বেসরকারি ব্যাংকে অভিন্ন পদসোপান প্রবর্তন প্রসঙ্গে

0
9452

মোশারফ হোসেন: দেশের গণমাধ্যমে ব্যাংক খাত সম্পর্কে টানা নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশের পর ব্যাংকারদের গলার জোর এখন অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে গেছে। তাই ব্যাংকারদের পক্ষে বা তাদের স্বার্থ নিয়ে কিছু বলতে চাওয়াটা বুমেরাং বটে। তথাপি বলার অপেক্ষা রাখে না, বর্তমান সময়ের ঈপ্সিত পেশা হিসেবে অনেক পেশার সঙ্গে ব্যাংকিংও শিখরে উঠে এসেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়ে উঠেছে পরিপূর্ণ ও কাঠামোবদ্ধ একটি পেশা। কিন্তু সত্যিকার অর্থে, কোনো একটি পেশার ভালো-মন্দ কিছু মানদণ্ডের ওপর নির্ভর করে, যেমন- কর্মপরিবেশ, বেতন কাঠামো, পদোন্নতির সুযোগ, চাকরি নিরাপত্তা, কর্মিবান্ধব করপোরেট কালচার, সামাজিক মর্যাদা, কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা প্রভৃতি। এসব মানদণ্ডের অধিকাংশই ব্যাংকের চাকরিতে বিদ্যমান। তাই ব্যাংকিং পেশা এখন চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ-তরুণীদের পছন্দের শীর্ষে।

স্বাধীনতা-উত্তরকালে ব্যাংক খাতের জাতীয়করণ থেকে শুরু করে ১৯৮২ সালে প্রথম বেসরকারি ব্যাংকের যাত্রা; ১৯৯১ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইন প্রণয়ন; ২০০৭ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংককে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর; ২০০৯ সালে ভূতপূর্ব বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক ও বাংলাদেশ শিল্পঋণ সংস্থাকে একীভূত করে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড গঠন; ২০১৩ ও ২০১৮ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন এবং ব্যাংকগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের হরেক রকম বিধিবিধান প্রণয়নসহ নানা পরিবর্তন এসেছে দেশের ব্যাংক খাতে। কিন্তু এসব পরিবর্তন ও আইনি নির্দেশনার কোনোটিতেই ব্যাংকারের স্বার্থ নিয়ে খুব একটা আলোচনা বা নির্দেশনা নেই বললেই চলে।

দেশে বর্তমানে ৫৮টি তফসিলি ব্যাংক রয়েছে, তার মধ্যে সরকারি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক ৯টি, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ৪০টি এবং বাকি ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে এসব ব্যাংকে ২০১৭ সালের শেষে এক লাখ ২০ হাজার ব্যাংকার কর্মরত (সূত্র: বণিক বার্তা, এপ্রিল ২৩, ২০১৮)। কিন্তু সম্মিলিতভাবে পুরো ব্যাংক খাত বিবেচনায় কোন গ্রেডে কতজন করে ব্যাংকার আছেন, এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়াটা দুরূহ ব্যাপার। বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলোতে ব্যাংকারদের পদবির নামকরণে ভিন্নতার কারণেই তা সম্ভব নয়। কারণটা নিচের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হবে বলে আশা করছি।

ব্যাংকের চাকরিতে অভিজ্ঞ ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যাংকারদের জন্য ওপরে ওঠার অনেক সুযোগ রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যাংক সুইচ করতে পারা মানেই হচ্ছে এক গ্রেড ওপরে উঠে যাওয়া, সেইসঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেতন ও আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধি পাওয়া। কিন্তু অন্য ব্যাংক থেকে কোনো অফার এলে তখন ব্যাংকারকে দেখতে হয়, প্রস্তাবিত গ্রেডটি তার বর্তমান গ্রেডের ঊর্ধ্বের কি না। ব্যাংক হয়তো উচ্চতর একটি গ্রেডই অফার করল, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় নতুন ব্যাংকের প্রস্তাবিত গ্রেডের নাম (যে গ্রেডে ব্যাংকার প্রমোটেড হতে যাচ্ছে) এবং বর্তমান ব্যাংকের গ্রেডের নাম (যে গ্রেড ছাড়তে চাচ্ছে) একই। ফলে ব্যাংক সুইচ করে আর্থিকভাবে লাভবান হলেও এবং সত্যিকার অর্থেই পদোন্নতি পেলেও গ্রেডের নামটি অভিন্ন হওয়ার কারণে প্রমোটেড হয়েও মনে হয় ‘আগের গ্রেডেই তো থেকে গেলাম!’ একই নামের গ্রেডে আরও কয়েক বছর চাকরি করতে হবে, এমনটা মনে হওয়ার কারণে এই পদোন্নতি ব্যাংকারকে আসলে মানসিকভাবে এগিয়ে নিতে পারে না। অন্যদিকে এই একই কারণে সাধারণ মানুষও কোনো একটি বেসরকারি ব্যাংকে একজন ব্যাংকারের পদোন্নতির ক্রম (hierarchy) বা অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে না, যেমনটা পারে একজন সরকারি ব্যাংকারের ক্ষেত্রে।

আসলে দেশে এতগুলো বেসরকারি ব্যাংক, কিন্তু একেক ব্যাংকে কর্মকর্তা বা নির্বাহী ব্যাংকারদের পদবি (grade/designation) একেক রকম। যেমন, ‘প্রবেশনারি অফিসার’ কিংবা ‘ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার’দের চাকরি স্থায়ী হওয়ার পর তাদের বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকে বিভিন্ন নামে, যেমন- অফিসার, সিনিয়র অফিসার, ফার্স্ট এক্সিকিউটিভ অফিসার, এক্সিকিউটিভ অফিসার, প্রিন্সিপাল অফিসার প্রভৃতি বিভিন্ন নামে পদায়ন করা হয়। আবার পদবির নাম বিবেচনায় কোনো কোনো ব্যাংকের একটি সিনিয়র পদ, অন্য ব্যাংকের জন্য জুনিয়র পদ। একদম ওপরের দিকে চার-পাঁচ ধাপে (ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে নিচের দিকে এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত) পদবি সব ব্যাংকে প্রায় একই হলেও নিচের দিকে অনেকটাই অমিল। এতে এক ব্যাংকের ব্যাংকারদের সঙ্গে অন্য ব্যাংকের ব্যাংকারদের সিনিয়রিটি বা জুনিয়রিটি তুলনা করতে, তাদের পদের বদলে বেতন-ভাতাদির তুলনা করে দেখতে হয়- কে সিনিয়র, আর কে জুনিয়র।

‘প্রবেশনারি অফিসার’ বা ‘ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার’ পদটিকে যদি ভিত্তি ধরা হয়, তাহলে ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ পর্যন্ত ১২ থেকে ১৫টি পদ রয়েছে প্রতিটি বেসরকারি ব্যাংকেই। এভাবে ‘প্রবেশনারি অফিসার’ বা ‘ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার’ পদে যোগদান করা একজন ব্যাংকারকে ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ পদ পর্যন্ত যেতে ১২ থেকে ১৫টি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এছাড়া ‘প্রবেশনারি অফিসার’ বা ‘ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার’ পদের নিচের পদে, মূল ধারার ব্যাংকিংয়ে আরও তিনটি থেকে পাঁচটি পদের ব্যাংকার থাকেন, যেমন- ট্রেইনি অফিসার, ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট, ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার, অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার, অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার-১, জুনিয়র অফিসার, জুনিয়র অফিসার-১, ব্যাংকিং অফিসার, অফিসার-১ প্রভৃতি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স করা ছেলেমেয়েরাও এসব পদে চাকরি করে। তবুও নিচের সারির এসব ব্যাংকার ওপরের দিকে দৃষ্টিপাত করলেই হতাশ হয়ে দেখেন, তার সামনে একে একে প্রায় ২০টির মতো ধাপ; আর ভাবেন, ‘কবে আমি অফিসার হব? কবে হব সিনিয়র অফিসার?’ নির্বাহী হওয়ার স্বপ্ন হয়তো অনেকে দেখার সাহসই করেন না।

অনেক ব্যাংকের পদায়নেই জুনিয়রিটি নির্দেশক শব্দের প্রাধান্য লক্ষ করা যায়, যেমন ব্যাংকের ক্যাডার পোস্ট হিসেবে খ্যাত ‘প্রবেশনারি অফিসার’ কিংবা ‘ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার’ কর্মকর্তাদের শিক্ষানবিশকাল শেষে একটি ব্যাংকে ‘জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে চাকরি স্থায়ী হয়। যদিও এই পদটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এবং এই পদের কর্মকর্তাদের মাঝ থেকেই ব্যাংকের ভবিষ্যৎ ডিএমডি-এমডিরা বের হয়ে আসবেন; কিন্তু ‘জুনিয়র’, ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট’, ‘ভাইস’- তিনটি শব্দই নিম্নপদস্থতা বোঝায়, যা পদটির অলংকার নষ্ট করে ফেলে।

অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় ‘অফিসার’ থেকে ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ পর্যন্ত ধাপ মাত্র ৯টির মতো এবং পদের নামকরণগুলোও প্রায় একই রকম। যেমন অফিসার থেকে ঊর্ধ্বক্রমানুসারে সোনালী ব্যাংকের পদক্রম হচ্ছে: ‘অফিসার>সিনিয়র অফিসার>প্রিন্সিপাল অফিসার>সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার>এজিএম>ডিজিএম>জিএম>ডিএমডি>এমডি।’ ফলে একজন সফল ব্যাংকারের ওপরের দিকে জিএম বা ডিএমডি লেভেল পর্যন্ত পদোন্নতি পাওয়াটা সম্ভব হয়। কিন্তু বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অনিয়মিত ও বিলম্বিত পদোন্নতি এবং দীর্ঘ পদসোপানের কারণে ১৫টি ধাপ অতিক্রম করাটা অনেক সফল ব্যাংকারের পক্ষেও সম্ভব হয় না। ৩০ বছর বয়সে চাকরিতে যোগদান করে একজন কর্মকর্তা যদি তিন বছর অন্তর অন্তর নিয়মিতভাবেও পদোন্নতি পান, তাহলেও এত ধাপ অতিক্রম করে এমডি হতে তার প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ বছর লাগবে। ফলে এ হিসাবে একজন এমডির বয়স গিয়ে দাঁড়াবে ৭৫ বছর, যা বাস্তবসম্মত নয়; কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনামতে একজন এমডির বয়স হবে সর্বোচ্চ ৬৫ বছর। তাছাড়া একই ব্যাংকে ক্যারিয়ারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চাকরি করে এমডি হওয়ার নজিরও খুব কমই আছে। তাই বেসরকারি ব্যাংকে দুই বছর পরপর পদোন্নতি ব্যবস্থা (কিছু ব্যাংকে বর্তমানেও প্রচলিত আছে) অথবা, ‘প্রবেশনারি অফিসার’ বা ‘ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার’-এর নিচের স্তরে মূল ধারার ব্যাংকিংয়ে সর্বোচ্চ দুটি গ্রেড এবং ওপরের দিকে ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১০টি গ্রেড ব্যবস্থা এবং সব বেসরকারি বাংকের জন্য একই পদসোপান চালু করাটাই হবে বাস্তবসম্মত। এতে সবাই হয়তো ডিএমডি-এমডি হয়ে যাবেন না, কিন্তু ক্যারিয়ারের শেষে একটি অধিকতর সম্মানজনক পদ নিয়ে অবসরে যেতে পারবেন। বিদেশি ব্যাংকগুলো যেহেতু তাদের নিজেদের দেশে নিবন্ধিত, তাই তাদের ব্যাংকারদের পদ-পদবি আমাদের দেশীয় ব্যাংকগুলো থেকে আলাদা হতেই পারে।

একেক বেসরকারি ব্যাংকের আর্থিক সামর্থ্য একেক রকম বলে সব বেসরকারি ব্যাংকে হয়তো একই বেতন কাঠামো প্রবর্তন করা সম্ভব নয়। কিন্তু সব বেসরকারি তফসিলি ব্যাংকগুলো অভিন্ন ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১ দ্বারা পরিচালিত এবং একই নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাই পদায়নের ক্ষেত্রে অভিন্ন পদসোপান ব্যবস্থা প্রবর্তন করাটা খুব সহজেই সম্ভব।

ব্যাংক খাত এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে প্রযুক্তি, কাঠামো এবং নিয়ন্ত্রণগতভাবে অনেক সাবলীল খাতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিরন্তর এই খাতকে একটি সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক খাতে রূপ দেওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাই শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে এবং ব্যাংকিং পেশার অধিকতর ব্র্যান্ডিং ও বিশেষায়নের জন্য বৃহৎ এই খাতের চালিকাশক্তি ব্যাংকারদের পদবি-জট কমিয়ে অভিন্ন পদবি ব্যবস্থা চালু করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক অথবা বেসরকারি ব্যাংকগুলো নিজেরাই উদ্যোগী হবে বলে আশা করছি। (নিবন্ধটি দৈনিক শেয়ার বিজ পত্রিকায় সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৮ তারিখে প্রকাশিত হয়েছে)     

লেখকঃ ব্যাংকার

[email protected]

Leave a Reply