ভাতা বিতরণে ব্যাংকারের উপলব্ধি

0
930

ছোট্ট একখান রাজ্য, অসংখ্য তার প্রজা। অভাব-অনটন, রোগ-বালাই লেগেই আছে রাজ্য জুড়ে। প্রজাদের এ দুর্দশা দেখে, রাজা মশাই সিদ্ধান্ত নিলেন সকল নাগরিক সেবা সমহারে প্রজাদের মাঝে পৌছে দিবেন। তাই তিনি চালু করলেন “প্রজা সুরক্ষা কার্ড”।

প্রথমবার রাজার তত্ত্বাবধানে অসহায় গরীব প্রজাদের মাঝে এই কার্ড বিতরণ করা হলো। “প্রজা সুরক্ষা কার্ড” এ খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মত মৌলিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিলো। প্রজাগণ এসব সুবিধা পেয়ে মহা খুশিতে জয়োধ্বনি করতে লাগল।

কিছুদিন পর এ কাজের দায়িত্ব পড়লো উজির-নাজিরদের উপর। তারা আবার সহায়তা নিলেন পায়িক-পেয়াদার। শুরু হয়ে গেলো অসঙ্গতি। যারা এ কার্ডের প্রকৃত সুবিধাভোগী তাদেরকে না দিয়ে অর্থের বিনিময়ে এসব সুবিধা অন্যদের পাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হলো। এক সময় ধীরে ধীরে সারা রাজ্য জুড়ে এটাই নিয়ম হয়ে গেল।

একদিন রাজ ভান্ডার থেকে কার্ডধারীদের খাদ্য বিতরণ হচ্ছিল, একে একে সবাই বস্তা ভর্তি খাবার নিয়ে বাড়ি যাচ্ছে। রাস্তায় এক মা তার ক্ষুধার্ত তিন সন্তানের খাবার জোগাড় করতে না পেরে হাউমাউ করে কাদছে। কেউ তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না।

এ সময় অন্য রাজ্য থেকে আসা এক বৃদ্ধলোক যাচ্ছিলেন এ রাস্তা দিয়ে। মহিলার কান্না দেখে জিজ্ঞেস করলেন “মা তুমি কাদছো কেন?”
গরীব প্রজাটি জানালো, তার স্বামীর নামে রাজার দেয়া একটি কার্ড ছিলো। সে প্রতিমাসে রাজ ভান্ডার থেকে কিছু খাদ্য পেত। তাই দিয়ে অসুস্থ্য স্বামী এবং সন্তানদের মুখে কোন রকম দু’বেলা দু’মুটো খাবার তুলে দিতেন। কিছুদিন হয় তার স্বামী মারা গেছে। স্বামী মারা যাবার পর তাকে আর কার্ডটি দেয়া হয়নি। কেন দেয়া হলো না জানতে চাইলে প্রজাটি বললো- মেলা টাকা চাওয়া হয়েছে তার কাছে, সে দিতে পারেনি বলে তাকে আর কার্ডটি দেয়া হয়নি। যারা টাকা দিতে পেরেছে তাদেরকেই কার্ড দেয়া হয়েছে এবং তারাই খাদ্য পাচ্ছে।

বৃদ্ধ লোকটি জানতে চাইলো তোমাদের এই কার্ড ব্যবস্থাটি কে চালু করেছে? সে জানালো- তাদের রাজা মশাই।এবার বৃদ্ধ তার থলে থেকে একটি ছোট্ট আয়না বের করে প্রজার হাতে দিয়ে বললেন- “যখন তোমার ছেলে-মেয়েরা খাবারের জন্য কান্নাকাটি করবে, এই আয়নাতে থুতু দিও। এতে কোন ভুল করবে না। দেখবে তোমার খাদ্য সংকট কেটে যাবে”। এই বলেই লোকটি চলে গেলেন।

প্রজা বাড়ি গিয়ে বৃদ্ধর কথা মতো আয়নাতে নিয়মিত কাজটি করতে লাগলেন।
এ দিকে প্রজাবান্ধব রাজা পড়েছেন এক অদ্ভূত সমস্যায়। সারা রাজ্যে জুড়ে খবর ছড়িয়ে পড়লো রাজার খাবারে অদৃশ্য কেউ থুতু ছুড়ে। খাবার নিয়ে বসলেই রাজা মশাই দেখতে পান থালা ভর্তি থুতু।

এই নিয়ে হুলস্থূল বেধে গেল। পন্ডিত-গনক-কবিরাজ সব এক হয়ে বিষয়টি সমাধান করতে চাইলো, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। রাজা না খেয়ে খেয়ে দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে।

পরবর্তীতে পার্শ্ববর্তী রাজ্য থেকে পন্ডিত ডাকা হলো। পন্ডিত মশাই রাজার সমস্যার কথা মনযোগ দিয়ে শুনে, রাজার দিকে ঘৃনার চোখে তাকালেন। বললেন “জাহাপনা আমাকে ক্ষমা করবেন, আপনি যে কাজ করেছেন, তার ফল এমনই হবার কথা”।

রাগে-ক্রোধে সেনাপতি তলোয়ার বের করলেন। রাজা ক্ষান্ত হতে বললেন। বিষয়টি কি তা জানা দরকার।
পন্ডিত বললেন- “মশাই আপনি ক্ষুধার্ত প্রজাদের সামনে খাবারের থালা দিয়ে আবার কেড়ে নিয়েছেন। তাই আপনার এই পরিনতি“। উজির-নাজির সবাই খামোশ! খামোশ! বলে উঠলেন কিন্তু রাজা সবাইকে থামিয়ে দিয়ে পন্ডিতের কথায় গুরুত্ব দিলেন। সারা রাজ্যে লোক পাঠালেন কোথাও কেউ না খেয়ে আছে কি না।

“খাদ্য সমস্যা আছে এমন প্রজাদের রাজ প্রাসাদে ডাকা হয়েছে” এই ঘোষণার পরপরই রাজার মহল শত শত লোকে লোকারণ্য হয়ে গেলো। এতো প্রজা দেখে রাজার চোখ কপালে। আমার রাজ্যে এত লোক না খেয়ে থাকে?

রাজা একে একে সবার সঙ্গে কথা বলছিলেন তাদের খাদ্য সমস্যার ব্যাপারে। সবার একই কথা মহারাজ আপনী আমাদের যে কার্ড দিয়েছিলেন তা আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে। আমরা টাকা দিতে পারি না বলে আমাদের আর এ কার্ড দেয়া হয় না। আমরা না খেয়ে আছি মহারাজ, আপনি আমাদের বাঁচান!

রাজা খেয়াল করলেন প্রজাদের মধ্যে একজনের হাতে আয়নার মতো একটি বস্তু। এবার তাকে ডাকা হলো। জানতে চাওয়া হলো তার হাতে ওটা কি? কি জন্য সে এটা এখানে বয়ে এনেছেন?

প্রজা তার হাতের বস্তুটি দেখিয়ে বললো- “মহারাজ এটি একটি আয়না। দৈনিক তিনবেলা আমার সন্তানরা যখন ক্ষুধায় কান্নাকাটি করে, তখন আমি এটিতে থুতু দেই আর তাতেই আমার সন্তানদের ক্ষুধা চলে যায়। ঘুষ না দিতে পারায় কার্ড পাইনি কিন্তু এই আয়না আমার সন্তানদের খাদ্য না দিতে পারলেও ক্ষুধা নিবারণে সাহায্য করে মহারাজ”!

রাজার আর বুঝতে বাকী রইলো না যে তার খাবারে থুতু আসে কোথা থেকে। রাজা সব ঘটনা শুনে ঐ প্রজাকে বললো- “মাগো আয়নায় আর থুতু দিও না! আমি তোমাদের খাবারের ব্যবস্থা করছি“।

অতপর রাজা, সারা রাজ্যে ঘোষণা করে দিলেন- “আজ থেকে সরকারী কাজে কেউ ঘুষ চাইলে থুতু দিও, তাদের মুখে দিও, আয়নায় দিও না”৷

সেই থেকেই সে রাজ্যে আর কেউ কোন কাজে ঘুষ চায় না……..

আমাদের দেশে এমন আয়না চালান দিলে বুঝা যেতো, কে বয়স্ক-বিধবা-অস্বচ্ছল ভাতা পাবার কথা আর কে পাচ্ছে। প্রতিবার ভাতা বিতরণ করতে গিয়ে অবাক হই, বেশির ভাগ ভাতা ভোগীই সমাজে প্রতিষ্ঠিত। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল। তাহলে সরকার যাদের কথা ভেবে এই কার্ডের প্রচলন করলো, তাদের লাভ হলো কতটুকু? জনপ্রতিনিধিদের আত্নীয়-স্বজনদের নামে কার্ডের ছড়াছড়ি। এমনভাবে ব্যাংকে এনে উপস্থাপন করে, মনে হয় যেন গর্বের সাথে ভিজিটিং কার্ড দেখাচ্ছে! আর সাধারণের বেলায় এ কার্ড তৈরি করতে নাকি পাঁচ হাজার টাকা লাগে। শুনে ঘৃণায় গা ঘিনঘিন করে!

লেখকঃ মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন
ব্যবস্থাপক, জনতা ব্যাংক লিমিটেড, বাতাকান্দি শাখা, কুমিল্লা উত্তর।

Leave a Reply