ব্যাংকের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সমূহ

0
1428

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে ব্যাংক ব্যবসার আকার, আকৃতি, উদ্দেশ্য ও গঠনে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। যুগের সাথে সাথে পুরাতন, আধুনিক এবং বর্তমানে ইলেকট্রনিক ব্যাংকিং এই ব্যবসার আধুনিকতার ছোঁয়া এনে দিয়েছে। তাছাড়াও প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নতুন নতুন ব্যাংকিং পণ্যের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবাকে যুগোপযোগী এবং গ্রাহকের প্রয়োজন অনুসারে প্রস্তুত করা হয়েছে৷

Objectives of Bank (ব্যাংকের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সমূহ)
ব্যাংকের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গ্রাহক এর প্রেক্ষাপটে ব্যাংকের উদ্দেশ্য বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। নিচে ব্যাংকের সাথে সংশ্লিষ্ট তিন ধরনের বেনিফিসিয়ারির পেক্ষাপটে ব্যাংকের উদ্দেশ্য সমূহ আলোচনা করা হল-
১) ব্যাংকের মালিক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পেক্ষাপটে ব্যাংকের উদ্দেশ্যাবলি;
২) সরকার এবং রাষ্ট্রীয় পক্ষের প্রেক্ষাপটে ব্যাংকের উদ্দেশ্যাবলি; ও
৩) ব্যাংক গ্রাহকদের প্রেক্ষাপটে ব্যাংকের উদ্দেশ্যাবলি।

১) ব্যাংকের মালিক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পেক্ষাপটে ব্যাংকের উদ্দেশ্যাবলি
নিম্নে ব্যাংকের মালিক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পেক্ষাপটে ব্যাংকের উদ্দেশ্যাবলি সমূহ আলোকপাত করা হলো-

ক) তহবিলের বিনিয়োগ ও মুনাফা অর্জন
ব্যাংকের মালিক, অংশীদার ও শেয়ার-হোল্ডারদের সঞ্চিত অর্থের সঠিক বিনিয়োগ করা ব্যাংকের একটি উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য যথাযথ পালন করতে ব্যাংকের শেয়ার-হোল্ডারদের কাঙ্খিত হারে মুনাফা অর্জন করা প্রয়োজন।

খ) সুনাম অর্জন
যথাযথ ব্যাংকিং করে প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধি করতে পারলে তাতে করে মালিকপক্ষের সুনাম বৃদ্ধি পায়।

গ) উন্নয়নে অংশগ্রহণ
ব্যাংক বিভিন্ন খাতে অর্থ বিনিয়োগ করে দেশে উৎপাদন এবং জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে সচেষ্ট হয়। এতে মালিকপক্ষের বিনিয়োগ সার্থক হয়। গ্রাহককে বিভিন্ন রকম সেবা দান করা ব্যাংকের একটি অন্যতম উদ্দেশ্য।

ঘ) সামাজিক অবদান
বিভিন্ন রকম সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এবং অর্জিত মুনাফার একটি অংশ সামাজিক উন্নয়নে ও সমাজ গঠনমূলক কাজে ব্যয় করা ব্যাংকের একটি অন্যতম উদ্দেশ্য।

২) সরকার এবং রাষ্ট্রীয় পক্ষের প্রেক্ষাপটে ব্যাংকের উদ্দেশ্যাবলি
নিম্নে সরকার এবং রাষ্ট্রীয় পক্ষের প্রেক্ষাপটে ব্যাংকের উদ্দেশ্যাবলি সমূহ তুলে ধরা হলো-

ক) নোট ও মুদ্রার প্রচলন
নোট ও মুদ্রা প্রচলন করে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে একমাত্র বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা প্রচলন করে। ব্যাংক চেক কখনো বিনিময়ের মাধ্যমে হিসেবে এবং মুদ্রার বিকল্প হিসেবে কাজ করে সরকারের মুদ্রা প্রচলনের কাজটি সহজ করে দেয়।

খ) মূলধন গঠন
সমাজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় ব্যাংক আমানতের মাধ্যমে সংগ্রহ করে তা বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে বিনিয়োগের জন্য ঋণ দেয়। দেশের মূলধন গঠনে সাহায্য করা এবং সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করা ব্যাংকের প্রধান অন্যতম উদ্দেশ্য।

গ) বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন
ব্যাংক যেকোন কারবারের ঋণ দেবার আগে ওই কারবারের খাতের গুরুত্ব বিবেচনা করে। সরকার নিয়মিতভাবে তার অগ্রাধিকার খাতগুলো দেশ ও জাতির সামনে তুলে ধরে। ব্যাংক সেই অগ্রাধিকারযুক্ত খাতে অর্থায়ন করে সরকারের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে অংশগ্রহণ করে থাকে।

ঘ) মুদ্রা বাজার নিয়ন্ত্রণ
সরকার তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের দ্রব্যমূল্য বা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সর্বদা মুদ্রা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এই কাজটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিচ্ছিন্নভাবে একা একা সাফল্যের সাথে সম্পাদন করতে পারে না। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক এক্ষেত্রে মুদ্রা বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সাহায্য করে থাকে।

ঙ) কর্মসংস্থান
দেশের বেকারত্ব দূরীকরণের জন্য সরকারকে সাহায্য করা ব্যাংক ব্যবস্থার একটি অন্যতম কাজ। ব্যাংকগুলো সেসব কারবারি অর্থায়ন করতে পারে, যেগুলো অধিকহারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে থাকে। যেমন- মূলধন নির্ভর প্রযুক্তির বদলে শ্রম নির্ভর প্রযুক্তিতে অর্থায়ন করে ব্যাংক অধিকতর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে সরকারকে সাহায্য করে থাকে।

৩) ব্যাংক গ্রাহকদের প্রেক্ষাপটে ব্যাংকের উদ্দেশ্যাবলি
নিম্নে ব্যাংক গ্রাহকদের প্রেক্ষাপটে ব্যাংকের উদ্দেশ্যাবলি সমূহ তুলে ধরা হলো-

ক) আমানত
গ্রাহকদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় সংগ্রহ করে ব্যাংকগুলো বিভিন্ন ধরনের আমানত সৃষ্টি করে থাকে। আমানতকারীকে তার সুবিধামতো আমানত সৃষ্টিতে সাহায্য করা ব্যাংকের একটি অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য।

খ) নিরাপত্তা
গ্রাহকের অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রীর নিরাপত্তা প্রদান করা ব্যাংকের একটি উদ্দেশ্য।

গ) উপদেষ্টা ও পরামর্শদাতা
ব্যাংক যখন কোন প্রকল্পে অর্থ লগ্নি করে, তখন প্রকল্পের লাভজনকতা মূল্যায়ন করে সেখানে বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে প্রকল্পেকে সাহায্য করে থাকে। এছাড়াও আরো বিভিন্ন রকম আর্থিক এবং অর্থ সংক্রান্ত পরামর্শ ব্যাংক গ্রাহককে দিয়ে থাকে।

ঘ) প্রতিনিধি
সেবার মূল্য গ্রহণের বিনিময়ে গ্রাহকের পক্ষে ব্যাংক প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে থাকে। এটি ব্যাংকের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য। ব্যাংকের পক্ষে ব্যবসায়িক চুক্তিতে অংশগ্রহণ করে, বিনিময় বিলে সই করে এবং বিভিন্ন ধরনের অর্থ সংগ্রহ করে থাকে।

ঙ) অর্থ স্থানান্তর
ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে গ্রাহকের নির্দেশ মোতাবেক বিভিন্ন ধরনের অর্থ দেশে-বিদেশে স্থানান্তর করে থাকে।

চ) জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও সহজীকরণ
গ্রাহকের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নকল্পে ব্যাংক বিভিন্ন ধরনের নতুন নতুন সেবা ও পণ্য সৃষ্টি করে থাকে। ক্রেডিট কার্ড দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত গ্রাহক নগদ টাকা ছাড়াই পণ্য ক্রয় করতে পারে। এটিএম মেশিন থেকে নগদ টাকা তোলা যায়।

উপরোক্ত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে ব্যাংকের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সমূহকে নিম্নরূপে বর্ণনা করা যায়-
১) সর্বাধিক লাভের জন্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ পরিচালনা করার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা।
২) নিম্ন সুদ হারে জনসাধারণের কাছ থেকে সঞ্চয় বা অলস অর্থ সংগ্রহ এবং উচ্চ সুদ হারে এই অর্থ জনসাধারণকে ধার বা লোন দেয়া।
৩) মানুষের মধ্যে সঞ্চয় প্রবণতা তৈরি করা।
৪) মানুষের সচ্ছলতা আনয়ন করার জন্য অর্থ বিনিয়োগে তাদের অনুপ্রাণিত করা।
৫) অর্থ সরবরাহ বাড়ানোর বিকল্প হিসাবে অর্থের মাধ্যমে অর্থোপার্জন করা।
৬) সঞ্চয়ের মাধ্যমে মূলধন তৈরি করা।
৭) বিনিয়োগ দ্রুততর করা।
৮) গ্রাহকদের সেবা প্রসারিত করা।
৯) অর্থ বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
১০) অর্থনৈতিক বিষয়ে সরকারকে সহযোগিতা ও পরামর্শ প্রদান করা।
১১) ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য সরকারকে সহায়তা করা।
১২) একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসাবে নোট এবং মুদ্রা ইস্যু এবং নিয়ন্ত্রণ করা।
১৩) একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসাবে বিনিময় হার বজায় রাখা এবং নিয়ন্ত্রণ করা।

Leave a Reply