অফশোর ব্যাংকিং কি? এর সুবিধা ও অসুবিধাসমূহ

2

অফ-শাের ব্যাংকের ব্যবসায় সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংক ব্যবসায়ের পাশাপাশি পরিচালনা করা যায়। আমানত গ্রহণ ও ঋণ প্রদানের দিক থেকে অফশাের ব্যাংকিং এর কার্যক্রম সাধারণ ব্যাংকগুলাের মত হলেও এ জাতীয় ব্যাংকের আমানত গ্রহণ এবং ঋণ প্রদান এ দুটি কার্যক্রমই বৈদেশিক সূত্র হতে আগমন ও বিদেশি গ্রাহকের অনুকূলে প্রদান করা হয়। অর্থাৎ এই ব্যাংকের কার্যক্রম শুধু অনিবাসীদের মধ্যেই সীমিত থাকে।

Definition of Offshore Banking (অফশোর ব্যাংকিং এর সংজ্ঞা)
যে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিদেশি সূত্র হতে বৈদেশিক মুদ্রায় তহবিল সৃষ্টি হয় এবং দেশীয় আইন-কানুনের বাইরে আলাদা আইন কানুনের মাধ্যমে এই তহবিল পরিচালিত হয় ও হিসাব সংরক্ষণ করা হয় তাকে অফ-শাের ব্যাংকিং বলে।

A Dictionary of Banking and Finance এ বলা হয়েছে-
Off-shore Banking refers to the international banking business involving non-resident foreign currency denominated assets and liabilities. It refers to the banking operations that cover only non-residents, l.e., mostly multinational producers of goods and services and financiers, and it does not mix with domestic banking.
অর্থাৎ অফ-শোর ব্যাংকিং অনিবাসী বৈদেশিক মুদ্রার সম্পদ এবং দায়গুলির সাথে জড়িত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবসায়কে বোঝায়। এটি এমন ব্যাংকিং অপারেশনগুলিকে নির্দেশ করে যা শুধুমাত্র অনিবাসিদের, যেমন- মাল্টিন্যাশনাল পণ্য এবং সেবা এবং ফাইন্যান্সারদের সম্পৃক্ত করে এবং এটি দেশীয় ব্যাংকিংয়ের সাথে মিশ্রিত হয় না।

মোটকথা- অফশোর ব্যাংকিং হলো ব্যাংকের অভ্যন্তরে পৃথক এক ব্যাংকিং ব্যবস্থা। বিদেশি কোম্পানিকে ঋণ প্রদান এবং বিদেশি উৎস থেকে আমানত সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে অফশোর ব্যাংকিংয়ে। এতে স্থানীয় মুদ্রার পরিবর্তে বৈদেশিক মুদ্রায় হিসাব হয়। ব্যাংকের কোনো নিয়ম-নীতিমালা অফশোর ব্যাংকিংয়ে প্রয়োগ হয় না। কেবল মুনাফা ও লোকসানের হিসাব যোগ হয় ব্যাংকের মূল হিসাবে। বর্তমানে দেশি-বিদেশি ৩৫টি ব্যাংক অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।

অফশাের ব্যাংকিং এমন ধরনের ব্যাংকিং যাতে অস্থানীয় বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনের কাজ করে থাকে। শাব্দিক অর্থে এটি প্রথম বুঝানাে হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাহামা, স্যাম্যান দ্বীপপুঞ্জের মত সমুদ্র সৈকতের কেন্দ্রগুলােকে যেখানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দিক দিয়ে অনেক শুষ্ক মওকুফ করা হয়েছিল।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অফশাের ব্যাংকিং সমুদ্র সৈকতের নিকটে হওয়ার প্রয়ােজন নাই। হংকং, শ্রীলংকা, ফিলিপাইন এবং সিঙ্গাপুর-এর মত স্থানে এশিয়ায় ৪টি এই ধরনের ব্যাংকিং ইউনিট রয়েছে। এটি বৈদেশিক মুদ্রা ঋণ ও ধার দেয়া-নেয়ার কাজে নিয়ােজিত থাকে।

অফশাের ব্যাংকিং-এর দুই ধরনের কেন্দ্র রয়েছে। একটি কাগজপত্রের অপরটি পরিচালনামুলক। ঐ কাগজে কেন্দ্র কেবল বিভিন্ন নিয়মনীতি, ট্যাক্স, লেভী, সুদ ইত্যাদি মওকুফের কাজ করে থাকে। আর পরিচালনা বিভাগ সংশ্লিষ্ট স্থানে আমানত ও ঋণদানের কাজ পরিচালনা করে থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৮৫ সালে ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিং পরিচালনার জন্য শুধু একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। সম্প্রতি ৩০ বছর পর বাংলাদেশ ব্যাংক অফশোর ব্যাংকিংয়ের জন্য পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা জারি করেছে ২৫/০২/২০১৯ তারিখে। নীতিমালাটি দেখতে ক্লিক করুন এখানে। শুরুতে বিদেশি ব্যাংকগুলো এ সেবায় থাকলেও প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ব্যাংক যুক্ত হচ্ছে অফশোর ব্যাংকিং সেবায়। গত পাঁচ বছরে এ ব্যাংকিং ব্যবস্থা বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সে কারণে বিদেশি ব্যাংকের পাশাপাশি দেশীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোও আলাদা শাখা বা ইউনিট খুলেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, অফশোর ব্যাংকিংয়ের আওতায় বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। যার বড় অংশই বিতরণ করেছে বিদেশি মালিকানাধীন হংকং সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন (এইচএসবিসি) ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক (স্ট্যানচার্ট)।

প্রচলিত আইনের বাইরে ব্যাংকিংয়ের সুযোগ থাকায় সবাই এখন অফশোর ব্যাংকিংয়ের দিকে ঝুঁকছে। তবে এ সুবিধা মূলত রপ্তানিকারকদের জন্য। কম সুদ হওয়ায় ব্যবসায়ীরাও এ ধরনের ঋণের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এছাড়া সুদের হার কম হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এখন অফশোর ইউনিট থেকেই ঋণ পেতে আগ্রহী। বাজারে সুদের হার ১০ শতাংশের বেশি হলেও এ ইউনিট থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া যাচ্ছে।

Advantages of Offshore Banking (অফশোর ব্যাংকিং এর সুবিধা)
অফশোর ব্যাংকিং এ সাধারণত নিম্নলিখিত সুবিধাগুলো পাওয়া যায়-
১. বৃহত্তর গোপনীয়তা;
২. কম বিধি-নিষেধযুক্ত আইনি প্রবিধান;
৩. কম বা কোন ট্যাক্সেশন নেই;
৪. আমানতের সহজ অ্যাক্সেস;
৫. স্থানীয় রাজনৈতিক বা আর্থিক অস্থিরতার বিপরীতে আমানতের সুরক্ষা;
৬. অফশোর ব্যাংকিং সুদের উপর ব্যক্তিগত আয়কর সাপেক্ষে সম্পদকে আটকায় না;
৭. কিছু অফশোর ব্যাংক কম খরচে সেবা দিয়ে কাজ করতে পারে এবং সরকারী হস্তক্ষেপের অভাবের কারণে অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংক হারের চেয়ে বেশি সুদের হার সরবরাহ করতে পারে। এছাড়াও অফশোর ব্যাংকিং এ প্রায়ই আমানতের সুদের হার হ্রাস করে;
৮. অফশোর ফাইন্যান্স কয়েকটি শিল্পের মধ্যে ভৌগোলিকভাবে দূরবর্তী দেশে প্রতিযোগিতামূলকভাবে যুক্ত হতে পারে। এটি উন্নয়নশীল দেশগুলিকে উৎস বিনিয়োগকে সহায়তা করতে এবং তাদের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি তৈরি করতে সহায়তা করে এবং উন্নত বিশ্বের উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে;
৯. সাধারণত ট্যাক্স কাটা ছাড়া অফশোর ব্যাংক দ্বারা সুদ দেওয়া হয়;
১০. অফশোর ব্যাংকিং প্রায়শই অন্যান্য স্ট্রাকচারের সাথে সংযুক্ত থাকে, যেমন- অফশোর কোম্পানি, ট্রাস্ট বা ফাউন্ডেশন, যাতে কিছু ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট কর সুবিধা থাকতে পারে।

Disadvantages of Offshore Banking (অফশোর ব্যাংকিং এর অসুবিধা)
অফশোর ব্যাংকিং এ সাধারণত নিম্নলিখিত অসুবিধাগুলো পাওয়া যায়-
১. অফশোর ব্যাংকিং অতীতের সাথে আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থনীতি এবং সংগঠিত অপরাধের সাথে মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে যুক্ত হয়েছে। ১১ সেপ্টেম্বর, ২০০১ এর পরে, সমুদ্রবন্দর ও ট্যাক্স হাভ্যানগুলি ক্লিয়ারিং হাউসসহ বিভিন্ন সংগঠিত অপরাধী গোষ্ঠী, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং অন্যান্য রাষ্ট্র বা অ-রাষ্ট্রীয় লোকদের সাহায্য করার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে, অফশোর ব্যাংকিং একটি বহিরাগত আর্থিক অনুশীলন যা বহির্মুখী এবং আন্তর্জাতিক কর্মীদের দ্বারা পরিচালিত হয়;
২. অফশোর বিচার বিভাগগুলি প্রায়ই দূরবর্তী, তাই সরাসরি অ্যাক্সেস এবং তথ্য অ্যাক্সেস পাওয়া কঠিন হতে পারে। তবুও বিশ্বব্যাপী টেলিযোগাযোগের কারনে এই গ্রাহকদের জন্য এটি খুব কমই একটি সমস্যা। হিসাবগুলি ফোন বা মেইল দ্বারা অনলাইন সেট আপ করা হয়ে থাকে;
৩. অফশোর প্রাইভেট ব্যাংকিং সাধারণত উচ্চ আয়ের মানুষরা খোলে, কেননা অফশোর হিসাবগুলি পরিচালনা ও চালু রাখার খরচ অনেক বেশি।

Offshore Banking Unit (অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট)
অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট (OBU) একটি ব্যাংক শেল শাখা, যা অন্য আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্রে অবস্থিত (অথবা, একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল)। অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট (ওবিইউ) বাজারে ঋণ দান করে, যখন তারা বিদেশী ব্যাংক এবং অন্যান্য OBU থেকে আমানত গ্রহণ করে। স্থানীয় আর্থিক কর্তৃপক্ষ ও সরকার OBU এর কার্যকলাপ সীমাবদ্ধ করে না। তারা দেশীয় আমানত গ্রহণ বা দেশের বাসিন্দাদের ঋণ দিতে অনুমোদিত নয়, যেখানে তারা অবস্থিত। সামগ্রিকভাবে OBU জাতীয় আইন দ্বারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে নমনীয়তা উপভোগ করে থাকে।

Rules of Offshore Banking (অফশোর ব্যাংকিং এর নীতি)
অফশোর ব্যাংকিং সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘােষিত নীতিসমূহ নিম্নরূপ-
১) OBU হবে বাংলাদেশের বা বৈদেশিক কোন ব্যাংকের একটি অংশ কিন্তু এ অফশাের ব্যাংক ব্যবসায়ের জন্য আলাদা একটি হিসাব রক্ষা করতে হবে।
২) যে সকল বিষয়ে ছাড় দেওয়া হয় সেগুলাে ব্যতীত এর পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের আইন প্রযােজ্য হবে।
৩) যারা OBU পরিচালনা করতে আগ্রহী হবে তাদেরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে।
৪) OBU স্বাধীনভাবে বৈদেশিক আমানত এবং ঋণগ্রহণ করতে পারবে। অনুরূপভাবে EPZ এলাকার শিল্পসমূহে ঋণ/বিনিয়ােগ করতে পারবে।
৫) OBU কতকগুলাে নির্দিষ্ট বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবসায় করতে পারবে। যেমন- ডলার, পাউণ্ড স্টালিং, কানাডীয় ডলার, ডয়েচ মার্ক, জাপানী ইয়েন, সুইস ফ্রাংক, নেদারল্যাণ্ড গীল্ডার, ফ্রান্স ফ্রাঙ্ক, সুইডিশ ক্রোনা, সিঙ্গাপুরী ডলার।
৬) OBU-এর ভৌগােলিক অবস্থান সম্পর্কে কোন বিধি-নিষেধ থাকবে না। এটি EPZ বা অন্য যে কোন স্থানে হতে পারে।
৭) EPZ এলাকার বাইরে বাংলাদেশী নাগরিকেরা ব্যাংকিং লেনদেন করতে পারবে না তবে অস্থানীয়দের বেলায় কোন বাধা নেই।
৮) বৈদেশিক করেসপনডেন্টদের নিকট যেমনভাবে দেশীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব পরিচালনা করতে পারে তেমনি OBU-এর নিকটও তারা বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব পরিচালনা করতে পারে।

অফশোর ব্যাংকিং করছে যেসব ব্যাংক
বিদেশি মালিকানাধীন এইচএসবিসি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, সিটিব্যাংক এনএ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলোন, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ও উরি ব্যাংক অফশোর ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। এ ছাড়া দেশীয় ব্যাংকের মধ্যে বেসরকারি খাতের এবি, আল-আরাফাহ্, ব্যাংক এশিয়া, ব্র্যাক, ঢাকা, ডাচ্-বাংলা, ইস্টার্ণ, এক্সিম, আইএফআইসি, ইসলামী ব্যাংক, যমুনা, মার্কেন্টাইল, মধুমতি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, ন্যাশনাল, এনসিসি, ওয়ান, প্রিমিয়ার, প্রাইম, পূবালী, শাহজালাল ইসলামী, সোস্যাল ইসলামী, সাউথইস্ট, স্ট্যান্ডার্ড, দি সিটি, ট্রাস্ট, ইউসিবিএল ও উত্তরা ব্যাংক এ সেবা দিচ্ছে। তা ছাড়া রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে একমাত্র অগ্রণী ব্যাংক অফশোর ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত।

2 মন্তব্যসমূহ

Leave a Reply