করোনা সংক্রমন ঝুঁকিঃ প্রসঙ্গ ব্যাংকিং লেনদেন

0

বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের দেশে। সংক্রমিত হচ্ছে লক্ষ লক্ষ আর মারা যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। ভিন দেশ থেকে নিজ দেশে উড়াল দিচ্ছে আবার কেউ শহর থেকে গ্রামে ছুটে যাচ্ছে। দেশ, নগর, মহানগর, জেলা, উপজেলা, গ্রাম সবই লকডাউন হচ্ছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, অফিস, আদালত, পরিবহন সবই বন্ধ। কোয়ারান্টাইন, হোম কোয়ারান্টাইন, সোস্যাল বা কমিউনিটি ডিসট্যান্সিং সহ নানা কৌশল অবলম্বন করছে সকলে।

বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয় বা নিজ গৃহে চলছে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা। লক্ষ্য একটাই করোনা ভাইরাসের সংক্রমন প্রতিরোধ করা। সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহন করেছে। প্রশাসন, মিলিটারি, আধা বা প্যারামিলিটারি বাহিনী, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। মুজিব বর্ষের অধিকাংশ কর্মসূচী সীমিত এবং মহান স্বাধীনতা দিবসের সকল কর্মসূচী ও বাতিল করা হল।

এমনকি নব্বইভাগ মুসলমান অধ্যুষিত দেশে মসজিদে যেতেও মুসলমানদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে যেন কোন কারনে সংক্রমিত না হয় অন্য কেউ। সরকার ২৬ মার্চ বৃহস্পতিবার থেকে আগামী ৪ এপ্রিল, ২০২০ রবিবার পর্যন্ত মোট দশ দিন সকল নাগরিককে হোম কোয়ারান্টাইনে থাকার জন্য নির্দেশনা দেয়া হল। প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে ও কঠোর হতে দেখা যাচ্ছে।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, এ মহাদুর্যোগকালীন সময়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা, কর্মচারিদের বেতন ভাতা প্রদান, নগদ জমা-উত্তোলন ও টাকা স্থানান্তর, ডিমান্ড ড্রাফট, পে অর্ডার ইস্যুসহ ব্যবসায়িক কর্মকান্ড অব্যাহত রাখার সুবিধার্থে আগামী ২৯ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত সকাল দশটা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত দুই ঘন্টা অর্থাৎ এ পাঁচ দিনে মোট দশ ঘন্টা ব্যাংকে সীমিত লেনদেন করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দিয়েছে।

Bangladesh Automated Cheque Processing System (BACPS) এবং Real Time Gross Settlement (RTGS) বন্ধ আর অনলাইন লেনদেনের সুবিধার্থে National Payment Switch Bangladesh (NPSB) চালু থাকবে। Bangladesh Electronic Fund Transfer (BEFTN) চালু থাকবে ১ এবং ২ এপ্রিল তারিখে।

ডিজিটাল বাংলাদেশে এখন ব্যাংকিং সেক্টরে নানা ধরনের ডিজিটাল প্রোডাক্টস এর আবির্ভাব হচ্ছে আর্থিক সেবা জনগনের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য। বাংলাদেশে Fully Online, Partially Online এবং Offline মিলে শহর এবং গ্রামে শাখা হল মোট ১০৫৮৩টি (জানুয়ারি, ২০২০)। গত জানুয়ারি মাসে MICR, Non-MICR Chq, EFT এবং RTGS এর মাধ্যমে লেনদেন হল মোট ৩,৬০,৬৪৩ কোটি টাকা।

মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে লেনদেন হল ৪২১০১ কোটি টাকা আর ইন্টারনেট ব্যাংকিং এর মাধ্যমে লেনদেন হল ৬৬৭০ কোটি টাকা। ১০৯৬১ টি ATM (Automated Teller Machine) এর মাধ্যমে ১৪,৮৩০ কোটি টাকা, ৬০৪৭৪ টি POS (Point of Sale) এর মাধ্যমে ১৬৬৬ কোটি টাকা, ২৫৮টি CRM (Cash Recycling Machine) এর মাধ্যমে ২৫৫ কোটি, ই-কমার্সের মাধ্যমে ২৭০ কোটিসহ লেনদেন হল মোট ১৭,০২১ কোটি টাকা গত জানুয়ারিতে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে গ্রাহকরা যে শাখা পর্যায়ে উপস্থিত হয়ে লেনদেন করেন, উপরোক্ত তথ্য-উপাত্তে তা প্রমানিত হয়নি। ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ATM, CRM, CDM, POS, e-commerce সহ নানা উপায়ে আর্থিক লেনদেন করতে পারেন সবসময় গ্রাহকরা। বাংলাদেশে স্থাপিত ১০৯৬১টি এটিএম বুথ থেকে কয়েকদিনে (ব্যাংক বন্ধ থাকলে) উত্তোলন করা যাবে ৭,৬৭৩ কোটি টাকা (প্রতিটিতে গড়ে সত্তর লাখ টাকা লোড দেয়া হলে)।

ক্ষতি/ সংক্রমন ঝুঁকিঃ
ধরুন, দেশের ১০৫৮৩ টি শাখাই দুই ঘন্টা করে খোলা থাকলো। এসব শাখায় কর্মরত কর্মীর সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। প্রতি পরিবারে পোষ্য গড়ে পাঁচ জন হলে করোনা সংক্রমনের আশংকা থাকবে দশ লাখের।

ধরুন, প্রতিদিন ব্যাংকে লেনদেন করতে শাখায় আসবে ১০০জন গ্রাহক। পাঁচ দিনে আসতে পারে প্রতি শাখায় ৫০০জন। তাহলে ১০৫৮৩ টি শাখায় আসার সম্ভাবনা ৫২,৯২,৫০০ জন গ্রাহক। প্রতি গ্রাহকের পাঁচজন পোষ্য হলে মোট ২,৬৪,৫৭, ৫০০ জন করোনা সংক্রমনের ঝুঁকি থাকবে। তাছাড়া যাতায়াতকালীন সময়ে তো আরো অনেকে যুক্ত হতে পারেন। তাহলে ব্যাংকার এবং গ্রাহকদের পরিবারের সম্ভাব্য সদস্য সংখ্যা প্রায় পৌনে তিন কোটি মানুষ করোনা সংক্রমন ঝুঁকিতে থাকবে।

তাছাড়া ব্যাংকিং পর্যায়ে ও কর্মীদের মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ নিরাপত্তা সহায়ক ইকুইপমেন্টের ও অপর্যাপ্ততা রয়েছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য ব্যাংকিং সেক্টরের কর্মীদের ভুমিকা অপরিহার্য। তবে এ দুর্যোগ মুহুর্তে সীমিত লেনদেনের সুবিধার্থে শাখা খোলা রাখা কতটুকু যৌক্তিক, তা ভেবে দেখার জন্য সকলের কাছে বিনীত অনুরোধ করছি।

আমরা বাঙালি। হুজুগে জাতি। কোন নিয়ম নীতি আমাদের আটকাতে পারে না। আমরা স্বাধীন। সরকার, প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট মহল এ মরনব্যাধী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। সেখানে মাত্র দশ ঘন্টা ব্যাংকিং লেনদেন সুবিধার্থে এতগুলো মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে, তা মোটেও বোধগম্য হচ্ছে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি সুবিবেচনা করতঃ জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহন করবেন বলে আশা রাখি।

লেখকঃ মোহাম্মদ সহিদ উল্লাহ (বাচ্চু), একজন ব্যাংক কর্মকর্তা

Leave a Reply