লকডাউনে ব্যাংক খোলা রেখে সামাজিক দূরত্ব কি সম্ভব?

0

বাংলাদেশের মানুষ যে কয়টা জায়গায় ঠাসাঠাসি বা ঘেঁষাঘেঁষি করে বা করতে বাধ্য হয়, তার একটা ব্যাংক। অন্যান্য জায়গার মধ্যে আছে গণপরিবহন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং উপাসনালয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, গণপরিবহন কার্যত বন্ধ আছে এবং মসজিদে না যাওয়ার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

অতি প্রয়োজনীয় দোকানপাট খোলা আছে, তবে পুলিশের ঠ্যাঙানির ভয়ে ক্রেতা ক্রমেই কমে আসছে। বাকি থাকলো ব্যাংক। যেহেতু নীতি নির্ধারকদের কাছে অর্থনীতি ধর্মনীতির চেয়েও বড়, তাই খোদার ঘর মসজিদ বন্ধ হলেও পুঁজিবাদের তোশাখানা ব্যাংক খোলা রাখতে হবে। বস্তুবাদের বাস্তবতা এখানেই।

এদিকে পুঁজিবাদের এক খয়েরখাঁ যুক্তি দিয়েছেন, বিপদের সময় টাকা পয়সার প্রয়োজন বেশি তাই ব্যাংক খোলা রাখা জরুরি। বটে, লুঙ্গির পেঁচে টাকা নিয়ে ঘুরতেন, সে-তো খুব বেশি দিন আগের কথা না। কোমরের ঘুন্সি খুলে বেল্ট পরলেই কি গতকাল ভুলে যেতে হবে? তিন মাসের খাবার মজুদ করতে পারেন, কাঁচা শাক-সবজি, মাছ-মাংস পর্যন্ত মজুদ করতে পারেন আর আলমিরার দেরাজে কিছু টাকা সংরক্ষণ করতে পারেন না!

যুক্তি হিসেবে তিনি আবার অন্যান্য দেশের নজির পর্যন্ত টেনেছেন, করোনার কারণে কোত্থাও ব্যাংক বন্ধ করা হয়নি। বিরাট যুক্তি। এরপরে আর কারো কোনো কথাই থাকতে পারে না। অবশ্যই পারে না, এতবড় মুখস্থ যুক্তির পরে আর কী বলার থাকে? তবে কি না ব্যাংকার নিজেকে মাঝে মাঝে মানুষ ভাবে, তাই কেউ কেউ একটু আধটু গাঁইগুঁই করে। সবাই না, সবাই না। আমি ভেবে অবাক হই, এত অল্প সময়ের মধ্যে এত দেশের খোঁজ তিনি নিলেন কী করে? প্রায় শ’দেড়েক দেশে পৌঁছে গেছে করোনা, এত দেশে তিনি কী করে গেলেন! তাঁর কাছে কি রাবণের রথ আছে না তখতে সুলাইমানি আছে?

অন্যদেশের নজির উপস্থাপনে অধমের কিঞ্চিৎ আপত্তি আছে। আপত্তির প্রথম কারণ, যারা ব্যাংক খোলা রেখেছে তারা করোনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। আমার জ্ঞানের পরিধি খুবই কম। বন্ধুবান্ধব মারফত ইতালি, স্পেন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের কথা জানি। যেহেতু গাব্রিয়েল বা জিব্রাইল আমার কাছে আসে না এবং বোরাকের মতো তেজ রাফতার কোনো বাহন আমার নেই, তাই করোনা আক্রান্ত সকল দেশের খবর বলতে পারলাম না। আশা করি উদাহরণের জন্য এই চারটা দেশ যথেষ্ট হবে। অতি উন্নত দেশ হওয়া স্বত্বেও তারা করোনার কমিউনিটি ট্রান্সমিশন ঠেকাতে পারেনি। আমার মনে হয়, না পারার একটা কারণ ব্যাংক খোলা রাখা।

আপত্তির দ্বিতীয় কারণ, ওসব দেশের ব্যাংক আর এদেশের ব্যাংকের প্রেক্ষাপট এক হলেও চিত্রপট এক না। ওসব দেশের অধিকাংশ লেনদেন হয় বুথে, ক্যাশে কদাচিত। তো বুথে যেসব লেনদেন হয় তার হিসাব কিতাব তো ভুতে মিলায় না, মিলাতে হয় ব্যাংকারকে। সুতরাং সেখানে সেজন্যেই ব্যাংক খোলা রাখা হয়। সুতরাং ঠাসাঠাসি বা ঘেঁষাঘেঁষির প্রয়োজন সেখানে পড়ে না। সামাজিক, অসামাজিক সব রকম দুরত্বই সেখানে বজায় রাখা সম্ভব।

কিন্তু এদেশের চিত্রপট কি সেরকম? এখানে কি সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা সম্ভব? এদেশে ব্যাংকের গ্রাহকেরা একে অপরের সাথে যতটা ঘনিষ্ঠ হয়, মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনের বেহায়া যুগলরা পর্যন্ত ততটা ঘনিষ্ঠ হয় না। ঘনীভূত জনতা একে অপরের সাথে লেপ্টে থাকে। সময়, সুযোগ ও রুচিবোধর অভাবে প্রায়ই একে অপরের গায়ের উপর নাক ঝাড়ে! গরমে, ঘামে হাঁচি-কাশি লেগেই আছে। ফলে, একের নাক মুখ নিসৃত বিন্দু বিন্দু জলকণা অন্যেরা নিজেরাও গ্রহণ করে, পরিবারের জন্যেও বহন করে। ফয়েজ ও বরকত থেকে কেউ বঞ্চিত হয় না।

বাঙালির ইতিহাসে নজির স্থাপনের কোনো নজির নাই, আছে শুধু নজির উপস্থাপনের। ব্যতিক্রম মাত্র দুটো, লখিন্দরের লোহার বাসর আর তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা। দুটোই ব্যর্থ হয়েছে। বাঁশের কেল্লা ব্যর্থ হয়েছিল কারণ এর ভিত্তি রচিত হয়েছিল আবেগের উপর। আবেগ ঈমানকে পোক্ত করে না দূর্বল করে এই ঘটনা থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে। লোহার বাসর ব্যর্থ হয়েছে ভিন্ন কারণে। স্বয়ং বিশ্বকর্মার সাহায্যে তৈরি করা এই ঘরে ফাঁক ছিল না বটে তবে ফোকর ছিল। সাপ ও সরীসৃপের দেবী মনসা সেই ফোঁকর দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন সুতানালি সাপ। ফলে ব্যর্থ হয় চাঁদ সওদাগরের সকল সতর্কতা। সাপের দংশনে মারা যায় লখিন্দর। তারপরে অনেক কাহিনী। মৃত স্বামী নিয়ে বেহুলার বেহাল দশা, সেসব থাক। কিভাবে সে ভেলায় চড়ে মৃত স্বামীকে নিয়ে ভেসে বেড়াল, কোথায় গিয়ে মনসার পালক মাতা নিতার সাক্ষাৎ পেল, কার সাহায্যে ইন্দ্রের সভায় গিয়ে কতক্ষণ নেচেছিল, চাঁদ সওদাগর কোন হাতে কোন ফুল ছুড়ে দিয়ে মনসার পুজো করেছিল, তা এখানে বাহুল্য।

তবে লকডাউনের ফলে বাংলাদেশটাও কি না লোহার বাসরে পরিণত হয়েছে, তাই দুচার কথা বলা। লখিন্দরের বাসরে ফাঁক নয় সামান্য ফোকর ছিল আর আমাদের বাসরে শুধু ফাঁক নয়, রাজ ফটক রয়েছে। সেই ফটকটা হচ্ছে দেশ ও জাতির স্বার্থে ব্যাংক খোলা রাখা। ব্যাংক খোলা রাখলে দেশ ও জাতির উপকার হয় মানি, কিন্তু অপকার কতটা হচ্ছে তা কি জানেন? অপারেশন সফল হয়েছে বুঝলাম কিন্তু রোগী ঘরে না গিয়ে গোরে যাচ্ছে কেন? জোতা তো একজোড়া দিলেন উপহার, সবাই দেখলো, কিন্তু গরু যে আমার মেরে খেয়েছেন, সেটা কি সবাই জানে?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যাংক খোলা রাখা রীতিমতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। করোনার স্প্রিড সেন্টারে পরিণত হবে ব্যাংকের শাখাসমুহ। ব্যাংকারদের কথা ভাবার কোনো দরকার নেই। গ্রাহকদের কথা ভাবুন। চেক দিয়ে গ্রাহক ক্যাশ কর্মকর্তার কাছ থেকে শুধু ক্যাশই নিবে না, ফাউ কিছু করোনাও নিবে। বিকজ, ক্যাশ ক্যারিজ করোনা। সি সি সি। ট্রিপল সি।

কার্টেসিঃ লেখাটি রিয়াজ মাহমুদ এর ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে নেয়া হয়েছে।

Leave a Reply