ঋণ অবলোপন কি? ঋণ অবলোপন করার প্রয়োজনীয়তা

0
2471

সহজ ভাষায়, ধরা যাক, আপনি একজন Borrower কে ঋণ দিয়েছেন। সেই ঋণ Borrower নিয়মিত Repay করেননি বলে Classify হতে হতে এক পর্যায়ে Bad & Loss/BL (মন্দ ও ক্ষতিজনক) মানে শ্রেণীকৃত হয়ে পড়েছে। এবং ফলস্বরূপ বাংলাদেশ ব্যাংকের Loan Provisioning এর নিয়ম অনুযায়ী আপনি উক্ত ঋণের বিপরীতে ১০০ ভাগ Provision সংরক্ষণ করছেন। আবার পাশাপাশি টাকা আদায়ের লক্ষ্যে অর্থ ঋণ আদালতে মামলাও দায়ের করেছেন। ঋণ আদায়ে সম্ভাব্য সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে এবং আপনি বুঝতে পারছেন এই টাকা আদায় হবার নয়, এই ধরণের ঋণ হিসাব আপনার বুকস থেকে Wash Out (মুছে ফেলা/ধুয়ে ফেলা) করাকেই বলে ঋণ অবলোপন।

ঋণ অবলোপন করার প্রয়োজনীয়তা কি?
ধরা যাক, আপনি নিজেই একটি ব্যাংক। আপনি General Public এর কাছ থেকে Deposit কালেক্ট করেন। যেহেতু এই Deposit আবার Depositor দের ফিরিয়ে দিতে হবে, কাজেই এই Deposit হচ্ছে আপনার Liability. এবার এই Deposit এর টাকা দিয়ে আপনি বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে Loan দিয়েছেন, যা আপনি আইনত সুদাসলে ফেরৎ পাবেন। কাজেই এই Loan হচ্ছে আপনার Asset.

এখন ধরা যাক, আপনি দশ জন বিভিন্ন ব্যক্তিকে ১০০ টাকা, ২০০ টাকা, ৪০০ টাকা, ৫০০ টাকা এ রকম করে সর্বমোট ২০০০ টাকা Loan দিয়েছেন এবং Accounting Rules অনুযায়ী এই ২০০০ টাকা আপনি আপনার ব্যালেন্স শীটে Asset হিসেবে প্রদর্শন করছেন। একটা সময় পরে দেখা গেলো যে ব্যক্তি ২০০ টাকা Loan নিয়েছে, উনি আর Repay করতে পারছেন না। অবস্থা এমনই খারাপ যে, ওই ব্যক্তি এই টাকা আর ফেরৎ দিতে পারবেন তার সম্ভাবনা সুদূর পরাহত। তাহলে আসলে আপনার Asset কত দাড়ালো? যদি বলেন, আপনার Asset ২০০০ টাকাই আছে, তাহলে আপনি আসলে সত্য গোপন করে আপনার Asset বেশী (Overstate) দেখাচ্ছেন, কারণ ঋণ ফেরৎ পাবার সম্ভাব্যতা বিচারে আপনি প্রায় নিশ্চিত যে, ওই ২০০ টাকা আর ফিরে আসবে না। তাহলে আপনার কি উচিৎ হবে না এই বলা যে, আপনার Asset আসলে ১৮০০ টাকা (২০০০ টাকা মাইনাস ২০০ টাকা)। আদায় সম্ভাবণা ক্ষীণ, এ রকম Loan ব্যাংকের Books থেকে ফেলে দিয়ে সম্পদের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরাই হচ্ছে ঋণ অবলোপনের উদ্দেশ্য।

কিভাবে ঋণ অবলোপন করবো?
খুবই সহজ। আবার আমরা সেই ২০০ টাকার ঋণের হিসাবে চলে আসি। এই ঋণ হিসাবটি Bad & Loss মানে শ্রেণীকৃত হবার আগে Classification এর বিভিন্ন ধাপ (যেমনঃ SMA, SS, DF) পেরিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের Loan Classification এর নিয়ম অনুযায়ী এই ঋণ হিসাবটি যখনই SS মানে শ্রেণীকৃত হয়েছিল, তখন থেকেই আপনি এই ঋণের বিপরীতে যে সুদ হয়েছে তা Interest Income হিসাবে না নিয়ে Interest Suspense হিসেবে জমা করেছেন। ধরা যাক, এই ২০০ টাকার ঋণের বিপরীতে আপনি ৩০ টাকা Interest Suspense হিসেবে জমা করেছেন। তাহলে ঋণ হিসাবটি অবলোপন করতে হলে আপনাকে প্রভিশন থেকে আরো ১৭০ টাকা সংস্থান করতে হবে। যদি আপনার প্রভিশন হিসাবে ১৭০ টাকা না থাকে, তাহলে আপনাকে চলতি বছরের আয় খাত থেকে টাকা নিয়ে ঋণ অবলোপন করতে হবে। যদি চলতি বছরের আয় খাতেও টাকা না থাকে, তাহলে আপনি ঋণ হিসাবটি অবলোপন করতে পারবেন না।

ধরা যাক, আপনার কাছে প্রভিশনে ১৭০ টাকা আছে বা যা কম আছে তা আপনি চলতি বছরের আয় খাত থেকে টাকা নিচ্ছেন, তাহলে আপনাকে নিম্নলিখিত Entry System এ Pass করতে হবেঃ
Debit: Interest Suspense + Provision + Current Year Income (if required)
Credit: Loan Account
ঋণ হিসাবটি সম্পূর্ণরূপে সমন্বয় করার জন্য যে পরিমাণ টাকা দরকার, আপনি ঠিক সেই পরিমাণ টাকাই Interest Suspense ও Provision Account থেকে Debit করবেন।

ঋণ হিসাব অবলোপন করলে কি সংশ্লিষ্ট Borrower তার দায় থেকে নিস্কৃতি পাবেন?
মোটেই না, বরং অবলোপনের আগে Borrower এর যে দায় ছিল, অবলোপন হয়ে গেলেও তা একই থাকবে, প্লাস চক্র বৃদ্ধি সুদের কারণে ওই Borrower এর দায় দিন দিন বাড়তেই থাকবে যেমনটা বাড়তো যদি ঋণ হিসাবটি অবলোপন করা না হতো। অর্থাৎ, ঋণ অবলোপনের সাথে গ্রাহকের দায় বাড়া বা কমার কোনো সম্পর্ক নেই।

ঋণ হিসাব অবলোপনের কোনো পালনীয় শর্ত আছে কিনা?
অবশ্যই, তিনটা শর্ত পূরণ করতে হবে-
(১) ঋণ হিসাবটি মন্দ ও ক্ষতিজনক মানে শ্রেনীকৃত হতে হবে;
(২) ১০০ ভাগ Provision থাকতে হবে। যদি Provision একাউন্টে প্রয়োজনীয় পরিমাণ টাকা না থাকে, তাহলে Current Year Income Debit করতে হবে;
(৩) মামলা দায়ের করা থাকতে হবে।

এছাড়া আরো কিছু গুরুত্ত্বপূর্ণ বিষয় আছে, যেমন-
(১) ঋণ হিসাব অবলোপন করতে গেলে ব্যাংকের Board of Directors দের অনুমোদন লাগবে;
(২) ঋণ অবলোপনের ক্ষেত্রে ৫ বছরেরও বেশী সময় ধরে Bad & Loss রয়েছে এরকম ঋণ আগে অবলোপন করতে হবে;
(৩) ঋণ অবলোপনের ক্ষেত্রে প্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থাৎ যে ঋণ হিসাবটি আগে Bad & Loss হয়েছে, তা আগে অবলোপনের ব্যবস্থা করতে হবে;
(৪) ব্যাংকের বর্তমান বা প্রাক্তন পরিচালকের নামে বা তার স্বার্থ সংশ্লিস্ট ঋণ হিসাব অবলোপন করতে গেলে অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতি লাগবে;
(৫) অবলোপিত ঋণ হিসাব কোনো অবস্থাতেই আর পুনঃতফসিল করা যাবে না;
(৬) ঋণ অবলোপনের পরেও ঋণ আদায়ের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যহত রাখতে হবে;
(৭) ব্যাংকের অভ্যন্তরে পৃথক Debt Collection Unit (যেমনঃ Recovery Division, Special Asset Management Division ইত্যাদি) এর উপর অবলোপিত ঋণ আদায়ের দায়িত্ব স্থানান্তর করতে হবে;
(৮) অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ের জন্য বা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ব্যাংক বহির্ভূত প্রতিষ্ঠান (3rd Party Debt Recovery Agent) কে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে;
(৯) অবলোপনকৃত ঋণ একটি পৃথক লেজারে সংরক্ষন করতে হবে এবং ব্যাংকের Annual Report এ চলতি বছর অবলোপিত ঋণের পরিমাণ ও ক্রমপুঞ্জিভূত অবলোপিত ঋণের পরিমাণ পৃথকভাবে “Notes of Accounts”–এ প্রদর্শন করতে হবে;
(১০) খেলাপী ঋণগ্রহীতার ঋণ অবলোপন করা হলেও ওই ঋণগ্রহীতা ঋণ খেলাপী হিসেবেই বিবেচিত হবেন;
(১১) অবলোপিত ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি-তে রিপোর্ট করতে হবে।

ঋণ অবলোপনের ক্ষেত্রে মামলা দায়েরের বিধান
ঋণ অবলোপনের ক্ষেত্রে মামলা দায়েরের যে বিধান রয়েছে সে সম্পর্কে দুটি কথাঃ
অনেকেই প্রশ্ন করেন অর্থ ঋণ মামলা না করে চেকের মামলা করে ঋণ হিসাব অবলোপন করা যাবে কিনা?
উত্তর হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে অর্থ ঋণ মামলাই করতে হবে এরূপ সুস্পষ্ট করে বলা নেই অর্থাৎ একটি Gray Area আছে। কিন্তু এটা Implied যে, আপনাকে অর্থ ঋণ মামলাই করতে হবে। Gray Area এর সুযোগ নিয়ে Regulator দের সাথে চালাকী করা যুক্তি সংগত হবে না।

আবার আপনি চাইলে দুটি ক্ষেত্রে মামলা দায়ের না করেই ঋণ অবলোপন করতে পারেন
(১) যদি ঋণ হিসাবের বকেয়া ৫০,০০০ টাকা অপেক্ষা কম হয় (যুক্তি হচ্ছে, অর্থ ঋণ মামলা করতে যা খরচ হয়, তা ৫০,০০০ টাকার নিচের অংকের ঋণের জন্য আসলে Cost Effective নয়)। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতির প্রয়োজন নেই;
(২) যদি মামলা দায়ের করা না থাকে কিন্তু মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন (অর্থাৎ আপনি হয়ত পত্রিকায় অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ১২ ধারা অনুযায়ী নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছেন), সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে ঋণ হিসাব অবলোপন করতে পারবেন। [লেখাটি পুরনো সার্কুলার অনুযায়ী]

Source: My Bank Bd

Leave a Reply