নন ব্যাংকিং লেনদেনে শুধুই মজা!

0
1131

নন ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন করে অনেকেই এখন প্রতারণার স্বীকার হচ্ছেন। নন ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন করে কিভাবে সাধারণ জনগণ প্রতারিত হচ্ছেন তার কয়েকটি কেস স্ট্যাডি তুলে ধরা হলো-

কেস স্ট্যাডি-১
জনাব আবদুর রহিম সাহেব ৩৮ বছর স্কুল শিক্ষকতা করে অবসর নিয়েছেন কিছুদিন হল। পেনশনের যে টাকা পেলেন তা থেকে কিছু টাকা দিয়ে জমি কিনলেন। আর বাকী ১৪ লক্ষ টাকা ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করে রাখলেন। সে টাকায় মাসে মাসে যে মুনাফা আসে তা দিয়ে তার মাসিক খরচ হয়ে যায়। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখলেন ব্যাংক অনেক কম মুনাফা দিচ্ছে তাকে। এলাকার নাম করা একটা সমিতি দেয় প্রতি লাখে ২ হাজার করে। রহিম সাহেবের মাথায় হাত। যেখানে ব্যাংক তাকে দিচ্ছে লাখে ৫/৬ শত টাকা মাত্র! ব্যাংকে টাকা রেখে কি ভুলটাই না তিনি করেছেন!

আর দেরি না করে তিনি ব্যাংক থেকে সব টাকা তুলে নিয়ে সেই সমিতিতে রাখলেন। পরপর ৩ মাস ২৮ হাজার করে সুদ পেলেন তিনি। ব্যাংকের চেয়ে সমিতি কত্তো ভাল!

জনে জনে তিনি সেই সমিতির গুণ গেয়ে বেড়াতে লাগলেন। একজন সফল স্কুল শিক্ষকের কথায় অনেকে সমিতিতে টাকা রাখা শুরু করল। এজন্য রহিম সাহেব অবশ্য সমিতির কাছ থেকে একটা কমিশন পেয়ে বেশ খুশি। কিন্তু তার সব খুশি শেষ হতে বেশী দিন লাগল না। চার মাস পরেই সেই “জন হিতৈসী সমিতি” এলাকার “সুদ লোভী” মানুষ গুলোর ৬-৭ কোটি টাকা নিয়ে রাতা রাতি হাওয়া হয়ে গেল। ফিট ফাট অফিস, চেয়ার টেবিল, মোটা-মোটা ফাইল, সবই পড়ে আছে। শুধু “টাই ওয়ালা” লোকগুলো নাই! আর রহিম সাহেব? রহিম সাহেব টাকার শোকে স্টোক করে প্যারালাইজড হয়ে চিরতরে নির্জীব হয়ে গেলেন।

কেস স্ট্যাডি-২
শরিফা খাতুনের স্বামী শহরে গার্মেন্টস এ চাকরী করে যে বেতন পায় তা দিয়ে গ্রামের বাড়িতে তাদের ছেলে মেয়ের পড়া লেখার খরচসহ সংসার খরচ মোটামুটি চলে যায়। হাস-মোরগ, ছাগল পালন করে আরো বাড়তি কিছু আয় করেন শরীফা।

গ্রামের ঘরে ঘরে “বীমা” জোয়ার বইছে। বীমাতে মাসে মাসে টাকা রাখলে ১২ বছরে যে টাকা জমবে সুদ আসলে ১০ গুন দেবে…..বছর বছর বোনাস তো আছেই…বীমা করে কেউ হঠাৎ মারা গেলেও ১২ বছরে যে টাকা জমতো সেই পরিমান টাকা শোধ করবে বীমা কোম্পানি…আর এটা যেই সেই বীমা নয়- নামের সাথে “ইসলামী” শব্দটাও আছে…বীমার লোকেরা বলেছে “অমুক” ব্যাংকের সাথে তাদের সরাসরি সম্পর্ক, বীমা করতে হলে আগে সেই ব্যাংকে একাউন্ট করতে হবে, বীমার বোনাসের টাকা সেই ব্যাংকের একাউন্ট থেকে তুলতে হবে, গ্রামের হাজার হাজার অশিক্ষিত অর্ধ শিক্ষিত মানুষ বীমার এই সব প্রচারনার ফাঁদে পড়ে বীমাতে লেজ আটকালো!

শরীফার এক শিক্ষিত আত্মীয়ও তাকে অনেক বুঝালেন- বীমাতে অনেক লাভ! শেষ পর্যন্ত শরীফা খাতুন বীমায় নাম লেখালেন। মাসে ২ হাজার করে ২ বছর চালানোর পর হাঁফিয়ে উঠলেন, এর মধ্যে এক বছরে ২৫০০ টাকা বোনাস পেয়েছেন- সেই টাকার চেক নিয়ে যে দৌঁড়া-দৌঁড়িটা করতে হয়েছে তা জনমের শিক্ষা হয়ে গেল! খেয়ে হোক না খেয়ে হোক কিস্তির টাকা গ্যাপ দেয়া যাবে না। আর ১২ বছরের আগে ভাংলে মুল টাকাও পাওয়া যাবে না- এই তথ্যগুলি অবশ্য বীমা কোম্পানী কৌশলে তাদের কাছে গোপন রেখেছে- যেটা শরীফারা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে! এভাবে খেয়ে না খেয়ে শরীফা বীমার কিস্তি চালালো আরো ৫ বছর।

এদিকে শরীফার স্বামীর চাকরী নেই গত ২ মাস। গার্মেন্টস এ গন্ডগোল লেগে দুইমাস বন্ধ। শরীফার মাথায় হাত। এখন বীমার কিস্তি চালাবে কি করে? বীমা করেছে স্বামীকে না জানিয়ে। এখন কিস্তি চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দুমাস গ্যাপ পড়ে গেল…আরো দুমাস পর তার স্বামী শহর ছেড়ে গ্রামে চলে এলো- চাকরী নেই, আয় নেই। ভিটে মাটি ছাড়া তাদের কোন জমিও নেই। দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে শরীফা চারদিকে অন্ধকার দেখতে লাগলেন। ভাবলেন বীমা ভেঙ্গে যে টাকা পাবে তা দিয়ে স্বামীকে একটা অটো কিনে দেবে।

কিন্তু বীমা ভাংতে গিয়ে “তাল পড়ে” মাথা ভাংগার মতো অবস্থা হলো তার। বীমা ওয়ালারা বললো- ৭ বছর চালিয়েছেন আর ৫ বছর চালালে তো আপনি অনেক টাকা পাবেন, এখন ভাংলে অনেক কম পাবেন। কত কম পাবে সেটা তারা কিছুতেই বলছে না…এই প্রসেস সেই প্রসেস- বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে বীমার লোকেরা শরীফাকে ৩ মাস ঘোরালো। পেটে ভাত নেই- এতো হাটা হাটি আর সহ্য হয় না- শরীফা প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল- “টাকা যত কম হোক তবু আমার টাকাটা দিন, ভাই আমি খুব কষ্টে আছি, আমি আর পারছি না….

অবশেষে শরীফা বীমা-কল থেকে তার “আঁটকে যাওয়া লেজ” ছাড়াতে সক্ষম হলো, যদিও প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। সে টাকা জমিয়েছে ১,৫২,০০০/- পেয়েছে ১,২২,০০০/-! বীমা যে কত্তো মজা গো! কত্তো মজা!! যদি এই টাকা সে ব্যাংকে জমাতো তাহলে কমছে কম ২৫০০০০+ টাকা পেতো।

কেস স্ট্যাডি-৩
গোপাল চন্দ্র নাথ। বাজারের সবচেয়ে বড় স্বর্ণ ব্যবসায়ী। দীর্ঘ আট বছর একই জায়গায় ব্যাবসা করে আসছেন। ইতি মধ্যে খুবই বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছেন। কম বেশী সবারই জানা- স্বর্ণ ব্যবসায়ী মনেই সুদের কারবারী, স্বর্ণ বন্ধক রেখে টাকা দেন। মোটা অংক সুদ আসল শোধ করেই স্বর্ণ ফেরত আনতে হয়। না হলে সব স্বর্ণই রেখে আসতে হয়। তবে সুদের হার অন্যান্য স্বর্ণকার থেকে একটু কম এবং দাদার অমায়িক ব্যবহারের কারণে সবাই দাদার কাছেই যায়।

তো এলাকার অনেকে নগদ টাকার প্রয়োজন পড়লে গোপাল দাদার শরণাপন্ন হন। দাদার কাছে স্বর্ণ বন্ধক রেখে টাকা আনেন। এলাকার কোন পরিবারের কোন মহিলার কত ভরি স্বর্ণ আছে সবই গোপাল দাদার নখদর্পে। বিপদে পড়ে এলাকার শত শত মানুষ শত শত ভরি স্বর্ণ দাদার কাছে বন্ধক রেখে টাকা নিয়েছে।

সেদিন টাকার প্রয়োজনে কয়েকজন দাদার দোকানে গিয়ে দেখলেন- দোকান বন্ধ। দাদা নাকি ইন্ডিয়া গেছেন। একজন হিন্দু মানুষ ইন্ডিয়া গেছে এই ঘটনা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার আমাদের দেশে। (সবাই ভাবে- তার আত্মীয় বাড়ি বেড়াতে গেছে। আর মুসলমান ইন্ডিয়া গেলে ভাবে চিকিৎসার জন্য গেছে!)

তো দাদা ইন্ডিয়া গেছে খুবই স্বাভাবিক কথা। এদিকে স্বর্ণ রেখে টাকা নেয়ার জন্য লোকেরা হন্য হয়ে খুঁজছে দাদাকে। দিন, সপ্তাহ, মাস যায়- দাদা ইন্ডিয়া থেকে ফেরে না! এবার যারা আগেই স্বর্ণ বন্ধক রেখেছিলেন তারাও অস্থির হয়ে ওঠেন- দাদার খোঁজে আসে….কিন্তু দাদা আর ফিরে আসেন নি! এলাকার মানুষের প্রায় সাড়ে ৩০০ ভরি স্বর্ণ নিয়ে দাদা চিরতরে ইন্ডিয়া তার দাদা বাড়ি চলে গেলেন….!!

(লেখার কলেবর বড় হয়ে যাচ্ছে, তাই এখানে শেষ করছি। আরো কেস স্টাডি ২য় পর্বে লিখবো- ইনশাআল্লাহ। যদি আপনার মনে হয় নন-ব্যাংকিং এর মজার মজার(!) ঘটনাগুলো মানুষকে জানিয়ে সচেতন করা উচিত তাহলে এই লেখাটা কপি করে বা শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন)।

কার্টেসিঃ YBS Shahin

Leave a Reply