খেলাপির ভয়ে প্রণোদনার ঋণ ছাড়ে অনীহা

0

তিন কারণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো করোনার প্রভাব মোকাবেলায় প্রণোদনার ঋণ ছাড়ে অনীহা দেখাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, প্রণোদনার অর্থ ফেরত না এলে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা। ঝুঁকিমুক্ত উদ্যোক্তা বাছাইয়ে ব্যাংকের সক্ষমতার অভাব ও নতুনদের ঋণ দানে অনাগ্রহ। এছাড়া করোনার প্রভাব থেকে কত দিনে অর্থনীতি স্বাভাবিক হবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব। এসব কারণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রণোদনার ঋণ বিতরণ করে ঝুঁকির মাত্রা বাড়াতে চাচ্ছে না।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৬ হাজার ১১৬ কোটি টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনার প্রভাব মোকাবেলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজগুলো বাস্তবায়নে নানামুখী ছাড় দেয়া হয়েছে। এরপরও ব্যাংকগুলো বিশেষ করে কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কোনো ঋণ দিচ্ছে না। শুধু বড় উদ্যোক্তাদের কিছু ঋণ দেয়া হয়েছে। প্রণোদনা বাস্তবায়নে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তদারকি আরও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকগুলো আগেই খেলাপি ঋণে ডুবে আছে। এখন তাদের ভয় প্রণোদনার ঋণ বিতরণ করলে খেলাপি ঋণ যদি আবার বেড়ে যায়, তখন তারা আরও খারাপ পরিস্থিতিতে পড়বে। নিউজটি আপনি পড়ছেন ব্যাংকিং নিউজ বিডি ডটকম-এ। ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কম থাকলে এখন তারা বেশি ঝুঁকি নিতে পারত। কিন্তু এ ঋণ বেশি হওয়ায় এখন ঝুঁকি নিয়ে ঋণ বিতরণ করতে সাহস পাচ্ছে না।

তিনি বলেন, প্রণোদনা বাস্তবায়ন করতে হলে এখন ব্যাংকগুলোকে সাহস দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি আরও জোরদার করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দেশ দেবে আর বাণিজ্যিক ব্যাংক সেটা মানবে না এটা হতে পারে না। এ প্রসঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কয়েকজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, প্রণোদনার ঋণ বিতরণে শর্ত অনেক শিথিল করা হয়েছে। কিন্তু মূল শর্তটি শিথিল করা হয়নি।

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশ (Banking News Bangladesh. A Platform for Bankers Community.) প্রিয় পাঠকঃ ব্যাংকিং বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশ এ লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী প্রণোদনার ঋণ বিতরণের পর আদায় দায়িত্ব শুধু ব্যাংকারদের। এ দায়িত্ব কোনোভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নেবে না। কোনো কারণে ঋণ আদায় না হলে বাংলাদেশ ব্যাংক যে ৫০ শতাংশ অর্থের জোগান দিল তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রক্ষিত হিসাব থেকে কেটে নেবে। ঋণ পরিশোধ না হলে তা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। তখন এর বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হবে। এতে ব্যাংকের টাকা আটকে যাবে। তখন একদিকে তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় আরও বেড়ে যাবে, অন্যদিকে তারল্য সংকট বাড়বে। তাই প্রণোদনার ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না।

ব্যাংকগুলোর দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৈরি প্রতিবেদনে থেকে দেখা যায়, জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৯৬ হাজার ১১৬ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। নিউজটি আপনি পড়ছেন ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশ-এ। এর মধ্যে মার্চের তুলনায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। মার্চে এর পরিমাণ ছিল ৯২ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে প্রভিশন ও স্থগিত সুদ বাবদ আটকে আছে প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা ।

আন্তর্জাতিকভাবে খেলাপি ঋণের হার ৩ শতাংশের বেশি থাকলেই ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়। সেখানে বাংলাদেশে আছে সোয়া ৯ শতাংশের বেশি। এ কারণে এমনিতেই ঝুঁকিতে আছে দেশের আর্থিক খাত। এর মধ্যে প্রণোদনার ঋণ ছাড় করার কারণে খেলাপি ঋণ আরও বৃদ্ধি পেলে ঝুঁকির মাত্রাও বেড়ে যাবে। এ বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল হালিম চৌধুরী বলেন, করোনার কারণে প্রায় ২ মাস ব্যাংকিং কার্যক্রম খুবই সীমিত ছিল। এখন পুরোদমে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ঋণ বিতরণ বাড়াতে ব্যাংকগুলো নানা চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর টাকা দিতে হলে কিছু নিয়ম-কানুন মানতে হয়। বেশিরভাগ উদ্যোক্তাই এগুলো মানতে পারছেন না। এ কারণে দেরি হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনায় বিশেষ করে কুটির ও ছোট উদ্যোক্তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক করতে তাদের দ্রুত টাকার জোগান দিতে হবে। তারা আশা করছেন এদের টাকার জোগান দিতে পারলে দ্রুত অর্থনীতি পুরোদমে সচল হবে। ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারম্যান আবুল কাশেম খান বলেন, প্রণোদনার ঋণ এ সময়ে অনেকেরই খুব উপকারে আসছে। এতে ঝুঁকি আছে কোনো সন্দেহ নেই। ঝুঁকি নিয়েও ছোটদের কাছে টাকা পৌঁছাতে হবে। তা না হলে অর্থনীতি স্বাভাবিক হবে না।

এ প্রসঙ্গে ব্যাংকাররা জানান, কুটির ও ছোট ব্যবসায়ীরা সাধারণত ব্যাংক থেকে ঋণ নেন না। নিজের টাকায় ব্যবসা করেন। করোনার কারণে তাদের নতুন করে পুঁজির প্রয়োজন পড়েছে। অনেকেই ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছেন। কিন্তু উদ্যোক্তাদের বাছাই করার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিয়েছে। একদিকে তাদের সম্পর্কে ব্যাংকের কোনো সম্পর্ক নেই। নতুন করে জানতে হচ্ছে। ঋণটি দিলে যাতে ফেরত আসে সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হচ্ছে। কেননা এ ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রাটা বেশি।

এছাড়া করোনায় মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান কমার কারণে চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। ফলে পণ্য উৎপাদন করে উদ্যোক্তারা এখন সেগুলো বিক্রি করতে পারবেন না। ফলে উদ্যোক্তাদের টাকাও আটকে যাবে। তখন তারাও ঋণ শোধ করতে পারবেন না। এসব মিলে ঝুঁকি রয়েছে।

Leave a Reply