কমিউনিকেশন স্কিল কী? একজন ব্যাংকার হিসেবে কমিউনিকেশন স্কিল এ ভালো করার উপায়

0
4230

কিছু মানুষকে দেখবেন আপনার খুব ভালো লাগে আর কিছু মানুষকে বিরক্তিকর। কিছু মানুষ সহজেই আপনাকে সব বুঝিয়ে দিতে পারে আর কিছু মানুষ সারাদিন কথা বলেও বোঝাতে পারছে না। পার্থক্যটা কমিউনিকেশন স্কিলে। কমিউনিকেশন স্কিল ব্যপারটা আসলে কী? তা আজকের লেখাতে বোঝানোর চেষ্টা করবো।

কমিউনিকেশন স্কিল কী?
কমিউনিকেশন স্কিল সম্পর্কে জানার আগে জানতে হবে কমিউনিকেশন বা যোগাযোগ কি? কমিউনিকেশন বা যোগাযোগ হল তথ্য আদান প্রদানের উপায় বা কৌশল। মানুষ থেকে মানুষ বা যন্ত্র থেকে যন্ত্রে তথ্য আদান প্রদান হতে পারে। এছাড়াও যোগাযোগের মাধ্যমে মনের ভাব আদান প্রদান করা হয়। যোগাযোগ ভার হতে পারে কথ্য বা অ-কথ্য। অনেকসময় অনেক ভাবে যোগাযোগ হয়। শুধু প্রাণী জগতে মানুষেরা যোগাযোগ করে না। প্রত্যেক পশু-পাখি যোগাযোগ করতে পারে। যোগাযোগ করার জন্য যে ধরণের মিডিয়া ব্যবহার করা হয় তা হলো-

  • ভিজুয়্যাল যোগাযোগ
  • ধ্বনির সাহায্যে যোগাযোগ
  • স্পর্শের সাহায্যে যোগাযোগ
  • গন্ধের সাহায্যে যোগাযোগ
  • লেখার সাহায্যে যোগাযোগ ইত্যাদি।

এখন আসুন জেনে নিই কমিউনিকেশন স্কিল সম্পর্কে। বর্তমান কর্পোরেট জগতে যোগাযোগের ক্ষেত্রে যে স্কিলটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সেটি হচ্ছে কমিউনিকেশন স্কিল। একজন ব্যাংকার হিসেবে কমিউনিকেশন স্কিল ডেভেলপ করা অত্যান্ত জরুরী। সেটা হতে পারে আপনার সহকর্মীর সাথে কিংবা গ্রাহকের সাথে। কমিউনিকেশন এর বাংলা অর্থ যোগাযোগ। যোগাযোগ আমরা সারাক্ষণই করছি একে অপরের সাথে। কিন্তু বেশির ভাগ সময় আমরা ভুল কমিউনিকেশন করি। যার কারণে আমরা বেশির ভাগ সময় সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হিমসিম খাই। অনেক সময় যার সাথে যোগাযোগ করছি তার কাছে বিরক্তির কারণ হয়ে উঠি। এর জন্য প্রয়োজন ইফেক্টিভ কমিউনিকেশন। যা দিয়ে মানুষের মন জয় করা সম্ভব।

ব্যাংকার হিসেবে কমিউনিকেশন স্কিল এ ভালো করার ১০টি উপায়
একজন ব্যাংকার হিসেবে ভালো করতে হলে কমিউনিকেশন স্কিল এ ভালো করতে হবে। ইফেক্টিভ কমিউনিকেশন এ দক্ষ হতে চাইলে নিচে দেওয়া ১০টি রুলস বাস্তব জীবনে গুরুত্ব দিয়ে ভাবুন ও অনুসরণ করুনঃ—

১) সুন্দর সম্ভাষণ
যার সাথে কথা বলতে চাচ্ছেন সে যদি অপরিচিত কোন হয়ে থাকে তাহলে ব্যাংকার হিসেবে প্রথমে তাকে সুন্দরভাবে সালাম দিন। নিজের পুরো নাম বলুন। কখনো সংক্ষিপ্ত নাম বলবেন না। হ্যান্ডসেক করুন। এটা হচ্ছে যোগাযোগ এর একটি শিষ্ঠাচার।

২) আই কন্ট্যাক্ট ঠিক করুন
সবসময় Eye-Contact করুন। একজন স্মার্ট ব্যাংকার সবসময় অপর একজন মানুষের চোখে চোখ রেখে কথা বলে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, যারা চোখে চোখ রেখে কথা বলেন তারা আত্নবিশ্বাসী হয়ে থাকে। মজার ব্যাপার হলো আমাদের দেশে বেশিরভাগ ব্যাংকার গ্রাহকের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারেন না। তারা ইতস্তত বোধ করেন। এর অর্থ দাঁড়ায় যে আপনি হীনমন্যতায় ভুগছেন। এটির কারণে আপনার দক্ষতা হ্রাস পেতে পারে।

৩) কথা বলার ক্ষেত্রে মনযোগী হোন
যিনি আপনার সাথে কথা বলছেন তাকে এটা বুঝিয়ে দিন যে আপনি তার কথা খুব মনোযোগ সহকারে শুনছেন। সে কথা বলার সময় মাঝে মাঝে তার কিছু কথা রিপিট করে তার কথার প্রশংসা করুন। এতে সে বুঝবে আপনি তার কথা মনোযোগ সহকারে শুনছেন। জানেন তো? মানুষ তাকেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে যে তার কথা মনোযোগ সহকারে শুনে।

৪) তর্কে জড়াবেন না
কথা বলার সময় ভুল করেও তর্কে জড়াবেন না। কেউ যদি আপনাকে অপমান করে কিছু বলে অথবা অযৌক্তিক ভাবে কথাবার্তা বলে এর অর্থ দাঁড়ায় তার ভিতর জ্ঞানের অভাব আছে। এ রকম পরিস্থিতিতে নিজেকে কন্ট্রোল করা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজের ভিতর একটি। একটিবার ভাবুন তো তর্ক করলে কে জিতবে? আপনি নাকি যার সাথে তর্ক করছেন সে? যদি সে জিতে আপনি হেরে যাবেন। আর যদি আপনি জিতেন তাহলে আপনাদের সম্পর্ক হারিয়ে যাবে। তাই তর্কে জড়াবেন না।

৫) সমালোচনা বর্জন করুন
সমালোচনা করবেন না এবং আপনার বন্ধু বা কলিগের অনুপস্থিতিতে তাকে নিয়ে খোশগল্প করবেন না। নিজেকে জিজ্ঞেস করেন তো আজ পর্যন্ত আমি যত মানুষ এর সমালোচনা করেছি তারা কি আমাকে ১ পয়সা দিয়েছে? যদি না দিয়ে থাকে তাহলে কি দরকার নিজের সময় নষ্ট করে অন্যকে নিয়ে সমালোচনা করার? সমালোচনা আপনাকে মানুষের চোখে ব্যক্তিত্বহীন করে তুলবে।

৬) যোগাযোগ রুলস মেনে চলুন
যোগাযোগ ক্ষেত্রে ৮০/২০ রুলস মেনে চলুন। একজন ব্যাংকার হিসেবে ৮০% কথা শুনবেন এবং ২০% কথা বলবেন। সৃষ্টিকর্তা আপনাকে ২টা কান দিয়েছেন বেশি করে শোনার জন্য এবং আর একটা মুখ দিয়েছেন কম কথা বলার জন্য। বুদ্ধিমান মানুষ সবসময় বেশি করে কথা শোনে এবং যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকু কথা বলে।

৭) প্রশংসা করুন
অন্যের প্রশংসা করুন। তার ভালো কিছু গুনাবলী তার সামনে তুলে ধরুন। যেমন তাকে বলতে পারেন আপনার শার্টটি অনেক সুন্দর। আপনার গতকালের কাজগুলো অনেক ভালো হয়েছিল। আপনি অন্যদের থেকে অনেক স্মার্ট। কেউ আপনাকে নিয়ে প্রশংসা করলে মনের ভিতর থেকে আপনি তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ অনুভব করেন। ভেবে দেখেছেন কি কখনো আপনি যদি একই থিওরি বাস্তবে প্রয়োগ করেন তাহলে আপনিও কিন্তু গ্রাহক বা কলিগের চোখে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবেন। তাই আজকে থেকে এই সিক্রেটটা মাথায় রাখবেন সবসময় অন্যের প্রশংসা করবেন।

৮) অন্যের ভাবনায় বিচলিত হবেন না
অন্যরা আপনাকে নিয়ে কি ভাবছে তা তাদের একান্ত ব্যপার। তাদেরকে ভাবতে দিন। একজন ব্যাংকার হিসেবে আপনার এইসব নিয়ে না ভাবলেও চলবে। তাই অন্যের কথায় নিজেকে প্রভাবিত করা বন্ধ করে নিজের কাজে মনোযোগ দিন।

৯) নিজের যত্ন নিন
সবসময় রুচিশীল পোশাক পড়ুন। চুলের যত্ন নিন। জুতার দিকে লক্ষ রাখবেন। নিজেকে সবসময় দুর্গন্ধমুক্ত রাখুন। ভালো ফেস ওয়াশ ব্যবহার করতে পারেন। ব্যাংকারদের পরিপাটি থাকা অত্যান্ত জরুরী।

১০) ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন করুন
বিশ্বমানের এই যুগে আপনাকে অবশ্যই ইংরেজিতে কথা বলতে জানতে হবে। না হলে অন্যদের থেকে পিছিয়ে যাবেন। ইংরেজিতে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সবসময় শুনুন। এজন্য ইংলিশ মুভি দেখতে পারেন। আপনাকে কিছু বুঝতে হবে না। শুধু দেখতে থাকুন। ১ বছর পর ইংরেজিতে নিজের দক্ষতা দেখে নিজেই অবাক হবেন।

ব্যাংকারদের লিডারশীপ স্কিল বাড়ানোর ১০টি উপায়
একজন ব্যাংকার হিসেবে ভালো করতে হলে লিডারশীপ স্কিল এ ভালো করতে হবে। লিডারশীপ স্কিল এ দক্ষ হতে চাইলে নিচে দেওয়া ১০টি রুলস বাস্তব জীবনে গুরুত্ব দিয়ে ভাবুন ও অনুসরণ করুনঃ—-

১) চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন আনুন
একজন ব্যাংকার হিসেবে প্রথমে নিশ্চিত করুন যে আপনি কাদেরকে প্রভাবিত করতে চান। তারপর তাদের মত করে চিন্তা করুন। তাদের আবেগগুলো বুঝার চেষ্টা করুন। তাদের মত ভাবনা চিন্তা করলে তাদের প্রভাবিত করা সহজসাধ্য হয়ে যায়।

২) অন্যের ভুল সংশোধন করে দিন
সহকর্মীরা ভুল করলে তাদের ভুলগুলো সংশোধন করে দিন। তারা ভুল করলে তাদেরকে এমন ভাবে বুঝিয়ে বলবেন যেন তারা আপনার কথায় নিজেকে তুচ্ছ না মনে করে এবং অপমান বোধ না করে।

৩) তর্কে জড়াবেন না
বড় মানের একজন ব্যাংকার হতে গেলে তুচ্ছ মানুষের সাথে কখনো তর্কে জড়াবেন না। তাদের উপেক্ষা করুন তাতেই আপনি জিতে যাবেন। নগণ্য মানুষের সাথে তর্ক করতে গেলে আপনি তাদের স্তরে নেমে যাবেন। আপনাকে নিয়ে মানুষ সমালোচনা করলে হতাশ হবেন না। মনে রাখবেন-
“Haters proofs that You are trying
Criticism proofs that you are growing” ©Shimanto

৪) নিজেকে সময় দিন
প্রতিদিন সকালে অন্তত ৬০ মিনিট সময় নিজের সাথে কাটাবেন। এ সময় নিজেকে সময় দিবেন শুধুমাত্র। সেক্ষেত্রে ২০/২০/২০ রুলস মেনে চলতে পারেন সকালের জন্য। প্রথম ২০ মিনিট দৌড়াবেন। পরের ২০ মিনিট বই পড়বেন। পরের ২০ মিনিট সারাদিনের কর্ম পরিকল্পনাগুলো নোট করবেন। এটা আপনার কাজে প্রোডাক্টিভিটি এনে দিবে। মনে রাখবেন যার সকাল ভালো কাটে তার সারাদিন ভালো কাটে।

৫) সবসময় উচ্চ মানসিকতা বজায় রাখুন
সবসময় Win Win মানসিকতা বজায় রাখুন। উইন-উইন মানসিকতা বলতে বুঝায় আমিও জিতবো আপনাকেও জিতাবো। ধরুন আপনার বাচ্চা আজকে বায়না ধরেছে সে আজকে ক্লাসে যাবে না। সেক্ষেত্রে আপনি তাকে বলুন যে সে আজকে ক্লাসে গেলে আপনি তার পছন্দের জিনিসটি তাকে কিনে দিবেন। এতে সেও খুশি হবে। আপনিও খুশি হবেন।

৬) স্মার্ট হন আচার ব্যবহারে
কোন অপরিচ্ছন্ন এবং যত্নহীন ব্যক্তি একজন সফল ব্যাংকার হতে পারেনা। পরিচ্ছন্নতা মানে আপনি নিজের প্রতি এবং নিজের কাজের প্রতি যত্নশীল হবেন। কলিগরা সেই ব্যাংকারকে অনুসরণ করে যে সকল ব্যাপারে একটি আনন্দদায়ক ব্যক্তিত্বের অধিকারী হন।

৭) সময় ব্যবস্থাপনা
একজন ব্যাংকারকে সবসময় Time Management করে চলতে হবে। টাইম ম্যানেজমেন্ট এর ৪টি রুলস হলো-
১) বেশি গুরুত্বপূর্ণ – বেশি জরুরি
২) বেশি গুরুত্বপূর্ণ – কম জরুরি
৩) কম গুরুত্বপূর্ণ – বেশি জরুরি
৪) কম গুরুত্বপূর্ণ – কম জরুরি।
আপনার সারাদিনের কর্মপরিকল্পনা ঠিক করার পর সেখান থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং বেশি জরুরি কাজগুলো বের করুন এবং সবার আগে সেগুলো সম্পাদন করুন।

৮) সহকর্মীদের প্রশংসা করুন
মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় আকাংখা হচ্ছে প্রশংসা শোনার আকাংখা। আপনি যদি আপনার কোন সহকর্মীকে দিয়ে আপনার একটি কাজ করে নিতে চান তাহলে প্রথমে তার কাজের প্রশংসা করুন। তাকে বুঝিয়ে বলুন তার ভিতর কত সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। বিশ্বাস করুন একটু প্রশংসা একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।

৯) ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনা করুন
একজন ব্যাংকারকে অবশ্যই ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করতে হবে। ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনা করলে কর্মক্ষেত্রে আপনি আপনার সর্বোচ্চটা দিতে পারবেন। কর্মীরাও কাজ করার অনুপ্রেরণা পাবে আপনাকে দেখে।

১০) সমস্যা সমাধান
সমস্যা সমাধানে দক্ষ হতে হবে। ছোট বেলা থেকে আমরা সমস্যা দেখে অজুহাত দিয়ে পালিয়ে যেতাম। যেমন বৃষ্টি হলে বলতাম আজকে বৃষ্টি তাই আমি স্কুলে যাবো না। একজন সফল ব্যাংকার হতে হলে সবসময় অজুহাত দেখানো বর্জন করতে হবে এবং সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। ইতিবাচক চিন্তাভাবনা সমস্যা সমাধানে আপনাকে দক্ষ করে তুলবে।

পরিশষে একথা বলা যায় যে ব্যাংকারদের জন্য কমিউনিকেশন স্কিল খুব বড় একটি বিষয়। এত অল্প কথায় এটা বোঝানো কঠিন। তাও যতটুকু সম্ভব বলার চেষ্টা করেছি। ভালো থাকুন এবং কমিউনিকেশন স্কিল বাড়ানোর জন্য নিজেকে যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলুন।

Leave a Reply