ব্যাংকিং এ শরীয়াহ: প্রসঙ্গ আমানত

0
2648

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ মানুষের প্রাত্যাহিক জীবনের আর্থিক ব্যবস্থাপনার সাথে ব্যাংকের সম্পর্ক এখন অনেক নিবিড়। ব্যাংক মানেই যে আর্থিক লেনদেনের ব্যাপার তা এখন মানুষ মাত্রই বুঝে। ব্যাংক ছাড়া ব্যক্তি, সমাজ, জাতীয় এবং আর্ন্তজাতিক ব্যবসা বাণিজ্য এবং অর্থনীতি অচল। আমাদের দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা পৌনে দু’শ বছর বৃটিশ উপনিবেশবাদের উত্তরাধিকার। যার মৌলনীতি এবং মূলভিত্তি সূদ। ফলে আবহমানকাল থেকে একটা ধারণা জনমনে বদ্ধমূল যে, সুদ ছাড়া ব্যাংক চলে না। এমতাবস্থায় পূর্বে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা সাধারণত ব্যাংক এড়িয়ে চলতেন। একান্ত বাধ্য হয়ে কেউ ব্যাংকে হিসাব খুললেও “সুদ নিবেন না” মর্মে ঘোষণা দিয়ে রাখতেন। কেউ কেউ আবার হিসাবে জমা হওয়া সূদ গরীব মিসকীনদের মাঝে বন্টন করে দিতেন। এখনো হয়তো অনেকে তাই করেন। এহেন প্রেক্ষাপটেই গত শতাব্দির আশির দশকে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের যাত্রা শুরু। পবিত্র কুরানের সূরা বাকারার ২৭৫ নং আয়াতাংশ “আর আল্লাহ ব্যবসাকে করেছেন হালাল এবং সুদকে করেছেন হারাম” এর আলোকে সূদকে পরিহার এবং ব্যবসাকে ধারণ করে দেশের মানুষকে সুদের অভিশাপ মুক্ত করতেই সেদিন গোড়াপত্তন হয়েছিল ইসলামী ব্যাকিং ব্যবস্থার। কল্পনা থেকে বাস্তব এবং বাস্তব থেকে সফলতার মহাসড়কে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ব্যাপ্তি যা এখন জাতীয় পরিমন্ডল পেরিয়ে আন্তজার্তিক পরিমন্ডলেও দ্যুতি ছড়াচ্ছে।

বিভ্রান্তি যুগে যুগে: ইসলামের আলোয় আলোকিত হবার আগে আরবরা সুদী অর্থ ব্যবস্থার সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল। আর তাই পবিত্র কুরানের সুদ নিষিদ্ধ এবং ব্যবসায়ের বৈধতা সংক্রান্ত বিষয়ক আয়াত নাযিল এবং এতদসংক্রান্ত নবী করিম (সা:) নির্দেশনামূলক বক্তব্যে ধাক্কা খাওয়া আরবরা বলাবলি করছিল যে “ব্যবসা আর সূদ তো একই”। এ যুগের সুদ খোররাও সে পার্থক্য বুঝতে চায় না। আসলে এরা বুঝেও না বুঝার ভান করে। কেননা দু’টির মধ্যে সম্পর্ক দিন ও রাতের মত। একটা থাকলে অন্যটা থাকবে না। আল্লাহ তায়ালা এর যে জবাব সে যুগে দিয়েছেন তা আজও যুগপৎভাবে প্রযোজ্য। আল্লাহ বলেন “যারা সুদ খায়, তারা ক্বিয়ামতের দিন দাঁড়াবে ঐ ব্যক্তির মত, যার উপরে শয়তান আছর করে উদ্ভ্রান্ত করে দেয়। তাদের এমন অবস্থা হবার কারণ এই যে, তারা বলে, ব্যবসা তো সূদের মতই” –[বাক্বারাহ-২৭৫]।

আমাদের দেশের দ্বীনি শিক্ষা ব্যবস্থার কোন ধারায়ই আধুনিক অর্থনীতি এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ইসলামী দৃষ্টিকোণ সম্পর্কে জানার সুযোগ একেবারেই নেই। জানার সুযোগ নেই এ ক্ষেত্রে সর্বশেষ গবেষণা এবং প্রয়োগের ফলাফল সম্পর্কেও। ফলে শুধুমাত্র প্রচলিত ধারণার উপর ভিত্তি করে সাধারণ মানুষ যেমন বিভ্রান্তিতে ভুগেন তেমনি দ্বীনি শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রিধারীগণও এর বাইরে থাকেন না। বেশীর ভাগ মানুষের চিন্তা অনুমান নির্ভর নানা প্রশ্ন এবং খটকায় ঘোরপাক খায়। প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা না নিয়েই কেউ কেউ আবার নানা মাধ্যমে বলে এবং লিখে প্রকাশ করেন নিজেদের অভিমত। এতে বিভ্রান্তি আরো ডালাপালা ছড়ায়।

ব্যাংকের কাজ: ব্যাংকের প্রধান কাজ জনগণ থেকে আমানত সংগ্রহ করা এবং তা লাভের উদ্দে্শ্যে ব্যবসায় খাটানো। ব্যাংক যাদের সাথে লেনদেন করে তাদেরকে গ্রাহক বলে । গ্রাহক আবার কয়েক প্রকারের হয়-

এক) আমানতকারী (DEPOSITOR): এরা চলতি, সঞ্চয়ী, ফিক্সড/মেয়াদী এবং মাসিক ভিত্তিক জমা মেয়াদী হিসাবের মাধ্যমে বাংকের তহবিলের যোগান দিয়ে থাকে। এরাই ব্যাংকের সামর্থের মূল পাটাতন, মূল শক্তির যোগানদাতা। কারণ ব্যাংকের ব্যবসায়িক সার্মথ তৈরীই হয় জনসাধারণের আমানত থেকে।

দুই) ঋণ/বিনিয়োগ গ্রাহিতা (CREDITOR): এরা ব্যাংক থেকে ব্যবসা, শিল্প এবং ব্যক্তি খাতে ব্যাংকে থেকে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করে থাকে। ব্যাংক সমূহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পালনীয় নীতিমালার ভেতর তাদের নিজ নিজ নিয়ম পদ্ধতিতে গ্রাহকদের পূজিঁ সরবরাহ করে থাকে।

তিন) আমদানী/রফতানি কারক: বর্হিবিশ্বের সাথে যারা ব্যবসা বাণিজ্য করেন তারা এই শ্রেণিভূক্ত। নির্ধারিত চার্জ/ফি এর বিনিময়ে এরা বিদেশে থেকে পণ্য আমদানী অথবা দেশের পণ্য বিদেশে রফতানী করেন। এই শ্রেণীর গ্রাহককেও ব্যাংকে হিসাব পরিচালনা করতে হয়। এদের কেউ কেউ আবার বিনিয়োগ/সিসি গ্রাহকও থাকেন যারা আমদানী/রফতানিতে ব্যাংক থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে থাকেন।
চার) ভাসমান (FLOATING) গ্রাহক: এরা ঐ শ্রেণীর লোক যারা ব্যাংকে সাধারণত: হিসাব পরিচালনা করেন না; তবে ব্যাংকিং সেবা নিয়ে থাকেন। যেমন বৈদেশিক রেমিটেন্সের উপকারভোগী, ডিমান্ড ড্রাফ্ট/পেমেন্ট ওর্ডার ক্রেতা ইত্যাদি। তারাও এ শ্রেণীর গ্রাহক যারা এক শাখা থেকে অন্য শাখার হিসাবে টাকা প্রেরণ করেন; কিন্তু নিজের একাউন্ট নেই ।

বর্ণিত চার প্রকার গ্রাহকের মাধ্যে প্রথম তিন শ্রেণীর গ্রাহকদের সাথে শরীয়ার নীতি অনুসরণের বাধ্যবাধকতার মধ্যেই পরিচালিত হয় ইসলামী ব্যাংকিং। চতুর্থ পর্যায়ের গ্রাহকগণ শুধুমাত্র সেবা গ্রহণ করেন নির্ধারিত চার্জের বিনিময়ে। তারা ব্যাংকে আমানতও রাখেন না এবং ব্যাংক হতে ঋণও নেন না। ফলে এসব সেবায় সূদ/মুনাফা হালাল/হারামের প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক নয়। এসব সেবা প্রচলিত ব্যাংক এবং ইসলামী ব্যাংক নির্বিশেষে নিয়ম নীতি একই। তবে “যে বিষয়ে হারাম হবার প্রকাশ্য নস নেই তা হালাল”-শরীয়ার এই নীতি আলোকে এসব সেবা কমপক্ষে মুবাহ’র মর্যাদাপ্রাপ্ত তো বটেই।

সুদ বনাম মুনাফা: ঋণের শর্ত হিসেবে ঋণের উপর আরোপিত মূলধনের নিশ্চিত ও নির্ধারিত অতিরিক্ত যা কিছু তাই সুদ। তা নগদ টাকা কিংবা ভোগ্য পণ্যই হোক না কেন। আবার তা তাৎক্ষণিক বিনিময় কিংবা বিলম্বে প্রদেয় হোক না কেন। অপরদিকে মুনাফা হচ্ছে বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রাপ্ত সম্পদের অনিশ্চিত বর্ধিত মূল্য।

সূদী ব্যাংকে সূদ যেমনে: সূদী ব্যাংক আমানতকারীকে সুদ প্রদানের শর্তে আমানত গ্রহণ করে। সেই আমানত আবার সুদের ভিত্তিতে ঋণে খাটায়ে সংগৃহীত সুদ আমানতকারীকে চুক্তি মোতাবেক পূর্ব নির্ধারিত হারে প্রদান করে। এভাবে জমাকারী, ব্যাংক এবং ঋণ গ্রহিতা সকলেই সুদের সাথে জড়িয়ে পড়ে। প্রসঙ্গত: সুদের সম্পর্ক ঋণের সাথে। প্রচলিত ব্যাংকিং পদ্ধতিতে আমানতকারী ব্যাংককে টাকা ঋণ দিয়ে জমাকৃত টাকার উপর অতিরিক্ত টাকা নেয়। আবার ব্যাংক ব্যবসায়ীকে নগদ টাকা ঋণ (সিসি) দেয় এবং তার উপর অতিরিক্ত আদায় করে আমানতকারীর সুদ সমন্বয় করে নিজেদের অংশ রাখে। ইসলামী শরীয়াত টাকাকে পণ্য হিসেবে গণ্য করে না। বরং টাকা পণ্য ক্রয় এবং উৎপাদনের মাধ্যম বলে গণ্য ইসলামী অর্থ ব্যবস্থায়। তাই টাকা ঋণ দিয়ে অতিরিক্ত আদায় টাকা বিক্রির ব্যবসা বলে গণ্য। আর সমজাতীয় পণ্যের বিনিময়ে উপরি আদায় নগদে যেমন সুদ (রিবা ফদল) তেমনি বাকীতেও (রিবা নাসিয়া) সুদ।

ইসলামী ব্যাংকে মুনাফা: ইসলামী ব্যাংক ইসলামী শরীয়ার নির্দেশিত পন্থায় লাভ–ক্ষতিতে অংশ গ্রহণের শর্তে আমানতকারীদের নিকট থেকে পূজিঁ সংগ্রহ করে থাকে। অত:পর হালাল ব্যবসায়- বাণিজ্যে ও শিল্প উদ্যোগে ব্যাংক নিজে অথবা আগ্রহী ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয়/ লাভ লোকসানে অংশিদারীমূলক পূজিঁর যোগান দিয়ে থাকে। এসব ব্যবসা-বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্জিত মুনাফার চুক্তি নির্ধারিত অংশ ব্যাংক এবং আমানতকারীর মধ্যে বন্টিত হয়। তবে ঘটিত লোকসানের দায়ভার আমানতকারী (সাহিবুল মাল) একক ভাবে গ্রহণ করেন। প্রথম পর্যায়ের গ্রাহক তথা আমনতকারীগণ যখন কোন ইসলামী ব্যাংকে আসেন তখন তাকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে পরিপালিত শরীয়াহ ভিত্তিক কোন পদ্ধতিকেই বেছে নিতে হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ তো বটেই সারা দুনিয়ায় ইসলামী ব্যাংক সমূহ গ্রাহকের নিকট হতে আমানত গ্রহণকালে দু’টি পদ্ধতির অনুসরণ করে থাকেন।

এক) আলওয়াদিয়া: আলওয়াদিয়া আমানত সংগ্রহের শরীয়া সম্মত এমন একটি পদ্ধতি যেখানে আমানতকারী এ শর্তে কারো নিকট টাকা গচ্ছিত রাখে যেখানে দ্বিতীয় পক্ষ তথা আমানতের জিম্মাদার তার জিম্মায় থাকা টাকা আমানতকারী চাহিবামাত্র ফেরৎ দেবার শর্তে তার নিজ ঝুঁকিতে ব্যবহার করার অনুমতিও লাভ করেন। এখানে আমানতকারী কোন প্রকার ঝুঁকি যেমন নেন না তেমনি কোন পারিতোষিকও দাবী করতে পারেন না। ইসলামী ব্যাংকে ব্যবসায়িক চলতি হিসাব আল ওয়াদিয়া পদ্ধতিতেই খোলা হয়।

দুই) মুদারাবা: মুদারাবা ইসলামী অর্থায়ন বা তহবিল সংগ্রহের এমন একটি পদ্ধতি যেখানে এক পক্ষ ব্যবসায়/ উদ্যোগের সম্পূর্ণ পূজির যোগান দেন এবং দ্বিতীয় পক্ষ উদ্যোক্তা ব্যবসা পরিচালনা করেন এই শর্তে যে ব্যবসার নীট লাভের চুক্তিসম্মত অংশ পূজিঁ সরবরাহকারী পাবেন। তবে ব্যবসার প্রকৃত লোকসানের দায় এককভাবে পূঁজি সরবরাহকারী বহন করবেন। মুদারাবা পদ্ধতিতে পূজিঁ সরবরাহকারীকে সাহিবুল মাল এবং উদ্যোক্তাকে মুদারিব বলা হয়। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক সমূহ তহবিল সংগ্রহের এই নীতি দেশে এবং দেশের বাইরে ব্যাপকভাবে অনুসরণ করে থাকে। এই লেনদেনের ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীগণ সাহিবুল মাল আর ব্যাংক উদ্যোক্তার মর্যাদা লাভ করেন। এই লেনেদেন এই শর্তে সম্পন্ন হয় যে, ব্যাংক তার অর্জিত লাভের একটি অংশ জমাকারী (সাহিবুল মাল) কে প্রদাণ করবে। তবে লোকসান হলে জমাকারী (সাহিবুল মাল) এককভাবে লোকসান বহন করবেন। ইসলামী ব্যাংক মুদারাবা পদ্ধতিতে সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাব, মেয়াদী আমানত হিসাব, বিশেষে সঞ্চয়ী হিসাব সমূহ পরিচালনা করে থাকে।

মুনাফা/লোকসান বন্টন: ইসলামী ব্যাংক সমূহ আমানতের সময়কাল ও ব্যবহার সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন মুদারাবা হিসাবের ওয়েটেজের ভিত্তিতে মুনাফার প্রাক্কলিত হার নির্ধারণ করে বছরান্তে হিসাবে মুনাফার অনুমিত অংশ জমা করে। তবে ব্যাংকের কেন্দ্রীয় চূড়ান্ত হিসাব সম্পন্ন হবার পর ব্যাংক জমাকারী (সাহিবুল মাল) এর প্রাপ্য চূড়ান্ত লভ্যাংশ ঘোষণা করে। এ পর্যায়ে প্রাক্কলিত হারে জমাকারীর হিসাবে দেয়া মুনাফা সমন্নয় করা হয়। অর্থাৎ আগে বেশী দেয়া হয়ে থাকলে তা কেটে আর কম দেয়া হয়ে থাকলে পূরণ করে দেয়া হয়। আবার ব্যাংকের লোকসানে বছর জমাকারীর হিসাব থেকে কেটে লোকসান সমন্বয় করা হয়। ফলে দেখা যায় ইসলামী ব্যাংকের জমা হিসাবে গ্রাহকরা কখনো বেশী, কখনো বা কম হারে মুনাফা পেয়ে থাকেন। কখনো আবার লোকসানের দায় সমন্নয় করতে গ্রাহকের হিসাব থেকে টাকা কাটা হয়। একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে ইসলামী ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাব Profit and Loss Sharing Account বা PLS Account নামেই পরিচিত ছিল। পরবর্তিতে “মুদারাবা” টার্মটি আরো বেশী যর্থাথ ধারণায় PLS কে মুদারাবায় উন্নীত করা হয়।

মূলধনে লোকসান: ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মুদারাবা বিনিয়োগকারী ব্যাংকের আমানতদার। হিসাব খোলার সময় ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে লিখিত আন্ডারটেকিং নিয়ে থাকে এই মর্মে যে ব্যাংকের প্রকৃত লোকসানের দায় এককভাবে আমানতকারী তথা মুদারিব বহন করবে। এখন প্রশ্ন হলো ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকরা তো কখনো পূঁজি লোকসানের দায় নিয়েছেন এমন তো হয়নি। এক্ষেত্রে জবাব হলো ব্যবসায় লস হতেই হবে এমন কোন শর্ত নেই। তদুপরি ইসলামী ব্যাংকেরও কোন কোন শাখা লস করে। কিন্তু ব্যাংকের সামগ্রিক একাউন্টস এক করে যখন দেখা হয় তখন আর লস থাকে না বলেই তা দৃশ্যমান হয়।

ব্যাংকের ব্যবসার হালাল হারাম প্রসঙ্গ: ইসলামী ব্যাংকের মূলনীতির মধ্যে দু’টি প্রণিধানযোগ্য বিষয় হলো শরীয়া মেনে ব্যবসা করা এবং লেনদেনে সুদ বর্জন করা। ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে ওআইসি প্রদত্ত সঙ্গায় সেই বিষয়টি পরিষ্কারভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে “An Islami Bank is a financial institution whose status, rules and procedure expressly state it’s commitment to the principles of Islamic Shariah and to the banning of the receipt and payment of interest on any of it’s operations [OIC].” তাই কোন ভাবেই ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সুদের লেনদেন যেমন করার যায় না তেমনি শরীয়াতের দৃষ্টিতে বৈধ নয় এমন কোন ব্যবসায়ও বিনিয়োগ করা যায় না। এই নীতি বাস্তবায়নের প্রকৃষ্ট উদাহরণ ইসলামী ব্যাংক বাংলোদেশ লিমিটেড। আকারে দেশের সর্ববৃহৎ পোর্টফলিও ধারি এই ব্যাংকের প্রায় পৌনে এক লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগের একটি টাকাও হারাম পণ্য/খাত তো বটেই এমনকি সিগারেট/তামাকেও নেই।

ফিক্সড ডিপোজিট ও ইসলামী ব্যাংক: প্রসঙ্গত: উল্ল্যেখ্য যে ইসলামী কখনো ফিক্সড ডিপোজিট হিসাবের মাধ্যমে আমানত সংগ্রহ করে না। সে হিসেবে গ্রাহকের একাউন্টে ফিক্সড সুদ দেবার প্রশ্নও ওঠে না। সূদী ব্যাংকের ফিক্সড হিসাবে বিকল্প ইসলামী হিসেবে ব্যাংক মুদারাবা টার্ম ডিপোজিট একাউন্ট (MTDRA) খুলে স্বল্প মেয়াদী/দীর্ঘ মেয়াদী আমানত জমা নেয়। এখানেও সেই শরীয়া সম্মত মুদারাবা নীতি অনুসরণ করা হয়। তবে ব্যাংকের ব্যবহার সুবিধা বেশী হওয়ায় মেয়াদী হিসাবে বেশী ওয়েটেজ ধরে এসব হিসাবে দেয় মুনাফার হার তুলনামুলক বেশী হয়।

রেট মানেই সুদ নয়: ব্যাংকের আমানত নেয়ার সময় প্রাক্কলিত মুনাফার হারই গ্রাহককে জানানো হয়। ব্যাংকের অতীতের মুনাফা প্রবণতার প্রতি লক্ষ্য রেখে এই রেট ঘোষণা করা হয়। তেমনি পণ্যের উপর মুরাবাহা বিনিয়োগ দেয়ার সময়ও গ্রাহককে ক্রয়মূল্যের উপর আরোপিত নির্ধারিত মুনাফার হার ঘোষণা করেই বিক্রি করা হয়। এটাই সম্মত লাভে ক্রয় বিক্রয় যা আরবীতে মুরাবাহা নামে পরিচিত এবং অনুশীলিত। অনেকে ব্যাংকের জমা হিসাব কিংবা বিনিয়োগ হিসাবের মুনাফার হারকেই সুদ বলে মনে করেন। অথচ এটি সম্পূর্ণ একটি ভুল ধারণা। কারণ রেট নিজে কোন সুদ কিংবা লাভ নয়। বরং রেট হলো লাভ কিংবা সুদের শতকরা হিসাবে প্রকাশ করার মাধ্যম। কোন মানুষ ব্যাংকের সাথে ব্যবসা না করলেও তার ব্যবসায় লাভ লোকসানের হিসাব রেট বা শতকরা হার বাদ দিয়ে করতে পারেন না।

শেষ কথা: সূদ কবিরা গুণাহ। হাদীসে ভাষ্য অনুযায়ী সূদখোর, সূদদাতা, সূদের দলীল লেখক এবং সাক্ষীরা যুগপৎভাবে অভিশপ্ত [১]। সূদ এর সত্তর প্রকার পাপের মধ্যে সর্বনিন্ম পাপ নিজ মায়ের সাথে ব্যভিচার তুল্য [২]। আবার সূদখোরের বিরুদ্ধে আল্লাহ এবং তার রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধ ঘোষণা রয়েছে পবিত্র কুরানে [৩]। তাই সূদের পাপ, অভিশাপ থেকে বাচার প্রশ্নে কোনরূপ আপোষ করার সুযোগ নেই । সুযোগ নেই “ব্যাংক সূদের পাপ আমার নয়; সরকারের” –এ কথা বলে পার পাওয়ার। এ যাবৎ যত কাজ এবং গবেষণা হয়েছে তার কাছাকাছি যেতে হবে আলেম, পন্ডিত জ্ঞানীদেরকেও। নিজেদেরকেও নিয়োজিত করতে হবে অনুরূপ কাজে। মানুষের আর্থিক জীবনকে শাপ এবং পাপমুক্ত করতে হলে আমূল সংস্কার আনতে হবে গোটা ব্যাংকিং এবং অর্থ ব্যবস্থাপনায় মনে রাখতে হবে “ইবাদাত কবুলের পূর্বশর্ত হালায় উপার্জন”। গবেষক/মুজতাহিদগণ এবং দায়ীগণ সক্রিয় এবং সম্পৃক্ত হলে সহজবোধ্য ভাবেই দূর করা যাবে জনমনের সকল বিভ্রান্তি এবং ভুল ধারণার।

লেখক: মো: মোসলেহ উদ্দিন
এসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড
ভৈরব শাখা, কিশোরগঞ্জ।

তথ্যসূত্র:
[১] মুসলিম/৩৯৪৮, আবুদাউদ/৩৩০০, তিরমিযী/১২০৯
[২] ইবনে মাযা/২২৭৪
[৩] সূরা বাকারা/২৭৮-২৭৯

Leave a Reply