বিদ্যমান আইনেই খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব

0
1955

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ কথায় আছে, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ শ্রেয়তর। কিন্তু আমাদের দেশে ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে প্রতিরোধ কিছুটা থাকলেও, কোনো প্রতিকার যেন একেবারেই নেই। তাই প্রতিবছরই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। ঋণখেলাপিদের দমনে সরকার, আইন, প্রশাসন সবই যেন কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই। ব্যাংকের ডকুমেন্টেশন, তদারকি ব্যবস্থা সবই যেন ব্যর্থ আস্ফালন। কিন্তু ব্যাংকারের বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই, ঋণ আদায়ে ঘাম ঝরানো, জুতার তলা ক্ষয় করা চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হয় প্রতিনিয়ত। খেলাপি গ্রাহকের পেছনে দৌড়ে ক্লান্ত ব্যাংকার। শেষতক আইনের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। মামলা করার সিদ্ধান্ত নিলেন প্রধান কার্যালয়ের অনুমতি সাপেক্ষে গ্রাহকের জামানতের চেক ব্যাংকে উপস্থাপন করলেন।

তহবিল অপর্যাপ্ততার কারণে চেক বাউন্স হলে খেলাপি গ্রাহককে আইনি নোটিস পাঠালেন। ঋণখেলাপি গ্রাহকের নির্লিপ্ত আচরণে বাধ্য হয়ে আইনের আশ্রয় নিলেন শাখা ব্যবস্থাপক। ‘দ্য নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাক্ট, ১৮৮১’-এর ১৩৮ ধারায় মামলা রুজু করলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। মামলা আমলে নেওয়ার পর, যথারীতি মামলাটি বদলি হয় দায়রা আদালতে। একটি টাকা আদায় না হওয়া সত্ত্বেও অজানা সব কারণে একের পর এক শুনানির দিন ধার্য হয়। পাশাপাশি খেলাপি গ্রাহকের সঙ্গে ব্যাংকারের আপস-মীমাংসার চেষ্টা চলে প্রতিনিয়ত। বিনয়ের সঙ্গে চলে অনুরোধ ‘ভাই! মামলাটি কিন্তু শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে, যে কোনো দিন রায় হয়ে যেতে পারে। আপনি কিছু টাকা জমা করেন। তাহলে আদালত হয়তো আপনাকে আরও কিছুদিন সময় মঞ্জুর করতে পারে।’

দিন যায়, আর মামলার বয়স বাড়তে থাকে। প্রায় দুই বছর পর মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য হয়। অদৃশ্য কারণে সাক্ষ্য গ্রহণের দিনে ব্যাংকের আইনজীবীর ব্যস্ততাও যেন বেড়ে যায়, ‘ম্যানেজার ভাই, আমার আরেকটি আদালতে শুনানি আছে। আপনার মামলার আদালত বসতে দেরি হবে। আমি এই ফাঁকে অন্য আদালতের শুনানি শেষ করে আসছি।’ বাদী ম্যানেজারের অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও আটকানো গেল না আইনজীবী সাহেবকে। যথারীতি ব্যাংকের মামলার ডাক পড়ল। কিন্তু হায়, বাদী ব্যাংকের আইনজীবীই যে আদালতে উপস্থিত নেই! সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য বাদী ব্যবস্থাপক কাঠগড়ায় দাঁড়ালে শপথ বাক্য পাঠ শেষে বিচারক জানতে চাইলেন, ‘আপনার আইনজীবী কোথায়?’ ম্যানেজার: ‘জি, উনার অন্য আদালতে শুনানি আছে।’ বিচারক: ‘আপনি কি একা বলতে পারবেন সবকিছু?’ ম্যানেজার: ‘জি, পারব।’

অমনি খেলাপি গ্রাহকের আইনজীবী তেড়ে এসে আছড়ে পড়লেন বাদী ম্যানেজারের ওপর ‘এই চেক কে লিখেছে? আমার মক্কেল এই চেক ব্যাংককে দেননি। আপনি জালিয়াতি করে এই চেকে বেশি টাকার অঙ্ক বসিয়েছেন, আপনি প্রতারণা করেছেন!’ ম্যানেজার যা বলার সব ঠিকঠাক বলে সাক্ষ্য শেষ করলেন। ভাবতে লাগলেন, ‘খেলাপি হওয়া সত্ত্বেও যে গ্রাহককে কখনও কটু বাক্যটি পর্যন্ত করিনি, বিনয়ের সঙ্গে ঋণের টাকার তাগিদ দিয়েছি, সেই গ্রাহকেরই আইনজীবী আমাকেই বলছে প্রতারক! কী বিচিত্র এই দেশ! জনগণের টাকা আত্মসাৎকারী ঋণখেলাপিকে সম্মানিত করে জনগণের অর্থ আদায়ে অনড় ব্যাংকারকে অপদস্থ করার কী হীন প্রচেষ্টা! ঋণের পক্ষে-বিপক্ষে কোনো দলিল না চেয়ে, উল্টো ব্যাংকার তথা বাদী ব্যাংকের দাবিকেই অসত্য প্রমাণের অপচেষ্টা। দুষ্টের লালনে আর শিষ্টের দমনে কী চমৎকার আইনি দাবা খেলা। সত্যিই সেলুকাস…!’

অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে চেক গ্রহণ করার বিরুদ্ধে অনেককেই খুব সোচ্চার দেখা গেছে। তাছাড়া ‘দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্র–মেন্ট অ্যাক্ট, ২০১৮’ (সংশোধিত)-এর খসড়ায় প্রচলিত আইনের ১৩৮ ধারা সংশোধন করে ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে কোনো ব্যাংক চেক না রাখার বিধানসহ জরিমানার পরিমাণ তিন গুণ থেকে কমিয়ে দ্বিগুণ এবং কারাদণ্ডের মেয়াদ এক বছর থেকে কমিয়ে ছয় মাস করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই সংশোধনী কার্যকর হলে তা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায় প্রক্রিয়াকে কঠিন ও বাধাগ্রস্ত করবে নিঃসন্দেহে।

এমনিতেই ঋণখেলাপিরা দেশের ব্যাংকিং খাতকে অক্টোপাসের মতো গিলে খাচ্ছে। এসব অক্টোপাসের গলা চেপে ধরার বদলে আমরা যেন তাদের এই সমূলে গিলে খাওয়ার রাক্ষসী বাসনাকে আরও উৎসাহ দিতেই ব্যস্ত। এই উল্টো চলার নীতির কারণেই ঋণখেলাপি সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে।

অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা অপ্রতুল এবং মামলা নিষ্পত্তিতে কালক্ষেপণ হয় বলে ব্যাংকাররা চেক ডিজঅনার করিয়ে ফৌজদারি আদালতে ক্রিমিনাল কেইস ফাইল করেন, যা অর্থঋণ আদালতের মামলার চেয়ে দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। কিন্তু অনেক ম্যাজিস্ট্রেট আদালতও ব্যাংকের চেকের মামলা নিতে নারাজ হন। তাদের মতে, ব্যাংকের ঋণ আদায়-সংক্রান্ত মামলা অর্থঋণ আদালতেই দায়ের করা উচিত।

বর্তমান আইনে যেহেতু বাধা নেই, ব্যাংক ফৌজদারি এবং দেওয়ানি দুই আদালতেই মামলা দায়ের করতে পারে। ফৌজদারি বা দেওয়ানি যে আদালতেই মামলা করা হোক না কেন, ব্যাংকের উদ্দেশ্য একটাই অনাদায়ী পাওনা আদায়। তাই কোন আদালতে মামলা করা হয়েছে, তা না দেখে মামলার উদ্দেশ্য দেখা উচিত। আর এই বিভাজন যদি করতেই হয়, তাহলে ব্যাংকের অর্থ আদায়ে দীর্ঘদিনের দাবি ব্যাংকের জন্য নিম্ন আদালতে আলাদা অর্থঋণ আদালত এবং উচ্চ আদালতে আলাদা বেঞ্চ গঠন করতে হবে; যা শুধু ব্যাংকের মামলাই পরিচালনা করবে। ব্যাংকের মামলার জন্য ঋণের মঞ্জুরিপত্র এবং হিসাবের বিবরণীর ওপর ভিত্তি করেই রায় দিতে করতে হবে। ঋণ খেলাপকে জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করতে হবে।

বর্তমানে চেকের মামলায় তিন গুণ পর্যন্ত জরিমানা এবং জেল দেওয়ার বিধান আছে। আদালত সাধারণত চেকের দাবির কাছাকাছি অর্থই জরিমানা করে কিংবা জেলসহ উভয় দণ্ড দেয়। কিন্তু কোনো খেলাপি যদি আদালতের কাছে তার ব্যাংকঋণ অস্বীকার করে কিংবা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে আদালতের সময় নষ্ট করে, কিংবা আদালতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে, তাহলে ফৌজদারি কিংবা দেওয়ানি যে আদালতেই মামলা করা হোক না কেন, ব্যাংকের দাবির তিন গুণ জরিমানা আরোপ করাসহ কমপক্ষে তিন বছর কারাদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আদালতের সব আদেশ বা রায় কার্যকর করে পুলিশ প্রশাসনকে প্রতিবেদন প্রদানে বাধ্য করতে হবে। মামলা দীর্ঘায়িত করার জন্য এক লাখ টাকার খেলাপিরাও হাইকোর্টে রিট করে বসে। তাই আইন করতে হবে পাঁচ কোটি টাকার ঊর্ধ্বের খেলাপিরাই কেবল হাইকোর্টে রিট করতে পারবে, অন্যদের নিম্ন আদালতের রায়ই মেনে নিতে হবে।

বর্তমান আইনি কাঠামোতে খেলাপি ঋণ থাকলে কোনো ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারে না। এর ফলে খেলাপি প্রার্থীরা নির্বাচনের আগে যৎসামান্য ডাউন পেমেন্ট দিয়ে তাদের খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করিয়ে তার সিআইবি স্ট্যাটাস স্ট্যান্ডার্ড করিয়ে নেয়। নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে সেই ব্যাংকের দিকে পিঠ ঘুরিয়ে দেয়। তাই আইন হতে হবে এমন যে, জনপ্রতিনিধিরা খেলাপি হলে তাদের সাংবিধানিক পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত বা বাতিল হয়ে যাবে।

আমাদের দেশে ছিঁচকে চোর বা ছিনতাইকারী ধরা পড়লে গণপিটুনির শিকার হয়। এ বহু উদাহরণ আছে। কিন্তু হাজার কোটি টাকা লুটেরা ঋণখেলাপিদের অনেক ক্ষেত্রেই মাথার তাজ করে রাখি। তাই ব্যাংকারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বুক ফুলিয়ে সমাজে বিচরণ করছে তারা। বিভিন্ন রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক, সামাজিক, ধর্মীয় কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব খেলাপিকে কর্তাব্যক্তির ভূমিকায় দেখা যায়। এ ধারাবাহিক আস্কারায় ঋণ খেলাপ করা ঋণগ্রহীতার অধিকার হয়ে গেছে, যেমনটা নিয়ম হয়ে গেছে নির্লজ্জ হাত পেতে ঘুষ গ্রহণ, আর দুর্নীতি যেমন ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। তাই প্রতিকার যদি আমরা সত্যিই চাই, তাহলে খেলাপিদের বিরুদ্ধে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তন করতে হবে, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এদের বিরুদ্ধে। আমরা দেখতে চাই, রাজাকারদের দিকে যেমন আঙুল তুলে বলা হয় ‘তুই রাজাকার’, ঠিক তেমনি দেশের কোটি জনতার আঙুল এসব খেলাপির দিকে তুলে বলতে হবে ‘তুই খেলাপি, তুই চোর, তুই ডাকাত!’

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বয়কট করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে কয়েকটি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এগুলো হলো
এক. নতুন করে আত্মীয়তা না করা,
দুই. রাজনৈতিক (তৃণমূল পর্যন্ত), ব্যবসায়িক (এফবিসিসিআইসহ বণিক সংগঠন), ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা,
তিন. বিভিন্ন ব্যবসায়িক বা পেশাগত সনদ বা ছাড়পত্র যেমন ট্রেড লাইসেন্স, আইআরসি, ইআরসি, টিআইএন, ভ্যাট, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রভৃতি ইস্যু না করা এবং নবায়ন না করা,
চার. ভিআইপি, সিআইপি, ভিভিআইপি প্রভৃতি স্ট্যাটাস বাতিল করা এবং কোনো খেলাপি যেন নতুন করে এ স্ট্যাটাস না পায়, তা নিশ্চিত করা,
পাঁচ. বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে খেলাপিদের নাম-ঠিকানা প্রিন্ট ও টেলিমিডিয়ায় প্রচার করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক তথা সব ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে সার্বক্ষণিক প্রদর্শন করা,
ছয়. বিদেশ পলায়ন প্রতিহত করণে পাসপোর্ট বাতিল করা, ইস্যু না করা এবং নবায়ন না করা,
সাত. হজ আবেদন মঞ্জুর না করা,
আট. ক্লিন সিআইবি রিপোর্ট ছাড়া জমিজমা বা ইমারত কেনাবেচা এবং যে কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পাদন নিষিদ্ধকরণ,
নয়. খেলাপিরা যদি চাকরিজীবী হন, তাহলে তাদের বেতন স্থগিত করা কিংবা বেতনের টাকা সংশ্লিষ্ট ঋণদাতা ব্যাংকে জমা প্রদান,
দশ. কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে বিদেশে পলায়নকৃত খেলাপিদের দেশে আনার ব্যবস্থা করা,
এগারো. যে কোনো ঋণের জন্য এবং সরকারি, ব্যবসায়িক, করপোরেট লাইসেন্স কিংবা রেজিস্ট্রেশনের জন্য ক্লিন সিআইবি রিপোর্ট বাধ্যতামূলক করা,
বারো. ভিক্ষুকদের ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের উপরের স্তরে সামাজিক মর্যাদা দেওয়া।

খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে ব্যাংকিং কমিশন গঠনেরও জোর দাবি উঠেছে। কিন্তু কী লাভই-বা হবে এই কমিশন গঠনে। কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হবে না কখনোই। অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ পড়লে মনে হয় খেলাপিদের বাঁচার কোনো পথ নেই। কিন্তু বাস্তবায়নের অভাবে এ আইনটিও খেলাপিদের জন্য নির্বিষ সর্পে পরিণত হয়েছে দংশন করবে, রক্তপাত হয়তো কিছুটা হবে, কিন্তু ব্যথা হবে না, প্রাণনাশ তো প্রশ্নাতীত। তাই ঋণ খেলাপের বিরুদ্ধে সরকারের সদিচ্ছা, দৃঢ় প্রত্যয়, কঠোর মনোভাব আর প্রতি ক্ষেত্রেই আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বর্তমান আইনি কাঠামোতেই খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

লেখকঃ মোশারফ হোসেন, ব্যাংক কর্মকর্তা

Leave a Reply