জাল দলিল চিনবেন যেভাবে

0
4173

বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে জমির দলিল সম্পাদনে এক ধরণের বাধ্যবাধকতা প্রদান করা হয়েছে। আর এ দলিলই মূলত একটি জমির আইনগত ভিত্তি। কিন্তু এ জমি-জমা সংক্রান্ত দলিলসহ বিভিন্ন দলিলের জালিয়াতির ঘটনাও অহরহ ঘটছে এবং এ সংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমার সংখ্যাও দিন দিন বেড়ে চলছে। অপরের সম্পত্তি প্রতারণা করে নিজ নামে বাগিয়ে নেয়ার জন্য নানা কৌশলে সৃজন করা হয় জাল দলিল। কখনও নিরক্ষর মালিককে প্রলোভন দেখিয়ে কখনও বা জমি মালিকের অজান্তে অন্য লোককে মালিক সাজিয়ে গোপনে জাল দলিল তৈরি করা হয়।

জাল দলিল (Fake Document)
সম্পূর্ণভাবে বা আংশিকভাবে জালকৃত যে কোন মিথ্যা দলিলকে জাল দলিল বলে।

দলিলের প্রকারভদে (Type of Document)
(১) কবলা দলিল;
(২) বিনিময় দলিল;
(৩) কবুলিয়ত দলিল;
(৪) দানপত্র/হেবা দলিল;
(৫) পাওয়ার অব এটর্ণী দলিল;
(৬) উইল দলিল;
(৭) বায়না দলিল;
(৮) চুক্তি দলিল;
(৯) পাওয়ার অব এটর্ণী দলিল;
(১০) আপোষনামা দলিল;
(১১) লীজ দলিল;
(১২) খায় খালাসী দলিল;
(১৩) ওছিয়ত নামা দলিল; ও
(১৪) পত্তনী দলিল।

জাল দলিল চিহ্নিত করণের পদ্ধতি/উপায় (দলিল পরীক্ষা করে)
(ক) হাতের লিখা: ১৯৭২ সনের পূর্বের কোন দলিলের মূল কপি যদি বলপেন দিয়ে লিখা থাকে তবে তা জাল দলিল। কারণ তখনও বলপেন আবিস্কার হয় নি।

(খ) ষ্ট্যাম্প উত্তোলনের তারিখ: ষ্ট্যাম্প উত্তোলনের সময় ষ্ট্যাম্পের পেছনে গ্রহিতার নাম, ঠিকানা, ভেন্ডারের নাম, তারিখ, সীল ইত্যাদি থাকে। ষ্ট্যাম্প গ্রহণের তারিখের পূর্বের তারিখ দিয়ে দলিল সৃজন করা হলে তা জাল দলিল।

(গ) দলিলের প্রাচীনতা পরীক্ষা: ১৯৪৭ সনের পূর্বে, ১৯৬০ সনের পূর্বে। ৬-৯-৬৫ থেকে ১৬-২-৬৯ পর্যন্ত, বাংলাদেশ হওয়ার পরের ইত্যাদি দলিল। ১৯৪৭ সনের ১৪ আগষ্টের পূর্বের দলিলে যদি পাকিস্তান লেখা থাকে; ১৯৬০ সনের পূর্বের দলিলে যদি সিও (রেভিনিউ) লেখা থাকে; ৬-৯-৬৫ থেকে ১৬-২-৬৯ পর্যন্ত সময়ের হিন্দু মালিকের সম্পত্তি বিক্রির ক্ষেত্রে কালেকটরের অনুমতি না থাকলে।

(ঘ) দলিলের গন্ধ পরীক্ষা করে: দলিলকে প্রাচীন বা অনেক পুরাতন করার জন্য নতুন দলিলকে পুরাতন কাঁথা, খড়ের গাদা, বাঁশের চৌঙ্গায় রাখা হয়। তখন এ সকল দ্রব্যাদির গন্ধ পাওয়া যায়। এরূপ দলিলকে সন্দেহের চোখে দেখে অন্যান্য তথ্যাদি যাচাই করতে হবে।

(ঙ) বালাম বহি পরীক্ষা করে: দলিল ও বালাম বহিতে গড় মিল থাকে। মূল দলিল বা সার্টিফাইট কপি বালাম বহির সাথে তুলনা করে গড় মিল নির্নয় করা যায়।

(চ) সাব রেজিস্ট্রি (এস আর) অফিস: ইসলামপুর (জামালপুর), নান্দাইল (ময়মনসিংহ), হরিরামপুর (মানিকগঞ্জ), কসবা (বিঃ বাড়িয়া), কেপুপাড়া (পটুয়াখালী), শ্রীপুর, মোহাম্মদপুর (মাগুড়া), ইসলামকাটি (তালা, সাতক্ষীরা), পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা), আত্রাই, পত্মী তলা, সদর (নওগাঁ), রাজাপুর (ঝালকাটি), ভূয়াপুর (টাংগাইল) ইত্যাদি। বর্ণিত অফিসগুলি ১৯৭১ সানে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। এই অফিসগুলোর ১৯৭২ সনের পূর্বের দলিলসমূহ বালাম বহিতে যাচাই করার সুযোগ নেই। এরূপ দলিল পাওয়া গেলে তা অন্যান্য পদ্ধতিতে সঠিকতা যাচাই করতে হবে।

(ছ) দুই এস আর অফিসের আওতায় দাতার জমি থাকলে: যেখানে দাতার বিক্রিত জমির পরিমাণ বেশী থাকে সেখানে দলিল রেজিস্ট্রি হতে হয়। কোন দাতার বিক্রিত জমির পরিমাণ যদি সাভারে এক একর এবং হরিরামপুরে ২ শতাংশ এবং উক্ত দলিলটি যদি হরিরামপুরে রেজিস্ট্রি হয়ে থাকে তবে তাকে প্রাথমিকভাবে জাল দলিল হিসেবে সন্দেহ করতে হবে।

(জ) রেকর্ড রুম এর তথ্যাদি যাচাই করে: ‘চ’ উপঅনুচ্ছেদে বর্ণিত সাব রেজিস্ট্রি অফিসে ১৯৭১ সনের পূর্বে কোন দলিল রেজিস্ট্রি হয়ে থাকলে এবং উক্ত দলিলে যদি দুটি ভিন্ন সাব রেজিস্ট্রি অফিসের অধীন দাতার জমি থাকে তবে এই দলিলে তফসিলে বর্ণিত দাতার জমি সংশ্লিষ্ট জেলার রেকর্ড রুমের তথ্যের সহিত যাচাই করতে হবে।

(ঝ) দলিলের স্বাক্ষর: দাতার স্বাক্ষর যদি অন্য কোন দলিল বা ডকুমেন্টে পাওয়া যায় তবে তার সহিত সন্দেহকৃত দলিলের স্বাক্ষর যাচাই করা।

(ঞ) তফসিল লিখার ভাষা: ১৯৬০ সনের পূর্বের দলিলে যদি সিও (রেভিনিউ) লেখা থাকে তবে তাকে জাল দলিল হিসেবে সন্দেহ করতে হবে। কারণ ১৯৬০ সনের পূর্বে সিও (রেভিনিউ) পদ ছিল না। ১৯৫৬ সনের পূর্বে কোন দলিলে যদি পূর্ব পাকিস্তান লেখা থাকে তাকেও সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতে হবে।

(ট) ভূমি উন্নয়ন কর: ১৯৭৬ সনের পূর্বের দলিলে যদি ভূমি উন্নয়ন কর শব্দটি লিখা থাকে তবে তাকে জাল দলিল হিসেবে সন্দেহ করতে হবে। কারণ ১৯৭৬ সনে ভূমি উন্নয়ন কর অধ্যাদেশ জারির পূর্বে ভূমি ব্যবস্থাপনায় এরূপ শব্দ ছিল না।

(ঠ) দশমিক এর প্রয়োগ: ১৯৬০ সনে পূর্ব পাকিস্তানে দশমিক পদ্ধতির হিসাব প্রবর্তিত হয়। ১৯৬০ সনের পূর্বের কোন দলিলে যদি দশমিক পদ্ধতিতে জমির হিসাব, খাজনার পরিমাণ উল্লেখ থাকে তবে তাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতে হবে।

(ড) তফসিলে জরিপ তথ্যাদি: এস এ রেকর্ড চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হওয়ার পরে শুধুমাত্র সিএস রেকর্ড দিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করা হলে, বিআরএস রেকর্ড চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হওয়ার পর শুধুমাত্র সিএস/এসএ রেকর্ডের তথ্যাদি দিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করা হলে; (বর্তমানে ২৫ বছরের ইতিহাস লিখতে হয়)।

(ঢ) একাধিক রেফারেন্স: কোন দলিলের বর্ণনা অংশে যদি একাধিক দলিল/বিনিয়ম দলিল/রেজিস্ট্রিকৃত আপোষনামা ইত্যাদির রেফারেন্স থাকে তবে সেগুলোর মূল কপি/সার্টিফাইড কপি/ তফসিল যাচাই করা।

(ণ) বিনিময়: কোন দলিলের বর্ণনা অংশে যদি বিনিময় দলিলের রেফারেন্স থাকে তবে সে সকল বিনিময় কেস নথি নিয়মিত হয়েছে কিনা তা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখায় যাচাই করা (ভারত হতে প্রত্যাগতদের বেলায়)।

(ত) কবুলিয়াত/বন্দোবস্ত যাচাই: সরকার কর্তৃক বন্দোবস্তকৃত জমির বন্দোবস্তের যাবতীয় তথ্যাদি ঢওও নম্বর রেজিস্টারে সংরক্ষিত থাকে। কোন দলিলের বর্ণনা অংশে যদি বন্দোবস্তমূলে প্রাপ্ত এরূপ রেফারেন্স থাকে তবে সংশ্লিষ্ট রেজিস্টারসমূহ যাচাই করা।

(থ) নামজারীর সময়: নামজারীর সময় দাতা, গ্রহীতা এবং খতিয়ানের অন্যান্য মালিকদের উপস্থিতিতে যথাযথ শুনানী গ্রহণ করা হলে।

(দ) পাওয়ার অব এটর্ণী: পাওয়ার অব এটর্ণীর মাধ্যমে ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়ে দাতা অন্য কোন ব্যক্তির জমি বিক্রি করলে সে ক্ষেত্রে পাওয়ার অব এটর্ণী যথাযথ ভাবে যাচাই করতে হবে। এক্ষেত্রে পাওয়ার অব এটর্ণীটি যথাযথভাবে স্ট্যাম্পিং করা হয়েছে কিনা/রেজিস্ট্রি কিনা/দাতা জমি বিক্রির ক্ষমতা দিয়েছে কিনা ইত্যাদি তথ্যাদি যাচাই করতে হবে।

জাল দলিলে বাতিলের পদ্ধতি
জাল দলিল যেভাবই তৈরী করা হোক না কেন জাল দলিল সম্পর্কে জানার সাথে সাথেই জাল দলিল বাতিলের জন্য দেওয়ানী আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে। জাল দলিল রেজিষ্ট্রি হয়ে থাকলে তা দেওয়ানী আদালতে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭ এর ৩৯ ধারা অনুযায়ী বাতিলের মামলা করা যাবে। ধারা ৪০ অনুযায়ী দলিল আংশিক বাতিলের মামলাও করা যাবে।

জাল সম্পর্কে জানার ৩ বছরের মধ্যে ঐ দলিল বাতিলের মামলা করতে হবে। নচেৎ তা তামাদি দোষে বাতিল হবে(তামাদি আইন ১ম তফসিল ৯১ অনুচ্ছেদ)। জাল দলিল বাতিল না হলে যিনি ক্ষতিগ্রস্থ হবেন তিনি মামলা করতে পারেন। অর্থ্যাৎ সম্পত্তিতে যার স্বার্থ আছে তিনি কেবল মামলা করতে পারেন। একাধিক ব্যক্তি পক্ষ হলে তাদের সবাই বা যে কোন একজন মামলা করতে পারেন। সম্পত্তির মালিক বেঁচে না থাকলে তার বৈধ ওয়ারিশগন মামলা করবেন। নাবালকের সম্পত্তি জাল দলিলের মাধ্যমে হাতিয়ে নিলে ঐ নাবালকের অভিভাবক বা ঐ নাবালক সাবালকত্ব অর্জনের পর সে নিজের মামলা করতে পারবেন।

দলিল বাতিলের মামলা করার জন্য কোর্ট ফি আইনের দ্বিতীয় তফছিলের ১৭(৩) অনু্চ্ছেদে উল্লেখিত হারে কোর্ট ফি প্রদান করতে হবে দলিল বাতিলের মামলার সাথে অন্য প্রতিকার যেমন দখল পাবার প্রার্থনা ও করা যাবে তবে এর জন্য অতিরিক্ত কোর্ট ফি দিতে হবে। (কোর্ট ফি আইন ৭(৪) (গ) ধারা। আদালতে বিচার শেষে যে ডিগ্রি প্রদান করবেন তার একটি নকল সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রি অফিসে প্রেরন করতে হবে। উক্ত নকলের কপি পেয়ে রেজিস্ট্রার অফিসার সংশ্লিষ্ট বালাম বহিতে দলিল বাতিলের বিষয়টি লিপিবদ্ধ করে রাখবেন। জাল দলিল বাতিলের মামলা ছাড়াও দলিল জালকারীর শাস্তি দাবি করে ফৌজদারী আদালাতে দন্ডবিধি ৪০৬/৪২০/৪৬৩-৪৭৩ ধারার মামলা করা যাবে।

পরিশেষে, কষ্টের টাকায় জমি কেনার পূর্বে দলিল যাচাই করে জমি কিনলে অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনা খুব সহজেই এড়িয়ে চলা সম্ভব।

কার্টেসিঃ সংগৃহীত, সংশোধিত ও পরিমার্জিত।

Leave a Reply