সুদহার ৯ ও ৬ বাস্তবায়নে কমবে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ

0
545

দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যাংক ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। আগামী ১ এপ্রিল থেকে এটি কার্যকর হওয়ার কথা। তবে এই সুদহার কার্যকর হলে এসএমই বা ক্ষুদ্র বিনিয়োগ সঙ্কটে পড়তে পারে বলে মনে করেন আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা।

এর কারণ হিসাবে তারা বলছেন, ঋণের সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনলে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের পরিধি বাড়বে। কিন্তু ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। কারণ বড় ঋণ এবং ক্ষুদ্র ঋণের পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে অনেক তফাৎ রয়েছে। এর ফলে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণে অনাগ্রহী হয়ে পড়বে ব্যাংকগুলো। তারা বড় ঋণের প্রতি মনোযোগী হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ব্যাংক ঋণের সুদহার বেধে দেওয়ার বিষয়টি মুক্তবাজার অর্থনীতির সাথে সাংঘর্ষিক।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন: ব্যাংক ঋণের সুদহার বেধে দেওয়া যৌক্তিক হতে পারে না। বরং ব্যাংকগুলোকে ঋণ ও আমানতের সুদহারের পার্থক্য বা স্প্রেড কমিয়ে আনার নির্দেশনা দেওয়া দরকার। এতে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় কমে আসবে।

এই সিদ্ধান্তে বেসরকারি এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে মন্তব্য করে তিনি বলেন: বিনিয়োগ বাড়াতে তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। যেমন- খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে হবে, পরিচালন ব্যয় কমানো এবং ব্যাংক মালিকদের অধিক মুনাফা অর্জনের ইচ্ছা ত্যাগ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, প্রভাব পড়তেই পারে। এখন দেখার বিষয় এটি কার‌্যকর করতে গেলে ব্যাংকগুলো আমানত পাবে কি না তা দেখতে হবে। আমানত না পেলে তো ব্যাংক ঋণ বিতরণ করতে পারবে না।

ব্যাংক ঋণের সুদহার বেধে দেওয়ার বিষয়টি মুক্তবাজার অর্থনীতির সাথে সাংঘর্ষিক বলে জানান সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

তিনি বলেন: এখন এমনিতেই বেসরকারি বিনিয়োগ নিম্মমুখী। এর মধ্যে ঋণের সুদহার এক অংকে নেমে আনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে বেসরকারি বিনিয়োগ আরও ক্ষতিগ্রস্থ হবে। কর্মসংস্থানের উপর নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে।

মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন: বাংলাদেশ ব্যাংক তার নিজের কাজটা ঠিকমতো করতে পারছে না। খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে পারলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

ব্যাংক ঋণের সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনলে হিতে বিপরীতও হতে পারে বলে মনে করেন অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার।

তিনি বলেন: ৯ শতাংশে ঋণ বিতরণ করতে হলে ৫ শতাংশে আমানত পেতে হবে। কিন্তু ৫ শতাংশে আমানত কারা রাখবে এই প্রশ্ন করে তিনি বলেন, বাজার বিশ্লেষণ না করে বিপরীত ধর্মী সিদ্ধান্ত এটি। এতে করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ চরম সংকটে পড়বে।

অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন: অবসরপ্রাপ্ত যেসব ব্যাংকার এবং সরকারি কর্মকর্তা ব্যাংকে টাকা জমা রেখেছেন তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হবে। হুট করে আমানতের সুদহার কমিয়ে দিলে তাদের সংসার চালাতে কষ্ট হবে। এসব আমানতকারীদের জন্য সঞ্চয়পত্রে বিশেষ ব্যবস্থা করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই পথও এখন বন্ধ। ৯ শতাংশে ঋণ বিতরণের সিদ্ধান্ত অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ বলে মনে করেন তিনি।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) এর সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আমিন জানান: একবারে সব খাতের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা ঠিক হবে না। ধাপে ধাপে করা যেতে পারে। কর্পোরেট গভর্নেন্স, ব্যাংকারদের অভিজ্ঞতাসহ নীতিগত জায়গাগুলোতে এখনো নাজুক অবস্থায় ব্যাংকিং খাত। প্রস্তুতি ছাড়া এত বড় সিদ্ধান্ত কতটুকু বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

তিনি বলেন: ৬ শতাংশের কমে আমানত সংগ্রহে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে ব্যাংকগুলোকে। আর আমানত না পেলে কোনো ঋণই দিতে পারবে না ব্যাংক। বেসরকারি বিনিয়োগ আরো কমে আসতে পারে। সরকার নির্ধারিত সীমার মধ্যে মোট কয়টি ব্যাংক ব্যবস্থাপনা করতে পারবে তা চিন্তা করে দেখা দরকার। কারণ সব ব্যাংকের স্থিতিশীলতা এক রকম নয়। এর ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

আমানত সংগ্রহের পর সাধারণত পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে ৪ শতাংশ সুদ যুক্ত করে ঋণ বিতরণ করা হয়। বিশ্বের অনেক দেশেই ঋণ ও আমানতের সুদহারের এ ব্যবধান অনুসরণ করা হয়। এই অবস্থায় যেসব ব্যাংকের আমানতের সুদহার ৯ শতাংশের বেশি সেগুলো ঠিক কত শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে আমানতের সর্বোচ্চ গড় পরিচালন ব্যয় বা কষ্ট অব ফান্ড পদ্মা ব্যাংকের এবং সর্বনিম্ন ডাচ-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের।

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন: চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে এটি চালু করা যাবে। সুদহার শুধু ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সকব ধরনের ব্যাংক ঋণে ৯ শতাংশ এবং আমানতে ৬ শতাংশ বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান তিনি।

তিনি আরও জানান: সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে রাখা হবে। এটি করা হবে মূলধনের ভিত্তিতে। যার মূলধন বেশি, সে বেশি আমানত পাবে। এটি যাতে সবাই সঠিকভাবে পায়; তার নজরদারি করা হবে।

Leave a Reply