ব্যাংক হলিডেঃ একটি পর্যালোচনা

0
1031

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ ব্যাংকিং লেনদেন করেন এমন লোকজন ও এই পেশায় জড়িতদের নিকট “ব্যাংক হলিডে” কথাটি অজানা নয়। বছরে ২(দুই) দিন ব্যাংক হলিডে হয়ে থাকে। এর একটি তারিখ ০১ জুলাই এবং আরেকটি ৩১শে ডিসেম্বর। সরকারী সাধারন ছুটির সাথে মিলে গেলে এ ছুটির দিনটি এগিয়ে আনা হয়।

নিজে ব্যাংকিং পেশায় জড়িত থাকায় এদিনের মাহাত্ম্য আমার নিকট সময়ের সাথে সাথে ভিন্ন ভিন্ন আমেজ সৃষ্টি করেছে। ক্যালেন্ডার ও ডাইরীর ছুটির এই হলিডের কথা উল্লেখ থাকে। এতে যে কারো মনে হতে এই দিন দু’টি ব্যাংকিং পেশায় জড়িতদের জন্য বিশেষ ছুটির দিন। এই পেশায় যোগদানের পুর্বে আমারও তেমনি ধারণা ছিলো। কর্মে যোগদানের পর মনে হলো যাক আমিও এই বিশেষ ছুটির ভাগীদার হলাম যা ব্যাংক কর্মীদের জন্য সবিশেষ সম্মানের। এ নিয়ে বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছি।

কিন্ত বাস্তব অনেক বেশি রূঢ়। ১৯৮৪ সালের ১লা এপ্রিল চাকুরীতে যোগদান করার সুবাদে সহসাই সত্য সামনে এসে দাঁড়ালো, যেহেতু ২(দুই) মাস পরেই ছিলো ০১ জুলাই। এই তারিখের দিন দুই পুর্বে এ নিয়ে সহকর্মীর সাথে আলোচনা করতেই সে বলে আর ছুটি! পরে টের পাবে। বুঝে গেলাম যেতে হবে অফিসে ০১ জুলাই। কি আর করা আগের দিন মধ্য রাত পর্যন্ত ম্যানুয়েল ইন্টারেস্ট পোস্টিং ও পরবর্তী লেজার ব্যালেন্সিং করার কাজ শেষে বাড়ি ফিরেছি। এ স্বত্ত্বেও পরদিন সকালে অর্থাৎ ব্যাংক হলিডের দিন ১০টার দিকে মন খারাপ করে কর্মস্থল ন্যাশনাল ব্যাংক এর দিলকুশা শাখায় গেলাম। নামে ছুটি কিন্তু সে কাজেরও বাড়া।

তখন কম্পিউটারাইজড লেনদেন ছিলো না। এদিন ডিপোজিট ও লোন হিসাবের জের তথা ব্যালেন্স ১ম ও ২য় ষান্মাসিক এর জন্য নতুন পাতা/লেজারে ট্রান্সফার করা হয়। এর পর চলে লেজার ব্যালেন্সিং করা হয়। আর রয়েছে প্রধান কার্যালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক এর চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন বিবরনী প্রস্তুতি ও প্রেরনের কাজ। এছাড়া থাকে দুপুর বেলায় মান সম্মত ভুরিভোজ।

শাখার কিছু প্রভাবশালী বড় গ্রাহক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক সহ প্রধান কার্যালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগনও আসেন। ভুরিভোজ শেষে বৈদেশিক বানিজ্য বিভাগের কর্মকর্তাগন এর চলে যাবার সুযোগ থাকলেও সাধারন ব্যাংকিং বিভাগ, ঋণ ও অগ্রিম বিভাগ এবং হিসাব বিভাগে কর্মরতদের সে সুযোগ ছিলো না। তথাকথিত এই ছুটির দিনে বাসায় ফিরতে ফিরতে ৫টা বেজে যেত যেখানে আর সব কর্মদিবসে ফিরতাম ৭টা-৮টা নাগাদ। ভাগ্য ভালো থাকলে পরদিন ছুটি মিলে যায়, নইলে আবার কর্মের শুরু পরদিন সকাল হতেই।

বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝলাম আসলে ছুটি হচ্ছে গ্রাহকগনের। ফলে এদিন গ্রাহকগন আসবেন না যাতে করে লেনদেন বন্ধ রাখা যায় এবং ব্যাংক শাখার ক্লোজিং সম্পর্কিত কাজকর্ম বাধাহীনভাবে চলতে পারে।

তবুও কিছু অবুঝ গ্রাহক টাকা উঠানো ও জমাদানের জন্য হাজির হয় এই দিনে। এদের ফেরাতেও বেশ কসরৎ করতে হয়। এরকম চলে আসার এই প্রবণতা এখনও বিদ্যমান।

অবশ্য বর্তমানে ব্যাংকিং লেনদেন ডিজিটালাইজড (এখনকার ভাষায়) হয়ে পড়ায় উল্লেখিত কাজ গুলো আর ম্যানুয়ালি করতে হয়না। কম্পিউটার প্রোগ্রাম দ্বারা রিপোর্ট জেনারেট করা যায়। বর্তমানে মুলতঃ নিজেদের মধ্যে প্রাণ খুলে গল্প গুজবের সুযোগ ঘটে এদিন। আর চলে আসা ট্রেডিশান অনুযায়ী কিছু নগদ প্রাপ্তিও ঘটে একই সাথে। ইদানিং স্বল্প কিছু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এই খাতে অর্থ ছাড় করছেন না বলে অসমর্থিত সুত্রে জানা গেছে। এ বিষয়টি সত্যি হলে আমরা ওইসব কর্তৃপক্ষকে আমরা ছ্যাচরা বলতেই পারি। পরিশেষে ব্যাংক হলিডে নিয়ে ৪(চার) লাইনের কবিতা দিয়ে এই লেখার যবনিকা টানছি।

“আজ ব্যাংক হলিডে
আজ গ্রাহকদের ছুটি
আজ আমাদের অফিস
কাজ এর সাথে গাল-গল্প-রুটি”।

সব মিলে এই হলো ব্যাংক হলিডে যে দিন ব্যাংক অফিসারদের ছুটি নেই। তবে বর্তমানে লেনদেন কম্পিউটারাইজড হওয়ার প্রেক্ষাপটে এদিন ছুটি ঘোষণা করা হলে মন্দ হবে না।

কার্টেসিঃ সাইফুল ইসলাম চৌধুরী, ব্যাংকার (অবঃ)

Leave a Reply