ব্যাংক তহবিলের ব্যবহার

0
841

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ ব্যাংক তার তহবিল সংগ্রহ করে তা অলস ভাবে ফেলে রাখার জন্য নয়। এ তহবিল ব্যবহার করে মুনাফা অর্জনই ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ইসলামী ব্যাংকসমূহও সঠিক নীতিমালার ভিত্তিতে এ তহবিল ব্যবহার করে মুনাফা অর্জনসহ আর্থিক অগ্রগতি ও সামাজিক কল্যাণ সাধন করে। সর্বাধিক নিরাপত্তা, অধিক তারল্য, আমানতকারীদের আস্থা ও মুনাফা অর্জন-এ নীতির ভিত্তিতে ব্যাংক তার তহবিল ব্যবহার করে থাকে। তার এ মুনাফার অংশ আমানতকারী ও শেয়ার হোল্ডারদের প্রদান করে থাকে। ব্যাংক তহবিলকে এমনভাবে বিনিয়োগ করে যাতে তারল্য ও বিনিয়োগের মধ্যে সমন্বয় সাধিত হয়। সাধারনত দুই ধরনের সম্পদে তহবিল বিনিয়োগ করতে হয়। যথাঃ-
ক) Non-Earning Assets বা অলাভজনক সম্পদ; ও
খ) Earning Assets লাভজনক সম্পদ।

ক) Non-Earning Assets (অলাভজনক সম্পদ)
ব্যাংক তার পুরো তহবিল লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করতে পারে না। কিছু নিয়ম-নীতি মেনে তাকে তহবিল ব্যবহার করতে হয়। বিনিয়োগের আগে ব্যাংকে তারল্য সংরক্ষণ করতে হয়। আর এ তারল্য সংরক্ষণ করতে যে সম্পদ ব্যাংক রেখে দেয়, তাকে লাভজনক সম্পদ বলে। এ সম্পদ দুই ধরনের হয়ে থাকে। যথা-
১) Cash Balance বা নগদ স্থিতি; ও
২) Capital Asset বা মূলধন সম্পদ।

১) Cash Balance (নগদ স্থিতি)
ব্যাংকের নগদ স্থিতি থেকে কোন প্রকার লাভ আসে না। বরং ব্যাংককে তার নিরাপত্তা বিধানের জন্য অর্থ ব্যয় করতে হয়। নগদ টাকা তরল সম্পদ হিসেবে পরিচিত। ব্যাংক তার তরল সম্পদ বা নগদ স্থিতি তিনভাবে সংরক্ষণ করে থাকে। যেমন-
i) Cash Reserve বা নগদ সংরক্ষণ;
ii) Bangladesh Bank Reserve বা বাংলাদেশ ব্যাংকে স্থিতি; ও
iii) Other Bank Reserve বা অন্যান্য ব্যাংকে স্থিতি।

i) Cash Reserve (নগদ সংরক্ষণ)
আমানতকারীদের চাহিদা মেটাতে ব্যাংককে তার ভল্টে নগদ অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়। এটা থেকে কোন মুনাফা আসে না। চলতি দায় মেটানোর জন্য এ সংরক্ষণ ব্যাংক তার অভিজ্ঞতার আলোকে করে থাকে। দৈনন্দিন গ্রাহক চাহিদা পূরণ করতে এ নগদ অর্থ ব্যাংকের জন্য অপরিহার্য।

ii) Bangladesh Bank Reserve (বাংলাদেশ ব্যাংকে স্থিতি)
বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংক তার অর্থের একটি অংশ সংরক্ষিত রাখতে বাধ্য থাকে। এ সংরক্ষণ আবার দু’ধরনের হয়ে থাকে। যথা-
a) Cash Reserve Ratio বা ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও; ও
b) Statutory Liquidity Reserveবা বিধিবদ্ধ তরল স্থিতি।

a) Cash Reserve Ratio (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও)
ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ এর ২৫ আর্টিকেল অনুযায়ী প্রতিটি তফসিলি ব্যাংক তার মোট মেয়াদি ও তলবি বা চাহিবামাত্র দায়ের (Time and Demand Liabilities) একটি নির্দিষ্ট অংশ বাংলাদেশ ব্যাংকে বা তার প্রতিনিধিত্বকারী ব্যাংকে নগদ আকারে জমা রাখতে বাধ্য। বর্তমানে এ হার ৫.৫%। এ রিজার্ভ ব্যাংকের তারল্য সংকট নিরসন করে থাকে এবং আমানতকারীদের দাবি তাৎক্ষণিক পূরণ করতে সহায়তা করে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও সময় সময় পরিবর্তন করে থাকে। ২০০৫ সালের ০১ অক্টোবর থেকে তফসিলী ব্যাংকসমূহ কর্তৃক বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিতব্য এ নগদ জমার হার কার্যকর আছে। উল্লেখ্য, ব্যাংকসমূহ গড়ে দ্বি-সাপ্তাহিক ভিত্তিতে শতকরা ৫.৫ ভাগ নগদ তহবিল সংরক্ষণ করে থাকে।

b) Statutory Liquidity Reserve (বিধিবদ্ধ তরল স্থিতি)
ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ এর ধারা মতে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোকে ১৮.৫ শতাংশ এসএলআর হিসেবে রাখার বিধান রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে নগদে রাখতে হয় ৫.৫ শতাংশ। বাকি ১৩ শতাংশ সরকারি বিল বা বন্ড কিনতে হয়। এটাকে বিধিবদ্ধ তরল সঞ্চয় বলে। অন্যান্য ব্যাংকের মতো ইসলামী ব্যাংকসমূহ যেহেতু কোনো সিকিউরিটি পেপার করতে পারে না, তাই তাদেরকে নগদ আকারেই এসএলআর সংরক্ষণ করতে হয়। তবে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বেলায় তা ১৮.৫০ শতাংশের পরিবর্তে নগদ আকারে ১১.৫০ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে ইসলামী ব্যাংকগুলোকে সিআরআর হিসেবে ৫.৫% এবং এসএলআর হিসেবে ৬% সহ মোট ১১.৫০ শতাংশ নগদ আকারে রিজার্ভ সংরক্ষণ করতে হয়। তরল সম্পদ সংরক্ষণের আবশ্যকীয় হার ০১ অক্টোবর ২০০৫ থেকে কার্যকর রয়েছে।

iii) Other Bank Reserve (অন্যান্য ব্যাংকে স্থিতি)
ব্যাংকসমূহ তার উদ্বৃত্ত তহবিল বিভিন্ন ব্যাংকে চলতি হিসাবে জমা রাখে। নানাবিধ কারণে এ জমার প্রয়োজন হয়। এটাও তরল সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে।

২) Capital Asset (মূলধন সম্পদ)
ব্যাংক যে তহবিল দালানকোঠা, আসবাবপত্র, গাড়ি ও অন্যান্য স্থায়ী প্রকৃতির সম্পদ বা জিনিসে বিনিয়োগ করেছে, তাকে মূলধন সম্পদ বলে। তবে এগুলোকে অলাভজনক হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এগুলো একেবারে অলাভজনক নয়।

খ) Earning Assets (লাভজনক সম্পদ)
লাভজনক সম্পদ বলতে সেইসব সম্পদকে বুঝানো হয় যাতে তহবিল বিনিয়োগ করলে মুনাফা অর্জিত হয়ে থাকে। ব্যাংক ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন করা। অন্যান্য ব্যাংক মুনাফা অর্জনের জন্য সাধারণত স্বল্পমেয়াদি ধার হিসেবে বা কলমানি হিসেবে অর্থ ধার দিয়ে থাকে। সাধারণত সাত দিনের জন্য এ ধার দেয়া হয় এবং বাজারের চাহিদা ও সরবরাহ মোতাবেক এর সুদ নির্ধারিত হয়। তাছাড়া স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বিল, বাংলাদেশ ব্যাংক সঞ্চয়পত্র, প্রতিরক্ষা সঞ্চয়পত্র, প্রাইজ বন্ড, আয়কর বন্ড, সরকারি বা আধা-সরকারি সিকিউরিটিজ, অন্যান্য আমানত, জয়েন্ট স্টক কোম্পানির শেয়ার ও ডিবেঞ্চার ইত্যাদিতে ব্যাংক তার তহবিল বিনিয়োগ করে থাকে। অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকসমূহে এ ধরনের সুদনির্ভর খাতে তার তহবিল খাটাতে পারে না। তাই ইসলামী ব্যাংকসমূহের একমাত্র খাত হলো সরাসরি বিনিয়োগ। বিনিয়োগ তহবিল খাটিয়ে ব্যাংক মুনাফা অর্জন করে থাকে।

Leave a Reply