ইসলামিক ব্যাংকিং এ মুদারাবা পরিচিতি ও ইতিহাস

0
627

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ মুদারাবা আমানত সংগ্রহের বহুল আলোচিত একটি ইসলামী নীতি। ইসলামী ব্যাংক সমূহ এই নীতির ভিত্তিতে সঞ্চয়ী হিসাবে আমানত গ্রহণ করে। এ নীতির আলোকে ব্যাংক মুদরাবা আমানতকারীদের সাথে এমন এক প্রকার চুক্তিতে হয় যে, আমানত ব্যবহারে ব্যাংকের পূর্ণ অধিকার থাকবে এবং এই আমানত ব্যবহার করে ব্যাংক যে মুনাফা অর্জন করবে তা একটি সম্মত অনুপাতে ব্যাংক ও আমানতকারীদের মাঝে বণ্টিত হবে।

➡ শাব্দিক পরিচিতি
‘মুদারাবা’ শব্দটি আরবী-المضاربة, এর শব্দমূল-ض، ر، ب) ضَرْب) , অর্থ: কষ্ট দেয়া, আঘাত করা, আক্রমণ করা। উক্ত মূল অর্থের সাথে সাদৃশ্য রেখে ব্যবসা বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে ভূ-পৃষ্টে সফর বা বিচরণ করাকেও ‘ ضَرْب’ বলা হয়।

এ অর্থে কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
وإِذا ضَرَبْتُم في الأَرْضِ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَقْصُرُوا مِنَ الصَّلاَةِ
“তোমরা যখন যমীনে সফর কর এবং তোমাদের আশংকা হয় যে, কাফিরগণ তোমাদেরকে পেরেশান করবে তখন সালাত কসর করলে তাতে তোমাদের কোনও গুনাহ নেই।” -সূরা নিসা: ১০১

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে-
وَآخَرُونَ يَضْرِبُونَ فِي الأرض يَبْتَغُونَ مِن فَضْلِ الله
“তোমাদের মধ্যে কিছু লোক এমন থাকবে যারা আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানের জন্য (ব্যবসা বা আয় উপার্জনের উদ্দেশ্যে) পৃথিবীতে সফর করবে।” -সূরা মুযযাম্মিল: ২০

আমাদের আলোচিত ‘মুদারাবা’র মধ্যে উক্ত অর্থই নিহিত। কারণ, সাধারণত মুদারিব বা ব্যবসায়ী ব্যবসার উদ্দেশ্যে সফর করে থাকে। বিশেষত আরব জাতি আমদানি নির্ভর দেশ ছিল। তাই তাদেরকে প্রায়ই ব্যবসার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশে সফর করার প্রয়োজন হত। সূরা কুরাইশে স্পষ্ট ইরশাদ হয়েছে, আরবরা শীতকালে শামে ও গ্রীষ্মকালে ইয়েমেনে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে সফর করত।

মুদারাবার আরেকটি নাম, ‘মুকারাযাহ’ (المقارضة) বা ‘ক্বিরায’ (القراض)। এর শাব্দিক অর্থ, পৃথক করা, বিচ্ছিন্ন করা।
যেহেতু পূঁজিদাতা তার সম্পদের একটি অংশ ব্যবসায়ীর জন্য পৃথক করে প্রদান করে তাই একে ‘মুকারাযা’ বা ‘কিরায’ বলা হয়। তবে এ নামটির অতীতে প্রচলন থাকলেও এখন আর নেই।

➡ পারিভাষিক পরিচিতি
তুরুস্কে ত্রয়োদশ শতাব্দিতে উসমানি সালতানাতের অধীনে রচিত ‘ইসলামী বিধিবদ্ধ আইন’-এর ১৪০৪ নং ধারায় মুদারাবার পরিচিতি পেশ করা হয়েছে এভাবে-
المضاربة نوع شركة على أن رأس المال من طرف،والسعي والعمل من طرف آخر، ويقال لصاحب رأس المال رب المال، وللعامل المضارب
“মুদারাবা এক প্রকার অংশীদারী ব্যবসা। এতে চুক্তি হয়, এক পক্ষ মূলধন যোগান দিবে। আর অপর পক্ষ ব্যবসার উদ্দেশ্যে শ্রম দিবে। মূলধন যোগানদাতাকে ‘রব্বুল মাল’ বলা হয়। আর ব্যবসার কাজ যে করে তাকে ‘মুদারিব’ বরা হয়।”

AAOIFI এর ১৩ নং শরীয়াহ স্ট্যান্ডারের ধারা: ২ -এ মুদারাবার পরিচিতি দেয়া হয়েছে এভাবে-
المضاربة شركة في الربح بمال من جانب (رب المال)، وعمل من جانب آخر (المضارب).
“মুদারাবা হল, মুনাফায় অংশীদারির চুক্তি। চুক্তিটি সম্পন্ন হয় এভাবে যে, এক পক্ষ (রব্বুল মাল) মূলধন যোগান দেয়। আর অপর পক্ষ (মুদারিব) শ্রম বা ব্যবসায়িক কাজ আঞ্জাম দেয়।”

উক্ত সংজ্ঞায় কীসে অংশীদারিত্ব তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাই এ সংজ্ঞাটাই অগ্রগণ্য।
বাংলায় সহজে এক কথায় বলতে পারি, ‘একপক্ষীয় মূলধনী অংশীদারী কারবার’।

➡ মুদারাবার ইতিহাস
মুদারাবা ব্যবসা ইসলাম উদ্ভাবন করেছে বিষয়টি এমন নয়। ইসলামের আগেও এর প্রচলন ছিল। ইসলাম এসে মৌলিকভাবে তা বহাল রেখেছে। আর এর সাথে মানব কল্যাণ নিশ্চিত করতে কিছু শর্তারোপ প্রদান করেছেন।

ইমাম ইবনু আব্দিল বার রহ. (মৃ. ৪৬৩) লিখেছেন-
القراض مأخوذ من الإجماع الذي لا خلاف فيه عند أحد من أهل العلم، وكان في الجاهلية فأقره الرسول صلى الله عليه وسلم في الإسلام
“মুদারাবার অনুমোদনটি ইজমা থেকে গৃহিত। এর বৈধতার ব্যাপারে জ্ঞানীদের মধ্যে কারো কোন দ্বিমত নেই। জাহেলী যুগে এর প্রচলন ছিল। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা ইসলামে বহাল রেখেছেন।” -(আল ইছতিযকার, খ. ৭, পৃ. ৩)

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. আরো বিস্তারিতভাবে লিখেছেন- ‘জাহেলী যুগে মুদারাবা ব্যবসা ছিল। বিশেষত কুরাইশ গোত্রের লোকদের মাঝে এর প্রচলন ছিল। কারণ, আরব জাতি ব্যবসা নির্ভর জাতি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওতের পূর্বে অন্যের সম্পদ দ্বারা মুদারাবা ব্যবসা করেছেন। যেমন হযরত খাদিজা রা. এর সম্পদ দ্বারা মুদারাবা ব্যবসা করেছেন। বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে শাম থেকে ফেরৎ আবু সুফিয়ানের যে বাণিজ্য কাফেলা মুসলমান কর্তৃক বাধার সম্মুখিন হয়েছিল, তাতে আবু সুফিয়ানের সাথে মক্কার অনেকেরই মুদারাবা চুক্তি ছিল। এরপর যখন ইসলাম এসেছে তখন মুদারাবাকে বহাল রাখা হয়েছে। তাই দেখা গেছে, সাহাবীগণ অন্যের সম্পদ দিয়ে মুদারাবা ব্যবসা করেছেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে নিষেধ করেননি। নবীর সামনে হওয়ার পরও নিষেধ না করাটাও সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং এটি সুন্নাহ দ্বারাও প্রমাণিত।’ -(ফাতাওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়া, খ. ১৯, পৃ. ১৯৫)।

কার্টেসিঃ সংগৃহীত

Leave a Reply