কয়েন বা মুদ্রা কি? মুদ্রার সাথে ব্যাংকের সম্পর্ক কি?

0
1204

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ প্রাচীনকাল থেকে মুদ্রা বিনিময় মাধ্যম হিসেবে বিভিন্ন দেশে চালু করা হয়েছিল। সুতরাং, মুদ্রা সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। সেই সময়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সাহায্যের জন্য ধর্মীয় ও স্থানীয় অভিজাত ব্যক্তিদের সঙ্গে অতিরিক্ত অবশিষ্ট মুদ্রা রাখা হয়েছিল। ধীরে ধীরে, এটি ব্যবসায়ী এবং অর্থদাতাদের জন্য লাভজনক ব্যবসা হয়ে ওঠে।

মুদ্রা কি?
মুদ্রা পণ্য বা সেবা আদানপ্রদানের জন্য একটি বিনিময় মাধ্যম। এটি অর্থের একটি ধরন। অর্থ হচ্ছে সেই সকল বস্তু যা বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কারেন্সি জোন বা মুদ্রা এলাকা হচ্ছে একটি দেশ বা এলাকা যেখানে একটি নির্দিষ্ট মুদ্রাই অর্থনীতির প্রধান বিনিময় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অধিকাংশ দেশেই একটি নির্দিষ্ট মুদ্রা যোগান ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

কার্যকারিতার ভিত্তিতে মুদ্রা বলতে আমরা বুঝি, ‘মুদ্রা একটি বিনিময় মাধ্যম, যা সবার নিকট গ্রহণীয় এবং যা মূল্যের পরিমাপক ও সঞ্চয়ের বাহন হিসাবে কাজ করে’।

Wikipedia তে মুদ্রা সম্পর্কে বলা হয়েছে-
A coin is a small, flat, (usually) round piece of metal or plastic used primarily as a medium of exchange or legal tender.
অর্থাৎ একটি মুদ্রা ছোট, সমতল, (সাধারণত) ধাতু বা প্লাস্টিকের বৃত্তাকার টুকরা প্রাথমিকভাবে বিনিময় বা বৈধমুদ্রার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বাংলাপিডিয়াতে মুদ্রা সম্পর্কে বলা হয়েছে-
মুদ্রা বলতে সাধারণত এমন একটি ধাতবখন্ডকে বুঝায়, যার একটি নির্দিষ্ট ধাতব বিশুদ্ধি (মেটালিক পিওরিটি) এবং নির্দিষ্ট তৌলরীতি (ওয়েট স্ট্যান্ডার্ড) আছে। নির্দিষ্ট তৌলরীতির ভিত্তিতে এবং নির্দিষ্ট ধাতব বিশুদ্ধির ওপর নির্মিত এই ধাতবখন্ড যখন বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত ও ব্যবহূত হয় তখন তা মুদ্রা বলে গণ্য হয়ে থাকে।

Investor Words Dictionary তে কয়েন বা মুদ্রা সম্পর্কে বলা হয়েছে-
Coin is a form of money, which is usually made from some type of metal. A coin is assigned a specific monetary value by a governing authority.
অর্থাৎ মুদ্রা অর্থের একটি রূপ যা সাধারণত এক ধরনের ধাতু থেকে তৈরি করা হয়। মুদ্রা একটি সরকার কর্তৃক একটি নির্দিষ্ট আর্থিক মূল্য বাবদ বরাদ্দ করা হয়।

উপরোক্ত সংজ্ঞা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে মুদ্রা নিম্নলিখিত কর্ম সম্পাদন করে-
বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে কাজ করে অর্থাৎ যেকোনো লেনদেন করার জন্য মুদ্রা ব্যবহার করা যায়। যেমন: একটি বই কিনতে টাকার ব্যবহার করা হয়। এখানে টাকা বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। মুদ্রার এটা সবচেয়ে প্রধান কাজ।

মূল্যের পরিমাপক হিসাবে কাজ করে অর্থাৎ যেকোনো অর্থনৈতিক পণ্য বা সেবার মূল্য কত এটা নির্ধারণ করা টাকার একটি কাজ। টাকার অস্তিত্ব আছে বলেই আমরা খুব সহজে একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১০০ টাকা নির্ধারণ করতে পারি, একটা বইয়ের মূল্য ২০০ টাকা নির্ধারণ করতে পারি, এক কেজি চালের মূল্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করতে পারি। এতে করে অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ সহজসাধ্য হয়ে যায়।

মুদ্রা ও তার ইতিহাস
মানব সৃষ্টি ও সভ্যতার বিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের প্রয়োজন, কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক বন্ধনের পরিধি প্রসার লাভ করতে থাকে। প্রমে মানুষের চাহিদা ছিল খুব সীমিত এবং পরস্পরের মধ্যে তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত দ্রব্যাদি বিনিময়ের মাধ্যমে নিজের চাহিদা নির্বাহ করতো। ‘দ্রব্যের বিনিময়ে দ্রব্য’ এই প্রাথাটি বিনিময় প্র্রথা হিসাবে পরিচিত। পর্যায়ক্রমে মানুষের জ্ঞান ও বুদ্ধির পরিধি বাড়ার সাথে সাথে মানুষের কর্মকাণ্ড বিশেষভাবে বিনিময় কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটে এবং সাথে সাথে মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা বৃদ্ধি পায়, যার পিছনে ঘোড়ার গাড়ি, নৌকা এবং পরবর্তীতে জাহাজের অবদান অসামান্য।

যোগাযোগের অসুবিধা দূর হওয়ার সাথে সাথে ভৌগোলিক বিভিন্ন অবস্থান থেকে প্রয়োজনমতো দ্রব্যাদি সংগ্রহের চেষ্টা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিনিময়ের মাধ্যম ছাড়াও সঞ্চয়ের ভাণ্ডার এবং মূল্যের পরিমাপক হিসাবে মুদ্রার প্রয়োজনীয়তা মুদ্রা সৃষ্টিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। মুদ্রার ইতিহাস খুবই বিচিত্র। ইতিহাস থেকে বিনিময় মাধ্যমে মুদ্রা হিসাবে বিভিন্ন সময় কড়ি, হাঙ্গরের দাঁত, হাতির দাঁত, পাথর, ঝিনুক, পোড়া মাটি, তামা, রুপা ও সোনার ব্যবহার লক্ষ করা যায়।

ব্যবহার, স্থানান্তর, বহন এবং অন্যান্য প্রয়োজনের কারণে ধাতব মুদ্রার ব্যবহার বেশিদিন স্থায়িত্ব লাভ করতে পারেনি। পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে ধাতব মুদ্রা ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ধাতব পর্দাথের সরবরাহ ঘাটতি দেখাদেয়, তাছাড়া স্বর্ণ এবং রৌপ্যের অলংকারাদিসহ অন্যান্য ব্যবহারের কারণে কাগজি মুদ্রার প্রচলন ঊনবিংশ শতাব্দীতে শুরু হয়। বর্তমানে কাগজি মুদ্রার সাথে সাথে ধাতব মুদ্রার প্রচলন থাকলেও ধাতব মুদ্রার ব্যবহার এখন ক্রমশ সীমিত হয়ে আসছে। কাগজের সহজলভ্যতা, সহজে বহনযোগ্য হওয়া এবং বর্তমানে বিভিন্ন রকমের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ায় কাগজি মুদ্রা ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে।

মুদ্রা এবং ব্যাংকের সম্পর্ক
সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে মানুষের সামাজিক বন্ধন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পায়, যার ফলে মানুষের মধ্যে লেনদেন এবং বিনিময়ের কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পায়। মুদ্রা প্রচলনের পরপরই ব্যাংকব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, যার জন্য মুদ্রাকে ব্যাংকব্যবস্থার জননী বলা হয়। ব্যাংকব্যবস্থা বিবর্তনের প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত ব্যাংক মুদ্রাকেই তার ব্যবসার প্রধান উপাদান হিসাবে ব্যবহার করে আসছে।

মানুষের কাছে থাকা প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ তার সঞ্চয় হিসাবে সংগ্রহের মাধ্যমে ব্যাংক তার আমানতের সৃষ্টি করে, যার বিনিময়ের সঞ্চয়কারী একটি নির্দিষ্ট সুদ বা মুনাফা পেয়ে থাকে। এই আমানত ঋণগ্রহীতাকে ঋণ হিসাবে বর্ধিত সুদে প্রদানের মাধ্যমে ব্যাংক তার ব্যবসায়িক মুনাফা লাভ করে থাকে। মুদ্রা ছাড়া যেমন ব্যাংক চলতে পারে না, তেমনি ব্যাংক ছাড়া মুদ্রার ব্যবহারও সীমিত।

Leave a Reply