ব্যাংক তহবিল কি? ব্যাংক তহবিলের উৎস সমূহ

0
1792

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ অন্যান্য ব্যবসার মতো ব্যাংক ব্যবসায় মুখ্য উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন করা। বিভিন্ন খাতে ব্যাংক তার তহবিল বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জন করে। তবে এই বিনিয়োগের জন্য আগে চাই তহবিলের নিশ্চয়তা। তহবিল ছাড়া বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করা যায় না। ব্যাংকগুলোও আমানত সংগ্রহ করার মাধ্যমে তাদের তহবিল গঠন করে এবং ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। ইসলামী ব্যাংকসমূহও বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তার তহবিল গঠন করে থাকে। সংগৃহীত তহবিল ব্যাংক যতটা সুপরিকল্পনা ও দক্ষতার সাথে কাজে লাগাতে পারে, ব্যাংকের মুনাফাও ততটা বেশি হয়ে থাকে।

ব্যাংক কর্তৃক সংগৃহীত অর্থ বা পুঁজিই হচ্ছে ব্যাংক তহবিল। ব্যাংক তার প্রয়োজনীয় তহবিল শেয়ার বিক্রয়, সঞ্চিতি তহবিল বা বিভিন্ন রিজার্ভ থেকে সংগ্রহ করতে পারে যা ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল। আবার ব্যাংক আমানতের মাধ্যমে জনগণের নিকট থেকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে ঋণ হিসেবে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে যা ব্যাংকের ঋণকৃত তহবিল হিসেবে গণ্য করা হয়। উভয় তহবিলের সমন্বয় এ ব্যাংকের তহবিল গঠিত হয়।

অতএব, ব্যাংক অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উৎস থেকে যে অর্থ সংগ্রহ করে, তার সমষ্টিকে ব্যাংকের তহবিল বলা হয়। অভ্যন্তরীণ উৎস বলতে শেয়ার মূলধন ও সঞ্চিতি তহবিল এবং বাহ্যিক উৎস বলতে সরাসরি আমানত ও বিনিয়োগের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের সমষ্টিকে বোঝায়।

Sources of Commercial Banks Fund (বাণিজ্যিক ব্যাংকের তহবিলের উৎস)
ব্যাংক ইচ্ছা করলে যেনতেনভাবে তহবিল গঠন করতে পারে না। ব্যাংক কতগুলো নির্দিষ্ট উৎস থেকে নির্দিষ্ট নিয়মে তার তহবিল গঠন করে থাকে। এর কিছু বহিঃস্থ উৎস আর কিছু অভ্যন্তরীণ উৎস রয়েছে। ব্যাংকের তহবিলের উৎস প্রধানত দুটি। যথা-
ক) Bank’s Owner’s Equity বা ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল; ও
খ) Bank’s Borrowed Fund বা ব্যাংকের কর্জকৃত তহবিল।

ক) Bank’s Owner’s Equity (ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল)
যে তহবিল ব্যাংকের ভেতরে ব্যাংকের মালিক, ব্যাংকের লাভ বা ব্যাংকের অন্যান্য নিজস্ব খাত থেকে গঠিত হয়, তাকে ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল বলে। নিজস্ব তহবিল আবার তিন ধরনের হয়ে থাকে। যেমন-
১) Paid up Capital বা পরিশোধিত মূলধন;
২) Reserve Fund বা সংরক্ষিত তহবিল; ও
৩) Undistributed Profit বা অবণ্টিত মুনাফা।

১) Paid up Capital (পরিশোধিত মূলধন)
প্রতিটি ব্যাংক কোম্পানির উদ্যোক্তা বা মালিকগণ তাদের শেয়ারের বিপরীতে যে অর্থ পরিশোধ করে থাকেন, তাকে পরিশোধিত মূলধন বলে। ব্যাংকের প্রাথমিক ও প্রধান উৎস হচ্ছে পরিশোধিত মূলধন। অংশীদারি কারবারি প্রতিষ্ঠান হলে মালিকগণ নিজেরা মূলধন সরবরাহ করে এবং যৌথ মূলধনী প্রতিষ্ঠান হলে শেয়ার ইস্যু করে মূলধন গঠন করা হয়ে থাকে৷ এটা ব্যাংক মূলধনের অন্যতম উৎস।

২) Reserve Fund (সংরক্ষিত তহবিল)
প্রতি বছর মুনাফার একটি অংশ শেয়ার হোল্ডার বা মালিকগণের মধ্যে বন্টন না করে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করে রাখা হয়, তাকে সংরক্ষিত তহবিল বলে। এই অর্থ ভবিষ্যতে মূল্যায়ন হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে৷ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুসারে ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ এর ১৪ ধারা অনুযায়ী প্রতিটি ব্যাংককে তার ভবিষ্যত পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে ব্যাংকের আয়ের থেকে একটি অংশ দিয়ে তহবিল গঠন করতে হয়। এটি কর পূর্ব নিট এর ২০%। এই তহবিলের উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যাংকের ভিত্তিকে মজবুত করা। এটি ব্যাংকের তহবিল এর একটা স্থায়ী উৎস। এ তহবিলকে মূলধনে রূপান্তর করা যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত এ সঞ্চয়ের অর্থ ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের চেয়ে কম থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত এ সঞ্চয় বাধ্যতামূলক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইচ্ছা করলে সংরক্ষিত তহবিলের হার কমাতে বা বাড়াতে পারে। সংরক্ষিত তহবিলের উৎস তিন ধরনের হয়ে থাকে। যেমন-
i) General Reserve বা সাধারণ সঞ্চিতি;
ii) Statutory Reserve বা বিধিবদ্ধ সঞ্চিতি; ও
iii) Other Reserve বা বিবিধ সঞ্চিতি।

i) General Reserve (সাধারণ সঞ্চিতি)
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ মোতাবেক সকল বাণিজ্যিক ব্যাংক তার মুনাফার একটি অংশ স্বেচ্ছায় জমা রাখতে পারে। ব্যাংকের আপদ-বিপদ মোকাবেলা করার জন্য এ সঞ্চয় কাজে লাগে। এ ধরনের সঞ্চয়কে সাধারণ সঞ্চিতি বলা হয়।

ii) Statutory Reserve (বিধিবদ্ধ সঞ্চিতি)
বাণিজ্যিক ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে বাধ্যতামূলকভাবে নির্ধারিত হারে যে সঞ্চিতি সংরক্ষণ করে থাকে, তাকে বিধিবদ্ধ সঞ্চিতি বলে।

iii) Other Reserve (বিবিধ সঞ্চিতি)
সাধারণ ও বিধিবদ্ধ সঞ্চিতি বাইরে ব্যাংক বিভিন্ন উদ্দেশ্যে সঞ্চিতি তহবিল গঠন করে থাকে। অবচয় সঞ্চিতি, লভ্যাংশ সমতাকরণ সঞ্চিতি, নিমজ্জিত সঞ্চিতি, অদাবিকৃত সঞ্চিতি, প্রিমিয়াম সঞ্চিতি বিবিধ সঞ্চিতির অন্তর্ভুক্ত।

তাছাড়া মন্দ বিনিয়োগের বিপরীতে রিজার্ভ বা ক্ষতিপূরণ সঞ্চিতি ও শেয়ার প্রিমিয়ামও ব্যাংকের নিজস্ব তহবিলের মধ্যে পড়ে।

Loss Offsetting Reserve (ক্ষতিপূরণ সঞ্চিতি)
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মোতাবেক প্রতিটি ব্যাংক তার শ্রেণিকৃত বিনিয়োগের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে একটি ফান্ড গড়ে তুলবে। এটাকে মন্দ বিনিয়োগের বিপরীতে রিজার্ভ বা ক্ষতিপূরণ সঞ্চিতি বলে। প্রতিবছর ব্যাংক তার লাভ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে এ ফান্ড তৈরি করে থাকে। এ সঞ্চিতি ব্যাংকের তহবিল হিসেবে বিবেচিত।

Share Premium (শেয়ার প্রিমিয়াম)
ব্যাংক তার শেয়ারের অভিহিত মূল্য (Face Value) এর বেশি মূল্যে শেয়ার বিক্রি করে যা লাভ করে সেই লাভের অংক শেয়ার প্রিমিয়াম হিসেবে বিবেচিত। শেয়ার প্রিমিয়াম হিসেবে যে ফান্ড তৈরি হয় তা ব্যাংকের তহবিল হিসেবে কাজে লাগে।

৩) Undistributed Profit (অবণ্টিত মুনাফা)
কোন কোন সময় ব্যাংক মুনাফার একটি অংশ ব্যাংকের অংশীদারদের মধ্যে বন্টন না করে তা ধরে রাখে, এটাকে অবিলিকৃত মুনাফা বলা হয়। এটাও ব্যাংকের তহবিল এর একটি উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।

খ) Bank’s Borrowed Fund (ব্যাংকের কর্জকৃত তহবিল)
যে তহবিল ব্যাংকের উৎসের বাইরে থেকে সংগ্রহ করা হয়, তাকে কর্জকৃত তহবিল বলে। এ তহবিল ব্যাংকের দায় হিসেবে বিবেচিত। কর্জকৃত তহবিলকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন-
১) Receiving Deposit বা আমানত গ্রহণ;
২) Borrowing from Other Banks বা অন্যান্য ব্যাংক থেকে ধার গ্রহণ; ও
৩) Other Sources বা অন্যান্য উৎস।

১) Receiving Deposit (আমানত গ্রহণ)
বাণিজ্যিক ব্যাংকের তহবিলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহ্যিক উৎস হচ্ছে আমানত গ্রহণ। ব্যাংক বিভিন্ন মেয়াদে (যথা- চলতি, সঞ্চয়ী, স্থায়ী) আমানত গ্রহণ করে থাকে, যা আমানতকারীরা এক সাথে তুলে নেয় না। ফলে ব্যাংক এ অর্থ ঋণ অথবা বিনিয়োগ হিসেবে ব্যবসায় খাটিয়ে মুনাফা অর্জন করে থাকে৷ ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ এর ৭ নং ধারা অনুযায়ী জনসাধারণের কাছ থেকে ব্যাংক এ আমানত গ্রহণ করে থাকে। বস্তুত জনসাধারণের এ আমানতই ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা সুদৃঢ় ও ও উন্নত করে।

২) Borrowing from Other Banks (অন্যান্য ব্যাংক থেকে ধার গ্রহণ)
বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো হতে ঋণ বা ধার নিতে পারে। আবার সিকিউরিটি বা ঋণপত্র বিক্রয় করেও মুদ্রাবাজার হতে তহবিল সংগ্রহ করে থাকে৷ এ ধরনের ধার হয় স্বল্পমেয়াদি।

৩) Other Sources (অন্যান্য উৎস)
প্রদেয় বিল তথা পেমেন্ট অর্ডার, ডিমান্ড ড্রাফটের অর্থও ব্যাংকের ব্যবহার যোগ্য ফান্ডের অন্যতম উৎস।

Leave a Reply