ব্যাংকাররাই কেন বলির পাঁঠা?

0
2268

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ সম্প্রতি পরিবেশ ও বন-বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. হাছান মাহমুদ রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে প্রাক-বাজেট আলোচনায় ব্যাংক এমডিদের বেতন-ভাতায় লাগাম টানতে বলার পরক্ষণেই অনেকেই ব্যাংকারদের বেতন-ভাতা নিয়ে হিসাব কষতে শুরু করেছেন। ২২ মার্চ আমাদের সময় পত্রিকার একটি যৌথ নিবন্ধে দুজন লেখক লিখেছেন, কোনো কোনো ব্যাংক নাকি বছরে ৮-১০টি প্রফিট বোনাস দিচ্ছে এবং এ প্রফিট বোনাস বাবদই নাকি কোনো কোনো কর্মকর্তা বছরে ৬-৭ লাখ টাকা বা আরো বেশি পাচ্ছেন!

বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, ব্যাংকের চার কি পাঁচজন নির্বাহীর বেতন-ভাতা দিয়ে সব ব্যাংকারের আয় বিচার করবেন না। লেখাটি পড়ে আমার মনে হয়েছে, ব্যাংকারদের রুটি-রুজি কেড়ে নিতে পারলেই যেন লেখকরা প্রশান্তি পেতেন।

প্রথমেই লেখকদ্বয়ের কাছে বিনীতভাবে জানতে চাই, বছরে ৮-১০টি প্রফিট বোনাস দেয়া, থইথই করে উপচে পড়া প্রফিটসমৃদ্ধ ব্যাংকটির নাম কী? এ অতিরঞ্জিত তথ্যটি লেখকরা হয়তো তাদের লেখার প্রসার বাড়াতে বলেছেন নতুবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংক্ষুব্ধ হয়ে কোনো বিশেষ ব্যাংকারের বিরুদ্ধে অতীত শত্রুতার শোধ নিতে এমনটা বলেছেন।

বছরে ৬-৭ লাখ টাকার প্রফিট বোনাস নেয়ার দিন বহু আগেই বিলীন হয়ে গেছে। অনেক ব্যাংকই ২০১৭ সালের জন্য কোনো প্রফিট বোনাস দেয়নি এবং কয়েক বছর ধরে ব্যাংকারদের আর্থিক প্রণোদনা বন্ধ আছে বললেই চলে। কয়েকটি ব্যাংক ২০১৮ সালের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পর্যন্ত দেয়নি। থমকে আছে প্রমোশন এবং বেতন বৃদ্ধির মতো অত্যন্ত সাধারণ বিষয়ও।

আরো বলা হয়েছে, ব্যাংকাররা ২ থেকে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ পেয়ে থাকেন। সরকারি ব্যাংকগুলো ও গুটি কয়েক বেসরকারি ব্যাংক তাদের কর্মীদের ৫ শতাংশ সুদে হাউজ লোন দিলেও ২ শতাংশ সুদে কোনো ব্যাংক ঋণ দিচ্ছে, এ খবরটি একজন ব্যাংকার হওয়া সত্ত্বেও পত্রিকার ওই লেখাটি পড়েই প্রথম জানতে পারলাম। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদে কিংবা প্রেফারেন্সিয়াল রেটে গ্রাহকরাই ঋণ পান কিন্তু ব্যাংকার হওয়া সত্ত্বেও ব্যাংকারদের বাণিজ্যিক হারেই ঋণ নিতে হয়, যা বাংলাদেশ ব্যাংকেরও নির্দেশ।

আমি যদি আমার নিজের ব্যাংকের কথাও বলি, গত বছর অনেক গ্রাহক প্রেফারেন্সিয়াল রেট ৯-১০ শতাংশ সুদে ঋণ পেলেও ব্যাংকারদের নিজের ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ১৩ শতাংশ হারেই ঋণ নিতে হয়েছে। তাছাড়া ব্যাংকারদের ঋণের কোনো মনিটরিং বা রিকভারি খরচ নেই, নেই খেলাপি হওয়ার কোনো আশঙ্কা। কারণ ব্যাংকারের অ্যাকাউন্টে মাসের বেতন ক্রেডিট হওয়ার আগেই ঋণের কিস্তির টাকা আদায় করে ফেলা হয়। অবসরকালীন যদি কোনো ঋণের ব্যালান্স থেকেও যায়, তাহলে বেনিফিটের টাকা থেকে তা আদায় করা হয়।

দু-একটি ব্যতিক্রম হয়তো থাকতে পারে কিন্তু এ ব্যতিক্রম দিয়ে পুরো খাতকে মূল্যায়ন করলে হবে না।

সমালোচনা হয়েছে ব্যাংকের চাকচিক্য আর সাজসজ্জা নিয়েও। আমরা একদিকে উন্নয়নশীল দেশের পতাকা বহন করব আবার কঙ্গো-লাইবেরিয়ার মতো জীর্ণশীর্ণতাও ধরে রাখতে চাইব, তাহলে কীভাবে হবে? সরকারি ব্যাংকগুলোয় হয়তো কোনো প্রতিযোগিতা নেই কিন্তু বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হয়। গ্রাহকদের জন্য উত্তম সেবা ও সেবার পরিবেশ দুটি বিষয়ই ব্যাংকগুলোকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নেয়। এখানে যা প্রয়োজন তা হচ্ছে, শাখাগুলোর চাকচিক্য না কমিয়ে সংস্থাপন ও রিনোভেশন খরচের ওভার-বিলিং যেন না হয়, সেটা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।

ব্যাংকগুলো ঋণের বিপরীতে উচ্চসুদ নিয়ে মুনাফালিপ্সু আচরণ করছে মর্মেও অনেকে আপত্তি উত্থাপন করছেন। গত বছর যখন কোনো কোনো ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে এসেছিল, তখনো আমানতকারীদের বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে অনেকেই বলেছেন। আমানতে কম সুদ দিলেও ব্যাংকের সমালোচনা হয় আবার ঋণের বিপরীতে বেশি সুদ আদায় করলেও ব্যাংকের সমালোচনা হয়। তাহলে আমরা কী চাইছি? উত্তরটা হচ্ছে, আমরা সবাই আমানত ও ঋণ উভয়ের যৌক্তিক সুদহার চাইছি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ যৌক্তিক সুদহার কত হবে? ব্যাংকের আমানতের সুদহার আমানতের জোগান তথা তারল্য প্রবাহের ওপর নির্ভর করে। সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার তহবিলের ৭৫-৮০ শতাংশই জমা হয় সরকারি ব্যাংকে।

বেসরকারি ব্যাংকের তারল্যের মূল উৎস হচ্ছে ক্ষুদ্র আমানতকারীরা কিন্তু সঞ্চয়পত্রের উচ্চ সুদহারের কারণে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ক্ষুদ্র আমানতকারীদের আমানত চলে যাচ্ছে সরকারি সঞ্চয়পত্রে। আর সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার তহবিলের ২০-২৫ শতাংশ নিজেদের ভাগে নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের মন জোগাতে হয় নানা আপ্যায়নে। তাই ঋণের সুদহার কমাতে হলে ব্যাংকের কস্ট অব ফান্ড (আমানতের বিপরীতে প্রদত্ত সুদ) কমাতে হবে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় সরকারি তহবিলের অংশীদারিত্ব বাড়াতে হবে এবং সঞ্চয়পত্রের সুদহার ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদহারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

আমরা সবসময় সমস্যার মূলে না ধরে শাখা-প্রশাখা ধরে টানাটানি করি। ফলে শাখা-প্রশাখা বিচ্ছিন্ন হয় ঠিকই কিন্তু মূল উৎপাটন না করতে পারার কারণে সমস্যা থেকেই যায়। ব্যাংকগুলো ঋণের সুদহার কেন কমাতে পারছে না কিংবা কয়েক দিন আগেও ব্যাংকগুলো ৮ থেকে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে ঋণ দিতে পেরেছে, এখন পারছে না কেন? উত্তর পেতে হলে সমস্যার মূলে হাত দিতে হবে। কোনো ব্যাংক যখন ১০০ কোটি টাকা ঋণ দেয়, তার বিপরীতে বছরে হয়তো ৬-৭ লাখ টাকা আয় করে কিন্তু এ ঋণটি যখন খেলাপি হয় তখন তা থেকে আর ব্যাংকের কোনো আয় হয় না।

কিন্তু এই ১০০ কোটি টাকার মালিক যে আমানতকারীরা, তাদের ১০০ কোটি টাকার আমানতের বিপরীতে সুদ প্রদান অব্যাহত থাকে। বিভিন্ন সংকট মুহূর্তে আমানতকারী গ্রাহকরা শুধু মুনাফাই নয়, মূল টাকাও নিয়ে যেতে চান, যেমনটা সবাই দেখছি ফারমার্স ব্যাংকের ক্ষেত্রে। ফলে ব্যাংককে তার অন্যসব পারফর্মিং অ্যাসেটের আয় থেকে এ আমানতকারীদের লভ্যাংশ প্রদান করতে হয়। এখানেই শেষ নয়, এই নন-পারফর্মিং ১০০ কোটি টাকার মন্দ ঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ হারে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রভিশন রাখতে হয় ব্যাংকের নিয়মিত আয় থেকে। ঠিক একইভাবে ১০০ কোটি টাকার মন্দ ঋণ রাইট-অফ করতে ব্যাংকের ১০০ কোটি টাকার আয় দিয়ে ঋণটিকে সমন্বয় করতে হয়। কয়েকটি ব্যাংক এ প্রভিশন রাখতেও ব্যর্থ হচ্ছে। কারণ প্রতি বছরই ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ বাড়ছে এবং সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রভিশনের অংক, যা ভাগ বসাচ্ছে ব্যাংকের মুনাফার ওপর।

পরিতাপের বিষয় এই হাজার হাজার কোটি টাকা আদায়ের জন্য কোনো মাথাব্যথা কারোর নেই। কারণ যারা বলবেন তারাই তো এই নাটের গুরু। তাই তথাকথিত জজ মিয়া নাটকের মতো ব্যাংকারদের বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ভিন্ন, সম্পদ ও দায়ের ভিত্তি একেক রকম। একেক ব্যাংকের ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রাও একেক রকম এবং প্রত্যেক ব্যাংক তার নিজস্ব আয় দিয়েই ব্যয় নির্বাহ করে। ব্যাংকগুলোর ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা মুনাফা হলেও কস্ট মিনিমাইজেশনও ব্যাংকগুলোর নিজস্ব ব্যবসায়িক স্ট্র্যাটেজি। তাই মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ব্যাংকগুলোর আয়-ব্যয় নিয়ন্ত্রণে বাহ্যিক হস্তক্ষেপ ব্যাংকিং খাতের জন্য মঙ্গলজনক হবে না।

ব্যাংকের অপারেটিং মুনাফা থেকে ৪২ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে সরকারকে কর প্রদান করে। তাছাড়া সরকারি ত্রাণ তহবিলে অনুদান, বিভিন্ন দুর্যোগে অর্থসহায়তা এবং সর্বোপরি সিএসআর কার্যক্রমে বেসরকারি ব্যাংকগুলো বরাবরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ব্যাংকের মুনাফা কমানোর মানে হচ্ছে, এ করের পরিমাণ কমানো তথা সরকারের উন্নয়ন অংশীদারিত্বে লাগাম টেনে ধরা।

যে দেশে ৪ হাজার কোটি টাকা কিছুই না, সে দেশে ১৫-২০ লাখ টাকা অনেক কিছু শুনলে অবাকই লাগে। একজন ব্যক্তির বেতন হিসেবে চিন্তা করলে হয়তো বেশিই মনে হয়। কিন্তু এ ২০ লাখ টাকা বেতনের পেছনে একজন এমডির দায়দায়িত্ব এবং চাকরির শঙ্কা কতটুকু, তা জানলে মনে হবে এ বেতন নিতান্তই কম। একজন এমডিকে বছরের শুরুতেই ২-৩ হাজার কোটি টাকার প্রফিট টার্গেট, ২০ হাজার কোটি টাকার নতুন আমানতের টার্গেট নিয়ে বছর শুরু করতে হয়। তাছাড়া সার্বক্ষণিক দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়, কখন না জানি বোর্ড নারাজ হয়ে যায়। আজকে অফিস শেষ করে বলতে পারেন না, কালকে তার চেয়ারে তিনি সমাসীন থাকতে পারবেন কিনা। এই তো কয়েক দিন আগেই পত্রিকার শিরোনাম হয়েছিল— ‘এমডি পদ হারিয়ে বেকার ৮ ব্যাংকার’। বেসরকারি ব্যাংক ব্যতীত অন্য কোনো সরকারি আমলা, যাদের বেতন-ভাতার সঙ্গে এমডিদের বেতন-ভাতার তুলনা করা হয়েছে, তাদেরকে কি এমন টার্গেট নামক খড়্গ মাথায় বয়ে বেড়াতে হয়, নাকি চাকরি হারিয়ে বেকার হওয়ার অনিশ্চয়তায় কখনো চিন্তিত হতে হয়?

বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যেখানে লাঞ্চ আওয়ারে অফিসে গিয়ে কোনো সেবা পাওয়া যায় না। কারণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দুপরের লাঞ্চ করতে গিয়ে আহার ও নিদ্রা দুই কাজ শেষ করে অফিসে আসতে আসতে সেবার সময়ই পার হয়ে যায়। ৯টার অফিস ১১টায় শুরু হয়, ৫টার অফিস শেষ হয়ে যায় ৩টা বাজলেই। আর ব্যাংকাররা লাঞ্চ, এমনকি নামাজের সময়েও সেবা প্রদান থেকে বিরত থাকতে পারেন না; অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের মাধ্যমে সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হয়। লেনদেন সময় ৪টা হলেও এর পরেও বহু অনুরোধের লেনদেনের ঢেঁকি গিলতে হয়।

ব্যাংকাররা ১০টা-৬টার চাকরি করেন না। ব্যাংকাররা ২৪/৭-এর পেশাজীবী। ডেস্ক ওয়ার্ক শেষ মানেই বাসায় চলে যাওয়া নয়। আমানত সংগ্রহ, নতুন অ্যাকাউন্ট ও গ্রাহক ম্যানেজ করাসহ রকমারি টার্গেট নিয়ে অফিস

শেষেও ব্যাংকারদের ছুটতে হয় নিরবধি— হোক সে এমডি আর হোক সে কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারী। নেই তাদের শুক্রবার, নেই কোনো শনিবার, নেই কোনো ঈদ, নেই কোনো পূজা-পার্বণ। ব্যাংকারদের শ্রমের তুলনায় যে পারিশ্রমিক তারা পান, তা দ্বিগুণ করলেও ব্যাংকারের শ্রম অবমূল্যায়িত হবে বলেই মনে হয়।

লেখক: মোশারফ হোসেন, ব্যাংকার।

সূত্রঃ বণিক বার্তা

Leave a Reply