সুদ কী? ইসলামে সুদের ভয়াবহতা!

0
518

সুদ কি? ইসলামে সুদের ভয়াবহতা! বর্তমানে প্রচলিত ইসলামী ব্যাংকিং, আলেমদের অবস্থান, দু-চারটি কথা- ইসলামি ব্যাংকিং নিয়ে আলেমগণ কেন কথা বলেন, কী কথা বলেন তা ধীরস্থীর হয়ে বোঝাপড়ার নিয়ত নিয়ে উপলব্ধি করা সকলের জন্যেই উত্তম হবে। তা না হলে আলেমদের উপর আপত্তি হতে থাকবে, যদিও আলেমরা আপনার উপকারী বন্ধু। একজন মুসলমানের জন্য এটাও স্বীকৃত হওয়ার কথা যে, আলেমদের আল্লাহ তাআলা ইলম ও তাকওয়ার বদৌলতে একটি অন্তর্দৃষ্টি দান করেন, যার মাধ্যমে তাঁদের সামনে এমন সত্যও উদ্ভাসিত হয়, যা অন্যদের সামনে উদ্ভাসিত হতে সময় নেয়।

জানা কথা যে, ফেসবুক খুব বেশি শাস্ত্রীয় ও তাত্ত্বিক আলোচনার জায়গা না। আমি সেদিকে যাচ্ছি না। জাস্ট কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে রাখি। চিন্তা করার জন্য। আলেমগণ যারা ইসলামি অর্থনীতি নিয়ে ভাবেন, তারা কোনোভাবেই এটা মনে করেন না যে, দু-চারটি শাখাগত সংশোধন করলেই তা ইসলামিক হয়ে যাবে। বরং আলেমদের ইসলামি ব্যাংকিং প্রস্তাবনার অন্যধর্মীয় কমপক্ষে দুটি উপকারী দিক আছে।
১) পুঁজিবাদি অর্থ ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে তার তাত্ত্বিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেওয়া।
২) ভবিষ্যতে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে যেন অর্থনীতিকে সঠিকভাবে পরিচালনার মূল এলিমেন্টস তৈরি থাকে। তখন নতুন করে ভাবনা শুরু করতে না হয় সে ব্যাপারটি নিশ্চিত হওয়া।

বর্তমানে ইসলামি ব্যাংকিং সংক্রান্ত প্রস্তাবনার অর্থ এই নয় যে, ইসলামের নামে যেসব ব্যাংকিং চলছে, তা শরীয়াহসম্মত। বরং কোনো ব্যাংককে শরীয়াহসম্মত বলার জন্য আলাদা এনালাইসিসের প্রয়োজন নি:সন্দেহে থেকে যায়। যে কারণে আলেমগণ বিশেষত উপমহাদেশীয় আলেমগণ কোনো ব্যাংককে শরীয়াহসম্মত বলেছেন এমন উদাহরণ খুবই রেয়ার। তবে প্রস্তাবনা কিন্তু তাঁরা দিয়ে যাচ্ছেন। এই প্রস্তাবনার উপরিউক্ত উপকারী দিকগুলো ছাড়া নগদে মানুষকে সুদ এড়িয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পুরা করার দিকটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

আলেমগণ লোনিং প্রজেক্টে মুরাবাহ, ইজারাহ ইত্যাদির বদলে মুশারাকাকে উৎসাহিত করেন। কেন? কারণ সুদভিত্তিক পূঁজিবাদি ব্যবস্থা এর মাধ্যমেই ধ্বংস হওয়া সম্ভব। সে সাথে এর মাধ্যমে ফ্রাকশনাল রিজার্ভ সিস্টেমকেও চ্যালেঞ্জ করা হয়। কারণ আলেমদের প্রস্তাবিত ব্যবস্থাপনায় প্রত্যেক লেনদেনের পেছনে পণ্য থাকতে হবে, এতে মানি ক্রিয়েট কঠিন হয়ে পড়বে। সরকারের মনিটরিং যোগ করা সম্ভব হলে মানি ক্রিয়েট টোট্যালি বন্ধ করা সম্ভব হবে। এরজন্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংক দরকার নেই, সেন্ট্রাল ব্যাংকও যথেষ্ট। যদি সদিচ্ছা তৈরি করা যায়।

এটা সত্য যে, বর্তমান ইসলামের নাম ধারণকারী অধিকাংশ ব্যাংকই সমস্যাগুলো পরিহার করতে পারছে না। কিন্তু কথা হলো, আলেমগণ তো স্পেসিফিকভাবে সেগুলোকে ইসলামিও বলছেন না। বাংলাদেশের অধিকাংশ ফতোয়া বিভাগগুলোকেই ধরেন, তারা পরিস্কার বলছে যে, ইসলামি ব্যাংকগুলো নামে ইসলামি, আসলে না। এমনকি মুফতী তাকী উসমানীরও একই বক্তব্য। এর জন্য আপনারা তাঁর রচিত “সুদবিহীন ব্যাংকিং” বইয়ের ৫৯ পৃষ্ঠায় ‘সুদবিহীন ব্যাংকসমুহের ব্যাপারে আমার অবস্থান’ শিরোনামের লেখাটি পড়তে পারেন।

মুশারাকা পদ্ধতি ফ্রাকশনাল রিজার্ভ সিস্টেমকে যদি চ্যালেঞ্জই করে, তাহলে আলেমগণ ব্যাংকের সংজ্ঞা কেন ভুল ভাবে করেন! আসলে কনভেনশোনাল ব্যাংকিং সুদ ভিত্তিক হওয়ায় এখানে মানি ক্রিয়েটের ব্যাপারটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এবং ব্যাংকের উৎপত্তি এই সুবিধা বিবেচনায়ই শুরু হয়েছে। এটা হচ্ছে পুজিপতিদের দিক থেকে।

কিন্তু জনগণের যে প্রয়োজন -তথা অলস মানি সংরক্ষণ বা অন্যের থেকে অলস টাকা দিয়ে ব্যবসা করা- পূরণ করার জন্য এধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, তার দিকে তাকিয়ে ব্যাংকের সংজ্ঞায়ন ‘আর্থিক মধ্যস্ততাকারী প্রতিষ্ঠান’ করলে মহা সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বরং এটাই ব্যাংকের গোড়ার বিষয় ছিল। কিন্তু পুঁজিপতিরা তা নিজেদের সুবিধার দিকে কনভার্ট করেছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি সংক্রান্ত সাইট ব্লকোনমির নীচের লেখা থেকে বিষয়টা বোঝা যাবে,

History of Fractional-Reserve Banking
A common theme that consistently emerges when looking at the formation and modern structure of Fractional-Reserve Banking (FRB) is debt. That being said, understanding how FRB came to be is necessary to understand its current structure, and how cryptocurrencies like Bitcoin, are so unprecedented.

FRB is the current form of banking in most countries around the world. Despite being around for a relatively long time, the focus of FRB in this piece is precisely on the modern iteration of such a system, where government monetary authorities and federal central banks monitor the financial system and regulate control of the currency supply.

Established in 1609, the Bank of Amsterdam was founded and is considered the precursor to modern central banks in existence today. Notably, the Bank of Amsterdam played a vital role in the early emergence of paper money, which took the form of a bank receipt issued by the bank for gold, silver, and other valuables that were deposited to the bank. At the time, the primary source of value was gold and silver; however, it was increasingly difficult to exchange through trade as they are cumbersome, especially over longer distances.

The banknotes became a standard medium of exchange between people as they represented a deposit with a goldsmith or bank. Something interesting soon followed, goldsmiths and banks realized that they could issue more deposit receipts (banknotes) than what they actually had stored in their reserves. They also realized that people just did not redeem their receipts for deposit all at once, but rather at various times, more on this later. Eventually, rather than providing a safe-haven for valuables, goldsmiths became businesses that were interest-paying and interest-earning. Thus, FRB came into existence.

জনগণের প্রয়োজনের বিবেচনায় যদি বিষয়টা না দেখা হয়, তাহলে এটাও মাথায় রাখা দরকার যে, এ হিসেবে ব্যাংক অস্তিত্বে আসারই সুযোগ তৈরি হতো না। হ্যাঁ, মহা সমস্যা হতো যদি আলেমগণ এধরনের প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিপতিদের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার ব্যাপারটি মাথায় না রাখতেন, অগ্রাহ্য করতেন। কিন্তু ঘটনা তো মোটেই তা নয়। আলেমগণ পরিস্কারভাবে মানি ক্রিয়েটের ব্যাপারটাকে নাজায়েয বলেছেন, এবং এটা পরিত্যায্য হওয়ার ব্যাপারটিকে প্রস্তাবনার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। উদাহরণত মুফতী তাকী উসমানীর বক্তব্য দেখুন-

“এই সুদি ব্যবস্থার মাধ্যমে এমন ব্যবস্থা অস্তিত্ব লাভ করেছে যে, যেখানে প্রকৃত সম্পদ ব্যাতিরেকে কাল্পনিক টাকার ছড়াছড়ি এত বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যদি এগুলোকে নোট বানিয়ে লম্বালম্বি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা ভূমি থেকে চাঁদ পর্যন্ত তিন চক্কর ঘুরে আসতে পারবে। আপনারা জানেন যে, নোটও কোনো প্রকৃত মানের ধারক হয় না। কিন্তু আমি যে টাকার ছড়াছড়ির কথা উল্লেখ করছি, তা নোটের আকারেও নয়; বরং কম্পিউটারে সৃষ্ট কাল্পনিক আকারে। প্রকৃত নোটের তুলনায় এর পরিমাণ কয়েক লক্ষ গুণ বেশি। আসবাবপত্র বা সম্পদ ছাড়া ঋণ জারি করা এবং কাল্পনিক জিনিসের কেনাবেচার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা পুরো অর্থব্যবস্থাকে বাতাসে ভরা বেলুনের মত বানিয়ে দিয়েছে, যেকোনো সময় যা ফেটে গিয়ে বিরাট ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করতে পারে।

এই সুদি ব্যবস্থাতে ঋণের কেনাবেচা হয়। এর জন্য আবার ঋণপত্রও (অর্থাৎ পরিশোধের অঙ্গিকারপত্র) হয়, সেই ঋণপত্রের বাজারও বসে, যাকে অপশন বলা হয়, আবার এসব অপশনের ক্রয়ের অধিকারও বিক্রয় হয়। যার মালিকানায় কিছুই থাকে না, সে শুধু কাল্পনিক ভিত্তির উপর ভবিষ্যতের ব্যবসা করে। স্টক মার্কেটে বিনিময়ের কারবার হয়ে থাকে।

মোটকথা, এটি বাতিল ও ফাসেদ লেনদেন ও চুক্তির একটি জগৎ, যা সুদি ব্যাংকিংয়ের একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে আছে। এই ভিত্তির উপরই পুরো পুঁজিবাদি ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে। সুদবিহীন ব্যাংকসমূহের জন্য শুধু সুদই নিষিদ্ধ নয়। বরং এসব লেনদেনও নিষিদ্ধ এবং এসব থেকে দুরে থাকা আবশ্যক। এ কারনেই বর্তমান বিশ্বমন্দার ঝড়ে যেখানে সারা পৃথিবীকে প্রচণ্ডরকমের ঝাঁকুনী দিয়েছে সেখানে সুদবিহীন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে কম প্রভাবিত হয়েছে। অনৈসলামিক বিশ্বও বিষয়টি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ তারা এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ মুরাবাহা ও ইজারার মতো পদ্ধতিই ব্যাবহার করছে।” (সুদবিহীন ব্যাংকিং, পৃ. ৩২২)

এখানের আলোচনায় দেখলেন যে, মানি ক্রিয়েটের ব্যাপারটাকে নাজায়েয বলা হয়েছে। এবং সুদ ও মানি ক্রিয়েট দুটাকেই নাকচ করা হয়েছে। এবং সুদবিহীন ব্যাংকিং যে, মানি ক্রিয়েটিং সিস্টেমকে চ্যালেন্জে ফেলে তাও বলা হয়েছে। তাছাড়া মুফতী তাকী উসমানী সাহেবের যে বই নিয়ে কথাবার্তা বলা হচ্ছে, “ইসলাম আওর জাদীদ মায়ীশাত ওয়া তিজারাত”। এই বইটাতেও তাকী সাহেব ব্যাংকের সংজ্ঞা উল্লেখ করেই ব্যাংকের কাজ কি তা বলেছেন। সেখানে তিনি ফ্রাকশনাল রিজার্ভ সিস্টেম ব্যাখ্যা করেছেন। (আরবী সংস্করণ, পৃ. ১১৭) শুধু সংজ্ঞার জায়গা থেকে কষ্ট করে একটু সামনে গেলেই আলাদা শিরোনাম পাওয়া যেত। সেগুলো না মিলিয়ে আলেমরা ব্যাংকের সংজ্ঞা জানেন না- কথাটি কেমন মনে হয় না!

আমি এতদিন যা বলতে চেয়েছি, তা কেন যেন বোঝাতে পারছিলাম না। আমি যা বলতে চাই, আলেমদের সাথে কথাবার্তা বলে তাঁদের মনোভাব এবং প্রস্তাবনাটা বোঝার চেষ্টা করুন। আলেমদের ব্যাপারে না-জানার অভিযোগ করার আগে বিষয়টি ভালভাবে তাহকীক করুন। আলেমদের প্রচেষ্টার অবমূল্যায়ন হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকুন। প্রচলিত ব্যাংকিং এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার কোনোটাই আলেমগণ স্বীকার করেন না। কিন্তু এগুলোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রস্তাবনা মূলত এসব সিস্টেম থেকে বের হওয়ার জন্য অথবা জরুরত পূরণ করার জন্য। সমর্থন করার জন্য নয়।

কওমীর তালেবুল ইলমদের অনুরোধ, নতুন প্রীতি ক্ষতিকর। নতুন কথা আসলে সময় নিন। জ্ঞানীদের দিকে রুজু করুন। আহলে ইলম জ্ঞানীদের প্রতি আস্থা রাখুন। মনে রাখুন, আস্থার সঙ্কট পৃথিবীর সবচে বড় রোগ। আমার এই লেখার কারণ আকাবিরপ্রীতি বা আকাবিরকে বাঁচানো নয়। বরং আলেমদের এবিষয়ে প্রচেষ্টার যে বাস্তবতা আমি জানি, তার সাথে অমিল দেখেই আমি বলছি। আপনারা অর্থনীতি বিষয়ে আলেমদের অবস্থানের হাকীকত বোঝার জন্য একটু কষ্ট করে তাকী সাহেবের ‘সুদবিহীন ব্যাংকিং’ বইটি পাঠ করুন। অনেক কিছুই স্পষ্ট হবে। আল্লাহতালা আমাদের সকলকেই সঠিক বুঝ দিন, হিদায়াতের উপর অটল রাখুন। ওয়ামা তাওফিকি ইল্লা বিল্লাহ।

কার্টেসিঃ সংগৃহীত

Leave a Reply