তারল্য ব্যবস্থাপনার তত্ত্ব কি?

0
1717

চাওয়া মাত্র জনগণের আমানতের দাবি নগদ অর্থে পূরণ করার ক্ষমতাকে তারল্য বলে। এজন্য প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংককে পর্যাপ্ত পরিমাণ নগদ অর্থ তরল আকারে সংরক্ষণ করা উচিত। কিন্তু তাই বলে যদি ব্যাংক আমানতের সব অর্থ নগদ অবস্থায় ধরে রাখে তাহলে ব্যাংকের তারল্য নীতি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয় সত্যি কিন্তু মুনাফা অর্জন নীতি ব্যাহত হয়। নগদ অবস্থায় সম্পদ ধরে রাখলে ব্যাংকের পক্ষে মুনাফা অর্জন করা সম্ভব হয় না, আবার অধিক মুনাফা অর্জনের জন্য অধিক পরিমাণ ঋণ প্রদান করতে হয়। ফলে ব্যাংকের তারল্য অবস্থা বজায় রাখা সম্ভব হয় না। সুতরাং এ দুটি পরস্পর বিরোধী নীতির সাথে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য তারল্য ব্যবস্থাপনার ওপর ভিত্তি করে যুগে যুগে বিভিন্ন তত্ত্বের উদ্ভব হয়েছে। নিম্নে এরূপ কয়েকটি তত্ত্বের বর্ননা তুলে ধরা হলো-

১. বাণিজ্যিক ঋণ তত্ত্ব বা স্ব-তারল্য বা প্রকৃত বিল তত্ত্ব;
২. স্থানান্তরযোগ্য তত্ত্ব;
৩. প্রত্যাশিত আয় তত্ত্ব; ও
৪. দায় ব্যবস্থাপনা তত্ত্ব।

১. বাণিজ্যিক ঋণ তত্ত্ব বা অ-তারল্য বা প্রকৃত বিল তত্ত্ব (Commercial loan Theory/Self Liquidity or Real Bills Doctrine Theory)
১৮শ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক ঋণ তত্ত্বের উদ্ভব হয়। এ তত্ত্ব অনুসারে, বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলােতে স্বল্পমেয়াদি ঋণ প্রদান করে যাতে তারা তাদের তারল্য চাহিদা মেটাতে পারে। এ সমস্ত ঋণ দ্বারা মানুষের বিভিন্ন ধরনের চাহিদা; যেমন- উৎপাদন, বন্টন, যাতায়াত ইত্যাদি মেটাতে পারে। অন্যভাবে বলতে গেলে, কোনাে ঋণকে তখনই স্ব-তাৱল্য বলা হবে যদি উক্ত ঋণের জামানত হিসেবে এমন সব দ্রব্য থাকে যা প্রস্তুত পর্যায়ে বা প্রস্তুতকৃত দ্রব্য চুড়ান্ত বিক্রয়ের জন্য রয়েছে। দ্রব্যগুলাে বিক্রয় করা হলেই ঋণ পরিশােধ করা হবে। এরূপ ঋণ ব্যাংকের অবিরত তারল্য (Continuous liquidity) ও আয়ের নিশ্চয়তা দিয়ে থাকে। ফলে তারল্য ও আয় একই সাথে লাভ করা সম্ভব হয়। আর এটাই বাণিজ্যিক ব্যাংকের তারল্য ঋণ তত্ত্ব বা প্রকৃত বিল তত্ত্বের মূল ধারণা।

এ তত্ত্বে ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদি ঋণ যেমন- স্থায়ী যন্ত্রপাতি, বাড়ি নির্মাণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে অর্থায়ন করতে কম আগ্রহ প্রকাশ করে। এ মতবাদের মূল যুক্তি হলাে, স্বল্পমেয়াদি ঋণ দানের মাধ্যমে ব্যাংক লেনদেন করা খাতের ব্যাংক কখনােই কু-ঋণের প্রভাবে না পড়ে। ফলে আমানতকারীর চাহিদা মােতাবেক তারল্য রক্ষা করে ব্যাংক পরিচালনা সহজ ও ঝুঁকিমুক্ত হয়।

২. স্থানান্তরযােগ্য তত্ত্ব (The shiftability theory)
১৯১৮ সালে আমেরিকার এইচ. জি. মৌলটন (H. G. Moultion) সর্বপ্রথম এ তত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা দেন। এ তত্ত্বে ঋণের পরিপক্বতার চেয়ে বরং সম্পদের স্থানান্তরযোগ্যতাকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়। ব্যাংক কত তাড়াতাড়ি তার সম্পদ স্থানান্তর করতে পারে তা এখানে দেখা হয়। এখানে লক্ষণীয় যে সম্পদ স্থানান্তরের সময় যাতে কোনাে মূলধন লােকসান না হয়। এ তত্ত্ব অনুযায়ী কোনাে সম্পদকে সম্পূর্ণরূপে স্থানান্তরযােগ্য হতে হলে তাৎক্ষণিকভাবে অন্য সম্পদে রূপান্তরিত হবাৱ বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে যাতে কোনাে মূলধন লােকসান ব্যতীত গ্রাহকদের তাৎক্ষণিক চাহিদা পূরণে সক্ষম।

যখন সব ব্যাংকিং সেক্টর তারল্য সমস্যার সখীন হবে তখন এ তত্ত্বটি প্রযােজ্য হবে না। কারণ এ সময় একটি ব্যাংক তারল্য রক্ষার জন্য এমন সম্পদ সংরক্ষণ করবে যার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে সাহায্য পেতে পারে। অবশ্য, কোনাে সম্পদ তরল সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার পূর্বে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন উক্ত সম্পদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিকট তরল সম্পদ হিসেবে বিবেচ্য কিনা। সাধারণত মাধ্যমিক বাজারে বিক্রয়যোগ্য বিল, বন্ড, সিকিউরিটি ইত্যাদিকে বিনিয়ােগের কথা বলা হয়েছে।

৩. প্রত্যাশিত আয় তত্ত্ব (Anticipated income theory)
১৯৯৯ সালে হার্ভার্ট ভি. প্রোসনাও (Hervert V Prachnow) প্রত্যাশিত আয় তত্ত্বটির উদ্ভাবন করুন। এ তত্ত্ব অনুযায়ী ঋণ গ্রহণকারী তার ঋণ পরিশোধের তালিকাটি প্রতাশিত আয় অথবা নগদ অর্থ গ্রহণের সাথে সমন্বয় করে তৈরি করে। এ তত্ত্বে মেয়াদি ঋণের ওপর জাের দেয়া হয়। একজন ব্যবস্থাপক সেসব প্রকল্পের ওপর গুরুত্ব দেবে যেগুলো ভবিষ্যতে বেশি মুনাফা বা নিশ্চিত মুনাফা অর্জনে সক্ষম। সকল প্রকার ঋণ স্বল্প অথবা দীর্ঘমেয়াদি তরল ঋণ হিসেবে বিবেচিত হয় যদি তা ঋণ গ্রাহকের পরিশোধের ক্ষমতার ওপর বিবেচিত হয়ে প্রদান করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ঋণ গ্রহীতা ও বাংকের মধ্যে এমন একটি চুক্তি হবে যে তার ভবিষ্যতে কি পরিমাণ মেশিনারিজ বা মজুদ পণ্য বিরাজমান থাকবে। এক্ষেত্রে জামানতের ঊপর খুব বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয় না।

অন্যভাবে বলতে গেলে, এই তত্ত্ব অনুসারে ব্যাংকাররা দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পোর্টফোলিওকে তারল্যের উৎস হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সাধারণত সমুদয় অর্থ (সুদ ও আসল) মেয়াদকাল শেষে পরিশােধ করতে হয় না বরং একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর কিস্তির (সুদ ও আসল) মাধ্যমে পরিশােধ করতে হয়। এই কিস্তির টাকাই ব্যাংকের তারল্যের উৎস।

৪. দায় ব্যবস্থাপনা তত্ত্ব (Liability management theory)
এটি তারল্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত তত্ত্বসমূহের সর্বশেষ সংযোজন। ১৯৬০ সালের দিকে এ তত্ত্বটি উদ্ভাবিত হয়। পূর্বের তত্ত্বগুলোতে সম্পদকে তরল সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু দায় ব্যবস্থাপনা তত্ত্বতে সম্পদকে তরল হিসেবে সংরক্ষণ না করে বরং অর্থ বাজার থেকে ঋণপত্র বা অন্যবিধ দলিল বিক্রয় করে দায় সৃষ্টির মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করার ওপর গুরুত্বারােপ করা হয়েছে।

Leave a Reply