ইসলামী ব্যাংকিং: তিন দশকে যেভাবে বুঝেছি- দুটোই তো ১২% পার্থক্য কি?

0
1881

২০১৪ এর শেষ দিকে যতদূর মনে পড়ে। ছোট বোনের ছেলের বিয়েতে গেলাম নারায়নগঞ্জ শহরের একটি কমিউনিটি সেন্টারে। প্রধান কার্যালয় থেকে যাওয়ার পথে জোহরের নামাজের সময় হলো। ফতুল্লা শাখায় গেলাম নামাজ আদায় করতে এবং একই সাথে একটু দেখার জন্যও। হাবীবুল্লাহ আল আমীন শাখার ব্যবস্থাপক। গেট থেকেই সবার আন্তরিক অভ্যর্থনা পেলাম।

ম্যানেজার সাহেবকে বললাম, নামাজ আদায় করবো এবং আপনাকে সহ বিয়েতে যোগদান করবো। কমিউনিটি সেন্টারের নাম শুনে বললেন, ‘এটার মালিক আমাদের একজন গ্রাহক যার একটি বিনিয়োগ প্রস্তাব বিবেচনাধীন আছে এবং তারা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের গ্রাহক ছিলেন। আপনি সম্মতি দিলে ওনাদেরকে দাওয়াত দিতে চাই। বললাম, ‘খুবই আনন্দের কথা, আমরা কৃতার্থ হবো। অবশেষে বিয়ের ভেন্যুতে পৌঁছলাম।

খেতে খেতে ভদ্রলোক বলছিলেন, “স্যার! আপনাদের ব্যাংকের সেবার মান আমাদের কাছে খুবই ভাল লেগেছে। তবে আমি একটা জিনিস এখনও বুঝতে পারিনি প্রচলিত ব্যাংকের সাথে পার্থক্য কোথায়? আপনারাও ১২% লাভ নিবেন, প্রচলিত ব্যাংকও ১২% নেয়। ক’দিন আগে একটি বহুজাতিক ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং সংক্রান্ত এক অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেয়েছিলাম। সেখানে জিজ্ঞেস করায় তারা বলেছে দুটোই এক জিনিস। তবে আমরা ইসলামী ব্যাংকিংয়ের কথা বললে গ্রাহকদের সাড়া পাই ভাল। বললাম, তাদের ব্যাংকের সবাই সম্ভবত এমন ঢালাও মন্তব্য করবেন না। আমার জানা মতে, তাদের একটা বিজ্ঞ শরী’আহ কাউন্সিল আছে যেখানে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী স্কলার আছেন। হতে পারে যিনি অনুষ্ঠানে কথা বলেছিলেন তিনি এ বিষয়ে যথার্থ ধারনা রাখেন না বিধায় গতানুগতিক জবাব দিয়েই দায় সেরেছেন।

আরও বললাম, খাবার টেবিলে যদি অর্থনীতির তত্ব কথা, যেমন মুদ্রা বেচাকেনা করা নিষিদ্ধ কেন অথবা সুদ কিভাবে সম্পদ স্বল্প সংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভুত হয় ইত্যাদি বিষয়ে বলতে শুরু করি তাহলে হয় খাবার ভাল লাগবে না; না হয় কথা ভাল লাগবে না। আবার এমন একটা প্রশ্ন করেছেন যেখানে নিরব থাকাও সম্ভব নয়। চলুন গল্পে গল্পে কিছু বুঝার চেষ্টা করি। আপনি আমাদের ব্যাংক থেকে বাইয়ে মুয়াজ্জল বা মোরাবাহা পদ্ধতিতে দুই কোটি টাকার বিনিয়োগ সুবিধা ভোগ করেন (যতদূর মনে পড়ে ওনার প্রস্তাবিত বিনিয়োগের লিমিট এমনই ছিল) এবং এখানে দ্রব্যের উপর ব্যাংক বারো শতাংশ লাভ ধার্য করেছে। অপরপক্ষে প্রচলিত ব্যাংকেও আপনার ঋণ সুবিধা বা লিমিটের পরিমান দুই কোটি টাকা এবং সুদের হার বারো শতাংশ। আপনি রড সিমেন্টের ব্যবসায়ী।

প্রচলিত ব্যাংকটির ঋণ সুবিধার বিপরীতে বলা আছে যে, রড সিমেন্টের ব্যবসা করার জন্যই আপনাকে এই ঋণ দেয়া হয়েছে। আপনি একটি চেক কেটে অথবা একাধিক চেকের মাধ্যমে এই টাকা উত্তোলন করলেন এবং রড সিমেন্ট ক্রয় করার পরিবর্তে বিদেশ ভ্রমন বা পূর্বে সৃষ্ট কোনো ঋণ পরিশোধ করলেন বা অন্য কোনো কাজে ব্যয় করলেন। এরূপ করার ক্ষমতা আপনার আছে, ব্যাংক আপনাকে নিবারন করবে না বা করতে পারবে না। বছর শেষে আপনি আপনার নিজস্ব সম্পদ থেকে চব্বিশ লক্ষ টাকার সুদসহ ব্যাংকের দেনা পরিশোধ করলেন; যদিও প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সুদের হিসাব এমন সরল নয়, তবুও আলোচনার সুবিধার্থে ধরে নিলাম। ব্যাংক কিন্তু সন্তুষ্ট আপনার লেন দেনে।

কিন্তু এখানে লক্ষনীয় যে, সুদের চব্বিশ লক্ষ টাকার বিপরীতে কোনো সম্পদ বা সেবা (Goods & Services) বাজারে আসে নি। কেননা আপনি ঋণের টাকা দিয়ে বিদেশ ভ্রমন করেছেন বা পূর্বে সৃষ্ট দেনা পরিশোধ করেছেন। এখানে ঋণের বিপরীতে চব্বিশ লক্ষ টাকা বাজারে অতিরিক্ত এসেছে কোনো পন্য বা সেবা ছাড়াই যেটি শুধুমাত্র মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে। সবাই যে ঋণের টাকা দিয়ে এমনটা করে সেটা বলছি না; কিন্তু করার সুযোগ থাকে এবং কম বেশি টাকা এমনভাবে ব্যবহৃত হয় এটি বাস্তবতা।

এবারে আসুন ইসলামী বিনিয়োগ পদ্ধতির কথায়। বাইয়ে মোরাবাহা বা মুয়াজ্জল পদ্ধতিতে ব্যাংক আপনাকে দুই কোটি টাকার বিনিয়োগ সুবিধা মঞ্জুর করলো। এখানে ব্যাংক আপনার হাতে একটি নগদ টাকাও দিবে না বা দেয়ার সুযোগ নেই। বাই মানেই হচ্ছে ক্রয় বিক্রয়। আপনার চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংক আপনাকে দুই কোটি টাকার রড সিমেন্ট বাজার থেকে কিনে আপনার কাছে বিক্রয় করবে। লাভের হার বারো শতাংশ অর্থাৎ এক বছরে পরিশোধ করবেন চব্বিশ লক্ষ টাকা লাভসহ। যখনই ফ্যাক্টরী থেকে দুই কোটি টাকার পন্য খালাস হবে, তখনই সেই কারখানা নতুন করে উৎপাদনে যাবে, কাঁচামাল আমদানী বা ক্রয় হবে। এখানে বিক্রয়ের বিপরীতে কোম্পানী কিছু লাভ করবে, নতুন কাঁচামাল ক্রয়ে এর বিক্রেতা কিছু লাভ করবে, পন্য পরিবহনে ট্রাক বা কার্গো ব্যবহৃত হবে এবং তারা কিছু আয় করবে, শ্রমিক নিয়োজিত করতে হবে লোডিং এবং আনলোডিং করার কাজে, তারা মজুরী পাবে। এভাবে একটি প্রকৃত ক্রয় বিক্রয়ের প্রভাব বাজারে অনেক ক্ষেত্রে পড়বে এবং লভ্যাংশটি ছড়িয়ে পড়বে।

যেহেতু ইসলামী পদ্ধতিতে ক্রয় বিক্রয় নিশ্চিৎ করা ব্যবসা বৈধ বা হালাল হওয়ার পূর্বশর্ত, তাই এখানে মূলধন অন্যত্র ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ নেই। এ জন্যই এ পদ্ধতি শ্রেষ্ঠ এবং প্রচলিত ব্যাংকের সাথে পার্থক্যের এটি একটি দিক। এর বাইরেও অনেক তাত্বিক দিক রয়েছে, যেগুলো আমাদের ম্যানেজার সাহেব আপনাকে বুঝিয়ে বলবেন অথবা আমার অফিসে আপনাকে স্বাগতম এ বিষয়ে আলোচনার জন্য। ভদ্রলোক বললেন, ‘স্যার! আমার প্রশ্নের শতভাগ উত্তর পেয়ে গেছি, এ বিষয়ে আমার কোনো অস্পষ্টতা নেই এখন।’

কেউ বলতেই পারে যে, ইসলামী ব্যাংকগুলোও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গ্রাহককে নগদ টাকা নেয়ার সুযোগ করে দেয় এবং মালামাল বা পন্য ক্রয় বিক্রয় সঠিক ভাবে হয় না। আমি বলবো সেটি পদ্ধতির দোষ নয়, ব্যাংকারদের অজ্ঞতা বা ব্যক্তিগত ত্রুটি। ইসলামী পদ্ধতিটি পরিপূর্ন, ত্রুটিমুক্ত এবং বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে বাধ্য। এখানে মূল্যস্ফীতির কোনো সুযোগ নেই, কেননা যে পরিমান লভ্যাংশ বাজারে এসেছে, সমপরিমান দ্রব্য এবং সেবা (Goods & Services) বাজারে এসেছে।

লেখকঃ নুরুল ইসলাম খলিফা

Leave a Reply