ইসলামি ব্যাংকিং ও প্রচলিত ব্যাংকিং

0
1255

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ ইসলামি ব্যাংকিং এবং প্রচলিত ধারার ব্যাংকিংয়ের মধ্যে অনেক ধরনের পার্থক্য আছে। প্রথম কথা হলো, এটা মেনে নিচ্ছে আগেই যে, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের যে নতুন ধারা আজ দেখছি, আধুনিক ব্যাংক সৃষ্টিতে এভাবে ব্যাংকিং পদ্ধতি গড়ে ওঠেনি; যদিও মুদারাবা, মোশারাকা পদ্ধতি ছিল, বাই মুয়াজ্জাল ছিল, বাই সালাম ছিল। কিন্তু বর্তমানে যে ধরনের ব্যাংকিং দেখছি, এই ধরনের ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান মুসলিম বিশ্বে গড়ে ওঠেনি। এমনকি আব্বাসীয় শাসনের সময়েও নয়। কিন্তু আধুনিক পশ্চিমা পদ্ধতি গড়ে ওঠে আরো ২০০ বছর আগে। এটাও সত্য কথা, Money Lender পদ্ধতি থেকে শুরু করে যারা মানি লোন করে, সুদখোর টাইপের যারা কাজ করত, আস্তে আস্তে সেটা ব্যাংকে পরিণত হয়। সেই ব্যাংকগুলোই আলটিমেটলি মুসলিম বিশ্বে চলে আসে। পরে যখন স্বাধীনতা আন্দোলন হলো এবং মুসলিম দেশগুলো স্বাধীন হতে থাকে, তখন আমরা যারা ইসলামকে ভালোবাসতাম, আমাদের মনে হলো- সুদভিত্তিক ব্যাংকিং তো হারাম; এর থেকে বাঁচার রাস্তা বের করা যায় কি না; আমরা কি তা করতে পারি না?

এ সময় চিন্তার ক্ষেত্রে একটি আন্দোলন শুরু হলো যে, আমরা কী করতে পারি? সৈয়দ আবুল আ’লা মওদুদী এবং অন্যান্য চিন্তাবিদ এ ব্যাপারে কিছু লেখালেখি করেছেন। কিন্তু তারা মূলত ব্যাংকার ছিলেন না। তারা ছিলেন এক ধরনের তাত্ত্বিক। সেই অবস্থায় নতুন যে একটি ব্যাংকিং আন্দোলন শুরু হলো, এর নেতৃত্ব দিলেন একদল ব্যাংকার, যারা ব্যাংকিং বোঝেন, ইসলামি অর্থনীতি বোঝেন। আমরা জানি, ১৯৬১ সালের দিকে প্রথম ইসলামী ব্যাংক গড়ে ওঠে এবং সেই ধারা এ পর্যন্ত চলে আসছে। বর্তমানে বলা হয়, বিশ্বের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ব্যাংক হচ্ছে ইসলামী ব্যাংক।

বর্তমান দুনিয়ায় দুটো ব্যাংক স্টিম আছে, একটি হচ্ছে সাধারণ ব্যাংকিং যার মূল ভিত্তি হচ্ছে সুদের মাধ্যমে ডিপোজিট নেয়া এবং ইনভেস্ট করা। এর পরিবর্তে আরেকটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা চলে এসেছে। সেটা ইসলামভিত্তিক। মুসলিম চিন্তাবিদদের প্রচেষ্টায় তা গোটা মুসলিম বিশ্বে আস্তে আস্তে বিস্তার লাভ করছে এবং ইউরোপ আমেরিকার কোনো কোনো দেশেও বিস্তার লাভ করেছে। এটাকে বিশ্বব্যাপী একটি দ্বিতীয় ধারা (Second Steam) হিসেবে মেনে নেয়া হয়েছে।

এ দুই ধরনের ব্যাংকের পার্থক্য অনেক। একটি পার্থক্য হলো ইসলামী ব্যাংক ইসলামভিত্তিক। অপর দিকে আধুনিক ব্যাংকিং সেক্যুলারভিত্তিক, এর পেছনে কোনো ধর্ম কাজ করছে না। না ইসলাম ধর্ম, না খ্রিষ্টান ধর্ম, কোনো ধরনের কাজ করছে না। দ্বিতীয়ত, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে নৈতিকতা রয়েছে। ইসলামের নৈতিক মূল্যবোধ, ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। কিন্তু সেক্যুলার ব্যাংকিংয়ের পেছনে সেই ফেস ভ্যালু (Face value) নেই। এখানে মূল কথা হচ্ছে, ব্যবসা করা এবং সুদের মাধ্যমে লাভ করা। মনে করা হয়, যত বেশি সুদ নেয়া যায়, তত ভালো এবং তত বেশি লাভ হয়। এই চিন্তাধারাটি কাজ করছে।

ইসলামি ব্যাংকিংয়ে সুদকে বাতিল করে অন্যান্য পদ্ধতি (Mechanism)- বের করা হয়েছে। এখানে সুদকে ঘৃণা করা হয়, অন্যান্য মেকানিজম যেটা শুরুতে বলেছি, বাই মুয়াজ্জাল, মুদারাবা, মুশারাকা, বাই সালাম, ইজারা- এ ধরনের কিছু পদ্ধতি একত্র করা হয়েছে।

আর মূল্যবোধের মধ্যে আছে, শুধু মুনাফা করাই (Profit making) ইসলামি ব্যাংকিংয়ের মূলনীতি নয়। যদি মূল্যবোধ থাকে সেটা আমাদের মূল্যবোধ; যদি ঘাটতি (Gaps) থাকে সেটা আমাদের ঘাটতি।
ইসলামি ব্যাংকিংয়ের মূল লক্ষ্য হচ্ছে-মানবজাতির মধ্যে চেতনা সৃষ্টি করা, বঞ্চনা দূর করা। Islamic Banking is an instrument of Islam- এটা ইসলামের একটি বড় হাতিয়ার বা উপাদান (instrument).

ইসলাম অর্থনৈতিক বঞ্চনা দূর করতে চায়। দারিদ্র্য দূর করতে চায়, সম্পদের সুষম না হলেও যতটা সম্ভব উত্তম বণ্টন করতে চায়। ইসলামের যত Objective আছে, চরিত্রের উন্নয়ন করতে চায়, ভালো জিনিসের উন্নতি এবং মন্দ বিষয়গুলো বন্ধ করতে চায়। সোজা কথা, Islamic Banking is not a neutral value thinking. ইসলামী ব্যাংক মূল্যবোধভিত্তিক, মূল্যভিত্তিক, মূল্যমানভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান এবং ইসলামের একটি বড় ইন্সট্রুমেন্ট। এ উপাদানের মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ, অর্থনীতিকে ভালো করতে চায়।
এ দিক থেকে চিন্তা করলে, ইসলামি ব্যাংকিং এবং আধুনিক ব্যাংকিংয়ের আকাশ-পাতাল পার্থক্য। সেক্যুলার ব্যাংকিংয়ের কাজ হচ্ছে লাভ করা, এর মধ্যে কোনো মূল্যবোধ নেই। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, মানবজাতির খেদমত বা মানবজাতির মধ্যে ন্যায় প্রতিষ্ঠা ভালো জিনিস তৈরি করা, মন্দ কাজ প্রতিরোধ করা। কিন্তু সেক্যুলার ব্যাংকিংয়ের মধ্যে এসব কিছুই নেই। এর মধ্যে আরো পার্থক্য রয়েছে।

ইসলামী ব্যাংক হলো- এমন একটা ব্যাংক যা বস্তুভিত্তিক, পণ্যভিত্তিক। পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে বা পণ্য ক্রয় করা হচ্ছে, না হলে পণ্য বানিয়ে দেয়া হচ্ছে, নয় বানিয়ে দেয়ার চুক্তি করা হচ্ছে। এমন বিষয় নেই যা সাধারণের জন্য ক্ষতিকর এবং কষ্টকর। এখানে জুয়ার ফাইন্যান্স করা সম্ভব নয়। আর একটা বিষয়, এখানে কম্পাউন্ডিং এর সুযোগ নেই। সুদের ওপর সুদ বসানোর সুযোগ নেই। এখানে যদি কেউ কর্জের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হন, সে ক্ষেত্রে প্রথম কথা হলো- ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে তার অসুবিধা হলে তাকে সময় দিতে হয়, যদি মনে হয় কার্জ গ্রহণকারী ফাঁকি দিচ্ছে, তবে জরিমানার (Penalty) ব্যবস্থা করা যাবে। আলেমরা বলেছেন, জরিমানা সঠিকভাবে হতে হবে যাতে করে সুদের মনোবৃত্তি সৃষ্টি না হয়। জরিমানা করে যে টাকা পাওয়া যাবে, সেটা ব্যাংক নিতে পারবে না, বরং তা দান খয়রাতে চলে যাবে। তাই বলা যায়, ইসলামি ব্যাংকিংয়ে চক্রহারের সুযোগ নেই। এটা অনেক ভালো সিস্টেম।

বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে সংক্ষেপে বলতে পারি যে, বর্তমানে ভালো। কিন্তু কিছু মহল থেকে অসুবিধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। কিছু মহল আছে, যারা না বুঝে, অজ্ঞতার বা হিংসা-বিদ্বেষের কারণে এর বিরোধিতা করছেন। কিন্তু আল্লাহ চাইলে আশা করি, অসুবিধাটা কেটে যাবে। আমি আশা করি যে তারাও এটা বুঝতে পারবেন, তাদের চিন্তাধারা এবং হিংসা-বিদ্বেষ সঠিক নয়, তাদের অজ্ঞতা দূর হয়ে যাবে। এই ব্যাংক বিশেষ কোনো পার্টির ব্যাংক নয়, এই ব্যাংক নির্দিষ্ট কোনো পার্টিকে সমর্থন করে না। এই ব্যাংকের Client হচ্ছেন সব পার্টির মানুষ। এর ইনভেস্টমেন্ট যাচ্ছে সব দলের মধ্যে, সব ধরনের লোকের কাছে। এটা জনগণের ব্যাংক, এটা সবার ব্যাংক, এটা শুধু মুসলমানদের ব্যাংক নয়, এটা সবার ব্যাংক।

আমাদের দেশে কিছু প্রচলিত ব্যাংক পুরোপুরি ইসলামী ব্যাংক হিসেবে রূপান্তরিত হচ্ছে এবং অনেক ব্যাংক ইসলামিক ব্যাংকিং উইং চালু করছে- এর পেছনে অনেক কারণ আছে। কেউ চান ইসলামী ব্যাংক হোক, কেউ বলেন যে, পুরোপুরি ইসলামী ব্যাংক করার দরকার নেই বরং কিছু ইসলামি উইং চালু করুন। প্রতিটি ব্যাংকে কিছু ইসলামি মানসিকতার লোক চাপ দিয়ে এটা করছেন। এটা কিন্তু তাদের জন্য ভালো তা বুঝতে হবে। এটা প্রমাণ করে যে, জনগণ ইসলামী ব্যাংক চায়। এটাও প্রমাণ করে যে, জনগণ এ ব্যাংকে আসতে চায়। আর এটাও প্রমাণ করে যে, যারা এসব ব্যাংকের উদ্যোক্তা তাদের একটা অংশ ইসলামিমনা। এর দ্বারা অনেক কিছুই প্রমাণিত হয়।

ইসলামি অর্থনীতির বর্তমান সাফল্যের অর্জন একদিনে হয়নি। ইসলামি অর্থনীতির মূল উৎস (Soure) আল কুরআন। যদি বলি, বণ্টনে ভালো হওয়া দরকার, এটাও কুরআনের। যদি বলি- সুদ হারাম, এটাও কুরআনের। যদি বলি ন্যায় (justice) প্রতিষ্ঠা করতে হবে, এটাও কুরআনের। সুতরাং, ইসলামি অর্থনীতির মূল ভিত্তি হচ্ছে কুরআন। রাসূলের (সা:) সুন্নাহও এ ক্ষেত্রে অনুসরণীয়।

আমাদের স্কলাররা এটা ডেভেলপ করেছেন। এ ক্ষেত্রে আগের যুগের অনেকের ভূমিকাই স্মরণযোগ্য। ইমাম গাজ্জালী লিখেছেন, তাদের ধরনে তারা লিখেছেন। ইমাম গাজ্জালী তার এহ্ইয়াউল উলুম বইতে লিখেছেন অর্থনীতি, ভোগ, ব্যবসায়-বাণিজ্য ইত্যাদি নিয়ে। এ ছাড়াও ইবনে তাইমিয়াসহ অনেক স্কলারের বই আছে। সেটা হয়তো আমিও জানি না এবং অনেক বই আছে যার বাংলায় অনুবাদ হয়নি।

আধুনিককালে ইসলামি অর্থনীতির জন্য যারা কাজ করেছেন, বিশেষ করে যাদের কথা উল্লেখ করতে হয়, তাদের মধ্যে মাওলানা মওদুদী অন্যতম। তিনি ইসলামি অর্থনীতির ওপরে লিখেছেন। তা ছাড়া যার কথা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকার মতো তিনি হলেন বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ড. ওমর চাপড়া। তার অনেক বইয়ের মধ্যে একাধিক বই বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রফেসর খুরশীদ আহমদ, নাজ্জাতুল্লাহ সিদ্দিকী- তারাও এ ক্ষেত্রে অনেক বই লিখেছেন।

বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রে বড় অবদান এম আজিজুল হক সাহেবের, যিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লি:-এর প্রতিষ্ঠাতা এমডি ছিলেন। পরে যারা অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে শরিয়াহ বোর্ডের একটা বড় অবদান রয়েছে। ইসলামী ব্যাংক কনসালটেটিভ ফোরাম কাজ করছে। এ ছাড়া কাজী হারুন নুর রশীদ, অন্যান্য ব্যাংকে যারা আছেন, বিভিন্ন সময়ে চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের সবার কমবেশি অবদান রয়েছে।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড দারিদ্র্যবিমোচনে অবশ্যই ভূমিকা পালন করতে পারে। ইসলামী ব্যাংক, ১৯৯৫ সালের দিকে Rural development program নামে একটি প্রজেক্ট শুরু করে; এর মডেল যদিও ড. মুহম্মদ ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক। অবশ্য এ ক্ষেত্রে গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের বিষয়টি পুরোপুরি বাদ দেয়া হয়েছে। এটি সুদের ভিত্তিতে টাকা জমা দেবে না বরং বাই মুয়াজ্জাল, বাই সালাম, বাই মুরাবাহা, বাই মুদারাবার মাধ্যমে টাকা লেনদেন করবে।

দারিদ্র্য ইসলামে হারাম। রাসূল (সা:) ভিক্ষাবৃত্তিকে হারামের কাছাকাছি বলেছেন। দারিদ্র্য দূর করা ইসলামে ফরজের সমতুল্য, ফরজে কেফায়া। উন্নয়ন ইসলামের একটা লক্ষ্য। কুরআনের আয়াতে শুধু আখেরাতের কল্যাণের কথাই বলা হয়নি, দুনিয়ার কল্যাণের কথাও বলা হয়েছে। দুনিয়ার কল্যাণও জরুরি। আর কল্যাণ মানেই হলো, প্রতিটি মানুষ খেয়ে থাকবে। সবার চাকরি ও উপার্জন প্রয়োজন। ব্যবসা লাগবে; বাণিজ্য লাগবে; কল্যাণের জন্য যেটা প্রয়োজন।

দারিদ্র্যবিমোচনে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকগুলো এবং ধনীক শ্রেণী উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। তারা যেন ইসলামি ব্যাংকিংকে ভালোভাবে জানেন। ইসলামি অর্থনীতিকে ভালোভাবে বোঝেন। ‘ফি সাবিলিল্লাহ’ মানে হচ্ছে জনগণের জন্য। আল্লাহকে কর্জ দেয়া মানে হচ্ছে দরিদ্রকে কর্জ দেয়া। তাই তাদের অবশ্যই ইসলামি অর্থনীতি, ইসলামিক ফাইন্যান্স, ইসলামিক ব্যাংকিং ভালোভাবে বুঝতে হবে। মনের মধ্যে দাতব্য (Charity) বিষয়টি থাকতে হবে। আল্লাহর অনুগত বান্দা হয়ে মৃত্যুবরণ করবো এবং আল্লাহর সীমা-পরিসীমা মেনে চলতে বাধ্য থাকবো।

লেখকঃ শাহ্ আব্দুল হান্নান

Leave a Reply