কাছে অত বেশি ডাটাও নাই। তবে সময়ের সাথে সাথে ব্যাংক যেমন এই সমস্যা কাটিয়ে উঠবে বলে মনে করা যায়, ফিনটেক স্টার্টআপগুলির কাছেও অনেক ডাটা বা তথ্য থাকবে।

ব্যাংকিং সার্ভিসের ক্ষেত্রেও অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভার্চুয়াল অ্যাসিট্যান্ট। এই ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্টগুলি এখন একজন মানুষের সাথে আরেকজন মানুষের মতই আলাপ আলোচনা চালাতে সক্ষম। যেমন গুগল অ্যাসিসট্যান্ট বা অ্যামাজনের ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যালেক্সা—এগুলি একজন হেয়ারড্রেসার বা রেস্টুরেন্টের ওয়েটারের মত কথাবার্তা ও কাজ চালাতে পারে। সুতরাং ব্যাংকিং সার্ভিসেও এদের কাজে লাগানো শুধু সময়ের ব্যাপার।

ইউএক্স (UX) জায়ান্টদের সাথে তাল মিলানো
টেকনোলজিতে একটা টার্ম খুব প্রচলিত। ইউজার এক্সপেরিয়েন্স বা সংক্ষেপে ইউএক্স। অনেক বড় বড় কোম্পানিই এই ইউজার এক্সপেরিয়েন্সের সুফল কাজে লাগিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে। এবং এই ইউএক্স দিয়েই তারা তাদের প্রতিযোগী কোম্পানিগুলিকে পিছনে ফেলে দিয়েছে। অ্যামাজনের কথাই ধরা যাক—অ্যামাজন তাদের প্রতিটা প্রোডাক্ট ইউজার এক্সপেরিয়েন্স দিয়ে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। যেমন, অ্যামাজন ইকো হচ্ছে এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় স্মার্ট হোম স্পিকার। অ্যামাজন এই হোম স্পিকারের ইউজার এক্সপেরিয়েন্স ইউনিক করে তুলেছে এটার সাথে তাদের ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যালেক্সা যোগ করে।

এমন খবর শোনা গেছে যে, অ্যামাজন নাকি বিশ্বের অনেক বড় বড় ব্যাংকের সাথে আলোচনা করেছে—অ্যামাজন সেইসব ব্যাংকগুলির সার্ভিসের কাজের দায়িত্ব নিতে চায়। অ্যামাজনের মত অন্যান্য বড় টেক জায়ান্টগুলি, যেমন অ্যাপল, ফেসবুক ও গুগল এখন স্মার্ট কার থেকে শুরু করে নিত্য ব্যবহার্য জিনিসের সাথে নিজেদেরকে যুক্ত করছে। সহজেই অনুমান করা যায় যে ভেনমো, পেপ্যাল ও স্কয়ারের পাশাপাশি উল্লেখিত কোম্পানিগুলিও প্রথাগত ব্যাংকিং ও লেনদেনের ক্ষেত্রে যুক্ত হতে চাইবে এবং নিজেরা নতুন কোনো সার্ভিস বা সেবা নিয়ে হাজির হবে।

ব্যাংক ও অন্যান্য টেকনোলজির হাতে এখনো সুযোগ আছে সুযোগসন্ধানী কোনো তৃতীয় পক্ষকে না এনে নিজেরাই টেকনোলজির সুফল ব্যবহার করে গ্রাহককে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার। এবং গ্রাহকরা তাদের ডাটা দিয়ে ব্যাংকের প্রতি যে আস্থা রেখেছে তার মূল্যায়ন করবে।

দশ বছর পরে রিটেইল ব্যাংক কি আদৌ প্রাসঙ্গিক থাকবে?
এটা নিশ্চিত যে আগামি দশ বছরে, সারা বিশ্ব জুড়ে ব্যাংক, তাদের গ্রাহক এবং ব্যাংকিং এর পরিবেশ সবকিছু বদলে যাবে। নগদ টাকার ব্যবহার আরো কমতে থাকবে, ডিজিটাল কারেন্সি আরো বেশি ব্যবহার্য ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। ভোক্তা ও গ্রাহকরা লেনদেনের জন্য আরো বিভিন্ন ধরনের অ্যাপ্লিকেশন ও ডিভাইস ব্যবহার করবে। ধীরে ধীরে ক্রেডিট কার্ড ও ডেবিট কার্ডের প্রাসঙ্গিকতা কমতে থাকবে। এবং এতে লেনদেনের ঝুঁকিও কমতে থাকবে।

উন্নত বিশ্বে বিল দেওয়া বা লেনদেনের কাজের জন্য মানুষজন ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্টের উপর নির্ভর করা শুরু করবে। এখন, ব্যাংক ও অন্যান্য অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের উচিৎ হবে নিজেদের সেক্টরে ধীরে ধীরে টেকনোলজির এই দিকগুলির প্রয়োগ ঘটানো। ব্যাংকের কল সেন্টার বা কন্ট্যাক্ট সেন্টারগুলিও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও চ্যাটবট-ভিত্তিক প্রযুক্তির সুবিধা নিতে পারবে। আগামি দশ বছরে ব্যাংক সেক্টর যদি নিজেদের শক্তি টিকিয়ে রাখতে চায়, তাহলে তাদের এই টেকনোলজিক্যাল পরিবর্তনের ব্যাপারে উদাসীন থাকা উচিৎ হবে না। এই পরিবর্তনের সর্বোচ্চ সুবিধা তাদের নেওয়া উচিৎ।

ব্যাংকের সাথে গ্রাহকের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি হচ্ছে আস্থা ও নিরাপত্তা। ব্যাংক অসাধারণ কিছু নিয়ম নীতি অনুসরণ করে গ্রাহকের সম্পদ ও তথ্য সংরক্ষণ করে ও নিরাপত্তা প্রদান করে। এই কারণে গ্রাহকের কাছে লেনদেনের জন্য ব্যাংক-ই প্রথম পছন্দ হিসাবে হাজির হয়। এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে ব্যাংকের উচিৎ হবে প্রযুক্তির এই পরিবর্তনগুলিকে স্বাগত জানানো এবং সেগুলি নিজেদের কাজে ব্যবহার করা।

কার্টেসিঃ টেক সিটি

Leave a Reply