দেশের সেরা অস্বচ্ছল ১০ ব্যাংক

0
5906

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ দেশে দশটিরও বেশি ব্যাংক এখন অসচ্ছল। এই ব্যাংকগুলো এতটাই দৈন্য অবস্থায় পড়েছে যে, মূলধনও খেয়ে ফেলছে। এরমধ্যে অর্ধডজন ব্যাংককে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে জনগণের করের টাকায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, এতদিন এই ব্যাংকগুলোয় বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ছিল, যা দিয়ে ব্যাংকগুলো দৈনন্দিন কাজে ব্যয় করার পরও মুদ্রাবাজারে টাকা ধার দিয়ে আয় করতে পারতো। কিন্তু উল্টো ধার করে চলছে। বিষয়টি উঠে আসে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুছ ছালাম আজাদের এক চিঠিতে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে দেওয়া ওই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘বেঁধে দেওয়া সুদহার কার্যকর করতে গিয়ে জনতা ব্যাংকের ২ হাজার ৬১২ কোটি টাকার আমানত হ্রাস পেয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, মানি মার্কেট থেকে কললোন ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অ্যাসিউরড লিকুইডিটি সাপোর্ট (এএলএস) ও রেপোর মাধ্যমে কর্জ (ধার) করে প্রয়োজনীয় সিআরআর সংরক্ষণ করতে হচ্ছে জনতা ব্যাংককে। শুধু জনতা নয়, চরম খারাপ অবস্থায় আছে রাষ্ট্রায়ত্ত সব ক’টি ব্যাংক। এই ব্যাংকগুলোকে মূলধন জোগান দিয়েও অবস্থার উন্নতি ঘটানো যাচ্ছে না।

এদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০১৮ সালের জুন প্রান্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনিয়মের মাধ্যমে দেওয়া ঋণ আদায় না হওয়ায় মূলধন খেয়ে ফেলছে সরকারি-বেসরকারি ১০ ব্যাংক। এই বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে এসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি হয়েছে ২৫ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি খাতে রয়েছে সাতটি ও বেসরকারি খাতে রয়েছে তিনটি ব্যাংক।

আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, শুধু সরকারি ব্যাংকই নয়, বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর অনিয়ম-দুর্নীতির বোঝাও এখন সরকারকে বইতে হচ্ছে। তারা বলছেন, অনিয়মে ডুবতে থাকা ফারমার্স ব্যাংকের শেয়ার কিনতে হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতার মতো ব্যাংকগুলোকে। অথচ এসব ব্যাংক নিজেরাই রয়েছে মূলধন ঘাটতিতে।

প্রসঙ্গত, বর্তমানে ব্যাংকগুলোকে ৪০০ কোটি টাকা অথবা ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশের মধ্যে যেটা বেশি, সেই পরিমাণ অর্থ মূলধন হিসাবে সংরক্ষণ করতে হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সাতটি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ২৩ হাজার ২৭০ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি ঘাটতিতে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। এই ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি আট হাজার ৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। মূলধন ঘাটতির দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সোনালী ব্যাংক। এই ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ছয় হাজার ৬০১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এছাড়া বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি রয়েছে তিন হাজার ১০৬ কোটি ২২ লাখ, জনতা ব্যাংকের দুই হাজার ১৯৫ কোটি ২৫ লাখ, অগ্রণী ব্যাংকের এক হাজার ৪১৯ কোটি ২৯ লাখ, রূপালী ব্যাংকের এক হাজার ২৯৩ কোটি ১৯ লাখ এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) ৬৪৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে।

বেসরকারি খাতের তিন ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮৭২ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এরমধ্যে আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি এক হাজার ৫২৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৩০১ কোটি ৯৯ লাখ এবং সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের (এসআইবিএল) ৪৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘প্রতিবছরই বাজেট থেকে ব্যাংকগুলোকে মূলধন জোগান দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘জনগণের করের টাকায় এভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানকে মূলধন সরবরাহ করা ঠিক নয়। তার মতে, সরকারের এই উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা এবং দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে।’

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের আর্থিক বিবৃতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯ সালের পর থেকে এমন কোনও বছর নেই, যে বছর মূলধন বাবদ ব্যাংকগুলোকে টাকা দিতে হয়নি। ২০০৯-১০ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত ৮ বছরে দেওয়া হয়েছে ১৪ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরকারি ব্যাংকগুলোকে দেওয়া হয়েছে এক হাজার ৮৫০ কোটি টাকা।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এ সংক্রান্ত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে ২০১৫-১৬ পর্যন্ত আট বছরের মধ্যে ৭ বছরই পুনঃমূলধনের নামে ব্যাংকগুলোকে দেওয়া হয়েছে ১১ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা, যা ক্রমবর্ধমান রাজস্ব আয়ের ১০ দশমিক ৮ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে সিপিডি’র ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে যেভাবে টাকা দেওয়া হচ্ছে, এটা না করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য তথা সামাজিক খাতে যদি টাকাগুলো খরচ করা যেতো, তাহলে দেশ অনেক বেশি উপকৃত হতো।’

তবে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান-বিআইডিএসের গবেষক ও অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত মনে করেন, সরকারি সেবার বিপরীতে এই ব্যাংকগুলো ফি নেওয়া শুরু করলে মূলধন পুনর্গঠনে বাজেট থেকে কোনও টাকা নিতে হবে না। তিনি বলেন, ‘সরকারি ব্যাংকগুলো আগের চেয়ে এখন অনেকটা ভালো করছে। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো সরকারের কাছ থেকে এভাবে আর টাকা নিতে হবে না।’

জানা গেছে, ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে সোনালী ব্যাংকে হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ও জনতা ব্যাংকে বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারিতে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ দুই প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ সুবিধা দিতে গিয়ে ডুবতে বসেছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। প্রতিষ্ঠান দু’টি হলো ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও অ্যানন টেক্স গ্রুপ। ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে ইতোমধ্যে ব্যাংকটির পুরান ঢাকার ইমামগঞ্জ ও মোহাম্মদপুর করপোরেট শাখার বৈদেশিক ব্যবসার লাইসেন্স (এডি লাইসেন্স) বাতিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই দুই শাখায় এলসি খোলাসহ বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার কারণে সংকটে পড়েছে পুরো ব্যাংকটি। এর ফলে টাকা ধার করে ও মূলধন ভেঙেই এখন দৈনন্দিন কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে ব্যাংকটির।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। আর অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ যোগ করা হলে খেলাপি ঋণ দাঁড়াবে এক লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। আলোচিত সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ এসব ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের ১৩ ব্যাংক। এসব ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। যার সিংহভাগই রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের।

Leave a Reply