ইসলামী অর্থনীতিতে যাকাতের ভূমিকা

0
198

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ ইসলামী রাষ্ট্রে আয়ের যে ক’টি উৎস রয়েছে তন্মধ্যে যাকাত অন্যতম। একই সঙ্গে যাকাত ইসলামের তৃতীয় বৃহত্তম ইবাদত। ঈমানের সাক্ষ্য ও সালাতের পরই যাকাতের অবস্থান। প্রসিদ্ধ হাদীসে ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিত- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভে যাকাতকে সালাতের পর উল্লেখ করেছেন। এছাড়া মুয়ায রা. ইয়ামানে যাওয়ার পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে দাওয়াতের যে পদ্ধতি শিখিয়েছেন, তাতেও সালাতের পরই যাকাতের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, যদি ইয়ামানবাসী শাহাদাত ও সালাতের কথা স্বীকার করে নেয়, তাহলে তাদের জানাবে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের উপর যাকাত ফরয করেছেন। যা তাদের ধনীদের থেকে উসুল করে গরীবদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হবে।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে অধিকাংশ জায়গায় সালাতের সাথে যাকাতকে মিলিয়ে উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, ‘সালাত কায়েম করো আর যাকাত আদায় করো’।

যাকাত গরীবের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ফলে বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পায়। যা যোগান বৃদ্ধিতে চাপ প্রয়োগ করে। যোগান বাড়াতে প্রয়োজন হয় বিনিয়োগ বাড়ানোর। গড়ে উঠে নতুন কারখানা। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, বেকারত্ব হ্রাস পায়। বিনিয়োগ বাড়ালে মুনাফা বৃদ্ধি পায়। কাজেই সম্পদও বৃদ্ধি পায়। ফলে যাকাতও বেড়ে যায়। এভাবেই পুরো অর্থনীতিকে চালিয়ে নিয়ে যায় যাকাত।

যাকাত কী?
যাকাত শব্দের অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া। রিবা (সুদ) অর্থও বৃদ্ধি পাওয়া। তবে যাকাত আর রিবার বৃদ্ধির মাঝে পার্থক্য আছে। যাকাত সম্পদের বরকত ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করে; সম্পদকে পবিত্র করে। অপরদিকে ‘রিবা’ সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি করে, তবে বরকত নষ্ট করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, আল্লাহ রিবার সম্পদ ধ্বংস করে দেন, আর যাকাত-সাদাকাতের সম্পদকে বৃদ্ধি করে দেন।

তিনি আরো বলেন, আপনি তাদের সম্পদ থেকে সাদাকা-যাকাত উসুল করুন। এটা তাদেরকে পবিত্র করবে। পরিভাষায় যাকাত হলো, শরীয়ত নির্ধারিত ব্যক্তিকে আল্লাহর সন্তুষ্টিচিত্তে শরীয়ত নির্ধারিত সম্পদের অংশের মালিক বানিয়ে দেয়া।

যাকাত হলো, ধনীর সম্পদে গরীবের হক। আল্লাহ তাআলা বলেন, আর তাদের সম্পদে গরীব ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে। কাজেই যাকাত আদায় না করার অর্থ, গরীবকে প্রাপ্য হক থেকে বঞ্চিত করা।

যাকাত অনাদায়ের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা কঠিন শাস্তির ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আর যারা স্বর্ণ ও রূপা জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদের কঠোর আযাবের দুঃসংবাদ শুনিয়ে দিন। সে দিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশকে দগ্ধ করা হবে। (সেদিন বলা হবে) এগুলো হলো তা যা তোমরা নিজেদের জন্যে জমা রেখেছিলে সুতরাং এক্ষণে আস্বাদ গ্রহণ করো জমা করে রাখার।

যাকাত কখন ফরয হয়?
প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের উপর যাকাত ফরয, যদি তার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ এক বছর পর্যন্ত থাকে।

নেসাবের ব্যাখ্যা
নেসাব হলো সম্পদের একটি পরিমাণ; সর্বনিম্ন যে পরিমাণ সম্পদ থাকলে ব্যক্তির উপর যাকাত ফরয হয় এবং তাকে বলা হয় সাহেবে-এ-নিসাব।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সোনা-রূপা, পশু ও ফসলের ভিন্ন ভিন্ন নেসাব বর্ণনা করে গেছেন। তবে যেহেতু পশু ও ফসল ভিন্ন অন্য সব খাতে সোনা-রূপার নেসাবই ধর্তব্য, তাই আমরা কেবল সেটা নিয়েই আলোচনা করবো।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বর্ণিত হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে সোনার নেসাব হয় ৮৭.৪৮ গ্রাম বা ৭.৫ ভরি। আর রূপার নেসাব হয় ৬১২.৩৬ গ্রাম বা ৫২.৫ ভরি। বর্তমানে বাজারমূল্য হিসেবে সোনার নেসাব দাঁড়ায় প্রায় তিন লাখ টাকা। আর রূপার নেসাব দাঁড়ায় প্রায় ৫২ হাজার পাঁচ শত টাকা। এই পরিমাণ সম্পদের মালিক কেউ হলে সে ছাহেব-এ-নেসাব অর্থাৎ নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে। যেহেতু যাকাত গরীবের হক, তাই গরীবের যে নেসাব হিসাব করলে উপকার বেশি হবে, সেটাই হিসাব করা উচিৎ। সে হিসেবে সামর্থবানদের উচিৎ রূপার নেসাবে হিসাব ধরে যাকাত আদায় করা। হ্যাঁ, যদি কারো সামর্থ্য কম থাকে বা আয়ের কোনো উৎস না থাকে, তাহলে তিনি সোনার নেসাবে উত্তীর্ণ হলেই যাকাত আদায় করবেন।

এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার ব্যাখ্যা
যেদিন নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে, সেদিন থেকে এক চন্দ্র বছর পর যাকাত হিসাব করতে হবে। যেমন কেউ এ বছর রমজানের এক তারিখে নেসাবের মালিক হলো। তাহলে পরের বছর রমজানের এক তারিখে তাকে যাকাত হিসাব করে আদায় করতে হবে।

নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার পর বছরের মাঝে যদি সম্পদের পরিমাণ নেসাব থেকে কমে আসে কিন্তু যাকাত হিসাব করার তারিখে নেসাব অটুট থাকে, তাহলে যাকাত আদায় করতে হবে। যেমন, কেউ রমজানের এক তারিখে তিন লাখ টাকার মালিক হলো। তাহলে সোনার নেসাব অনুসারে সে সাহেবে নেসাব বলে গণ্য হবে। কিন্তু দু’মাস পরেই তার পঞ্চাশ হাজার টাকা ব্যয় হয়ে গেলো। এখন দেখতে হবে যাকাত হিসাব করার তারিখে, অর্থাৎ পরের বছর রমজানের এক তারিখে তার কাছে কত টাকা আছে। যদি তিন লাখ বা তদুর্ধ্ব হয়, তাহলে যাকাত আদায় করতে হবে। যদি নেসাব থেকে কম হয়, তাহলে যাকাত আদায় করতে হবে না। পরবর্তীতে আবার যেদিন নেসাবের মালিক হবে, সেদিন থেকে এক বছর হিসাব করতে হবে।
আরেকটি বিষয় হলো, সব সম্পদের উপর ভিন্নভাবে এক বছর অতিক্রান্ত হওয়া জরুরী নয়। বরং যাকাত হিসাবের তারিখে যাকাত যোগ্য যত সম্পদ আছে, সব হিসাব করতে হবে। তা একদিন আগে হাতে আসলেও।

বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কার করা যাক। নেসাবের মালিক হওয়ার পর এক বছরের শর্ত দেয়ার কারণ হলো, ব্যক্তির সম্পদের মালিকানা স্থিতিশীল কিনা তা যাচাই করা। নেসাব পরিমাণ সম্পদ এক বছর স্থায়ী থাকলে তা সম্পদের স্থিতি প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে। তাই প্রত্যেক সম্পদে আলাদাভাবে এক বছর অতিক্রম হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং যাকাত হিসাবের তারিখে সকল যাকাতযোগ্য সম্পদ হিসাব করে ২.৫% যাকাত আদায় করতে হবে।

কোন কোন সম্পদে যাকাত আসে
ব্যবহারের সম্পদে সাধারণত যাকাত আসে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, একজন মুসলিমের উপর তার দাস ও তার ব্যবহারের ঘোড়ার ক্ষেত্রে যাকাত নেই। এছাড়া ছয় প্রকার সম্পদের ক্ষেত্রে যাকাত আসে। সোনা-রূপা, নগদ অর্থ, ব্যবসার সম্পদ, জীব-জন্তু, কৃষিজ উৎপাদন ও খনিজ সম্পদ। এই প্রবন্ধে আমরা কেবল প্রথম তিন প্রকার নিয়ে আলোচনা করব।

সোনা-রূপা
সোনা-রূপাতে সর্বাবস্থায় যাকাত হিসাব করতে হয়। তা ব্যবহারের হোক বা ব্যবসার হোক।

নগদ অর্থ
নগদ অর্থ বলতে ব্যাংকে থাকা টাকা, হাতে থাকা নগদ অর্থ এবং যে কোনো বিনিয়োগ। যেমন বন্ড ইত্যাদি।

ব্যবসার সম্পদ
ব্যবসার সম্পদ হলো যাকাতযোগ্য সম্পদের অন্যতম খাত। ব্যবসার সম্পদ বলতে প্রত্যেক ঐ সম্পদ, যা ক্রয়ের সময় বিক্রয়ের নিয়ত বা ইচ্ছা থাকে। সাধারণত কোনো সম্পদ ক্রয়ের সময় কয়েক রকম নিয়ত থাকতে পারে।
১. নিজে ব্যবহারের নিয়ত। এ ক্ষেত্রে এতে যাকাত হিসাব করতে হবে না।
২. ভাড়া দেয়ার নিয়ত। এ ক্ষেত্রে সম্পদটির উপর যাকাত হিসাব করতে হবে না। তবে ভাড়া যদি হাতে থাকে বা ব্যাংকে থাকে, তাহলে তাতে যাকাত হিসাব করতে হবে।
৩. বিক্রয়ের নিয়ত। এ ক্ষেত্রে সম্পদের বিক্রয়মূল্য বা বাজারমূল্যের উপর যাকাত হিসাব করতে হবে।
৪. ক্রয়ের সময় কোনো নিয়ত করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে সম্পদের উপর কোনো যাকাত হিসাব করতে হবে না।
মোটকথা, বিক্রয়ের ইচ্ছায় ক্রয় করে থাকলে তা ব্যবসার সম্পদ বলে গণ্য হবে এবং তাতে যাকাত আসবে। অন্যথায় যাকাত আসবে না। এটাই মূলনীতি।

এবার বিভিন্ন সম্পদ আলাদাভাবে আলোচনা করা যেতে পারে
জমি, প্লট, ফ্ল্যাট ইত্যাদি যদি ক্রয়ের সময় বিক্রয়ের ইচ্ছায় ক্রয় করে থাকে, তাহলে সেগুলো যাকাতের জন্য হিসাব করতে হবে। অন্যথায় করতে হবে না। কাজেই উত্তরাধিকার সূত্রে যদি কেউ এসবের মালিক হয়, বা কেউ উপহার হিসেবে দিয়ে থাকে, তাহলে যাকাত হিসাব করতে হবে না। কারণ এখানে ক্রয়ই হয়নি, বিক্রয়ের ইচ্ছায় ক্রয় তো পরের বিষয়।

শেয়ার যদি সেকেন্ডারী মার্কেটে বিক্রয় করার ইচ্ছায় ক্রয় করে থাকে, তাহলে যাকাত হিসাবের তারিখের বিনিময়মূল্য যাকাতে হিসাব করতে হবে। যদি কেবল কোম্পানীর মুনাফা বা ডিভেডেন্ডের জন্য ক্রয় করে থাকে, তাহলে যাকাতের জন্য হিসাব করতে হবে না।

ফ্যাক্টরীর কাঁচামাল, তৈরীকৃত পণ্য, তৈরীর প্রক্রিয়াধীন পন্য, এসবের উপর যাকাত হিসাব করতে হবে। কেননা, এ সবই বিক্রয়ের ইচ্ছায় ক্রয় করা হয়েছে। কিন্তু কোম্পানীর গাড়ি, ফ্ল্যাট, ফিক্সড এ্যাসেট, মেশিনারিজ এসবের উপর যাকাত হিসাব করতে হবে না। কারণ এগুলো ক্রয়ের সময় বিক্রয়ের ইচ্ছায় ক্রয় করা হয়নি।

উল্লেখ্য যে, যাকাত হিসাবের সময় সম্পদের মূল্য হিসাব করতে হয়। আর সম্পদের মূল্য তা-ই যা দিয়ে বাজারে বিক্রয় করা যায়। কাজেই সম্পদের বিক্রয়মূল্যই যাকাতের ক্ষেত্রে হিসাব করতে হবে। তা ক্রয়মূল্য বা বাজারমূল্য থেকে কম-বেশি যাই হোক।

উদাহরণস্বরূপ, রাশেদ একটি প্লট ক্রয় করেছে চল্লিশ লাখ টাকা দিয়ে। ক্রয়ের সময়ই তা পুন:বিক্রয়ের নিয়তে ক্রয় করেছে। যাকাত হিসাবের তারিখে যাচাই করে দেখা গেলো যে, প্লটটি এখন পঞ্চাশ লাখ টাকার বিনিময়ে বিক্রয় করা যাবে। তখন প্লটটির মূল্য পঞ্চাশ লাখ টাকা ধরেই যাকাত হিসাব করতে হবে।

আবার খালেদ আশি হাজার টাকার শেয়ার ক্রয় করেছে, সুযোগ পেলেই বিক্রয় করে দিবে। কিন্তু যাকাত হিসাবের তারিখে বাজারে তার শেয়ারের বিনিময় মূল্য দাঁড়িয়েছে ত্রিশ হাজার টাকা। কাজেই তাকে ত্রিশ হাজার টাকাই যাকাতের জন্য হিসাব করতে হবে।

যাকাত হিসাবে ঋণের প্রভাব
যাকাত হিসাব করার সময় ঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এ বিষয়ে আলোচনা করা যাক।
ঋণ দু’প্রকার হতে পারে-
১. প্রাপ্য ঋণ অর্থাৎ যে ঋণ অন্যের কাছ থেকে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
২. প্রদেয় ঋণ অর্থাৎ যে ঋণ অন্যকে আদায় করতে হবে।

প্রাপ্য ঋণের ক্ষেত্রে বিধান হলো, যখন হাতে আসবে তখন পেছনের বছরসহ যাকাত আদায় করে দিতে হবে। কাজেই পাওয়ার সম্ভাবনাময় ঋণগুলো প্রতিবছর যোগ করে হিসাব করে যাকাত আদায় করে দেয়াই ভালো।

আর প্রদেয় ঋণ দু’রকম হতে পারে। একবারে পরিশোধযোগ্য ও কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য। যেসব ঋণে কিস্তির সুবিধা নেই এবং তা নগদ আদায় করে দিতে হবে, সেগুলোকে যাকাতের হিসাব থেকে বিয়োগ করে নিতে হবে।

আর যেসব ঋণে কিস্তিতে পরিশোধের সুবিধা আছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে পরবর্তী এক বছরের কিস্তি যাকাতের হিসাব থেকে বিয়োগ করতে হবে। পুরো ঋণ বিয়োগ করা যাবে না। যেমন- রাশেদ একটি গাড়ি ক্রয় করলো, যার মূল্য বিশ লাখ টাকা। এবং তা পাঁচ বছরে পরিশোধযোগ্য। তো, যাকাত হিসাব করার সময় কেবল এক বছরের প্রদেয় তথা চার লাখ টাকা বিয়োগ দিতে পারবে। তবে ঋণ যদি প্রয়োজন অতিরিক্ত সম্পদ ক্রয়ের জন্য নেয়া হয়ে থাকে। যেমন- অতিরিক্ত একটি বাড়ি বা গাড়ি কিংবা ফ্যাক্টরীর একটি অতিরিক্ত মেশিন, যার উপর জীবন নির্ভর করে না, তাহলে তা যাকাতের হিসাব থেকে বাদ দেয়া হবে না। বরং এই ঋণ ঐ সম্পদের বিপরীতে ধরা হবে। অর্থাৎ ঋণ আদায়ে অপারগ হলে তা ঐ সম্পদ বিক্রয় করেই পরিশোধ করা হবে।

বিষয়টা আরেকটু ব্যাখ্যা করা যাক। যাকাতের হিসাব থেকে প্রদেয় ঋণ বিয়োগ দেয়ার কারণ হলো, যেহেতু ঋণ আদায় করতে হবে এই টাকা দিয়েই, তাই তা থেকে খরচ না করা। কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত সম্পদে বিনিয়োগের জন্য ঋণ করা হলে, পরবর্তীতে কোনো সমস্যা হলে তা বিক্রয় করেই ঋণ আদায় করা সম্ভব। এবং এতে ব্যক্তির জীবন চালাতে কোনো ক্ষতি হবে না। কাজেই এটা যাকাতের হিসাব থেকে বাদ দেয়া হবে না।

উদাহরণস্বরূপ, রাশেদ একটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছে চল্লিশ লাখ টাকায়। উদ্দেশ্য, দাম বাড়লে বিক্রয় করে দেয়া। রাশেদ তা পাঁচ বছরের কিস্তিতে ক্রয় করেছে। তার মোট প্রদেয় ঋণের পরিমাণ পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা। কিন্তু রাশেদের আরো একটি বাড়ি আছে, যেখানে সে ও তার পরিবার থাকে। কাজেই এই ফ্ল্যাটের টাকা অন্য খাত থেকে পরিশোধ করতে অক্ষম হলে তা বিক্রয় করেই পরিশোধ করা সম্ভব। কাজেই এই ঋণের টাকা যাকাতের হিসাব থেকে বিয়োগ দেয়া হবে না।

যাকাত কীভাবে হিসাব করবে?
বৈবাহিক সম্পর্ক ও ঔরসজাত সম্পর্কের মানুষকে যাকাত দেয়া যায় না। কাজেই স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্র, দাদা-নাতী কাউকে যাকাত দেয়া যাবে না।

এছাড়া যে কোনো গরীবকে যাকাত দেয়া যাবে। গরীব বলতে এমন ব্যক্তিকে বুঝায় যার হয়তো কোনো সম্পদই নেই। কিংবা আছে তবে তার প্রয়োজনীয় সম্পদ ও জীবন যাপনে প্রয়োজনীয় খরচ বাদ দিলে তা নেসাবের চেয়ে কম হয়।

আল্লাহ তাআলা যাকাত আদায়ের সাতটি খাত উল্লেখ করেছেন। ফকীর, মিসকীন, যাকাত উসুল ও আদায়ের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি, ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, জিহাদকারীর জন্য এবং মুসাফির।

যাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে আত্মীয়-স্বজনের প্রাধান্য দেয়া উচিৎ। যাকাত আদায়ের সময় যাকাতের টাকা উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। আদায়ের সময় বা যাকাতের টাকা আলাদা করার সময় নিয়ত করলেই হবে। তবে এই দু’সময়ের কোনোটাতেই নিয়ত না করলে যাকাত আদায় হবে না। এমনিতেই কাউকে টাকা দিয়ে পরে তা যাকাতের খাত থেকে দিয়েছে নিয়ত করলে যাকাত আদায় হবে না। এখানে উল্লেখ্য যে, যাকাতের ক্ষেত্রে গরীবকে মালিক বানিয়ে দেয়া শর্ত। কাজেই যাকাতের টাকা দিয়ে মসজিদ বানানো, মাদরাসা বানানো, রাস্তাঘাট নির্মাণ, কূপ খনন ইত্যাদি করা যাবে না। বরং সরাসরি গরীবকে যাকাতের টাকার মালিক বানিয়ে দিতে হবে।

কোনো গরীবকে পড়াশোনা, চিকিৎসা, বিবাহ দেয়ার জন্যও যাকাত দেয়া যেতে পারে। তবে তাকে সে টাকার মালিক বানিয়ে দিতে হবে।

যাকাতের টাকা নগদ না দিয়ে গঠনমূলক কিছু ক্রয় করে দেয়া যেতে পারে। যেমন, কেউ কাজ করার সামর্থবান হলে তাকে সেলাই মেশিন, রিক্সা, ভ্যান, কম্পিউটার ইত্যাদি ক্রয় করে দেয়া যেতে পারে। যেনো তা দিয়ে উপার্জন করে সে স্বাবলম্বী হতে পারে। এবং এক সময় তাকে আর যাকাত গ্রহণ করতে না হয়। অল্প অল্প করে অনেককে না দিয়ে প্রতিবছর প্ল্যান করে কিছু মানুষকে বেশি করে দিলে সে তাকে গঠনমূলক কাজে লাগাতে পারবে।

হারাম সম্পদে যাকাত আসে না এবং হারাম সম্পদ দিয়ে যাকাত আদায়ও করা যায় না। যাকাত তো হলো সম্পদের কেবল ২.৫ শতাংশ। আর হারাম সম্পদ তো পুরো একশ শতাংশই দান করে দেয়া ওয়াজিব। কারণ এ সম্পদের মালিক ব্যক্তি নয়। কাজেই সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, অন্যায়ভাবে দখলকৃত সম্পত্তি ইত্যাদি সব প্রকার হারাম সম্পদ তাৎক্ষণিকভাবে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া দান করে দায়মুক্ত হতে হবে।

ট্যাক্স এবং যাকাত
সরকারি ট্যাক্স এবং যাকাত এক নয়। যাকাত একটি ইবাদত। কাজেই ট্যাক্সের টাকাকে যাকাত বলে গণ্য করা যাবে না। তবে হ্যাঁ, ট্যাক্সে প্রদেয় টাকা যাকাতের হিসাব থেকে বিয়োগ দেয়া যাবে। কারণ এটিও একটি ঋণ, যা ব্যক্তির কাছে রাষ্ট্র পাবে।

যাকাতুল ফিতর বা সাদাকাতুল ফিতর
সাদাকাতুল ফিতর অর্থ ফিতরের দিনের সাদকা। ফিতর বলতে ঈদুল ফিতর বোঝানো হয়। অর্থাৎ ঈদুল ফিতরের দিন দেয়া সদকা। একে যাকাতুল ফিতরও বলা হয়ে থাকে। সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। হাদীসে আছে, ইবনে ওমর রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদাকাতুল ফিতর আবশ্যক করেছেন। এর পরিমাণ হলো, এক ‘সা’ যব বা এক ‘সা’ খেজুর। ছোট-বড়, স্বাধীন-পরাধীন সবার উপরই এটা আবশ্যক। সাদাকাতুল ফিতর প্রত্যেক সামর্থবান মুসলিম ব্যক্তির উপর ওয়াজিব। সামর্থবান শব্দের ব্যাখ্যা হলো, প্রয়োজন অতিরিক্ত সম্পদের পরিমাণ যাকাতের নেসাব পরিমাণ হওয়া। যাকাতের সাথে এর পার্থক্য হলো, এখানে প্রয়োজন অতিরিক্ত সম্পদ নেসাব পরিমাণ হলেই তা ওয়াজিব। সোনা-রূপা বা ব্যবসায়িক সম্পদেই তা হতে হবে, এমন নয়। আবার যাকাতের ন্যায় এক্ষেত্রে এক বৎসর অতিরিক্ত হওয়াও জরুরী নয় বরং ঈদের আগের দিনও কেউ এই পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে তাকেও তা আদায় করতে হবে।

সাদাকাতুল ফিতর নারী-পুরুষ সবার উপর ওয়াজিব। নিজের পক্ষ থেকে এবং নিজের অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান বা অবিবাহিত মেয়ের পক্ষ থেকে তা আদায় করতে হবে। সন্তানের নামে সম্পদ থাকলে সেখান থেকে আদায় করা যাবে। প্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানের পক্ষ থেকে আদায় করা ওয়াজিব নয়। কোনো এতিম শিশুর ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়ে থাকলে তার পক্ষ থেকেও আদায় করতে হবে।

ঈদুল ফিতরের ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হয়। কাজেই সেদিন ভোরের আগে যে জন্ম নিয়েছে বা এই পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছে, তাকেও এই সাদকা আদায় করতে হবে। কেউ যদি সেদিন ভোরের আগে মারা যায় তার উপর সাদকা ওয়াজিব হবে না। আবার ভোর হবার পর কেউ জন্ম নিলে তার পক্ষ থেকেও সাদকা আদায় করা ওয়াজিব হবে না। ঈদুল ফিতরের দিন সকালে ঈদের নামায পড়তে যাওয়ার আগে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা উত্তম। তবে সময়ের আগেও আদায় করা যেতে পারে। আবার কোনো কারণে সময়মতো আদায় করতে না পারলে পরেও আদায় করা যাবে। কেউ আদায় না করে মৃত্যুবরণ করলে তার পক্ষ থেকে তার উত্তরাধিকারী আদায় করে দিলেও আদায় হয়ে যাবে। হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী যেসব শস্য দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় হয়ে যায় সেগুলো হলো- যব, গম, খেজুর, কিসমিস ও পনীর। পনীর হলে এক সা। গম হলে আধা সা। সা এর বর্তমান পরিমাণ হলো, ১ সা= ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম। আর ১/২ সা= এক কেজি ৬৫০ গ্রাম।

হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, এই পাঁচ প্রকার শস্য সরাসরি দিলেও হবে, আবার এসবের মূল্য দিলেও হবে। তবে অন্য কোনো শস্য দিতে চাইলে এই পাঁচ প্রকারের কোনো এক প্রকারের মূল্য হিসাব করে দিতে হবে। এই সদকা দেয়ার উদ্দেশ্য হলো, ঈদের দিন গরীবের প্রয়োজন পূরণ করা, যেনো তাকে কোথাও চাইতে না হয়। কাজেই সামর্থানুযায়ী বেশি মূল্যটা আদায় করাই উত্তম হবে। যব, খেজুর, কিসমিস বা পনীর হিসাব করে দিলে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর মূল্য দেয়া যাবে। আর গম হিসাবে দিলে এক কেজি ৬৫০ গ্রাম বা এর মূল্য দেয়া যাবে।

ইসলামী ফাউন্ডেশনের ঘোষণা অনুযায়ী এ বছর গম বা আটা দিয়ে আদায় করলে অর্ধ সা বা ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম বা এর বাজারমূল্য ৬০ টাকা আদায় করতে হবে। খেজুর দিয়ে আদায় করলে এক সা বা ৩ কেজি ৩০০ কেজি বা তার বাজারমূল্য ১ হাজার ৩২০ টাকা। কিসমিস দ্বারা আদায় করলে এক সা বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজারমূল্য দেড় হাজার টাকা আদায় করতে হবে।

যাকাত আদায়ের খাতসমূহে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা যাবে। পরিবারের কয়েকজনের সদকা মিলিয়ে একজন গরীবকে একসঙ্গে দেয়া যেতে পারে।

উপসংহার
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী ২০০৯ এ বাংলাদেশে মিলিয়নেয়ারের (ব্যাংকে নূন্যতম দশ লাখ টাকা সঞ্চয়কারী) সংখ্যা ২৩,৩১০ জন। যাদের সমুদয় সঞ্চয়ের পরিমাণ ১,০০,৫৪৪ কোটি টাকা। যা পুরো ব্যাংক সঞ্চয়ের ৩৩ শতাংশ। এই ২৩,৩১০ জনের মধ্যে ৮০% মুসলিম ধরলে তাদের যাকাত আসে ২০০০ কোটির টাকার বেশি। আর যাকাত তো দশ লাখ টাকায় নয়, আরো অনেক কম টাকায় ফরজ হয়। তাহলে সবার সমষ্টিগত যাকাত হিসাব করলে নূন্যতম পাঁচ হাজার কোটি টাকা হবে। যা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের উন্নয়ত খাতের অনেক উপখাতের বাজেটের তুলনায় বেশি। যাদের উপর যাকাত ফরজ, তারা সবাই যাকাত দিলে দেশে আর কোনো দরিদ্র অবশিষ্ট থাকত কিনা সন্দেহ।

Leave a Reply