ব্যাংক ব্যবস্থার ক্রমবিকাশ

0
2707

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ আসসালামু আলাইকুম। আজ আলোচনা করবো Evolution of Bank বা ব্যাংক ব্যবস্থার ক্রমবিকাশ নিয়ে। আজ আমরা যে ব্যাংকিং পেশার সাথে জীবন বেঁধে ফেলেছি, সেটার শেকড়ও কি আমরা খুঁজে পেয়েছি? কোথায়, কিভাবে শুরু হলো বর্তমান বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি ‘ব্যাংকিং’?

কবে, কোথায় ও কীভাবে আজকের এ ব্যাংক ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে তা সঠিকভাবে বলা বেশ কঠিন। তবে দ্রব্য বিনিময়ের সমস্যা দূর করার উদ্দেশ্যে মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন ঘটে। ঐতিহাসিকদের মতে, খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ অব্দে গ্রীস, রোম ও মিসরে মুদ্রা প্রচলন হয় এবং তখন থেকেই ব্যাংকিং ব্যবস্থার অনানুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। নিম্নে সভ্যতার আলোকে তা বর্ণনা করা হলো।

কথিত আছে, রেনেসাঁ যুগে ইটালীর লোম্বার্ডী (Lombardy) নামক স্থানে একটি বাজার ছিলো। সেখানে ইহুদী ব্যবস্যায়ীগণ লম্বা বেঞ্চ পেতে টাকা পয়সার লেনদেন করতেন। যে বেঞ্চের উপরিভাগ ঢাকা থাকতো সবুজ টেবিলক্লথ দিয়ে। এ বেঞ্চকে ইটালীয় ভাষায় বলা হতো ‘ব্যাংকো (Banco)’। আঞ্চলিক ভাষায় টাকা-পয়সা লেনদেনের এই বেঞ্চকে – ব্যাংকা, ব্যাংকাছ ইত্যাদি নামেও অভিহিত করা হতো। ধারনা করা হয় সর্বাধিক প্রচলিত ‘Banko’ শব্দ থেকেই ‘Bank’ শব্দটি এসেছে।

বর্তমানে ‘ব্যাংক’ বলতে আমরা এক ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বুঝি। এখানে আমরা সাধারণ মানুষের সঞ্চয় সংগ্রহ করে পুঁজি গড়ে তুলি এবং সেই পুঁজি ঋণ হিসেবে উদ্যোক্তাদের চাহিদা মতো প্রদান করি। উদ্দ্যোগতারা ঋণ গ্রহনের পর সেটা বিনিয়োগ করেন এবং নির্দিষ্ট সময় বা মেয়াদান্তে ঋণকৃত অর্থের উপর সুদ বা মুনাফা প্রদান করে থাকেন।

মুনাফার এই টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে সাধারণ সঞ্চয়কারীর হাতে পৌঁছে তার প্রাপ্য লাভ হিসেবে। এভাবেই ব্যাংক বিশ্ব অর্থনীতির প্রধানতম চালিকা শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে যুগের পর যুগ! যদিও ধারনাকরা হয় ‘আধুনিক ব্যাংকিং’ এর উন্মেষ ঘটে মধ্যযুগে রেনেসাঁর শুরুতে। প্রাচীনটা তবে কবে?

নিম্নে ধারাবাহিকভাবে Evolution of Bank বা ব্যাংক ব্যবস্থার ক্রমবিকাশ সম্পর্কে আলোচনা করা হলোঃ

(ক) সিন্ধু সভ্যতা (খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০-২০০০ অব্দ)
এ সময় সিন্ধু এলাকা ব্যবসায়-বাণিজ্যে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল। মুদ্রা প্রচলনের পর সিন্ধু ব্যবসায়ীরা ব্যবসায়-বাণিজ্যে আরো উন্নতি লাভ করে। তারা নির্দিষ্ট একজনের নিকট অর্থ জমা করত। জমাকৃত অর্থ সুযোগমত জমাগ্রহণকারী ঋণ দিতো এবং বিনিয়োগ করত।

(খ) ব্যাবিলনীয় সভ্যতা (খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দ)
এ সময় ব্যাবিলনে উপাসনালয়কে কেন্দ্র করে ব্যাংক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। যেসব ব্যবসায়ীর হাতে বেশি অর্থ জমা হত, তারা তা ধর্মযাজকদের হাতে জমা রাখত। ধর্ম যাজকরাও সুযোগমত তা থেকে লোকদের ঋণ প্রদান করত। এভাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রচলন ঘটে। উপাসনালয়গুলোর নিরাপত্তা, মজবুত অবকাঠামো এবং ধর্মযাজকদের সততা ও বিশ্বস্ততার কারণেই লোকেরা উপাসনালয়গুলোকে ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করত।

(গ) বৈদিক সভ্যতা (খ্রিস্টপূর্ব ২০০০-১০০০ অব্দ)
বৈদিক যুগে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বেদ ও মনুতে ঋণ ও সুদের ব্যবসায় সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়, যা দ্বারা ব্যাংক ব্যবসায় উন্নয়নের পরিচয় পাওয়া যায়।

(ঘ) রোমান সভ্যতা (খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দ)
এ সময়ে ব্যাংক ব্যবস্থার কিছুটা অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়। এখানে Argenteri ও Collystiboi নামে একদল ব্যাংক ব্যবসায়ী ছিল। লেনদেনে তারা চেক ও ড্রাফটের ব্যবহার শুরু করে। আধুনিক বাণিজ্যিক ব্যাংকের তাত্ত্বিক রূপটি এ সময়েই গড়ে ওঠে।

(ঙ) চীন সভ্যতা (খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দ)
খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দে চীনে ব্যবসায় বাণিজ্যের উন্নতির সাথে সাথে অর্থ সংরক্ষণ, ঋণদান ও লেনদেন বেড়ে যাওয়ায় প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শান্সি ব্যাংক (Shansi Bank) প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

(চ) গ্রীক সভ্যতা (খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দ)
এ সময় এতদঅঞ্চলের মানুষ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে অর্জ জমা, ঋণদান ও বিনিয়োগ ইত্যাদি নানা রকম লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যা ব্যাংক ব্যবস্থা উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

(ছ) আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা
ইটালীর রোমে ইয়াহুদী ব্যবসায়ী ও মহাজনরা যৌথ ব্যাংক ব্যবস্থা গড়ে তোলে। যুদ্ধকালীন সংকট মোকাবেলায় বাধ্যতামূলক ঋণের ব্যবস্থা নিয়ে ১১৫৭ সালে ভেনিস সরকার প্রতিষ্ঠা করে পৃথিবীর সর্বপ্রথম ব্যাংক ‘ব্যাংক অব ভেনিস’। ১১৭৮ সালে ইতালীর জোনোয়া শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘দি ব্যাংক অব সান জর্জিও’।

১৪০১ সালে আধুনিক ব্যাংকের আদলে ব্যাংক অব ডিপোজিট নামে একটি ব্যাংক বার্সিলোনায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৬০৯ সালে নেদারল্যান্ডে ‘ডাচ আমস্টারডাম ব্যাংক ১৬৫৬ সালে পৃথিবীর সর্বপ্রথম সনদপ্রাপ্ত সুইডেনে ‘ব্যাংক অব সুইডেন প্রতিষ্ঠিত হয়। ‘ব্যাংক অব ইংল্যান্ড দ্বিতীয় সনদপ্রাপ্ত ব্যাংক হলেও ১৬৯৪ সালে এই ব্যাংকটি গ্রেট বৃটেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রূপান্তরিত হয় যা পৃথিবীর প্রথম কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৃষ্টান্ত।

সবাই ভাল থাকবেন। আল্লাহ হাফিজ।

Leave a Reply