বাণিজ্যিক ব্যাংকের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা সমূহ

0
1164

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ বাণিজ্যিক ব্যাংক কে কেন্দ্র করে একটি দেশের কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য গড়ে ওঠে৷ এতে বৃদ্ধি পায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সম্ভব হয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন৷ কাজেই একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাণিজ্যিক ব্যাংকের গুরুত্ব অনস্বীকার্য৷ বস্তুত বাণিজ্যিক ব্যাংককে কেন্দ্র করেই আধুনিক বিশ্বের অর্থনৈতিক কার্যকলাপ আবর্তিত হচ্ছে৷ আর এজন্য অনেকেই বাণিজ্যিক ব্যাংককে আধুনিক অর্থনীতির মধ্যমনি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন৷ নিম্নে বিভিন্ন দিক বিচারে বাণিজ্যিক ব্যাংকের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা সমূহ আলোচনা করা হলো-

১) Collecting deposit & formation of capital (সঞ্চয় সংগ্রহ ও মূলধন গঠন)
উন্নয়নশীল দেশে অনেক সময় সংগ্রহযোগ্য মূলধন থাকা সত্বেও বিক্ষিপ্ত অবস্থায় থাকে৷ এসব দেশে বাণিজ্যিক ব্যাংক মূলধন গঠন এবং সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে৷ জনগণের অব্যবহৃত এবং উদ্বৃত্ত সঞ্চয় সংগ্রহ করে বিভিন্ন উৎপাদনশীল কাজে বিনিয়োগের সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করতে পারে৷ একটি দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা মূলধনের ওপর নির্ভরশীল৷ উন্নয়নের জন্য যে মূলধন প্রয়োজন তা বেশিরভাগ দেশে নেই৷ এসব দেশের অনগ্রসরতার প্রধান কারণ মূলধনের স্বল্পতা৷ মুলধন সৃষ্টির জন্য দরকার সঞ্চয়৷ আর এ সঞ্চয় সংগ্রহ করে বাণিজ্যিক ব্যাংক দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রাখছে৷

২) Providing loan (ঋণদান)
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো গ্রহণকৃত আমানতের একটি অংশ আমানতকারীদের দাবি মেটানোর জন্য নিজের কাছে তারল্য হিসেবে রেখে দেয় এবং বাকি অংশ ব্যবসায়ী, শিল্প প্রতিষ্ঠান ও জনগণকে ঋণ হিসেবে প্রদান করে৷ এসব ঋণের উপর ব্যাংক নির্দিষ্ট হারে সুদ বা মুনাফা চার্জ করে থাকে৷ বিভিন্ন রকম জামানতের বিপরীতে বাণিজ্যিক ব্যাংক ঋণ ও অগ্রিম জমাতিরিক্ত ও নগদ ঋণ প্রদান করে থাকে৷ অবশ্য ব্যাংক অনেক ক্ষেত্রে জামানতহীন ঋণ প্রদান করে থাকে৷ এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে মূলধনজনিত সমস্যা দূর হয়ে থাকে৷

৩) Creation of medium of exchange (বিনিময়ের মাধ্যম সৃষ্টি)
ব্যাংকিং ইতিহাসের প্রথম দিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নোট প্রচলন করতে পারলেও বর্তমানে এ দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয় দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে৷ কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যাংক চেক, হুন্ডি, বন্ড, ঋণপত্র, সিকিউরিটিজ, ড্রাফট, পে-অর্ডার ইত্যাদি বিনিময়ের মাধ্যম সৃষ্টি করে থাকে৷ এর ফলে লেনদেন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে গতিশীলতা সৃষ্টি হয়৷ যা ব্যবসা-বাণিজ্যের ইতিবাচক হিসেবে কাজ করে থাকে৷

৪) Transfer of money (অর্থের স্থানান্তর)
বাণিজ্যিক ব্যাংক ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে এক স্থান হতে অন্য স্থানে সহজে ও নিরাপদে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ দিয়ে থাকে৷ এমনকি ব্যবসায়ীদের টাকা এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তর করে থাকে৷ এক্ষেত্রে অবশ্য উক্ত ব্যাংকগুলোর শাখা ও তাদের প্রতিনিধি এই সকল কাজের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকে৷ এ ধরনের কার্যক্রম দ্বারা ব্যবসায়ীদের আর্থিক ঝুঁকি থেকে চিন্তা মুক্ত করে৷

৫) Representation (প্রতিনিধিত্ব)
বাণিজ্যিক ব্যাংক আমদানিকারক ও রপ্তানীকারকদের প্রতিনিধি হিসেবে বিদেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ, বিদেশে পণ্যের বাজার সৃষ্টি, বৈদেশিক পাওনা নিষ্পত্তি, বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে৷ এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ প্রশস্ত হয়৷

৬) Development of agriculture (কৃষি উন্নয়ন)
বাণিজ্যিক ব্যাংক কৃষি উন্নয়নের জন্য কৃষকদের বিভিন্ন প্রকার ঋণ প্রদান করে থাকে৷ যেমন- খাদ্যশস্য ঋণ, অর্থকরী ফসল ঋণ, ফলের বাগানের জন্য ঋণ, গুদামজাতকরণের জন্য ঋণ, পল্লী ঘর-বাড়ি তৈরির জন্য ঋণ, খামার প্রকল্প ঋণ, ক্ষুদ্র হস্তচালিত শিল্প ঋণ, উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঋণ ইত্যাদি৷ এতে একটি দেশের কৃষি ক্ষেত্রে উন্নতি হয়৷ ফলে একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি সাধিত হয়৷

৭) Development of industry (শিল্প উন্নয়ন)
বাণিজ্যিক ব্যাংক শিল্প উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে থাকে৷ এই ব্যাংক শিল্পে দীর্ঘ ও স্বল্প মেয়াদী মূলধন সরবরাহ, বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ, পণ্য বাজারজাতকরণ, পণ্যের মান উন্নয়ন, শিল্পকে আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণসহ শিল্প উন্নয়নের জন্য নানাভাবে সাহায্য ও সহায়তা করে থাকে৷

৮) Helping international trade (আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সহায়তা)
বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তথা পণ্য দ্রব্য আমদানি-রপ্তানিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে৷ বৈদেশিক বাণিজ্যের সকল কাগজপত্র বাণিজ্যিক ব্যাংক এর সাহায্যে আদান প্রদান করা হয় এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক আমদানিকারকের প্রত্যয়পত্র ইস্যু করে থাকে৷ বর্তমানে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে ব্যাংকের সাহায্য ও সহযোগিতা ছাড়া বৈদেশিক বাণিজ্য একেবারেই অচল৷ এ সকল সহযোগিতামূলক কার্যাবলী বাণিজ্যিক ব্যাংক করে থাকে৷

৯) Settlement of payment (দেনা-পাওনার নিষ্পত্তি)
বাণিজ্যিক ব্যাংক ব্যবসায়ীদের পক্ষ হয়ে বিভিন্ন রকম লেনদেন করে থাকে৷ এ সকল ব্যাংক ব্যবসায়ীদের পক্ষ হয়ে প্রদেয় বিল, বেতন, ঋণের সুদ, বীমা প্রিমিয়াম, ভাড়া ইত্যাদি পরিশোধ করে থাকে৷ আবার ব্যবসায়ীদের পক্ষ হয়ে বেতন, বিনিয়োগের সুদ বা লভ্যাংশ, প্রাপ্য বিল, চেক, পেনশন ইত্যাদি বাবদ অর্থ আদায় করে থাকে৷ এসব কার্যাবলী উন্নত অর্থনীতির পরিচায়ক হয়ে থাকে৷

১০) Discount bill of exchange (বিনিময় বিল বাট্টাকরণ)
একজন ব্যবসায়ী অন্য একজন ব্যবসায়ী থেকে ধারে মাল ক্রয় করলে নগদ অর্থের পরিবর্তে বিনিময় বিল দিয়ে থাকে৷ ফলে উক্ত ব্যবসায়ী (বিক্রেতা) মেয়াদের পূর্বে তার টাকা আদায় করতে পারে না৷ কিন্তু বিক্রেতার আর্থিক সংকটের সময় ব্যাংক মেয়াদ পূর্তির পূর্বে তার বিল বাট্টাকরণ করে নগদ অর্থ সরবরাহ করে থাকে৷ ফলে বিক্রেতার আর্থিক সংকট দূরীভূত হয়৷ এ ধরনের কার্যাবলী ব্যবসা-বাণিজ্যকে গতিশীল করে৷

১১) Incorrect to savings (সঞ্চয়ের আগ্রহ সৃষ্টি)
বাণিজ্যিক ব্যাংক আমানত কারীকে তার আমানতের উপর সুদ বা মুনাফা প্রদান করে থাকে৷ এর সুদ বা মুনাফা আমানতকারীর একটি নিশ্চিত আয়৷ এ ধরনের আয়ের ক্ষেত্রে আমানতকারীর আমানতি টাকার যেমন ঝুঁকি নেই তেমনি নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় আসতেই থাকে৷ ফলে আমানতকারীরা বেশি করে অর্থ সঞ্চয় করতে এবং সঞ্চিত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখতে অনুপ্রাণিত হয়ে থাকে৷

১২) Employment (কর্মসংস্থান)
বর্তমানের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পুরণার্থে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দেশে-বিদেশে শাখা স্থাপনের মাধ্যমে তার কার্যাবলী সম্পাদন করে থাকে৷ আর এই ব্যাংকের কার্যাবলী বা কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য প্রচুর লোক প্রয়োজন হয়৷ ফলে বানিজ্যিক ব্যাংক বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিয়ে তাদের জীবন যাত্রার মান উন্নত করছে৷ এর ফলে দেশের বেকারত্ব সমস্যা কিছুটা হলেও হ্রাস পাচ্ছে৷

১৩) Helps in credit control (ঋণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা)
বাণিজ্যিক ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক গৃহীত ঋণ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে৷ এতে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়৷ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে বাণিজ্যিক ব্যাংক ঋণ নিয়ন্ত্রণের জন্য সুদের হার হ্রাস-বৃদ্ধি করে, খোলা বাজারে শেয়ার এবং সিকিউরিটিজ ক্রয় বিক্রয় করে, ঋণদান করে, ঋণের অর্থ সংগ্রহ করে৷

১৪) Profitable investment (লাভজনক বিনিয়োগ)
প্রাপ্ত আমানত বাণিজ্যিক ব্যাংক সব সময় ব্যাংকে রেখে দেয় না৷ এর থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ বাণিজ্যিক ব্যাংক লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করে থাকে৷ এতে উক্ত খাতগুলো উন্নত হয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি ত্বরান্বিত করে থাকে৷

১৫) Regional development (আঞ্চলিক উন্নয়ন)
বাণিজ্যিক ব্যাংক মূলধনের গতিশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অঞ্চল ভিত্তিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে থাকে৷ উদ্বৃত্ত অঞ্চল থেকে ঘাটতি অঞ্চলে বিনিয়োগকে স্থানান্তরের মাধ্যমে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করে৷ যা একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য৷

১৬) Implementation of financial plan (আর্থিক নীতি বাস্তবায়ন)
বাণিজ্যিক ব্যাংক সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক নীতি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে৷ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে জনগণের সরাসরি সম্পর্ক থাকে না৷ তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবসময়ই বাণিজ্যিক ব্যাংকের সাহায্যে তার আর্থিক নীতি বাস্তবায়ন করে থাকে৷

১৭) Increase standard of living (জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন)
বাণিজ্যিক ব্যাংক দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের আয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়তা করে থাকে৷ ফলে মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ে৷ সর্বোপরি জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন ঘটে থাকে৷

পরিশেষে এ কথা বলা যায় যে, একটি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাণিজ্যিক ব্যাংকের অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ়৷ আর এই অবস্থানের জন্যই অধ্যাপক সেয়ার্স যথার্থই বলেছেন- Banks are not merely traders in money, But also important manufacturer of money.

Leave a Reply