সমন্বিত উদ্যোগেই খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব

0
761

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে বিবদমান শীর্ষ জাতীয় সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে ব্যাংক খাতের ‘খেলাপি ঋণ’। এ সমস্যা অতীতেও ছিল। তবে বর্তমানের অবস্থা নিকট অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভয়াবহ। কয়েকটি জাতীয় দৈনিকের সাম্প্রতিক সংবাদে এ ভয়াবহতারই তীব্রতা ফুটে উঠেছে। গত পাঁচ বছরে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। ২০১৮ সাল শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা, যা আমাদের জাতীয় বাজেটের এক-চতুর্থাংশ! ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা, যা পদ্মা সেতুর বাজেটের দুই-তৃতীয়াংশের সমান। বর্তমান অর্থমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, দেশে বর্তমানে (ডিসেম্বর, ২০১৮ ভিত্তিক) ঋণখেলাপির সংখ্যা দুই লাখ ৬৬ হাজার ১১৮ (হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ থাকার কারণে ওই তালিকায় অন্তর্ভুক্তির যোগ্য কিছুসংখ্যক ঋণখেলাপির নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি) যা মালদ্বীপের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি! এভাবে চলতে থাকলে দেশের ব্যাংক খাত পঙ্গুত্ব বরণ করতে বেশিদিন লাগবে না।

সাধারণত ছয় মাস বা তদূর্ধ্ব মেয়াদে অনাদায়ী থাকা ঋণকেই খেলাপি (ডিফল্টার) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ছয় মাসের কম সময় ধরে অনিয়মিত বা অনাদায়ী ঋণের সঙ্গে অবলোপন করা (রিটেন অফ), পুনঃতফসিল করা (রিশিডিউলড) ও পুনর্বিন্যাসকৃত (রিস্ট্রাকচার্ড) ঋণের পরিমাণ যোগ করলে এ খাতে খেলাপির আসল চিত্র বিভীষিকাময়ই প্রতীয়মান হবে। তবুও আমরা আশাবাদী। কারণ আমরা জানি, ‘দুষ্টের দমন, শিষ্টের লালন’ এটাই প্রকৃতির বিচার। তাই ব্যাংক খাতের দুষ্টচক্রেরও বিচার দেখতে পাব বলে আশা রাখছি। তবে প্রকৃতির বিচারে ন্যায়বিচার শতভাগ নিশ্চিত হলেও অনেক ক্ষেত্রেই এ বিচার সময়সাপেক্ষ। কারণ, পার্থিব আদালতে বিচার না পেলে আমরা স্রষ্টার আদালতের বিচারের অপেক্ষায় থাকি। আর এ অপেক্ষা শুধু ইহকালের নয়, কখনও কখনও পরকালেরও বটে। তবে মানুষের আদালতে যে ন্যায়বিচার মেলে না, তাও কিন্তু নয়। এখানে অনন্তকালের অপেক্ষা না থাকলেও দীর্ঘকালব্যাপী চলমান বিচার প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচারের আশা নিশ্চিত হওয়া যায় না। আর ন্যায়বিচারপ্রাপ্ত হলেও অনেক ক্ষেত্রেই রায় পেতে ও আসামির সাজা কার্যকর হতে হতে বিচারপ্রার্থীর জীবনের আয়ুই ফুরিয়ে যায়। ব্যাংক ও অর্থনীতির দুষ্কৃতকারীদের বিচার প্রক্রিয়াও কি আমরা অনন্ত-অসীমের সেই প্রকৃতির হাতেই সোপর্দ করে দিয়েছি?

নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের বক্তব্যে আমরা আশান্বিত হতে চাই। ‘খেলাপি ঋণ আর এক টাকাও বাড়বে না’ বলে তিনি যে প্রতিশ্রুতিপূর্ণ শপথবাক্য উচ্চারণ করেছেন তা ‘খেলাপি’ রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে কাজ করবে বলেই বিশ্বাস।

খেলাপি ঋণকে কেবল ব্যাংক খাতের সমস্যা বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা অর্থমন্ত্রীর হাতে সোপর্দ করে দিলেই সমস্যার সুরাহা হবে না। প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সমন্বিত উদ্যোগের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে দুদক বড় ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। একক খাত হিসেবে দুদকের সর্বোচ্চ মামলা ও গ্রেফতার ব্যাংক সেক্টরেই বলে সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ড. ইকবাল মাহমুদ। যদিও ব্যাংকারদের জেলে নেওয়াটা খুব সহজ। কারণ, বলা হয়ে থাকে ‘ব্যাংকারদের এক পা নাকি সব সময়ই জেলে থাকে!’ তাই দুদক অনায়াসেই এই নিরীহ প্রকৃতির শিকারগুলোকে তাদের জালে আটকাতে পারছে। হ্যাঁ, এক্ষেত্রে অবশ্যই দুদকের ভূমিকার প্রশংসা করছি; তবে বাহবা দিতে পারছি না। দুদকের এই সাঁড়াশি ধড়পাকড়ে দুর্নীতিবাজ ব্যাংকারদের পাশাপাশি খেলাপিরাও যদি অধিক সংখ্যায় স্থান পেত, তাহলে যেমন দুদককে স্ট্যান্ডিং ওভেশন দিতাম, দেশের মানুষও খেলাপি ঋণ আদায়ে উল্লেখযোগ্য একটি পরিবর্তন এরই মধ্যেই দেখতে পেত।
চিহ্নিত জাতীয় শত্রুকে আমরা এড়িয়ে চলি, ঘৃণার চোখে দেখি। চেনাজানা এ-জাতীয় শত্রুকে আমরা সামাজিকভাবে এড়িয়ে চলছি না কেন? কীভাবে আমানত-খেকো খেলাপিরা রাজনীতি, ব্যবসা, সামাজিক সংগঠনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন?

পুলিশ নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের অভিযানে নামে; তেমনই একটি মাস যদি পুলিশ প্রশাসন তাদের নিজ নিজ থানায় ব্যাংকের মামলা-সংক্রান্ত ওয়ারেন্টগুলো তামিল করে, তাহলে খেলাপিদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাবে। এক মাসেই ব্যাংকের অনেক ছোট খেলাপি ঋণ আদায় হয়ে যাবে।
খেলাপি ঋণ পর্যালোচনায় কমিটি গঠনের কথা বলেছেন নতুন অর্থমন্ত্রী। তবে এ কমিটি যদি সাম্প্রতিক সড়ক দুর্ঘটনা রোধবিষয়ক কমিটির মতো বিতর্কিত হয়, তাহলে কোনো ফল আসবে না। কোনো খেলাপির সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই; দলনিরপেক্ষ, সরকারের আজ্ঞাবহ নয় এমন ব্যক্তিরাই যেন স্থান পান কমিটিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান ও সাবেক একাধিক গভর্নরের নেতৃত্বে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের এমডি (একটি বিদেশি ব্যাংকের এমডিসহ), অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের দুজন প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠন করা যেতে পারে এ কমিটি। তবে কমিটি গঠনের আগে সরকারের পক্ষ থেকে এ কমিটির যে কোনো সুপারিশ যে কারও পক্ষে বা বিপক্ষেই যাক না কেন, তা বাস্তবায়ন করা হবে মর্মে অঙ্গীকার করতে হবে এবং তা রক্ষা করতে হবে।

ব্যাংকগুলোকেও মানতে হবে যে, নিজের ঘরের সমস্যা পরের ঘরের কেউ সমাধান করে দেবে না। নিজস্ব কিছু উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে প্রতিটি ব্যাংককে। ক্লাসিফায়েড, রিটেন অফ, রিশিডিউলড, রিস্ট্রাকচার্ড ও দুর্বল ঋণগুলো চিহ্নিত করে যথাশিগগির প্রধান কার্যালয়ে রিকভারি মনিটরিং কমিটি ও শাখা পর্যায়ে রিকভারি টিম গঠন করে প্রত্যেক নির্বাহী কর্মকর্তাকেই নির্দিষ্ট কিছু অ্যাকাউন্টের ঋণ আদায়ের দায়িত্ব দিয়ে নিয়মিত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রধান কার্যালয় ও আঞ্চলিক কার্যালয়ের নেতৃত্বে নিয়মিত ক্যাম্পেইন এবং তদারকির পাশাপাশি শাখাগুলোও নিয়মিত আদায় কার্যক্রমের অতিরিক্ত মাসের অন্তত একটি দিন ‘রিকভারি ডে’ পালন করবে। আদায়ে পারদর্শী নির্বাহী ও কর্মকর্তাকে আর্থিক প্রণোদনা ও বিশেষ পদোন্নতির বিধান রাখা যেতে পারে। যেসব শাখায় খেলাপি ঋণের আধিক্য, সেসব শাখায় বর্তমান লোকবলের অতিরিক্ত অন্তত একজন রিকভারি অফিসার নিয়োগ দিতে হবে, যাকে রিকভারি ব্যতীত অন্য কোনো দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। বিভিন্ন রিকভারি এজেন্টও নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট ছাড়ে কিছুসংখ্যক খেলাপি ঋণ বিক্রির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

তবে এক্ষেত্রে সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংককে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। এসব এজেন্সিকে উৎসাহী করতে সহজ প্রক্রিয়ায় নামমাত্র ফি’তে লাইসেন্স প্রদান করতে হবে। এসব এজেন্সি রিকভারি কার্যক্রমের অতিরিক্ত নিলাম করা সম্পত্তি বিক্রিতে মধ্যস্থতার পাশাপাশি নিজেরাও কিনতে পারবে। সরকারের পক্ষ থেকেও এমন একাধিক এজেন্সি গঠন করা যেতে পারে। এছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনসাপেক্ষে কুইক হিলের জন্য সীমিত সময়ে ১০ বছরের অধিক সময় ধরে অনাদায়ী ঋণগ্রহীতা যারা এককালীন সব ঋণ পরিশোধ করবেন, তাদের সুদ ও মূল ঋণের একটি অংশ মওকুফের অফার দেওয়া যেতে পারে।
সুস্থ ঋণের পূর্বশর্ত হচ্ছে সুস্থ ও সঠিক ডকুমেন্টেশন, যা ঋণের পক্ষের দলিল ও প্রমাণ। তাই শাখাগুলোয় ডকুমেন্টেশন প্রক্রিয়াকে কমপ্লায়েন্ট করতেই হবে। এজন্য প্রতি বছর বেস্ট ডকুমেন্টেশন কমপ্লায়েন্ট শাখা নির্বাচন করে পুরস্কৃত করার পাশাপাশি ডকুমেন্টেশন নন-কমপ্লায়েন্ট শাখাগুলোকে জরিমানা ও শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

যে ব্যক্তি কোনো ব্যাংকের খেলাপি, তাকে অন্য কোনো ব্যাংক আর কোনো ধরনের ব্যাংকিং সেবা ও সুবিধা দিতে পারবে না। এক ব্যাংকে ঋণ অনিয়মিত বা খেলাপি হলে তখন সেই ব্যক্তি অন্য ব্যাংকে ভাব জমানোরও নজির আছে। যে ব্যাংকে খেলাপি, সে ব্যাংকে লেনদেন বন্ধ করে দিয়ে পার্শ্ববর্তী আরেক ব্যাংকের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং লেনদেন করতে দেখা যায়। তাই এমন ব্যক্তির ব্যাংকিং সেবায় সব ব্যাংককে একযোগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে হবে। তবে হ্যাঁ, খেলাপিরাও বোকা নন, তৃতীয় কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে হাসিল করিয়ে নিতে পারেন ব্যাংকিং কার্যটি। তবে যা-ই হোক, খেলাপি ও মন্দ ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে একটি দৃষ্টিভঙ্গি তো তৈরি হবে! আর খেলাপিদের জন্য এটি সতর্কবার্তা হিসেবেও কাজ করবে।

বর্তমানে অনলাইন ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, আরটিজিএস, বিইএফটিএন প্রভৃতি সুবিধার মাধ্যমে রিয়েল টাইম এনি-ব্রাঞ্চ ও এনি-ব্যাংক ব্যাংকিং সম্ভব হচ্ছে। তাই ফান্ডেড ঋণের ক্ষেত্রে নগদ উত্তোলন-রীতি পরিহার করে ঋণগ্রহীতার নির্দিষ্ট কিছু সাপ্লায়ারের হিসাবে ফান্ড ট্রান্সফার পদ্ধতি অনুসরণ করলে ফান্ড ডাইভার্সন বন্ধ হয়ে আসবে। এক্ষেত্রে ঋণ আবেদনেই গ্রাহককে তার সাপ্লায়ারদের নাম, তাদের ব্যাংক ও ব্যাংক হিসাব নম্বর উল্লেখ করতে হবে।

বর্তমানে কিছু ব্যাংক কিস্তিভিত্তিক পারসোনাল ও স্মল বিজনেস ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্য ব্যাংকের সিসি ঋণগ্রহীতাকে খোঁজে। এতে অন্যের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া যায়। নিজের ব্যাংকের ঋণ অনাদায়ী হলে সিআইবিতে রিপোর্টিং হয়। আনক্লিন সিআইবির কারণে সিসি ঋণদাতা অন্য ব্যাংকটি সেই সিসি ঋণ আর নবায়ন করতে পারে না। আর এ সুবিধাটিই কাজে লাগাতে চায় টার্ম লোন প্রদানকারী ব্যাংকটি। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ওভার ফাইন্যান্সিং ও মাল্টিপল ফাইন্যান্সিংয়ের কারণে মাঝপথে দুটি ব্যাংকই বিপদাপন্ন হয়। তাই সিআইবি রিপোর্টে ঋণের তথ্যের পাশাপাশি ঋণদাতা সব ব্যাংকের নাম ও ঋণের উদ্দেশ্যও উল্লেখ করতে হবে এবং একই ব্যবসা বা পারপাসের বিপরীতে মাল্টিপল ফাইন্যান্সিংয়ের জন্য পূর্ববর্তী ঋণদাতা ব্যাংকের অনাপত্তিপত্র গ্রহণ করতে হবে। তা না মানলে প্রথম ব্যাংকের ঋণটি খেলাপি হলে দ্বিতীয় ব্যাংকটিকে তার দায় নিতে হবে।

যে কোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগে গ্রাহকের অন্তত ৫০ শতাংশ মার্জিন নিশ্চিতের পাশাপাশি বার্ষিক ক্রয়ের বা বিক্রয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ পর্যন্ত ঋণ প্রদানের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া যেতে পারে। যেমন, বার্ষিক ক্রয়ের এক-চতুর্থাংশ অথবা টার্নওভারের এক-পঞ্চমাংশের বেশি ঋণ প্রদান করা যাবে না। তবে ঋণের আবেদনকারীকে ব্যাংকের কাছে ক্রয় বা টার্নওভারের পক্ষে যথাযথ প্রমাণ দাখিল করতে হবে; যেমন ব্যাংক বিবরণী (শুধু অ্যাকাউন্ট টু অ্যাকাউন্ট ট্রান্সফার বিবেচ্য হবে), চালান, বিক্রয় রসিদ, ক্রয় বই, বিক্রয় বই, ডিও প্রভৃতি বিবেচ্য হবে।
ফাঁকা বুলিসমৃদ্ধ অসত্য ও অবাস্তব নেট ওয়ার্থ (দায়ের চেয়ে বেশি সম্পদ বা প্রকৃত সম্পদ) তৈরি না করে প্রমাণযোগ্য সম্পদ ও দায়ের ভিত্তিতে নেট ওয়ার্থ (দায়ের চেয়ে বেশি সম্পদ) তৈরি করতে হবে। তাই দায় জানতে সিআইবি রিপোর্টের পাশাপাশি ঋণগ্রহীতা ও জামিনদাতা উভয়ের কাছ থেকেই সম্পদের মালিকানা প্রমাণে জমিজমা, ফ্ল্যাট, বাড়ি, স্থাপনা প্রভৃতির মালিকানা দলিল, নামজারি খতিয়ান ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের রসিদ গ্রহণ করতে হবে। আয়কর বিবরণী, ব্যাংক হিসাবের বিবরণীও বিবেচনায় নিতে হবে। ঋণগ্রহীতা ও জামিনদাতার মোট নেট ওয়ার্থের অর্ধেকের বেশি ঋণ না দেওয়ার বিধান করা যেতে পারে।
৫০ লাখ বা তদূর্ধ্ব অঙ্কের ঋণের জন্য অডিটেড আয় বিবরণী, ব্যালান্স শিট, প্রজেক্ট প্রোফাইল, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল অ্যাসেসমেন্ট বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোর কাছ থেকে সব গ্রাহকের জন্য একই আদলে তৈরি করা গৎবাঁধা অ্যানালাইসিস গ্রহণ না করে কাস্টমাইজড ক্রেডিট রিপোর্ট দিতে বলতে হবে। আইন করে সার্ভে কোম্পানির সঙ্গে এদেরকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

প্রতিটি ঋণ প্রস্তাবে গ্রাহকের সম্ভাবনা বিধৃত করার পাশাপাশি ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জগুলোও উল্লেখ করতে হবে।
কোনো শাখার প্রতি ১০টি ঋণ মঞ্জুরির অন্তত একটি ঋণের জামানত ও ব্যবসায় দৈবচয়ন পদ্ধতিতে প্রধান কার্যালয়ের প্রতিনিধিদল সরেজমিনে ভিজিট করবে। ঋণ অনুমোদনকারী সিআরএম প্রথম স্যাঙ্কশনের সময় এবং প্রতিটি নবায়নে ও সীমা বর্ধিতকরণে ব্যবসায়, স্টক এবং জামানতের ভিডিওচিত্র ও ছবি গ্রহণ করতে পারে।
ঋণের কিস্তি পরিশোধের সামর্থ্য মাথায় রেখে ঋণ প্রদান ও কিস্তি নির্ধারণ করতে হবে। কিস্তিভিত্তিক টার্ম লোনের ক্ষেত্রে গ্রস স্যালারি বা ইনকামের পরিবর্তে ‘টেক হোম’ ও ‘ডিসপোজেবল’ স্যালারি বা ইনকামকেই বিবেচনা করা উচিত। মাসিক কিস্তি যেন টেক হোম স্যালারি বা ইনকামের এক-তৃতীয়াংশ এবং ডিস্পোজেবল স্যালারি বা ইনকামের অর্ধেকের বেশি না হয়।

ব্যাংকগুলোর মধ্যকার অসুস্থ প্রতিযোগিতা রোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। এজন্য যে কোনো টেকওভার ও ব্যাংক সুইচের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকে রিপোর্টিং বাধ্যতামূলক করতে হবে, যেখানে টেকওভার ও ব্যাংক সুইচের কারণ, গ্রাহকের প্রাপ্ত সুবিধাদি বর্ণনার পাশাপাশি বিদ্যমান ও প্রস্তাবিত জামানতের পরিমাণ, মূল্যায়ন, পুনর্মূল্যায়ন প্রভৃতিরও উল্লেখ থাকবে। বর্তমানে ব্যাংক সুইচের ক্ষেত্রে নতুন ব্যাংক পুনরায় জামানতের মূল্যায়ন করে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অতিমূল্যায়ন করে থাকে। গ্রাহকরা এ কারণেই ঘন ঘন ব্যাংক পাল্টাতে চান। তাই ব্যাংক সুইচের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী ব্যাংক কর্তৃক জামানতের মূল্যায়ন পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে পরবর্তী ব্যাংক নতুন করে ওই একই জামানতের মূল্যায়ন করতে পারবে না। এছাড়াও গ্রাহকের মধ্যে ব্যাংক সুইচের প্রবণতা রোধে ঋণ গ্রহণের অন্তত তিন বছরের মধ্যে ব্যাংক সুইচ না করতে পারার বিধান করা যেতে পারে।

খেলাপি সমস্যা ব্যাংক খাতের ক্যানসার। তাই সাধারণ ওষুধে এ রোগ আর সারবে না। এ মুহূর্তে ব্যাংক খাতে একটি সমন্বিত ‘বিগ পুশ’ তথা বড়সড় একটি ধাক্কা প্রয়োজন, যা ব্যাংক খাতকে নাড়িয়ে দেবে, জাগিয়ে দেবে। ব্যাংকগুলো যেমন ঝিমিয়ে পড়া আদায় প্রক্রিয়ায় গতি আনতে সময় সময় ‘আদায়’ ক্যাম্পেইন করে থাকে, এমন মিশন নিয়ে উচ্চ ও নিম্ন আদালতও খেলাপি ঋণের ‘রায় মাস’, পুলিশ প্রশাসনও একযোগে সাজাপ্রাপ্ত ও ওয়ারেন্টভুক্ত খেলাপি ‘গ্রেফতার মাস’ পালন করুক। এতে রাতারাতি দৃশ্যপট পাল্টে না গেলেও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের দৌরাত্ম্য কমবে। আগের মতো দাপট দেখানোর সাহস পাবে না তারা।

লেখকঃ মোশারফ হোসেন, ব্যাংক কর্মকর্তা, কিশোরগঞ্জ
[email protected]

Leave a Reply