মন্দঋণ: ব্যাংকারদের করণীয়

0
772

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ ২০১৭ সালের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণ ছিল ৬ লাখ ৯৭ হাজার ১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭৩ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা শ্রেণীবদ্ধ, যা মোট ঋণের ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। আশি কিংবা নব্বইয়ের দশকে আমাদের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা বিবেচনায় নিলে হয়তো এ অংকটা খুব বেশি বড় মনে হবে না, কিন্তু শ্রেণীবদ্ধ ঋণের অংকটা বাড়তে থাকলে অথবা হঠাৎ কিংবা কৃত্রিম কারণে হ্রাস পেতে শুরু করলে আমাদের সতর্ক হতে হয়। বাংলাদেশের বেশির ভাগ ব্যাংকেই শক্তিশালী ‘ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’ সংস্কৃতি নেই, যা এ পরিস্থিতিকে আরো বেশি বিপজ্জনক করে তুলেছে।

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের করা ‘স্ট্রেস টেস্ট’ এবং বিআইবিএমের কিছু পর্যালোচনা প্রতিবেদন আরো বেশকিছু উদ্বেগজনক বিষয় সামনে নিয়ে এসেছে। কয়েকজন বড় ঋণগ্রহীতার কাছে বেশির ভাগ ঋণ পুঞ্জীভূত হয়ে থাকায় সম্ভাব্য যেকোনো আর্থিক সংকট অথবা চ্যালেঞ্জিং সময়ে অনেক ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আমরা ৩০ শতাংশের অধিক শ্রেণীবদ্ধ ঋণের যুগ পার করেছি। এর জন্য উন্নয়ন অংশীদারদের পরিচালিত ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কার্যক্রম, যাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয় সহযোগিতা ছিল, এর পাশাপাশি বেসরকারি ও বিদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর রিস্ক ম্যানেজাররাও ধন্যবাদ পাবেন, তারা বড় প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও নিজেদের সম্পদ পোর্টফোলিওর উন্নতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা আমাকে প্রায় প্রশ্ন করেন, কেন একটি ঋণ মন্দে পরিণত হয়? কীভাবে আমরা ঋণ ক্ষতি এড়াতে পারব? রিস্ক অফিসার বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা হিসেবে আমি প্রায় ১৫ বছর কাজ করেছি। দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা আমাকে একটি বিষয় শিখিয়েছে, ঋণ সাধারণত মন্দ হয় যেসব কারণে তাহলো— ১. ঋণ প্রদানে প্রয়োজনীয়তার দুর্বল মূল্যায়ন
২. ঋণের কাঠামো বিবেচনায় দুর্বলতা
৩. নিরাপত্তা বা জামানতের ঘাটতি,
৪. ব্যবসায় অভ্যন্তরীণ নগদ অর্থের অপর্যাপ্ততা
৫. ব্যবসার ভিত্তি, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অথবা ধারাবাহিকতার দিকে না তাকিয়ে শুধু ঋণগ্রহীতার নামের ওপর ভর করে ঋণ প্রদান
৬. চলমান প্রতিযোগিতা অথবা উদীয়মান প্রতিযোগিতা সম্পর্কে ঋণ কর্মকর্তার অজ্ঞতা বা ভুল মূল্যায়ন
৭. অর্থনৈতিক মন্দা অথবা মূল ব্যবসার বাইরে অন্যান্য ব্যবসায় বিনিয়োগ বা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা বিবেচনায় না নেয়া।

এ কারণগুলোর সঙ্গে আরো যোগ করতে হবে— দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের ঝুঁকি বুঝতে না পারার ব্যর্থতা, ঋণ কর্মকর্তাদের দুর্নীতি বা ব্যর্থতা, জামানত বা চুক্তির শর্ত পূরণ করতে না পারলেও ঋণ দেয়া অথবা যথাযথ নজরদারির অভাব। একজন গ্রাহক হয়তো যে কোনোভাবে ঋণ অনুমোদন বা ছাড় করতে চাইবেন। এটি ঋণ কর্মকর্তার দায়িত্ব ওই পোর্টফোলিওর সংশ্লিষ্ট সব ধরনের ঝুঁকি যাচাই করা এবং ওই ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া। আমি দেখেছি, ঋণ ফেরতে ভুল শর্ত বা কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এক বৃহৎ টেক্সটাইল গ্রাহকের ঋণ কীভাবে বারবার অনাদায়ী হয়ে যাচ্ছিল।

ট্রেড সাইকেল অনুযায়ী, এন্ড টু এন্ড ট্রানজিকশনে (কাঁচামাল আমদানি থেকে রফতানি আয় দেশে আনা পর্যন্ত) সময় লাগে ১০৫ দিন, আর ঋণ যদি ফেরত দিতে হয় ৯০ দিনের মধ্যে, এটি উভয় পক্ষের জন্য সমস্যা তৈরি করে। একইভাবে আমরা দেখেছি, যথাযথ উত্তরাধিকার না থাকায় একজন বড় ট্যানারি গ্রাহকের হঠাৎ মৃত্যুর পর কীভাবে স্থানীয় একটি বৃহৎ ব্যাংককে বিশাল অংকের অর্থ গচ্চা দিতে হয়েছিল। একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের একজন বড় ঋণগ্রহীতা মেয়াদি ঋণ ছাড় করার পর পরই ঋণখেলাপি হয়ে পড়েন, কেননা জার্মান মার্কে বিনিময় হারের উত্থান-পতনের বিপরীতে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, যার ফলে তার প্রকল্প ব্যয় ধারণার তুলনায় কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছিল।

একটি গ্লোবাল করপোরেটের একজন বৃহৎ ডিস্ট্রিবিউটর ক্লায়েন্ট ঋণখেলাপি হয়েছিল। কারণ ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে নেয়া তার সব অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল জমি কিনতে, গ্রাহকপণ্য বিতরণ ব্যবসায় নয়। ঋণ কর্মকর্তারা প্রায়ই বড় গ্রাহকদের কাছে বাঁধা থাকেন তাদের অনুমিত পেশি বা ব্যবসায়িক শক্তির কারণে। এমনকি কর্মকর্তাদের মাঝে মধ্যে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলও করা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, বড় গ্রাহকরাই ঋণের শর্ত ঠিক করে দেন। কোনো গ্রাহকের ১০০ টাকার প্রয়োজন হয়, আর যদি ব্যাংক তাকে ২০০ টাকা দেয়, তবে গ্রাহকের ওই অতিরিক্ত টাকা ব্যবসার বাইরে ব্যয় করার জোর সম্ভাবনা তৈরি হয় অথবা গ্রাহক ঠিক সময়ে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে অনিয়মিত হয়ে পড়তে পারেন।

গ্রাহক যে-ই হোন অথবা যে ব্যবসাই করুক না কেন, ঋণ কর্মকর্তাকে ব্যবসার জন্য গ্রাহকের কী পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন এবং কী আদলে তা দেয়া হবে, এটা নিয়ে অবশ্যই গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। কথায় বলে, আপনি যদি একবার টুথপেস্ট থেকে অতিরিক্ত পেস্ট বের করে ফেলেন তবে তা আর ভেতরে প্রবেশ করাতে পারবেন না। একইভাবে যদি আপনার কানে কিছু পানি প্রবেশ করে, তবে ওই পানিকে বের করার জন্য আপনাকে আরো কিছু পানি প্রবেশ করাতে হবে। তাই ঋণ দেয়ার আগে ঋণ কর্মকর্তাকে বিজনেস মডেলের দিকে তাকাতে হবে। দেখতে হবে অনুমিত টার্নওভার কত, এন্ড টু এন্ড ট্রানজিকশনের মেয়াদ এবং এর পর সব হিসাব মিলিয়ে একটি অংক দাঁড় করাতে হবে এবং প্রকল্প ঋণের ক্ষেত্রে অবশ্যই জানতে হবে এ অংকের কতটা ব্যাংক অর্থায়ন করবে এবং কতটা মালিক বা উদ্যোক্তা। সরবরাহকৃত জামানতের অবশ্যই যথাযথ বাজারমূল্য নিরূপণ করতে হবে। একইভাবে জামানত-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অনিষ্পন্ন বা আউটস্ট্যান্ডিং বিষয়গুলো পর্যালোচনা করতে হবে।

বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকা, নদীদূষণ না করা— কর্তৃপক্ষের এমন বাধ্যবাধকতা না মানার কারণেও ঋণ মন্দে পরিণত হতে দেখা যায়। সামাজিক গোষ্ঠীগুলো এসব শর্ত না মানা কারখানা বন্ধে করতে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করতে পারে। ভুল ভূমি অধিগ্রহণ— যেমন স্কুল বা প্রার্থনার জায়গা নিয়ে কারখানা স্থাপন করতে গেলে বাধা আসতে পারে। এর ফলে কোম্পানিকে কারখানা অন্য কোথাও সরিয়ে নিতে হতে পারে, যার ফলে অবধারিতভাবে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যায়। আরেকটি বিষয়, উদ্যোক্তা যেসব খাতে শক্তিশালী, তার বাইরের ব্যবসা করলে ঋণ যথা সময়ে ফেরত দেয়ায় তেমন সহায়তা করে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিটি ব্যবসায়িক লগ্নিতে জয়ীদের সঙ্গে থাকতে হবে, পরাজিতদের সঙ্গে নয়। কেউ যদি কিছুটা ছাড় দিয়ে গ্রাহকের পছন্দনীয় খাতে ঋণ দিতে চায়, তবে মূল্যে বা সুদের হারে অন্তর্নিহিত ঝুঁকিটিকে বিবেচনা করতে হবে অথবা সরকারকে অবশ্যই ভর্তুকি দিতে হবে ওইসব খাতে অর্থের প্রবাহকে উত্সাহিত করতে।

বাংলাদেশে অনেক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কোনো রিস্ক পলিসি বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতি নেই অথবা ঋণ অনুমোদন, ছাড় ও আদায়ের কোনো কাঠামোগত পদ্ধতি নেই। আমি দেখেছি, অনেক প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিভাগে প্রচুর লোক রয়েছে, কিন্তু প্রতিটি ঋণ অনুমোদন বোর্ডের ওপর নির্ভরশীল। অনেক প্রতিষ্ঠানেই প্রতিনিয়ত জামানতের মূল্যায়ন সংস্কৃতি অনুপস্থিত। ব্যবসা বা ট্রেড সাইকেল মূল্যায়ন করার আগেই ঋণ অনুমোদন করা হয়। এর ফলাফল হয় মন্দঋণ, জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, মূলধন ক্ষয়, মুনাফার পতন এবং চূড়ান্তভাবে শেয়ারের দরপতন। একটি বলিষ্ঠ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংস্কৃতি, একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতি প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের ক্ষতি এড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে এর চেয়ে আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ ব্যবস্থাপনায় সঠিক লোক নিয়োগ। আমরা যদি ১০০ কোটি টাকার ঋণ ছাড় করি, তবে আমরা তা থেকে হয়তো সুদ ও অন্যান্য ফি হিসেবে ৩-৪ কোটি টাকা নিট আয় করতে পারব। আবার আমরা যদি একই পরিমাণ ঋণ দিয়ে বিপাকে পড়ি, তবে ১০০ কোটি টাকার পুরোটাই তো হারাবই, সঙ্গে মর্যাদাও যাবে, কর্মচারীরাও নিরুত্সাহিত হবে।

লেখক: মামুন রশীদ
ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক।

Leave a Reply