শুধু ব্যাংকগুলোকে এত গালমন্দ কেন?

0
997

দেশের অর্থনীতির চাকা সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত করার জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা উদীয়মান অর্থনীতির অপরিহার্য পূর্বশর্ত। বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ বর্তমান অর্থবছরে প্রাক্কলন করা হয়েছে। ৭ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি রয়েছে এমন দেশ সারা বিশ্বে ভারতের পরেই হচ্ছে বাংলাদেশ। এ ধরনের অসাধারণ কৃতিত্বের দাবিদার হচ্ছে বর্তমান সরকার ও বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এ সরকারের সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও দেশের ভাগ্য উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় মনোবল বাংলাদেশের মতো ছোট দেশটিকে ক্রমান্বয়ে সম্মানজনক অবস্থানের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দেশটির অর্থনীতি সামনের দিকে ধাববান করার জন্য দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ২০০৮-০৯ ও ২০০৯-১০ অর্থবছর ব্যতিরেকে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একনাগাড়ে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ঊর্ধ্বে অবস্থান করছে, যা একটি অভাবনীয় উন্নয়নের উদাহরণ।

বাংলাদেশের এই সম্মানজনক অবস্থা দুই দশক আগেও পরিকল্পনা বা কল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এ দেশের ব্যাংকগুলোর বিশেষ করে সরকার নিয়ন্ত্রিত ছয়টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও মূলধন ঘাটতির বিষয় নিয়ে ইদানীং বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। এসব ব্যাংকের মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন ঘাটতি মেটাতে সদাশয় সরকারকে জনগণের কাছ থেকে আহরিত রাজস্ব তহবিল থেকে মূলধন জোগাতে হচ্ছে। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, ২০১৬-এর পূর্ববর্তী বছরগুলোয় সরকার নিয়ন্ত্রিত ছয়টি ব্যাংকসহ দেশের অন্য যে ৩৯টি ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংক বছর শেষে বিপুল অংকের পরিচালন মুনাফা অর্জন করেছিল, সেসব ব্যাংককে কিন্তু আয়কর আইন মেনে তাদের অর্জিত নিট মুনাফার ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ সরকারি কোষাগারে যথাসময়ে (কখনো কখনো অগ্রিম ট্যাক্স আকারে) জমা দেয়া বাধ্যতামূলক ছিল।

এভাবে প্রতি বছর সরকারি কোষাগারে ব্যাংকগুলোর আয়কর জমার পরিমাণ কিন্তু নিতান্ত কম নয়। স্বাধীনতার জন্মলগ্নে তত্কালীন ১২টি ব্যাংককে একত্রিত করে সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংক নামে যে ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সৃষ্টি হয়েছিল, সেসব ব্যাংকের মধ্যে শেষোক্ত পূবালী ও উত্তরা ব্যাংক ছাড়া (যা ১৯৮৩ সালে বিজাতীয়করণ করা হয়) অন্য চারটি ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকস (জাতীয়করণ) আদেশ, ১৯৭২ মোতাবেক সরকারি-বেসরকারি সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ১৯৭২ সাল থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের অর্থনীতির পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের শিল্প-কারখানা চালু রেখে বেকারত্বের ছোবল থেকে এ দেশের লাখ লাখ শ্রমিককে রক্ষা করার জন্য শত শত কোটি টাকার জামানতবিহীন ঋণ প্রদান করতে হয়েছে। তখন সর্বক্ষেত্রে ঋণ নীতিমালা অনুসরণ করে ঋণ আদায়ের সম্ভাব্যতা যাচাই করে ঋণ বিতরণ করার সুযোগ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো পায়নি।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সরকারের সর্বোচ্চ মহলের সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে এসব ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীকে ঋণ বিতরণের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এসব নির্দেশিত ঋণের যে অংশ এখনো অনাদায়ী রয়েছে, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিসিডি-৩৪, তৎপরবর্তী সার্কুলার/সার্কুলার লেটার এবং সর্বশেষ বিআরপিডি সার্কুলার নং-১৫-এর নির্দেশনা মোতাবেক ‘মন্দ ও কুঋণ’ নামে শ্রেণীবিন্যাসিত অবস্থায় রয়েছে। এসব ঋণের ক্লাসিফিকেশন স্ট্যাটাস ‘মন্দ ও কুঋণ’ হওয়ায় নিয়ম মোতাবেক ব্যাংকগুলোর ১০০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু প্রভিশন সংরক্ষণ করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিচালন মুনাফা ব্যাংকগুলোর অর্জন না হওয়ায় তারা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, যা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। এসব নির্দেশিত ঋণ যেভাবে প্রদান করা হয়েছিল, এখন যদি সেই পদ্ধতিতে ত্বরিত আদায় হয়ে যায়, তাহলে আর এসব রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি সরকারকে মেটাতে হবে না।

এর পরও একটি কথা বোধহয় বলা যায়, এসব ব্যাংকের আর্থিক সহযোগিতা নিয়েই কিন্তু এ দেশের অগণিত উদ্যোক্তা আজ প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি-ব্যবসায়ী হিসেবে এ দেশের কোটি কোটি শিক্ষিত-অশিক্ষিত মানুষকে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন, যে কারণে আজ এ দেশের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬০২ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। তৈরি পোশাক তৈরিতে বিশ্বের তৃতীয় প্রধান রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের প্রথম ১০টি তৈরি পোশাক শিল্পের সাতটি বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছেন।

সমাজের অনেক বিশিষ্টজনেরও ধারণা— ব্যাংকঋণের খেলাপি টাকা আদালতে মামলা দায়ের করলেই বুঝি দ্রুত আদায় হয়ে যায়। না, ব্যাংকঋণ আদায়ের প্রকৃত পদ্ধতি তা নয়। অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এ মামলা দায়ের করে খেলাপি গ্রাহকের বিরুদ্ধে খুব সহজেই ডিক্রি পাওয়া গেলেও ব্যাংকগুলোর হাজার হাজার জারি মামলা দীর্ঘ সময় ধরে আদালতে ঝুলে আছে বা বিভিন্ন পর্যায়ে বছরের পর আটকে আছে। যে কারণে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায় হচ্ছে না। আমরা জানি, অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ ব্যাংক ঋণ আদায়-সংক্রান্ত একটি অত্যন্ত কার্যকর আইন। কিন্তু এ আইনের আওতায় মামলা দায়ের করে একজন ভালো আইনজীবী নিয়োগ করে দিলেই ব্যাংকের ঋণের টাকা সহজেই আদায় হয়ে যাবে না। কোনো ঋণ খেলাপি হলে এবং আদায়ের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে ঋণ আদায়ের জন্য আইনগত ব্যবস্থার পরিপালনীয় অংশ হিসেবে অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ধারা-১২ ও উপধারা (১) ও (২) নির্দেশনা অনুযায়ী আদালতে মামলা দায়েরের আগে এ আইনের ধারা-৩৩ অনুসরণে সংশ্লিষ্ট ঋণের বিপরীতে গৃহীত বন্ধকি সম্পত্তি দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিলামে বিক্রির পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়।

বন্ধকিকৃত সম্পত্তি নিলামের (কমপক্ষে ৩টি আবেদনের বিপরীতে) মাধ্যমে বিক্রি করা সম্ভব হলে বন্ধকিকৃত সম্পত্তির নিলামমূল্য ঋণের পাওনা থেকে বিয়োগ করে অবশিষ্ট পাওনার জন্য প্রদেয় কোর্ট ফি, হলফনামাসহ মামলার আরজি সংশ্লিষ্ট অর্থ ঋণ আদালতের সাব-জজ বরাবরে আইনজীবীর মাধ্যমে জমা দিতে হয়। বড় বড় লোন ডিফল্টারদের ক্ষেত্রে এ আইনের ধারা-১২-এর আওতায় বন্ধকি সম্পত্তির নিলাম বিজ্ঞপ্তি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পরই লোন ডিফল্টাররা সংবিধানের ১০২ ধারার আওতায় নিলাম বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট দায়ের করে নিলাম কার্যক্রম স্থগিত করেন। ফলে ঋণ আদায় কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। রিট দায়ের না হলে বিবাদী কর্তৃক হাজির হয়ে লিখিত জবাব দাখিলের ৯০ দিনের মধ্যে মামলার ডিক্রি হওয়ার বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবে কোনো কোনো অর্থ ঋণ আদালতে মামলা দায়েরের এক-দুই বছরের মধ্যেও এর নিষ্পত্তি হয় না। কিন্তু মামলার আসল সমস্যা জারি মামলা পর্যায়ে।

আদালতের ডিক্রির মাধ্যমে লোন ডিফল্টারকে ব্যাংকের দাবিকৃত টাকা পরিশোধে জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়। খুব কম ক্ষেত্রেই আদালত রায় প্রদানের সময় ডিক্রিকৃত টাকা এককালীন অথবা কিস্তিতে পরিশোধের সময়সীমা নির্ধারণ করে থাকেন। কিন্তু আদালতের সময়সীমা নির্ধারণসংবলিত ডিক্রি প্রদান করা হলেও ৯০ শতাংশ (প্রায়) ক্ষেত্রেই আদালতের নির্দেশ মোতাবেক খেলাপি গ্রাহক ঋণ পরিশোধ করেন না। ফলে এ ধরনের সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার ১০০ দিনের মধ্যে এবং যেক্ষেত্রে ঋণ পরিশোধে সময়সীমা নির্ধারিত থাকে না, সেক্ষেত্রেও ডিক্রি প্রদানের ১০০ দিনের মধ্যে সত্যিকারভাবে ঋণের টাকা আদায়ের জন্য এ আইনের ধারা-২৭ অনুযায়ী জারি মামলা আদালতে দায়ের করতে হয়। জারি মামলা দায়েরের পর আবার আদালত ব্যাংকের খরচায় লোন ডিফল্টারের নামে নোটিস জারির পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন।

যদি সমন জারির ১৫ দিনের মধ্যে উক্ত নোটিস জারি হয়ে ফেরত না আসে, তাহলে উক্ত নোটিস বাদীর খরচায় বহুল প্রচারিত একটি জাতীয় দৈনিকে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হয়। তারপর আদালতের প্রসেস সার্ভারের মাধ্যমে শুরু হয় বন্ধকি সম্পত্তি চিহ্নিতকরণ, ঢোল-শহরত ও বন্ধকি সম্পত্তিতে লাল নিশান ওড়ানো কার্যক্রম। এসব কার্যক্রম সুসম্পন্ন করতে অনেক সময় পার হয়ে যায়। তারপর আবারো আসে আদালতের মাধ্যমে আইনের ধারা-৩৩ অনুসরণে বন্ধকি সম্পত্তির নিলাম কার্যক্রম।

সোর্সঃ সংগৃহীত

Leave a Reply