ব্যাংকারদের সততা, প্রেষণা ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়

0
690

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ আপনি যদি একজন চাকরিজীবী হন, আর কেউ যদি আপনাকে প্রশ্ন করে যে, কর্মজীবনে আপনি সৎ কি নাআপনার উত্তরটা হয়তো এমন হবে, ‘কী বলেন! জীবনে কারও এক টাকাও মেরে খাইনি, দুই টাকা অনিয়ম করে নিজের পকেটে পুরিনি, কাজের বিনিময়ে কেউ আমাকে কখনও দশটি টাকাও ঘুষ দিতে পারেনি। চাকরিজীবনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গেই চাকরি করে আসছি।’ কথাগুলো হয়তো আপনি নিতান্তই সত্যি বলেছেন। আমাকেও কেউ যদি এই প্রশ্নটি করে, আমিও আপনার মতো করে একই উত্তর দেব। কিন্তু আপনি, আমি, আমরা কি পেশাজীবনে আসলেই সৎ? কী ভাবছেন? ভাবছেন, ‘একবার তো এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েই দিলাম, আবার কেন এই প্রশ্ন!’ তবুও প্রশ্নটা আমি আবার করলাম। সততার প্রশ্নে আপনি হয়তো দৃঢ়চিত্তেই বলছেন যে, আপনাকে কেউ এক কোটি টাকা দিলেও সততার নীতি থেকে টলাতে পারবে না। আপনার এই দৃঢ়তার প্রতি পূর্ণ সম্মান দিয়েই বলতে চাই, সততার প্রশ্নে আপনার উত্তর সঠিক, তবে আংশিক। কারণটা নিচের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হবে বলে আশা রাখছি।

সততা পরিমাপের কোনো দাঁড়িপাল্লা না থাকলেও সর্বজনের কাছে এটা স্বীকৃত যে, গুণগত দৃষ্টিতে এক টাকার ঘুষ গ্রহণও অসততা, এক কোটি টাকার ঘুষ গ্রহণও অসততা। কিন্তু সংখ্যাগত দিক দিয়ে অবশ্যই এক টাকার ঘুষকে এক কোটি টাকার ঘুষের সমান বলার কোনো সুযোগ নেই। তাই টং দোকানের একজন কর্মচারীর অসততা যেমন একজন ব্যাংকারের অসততার সমান হওয়ার সুযোগ নেই, ঠিক তেমনি একজন ব্যাংকারের সততাকে একজন টং দোকানের কর্মচারীর সততার সঙ্গে সমান করে দেখার সুযোগ নেই। টং দোকানের কর্মচারীর অসৎ হওয়ার সুযোগ থাকলেও তার ব্যাপ্তি একজন ব্যাংকারের পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় নিতান্তই নগণ্য। ঠিক একই কারণে টং দোকানের কর্মচারীর সততার সেতুর তুলনায় একজন ব্যাংকারের সততার পুলসিরাত অনেক কণ্টকাকীর্ণ। একজন ব্যাংকার দিনের আট থেকে ১০ ঘণ্টাই টাকা-পয়সার মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকেন। একজন ব্যাংকার প্রতিদিন যত টাকা দেখেন, আর যত টাকার পরশ নেন, সে ধরনের অভিজ্ঞতা ক’জন সাধারণ মানুষের হয়? যদিও একটা অনেক বড় পার্থক্য আছে যে, একজন সাধারণ মানুষের হাতে বা ঘরের সিন্দুকে যে টাকাটা থাকে, ওটা তার নিজের, আর ব্যাংকারের কাছে গচ্ছিত টাকা ব্যাংকারের নিজের নয়, সাধারণ গ্রাহকদের। ব্যাংকার এই অর্থের জিম্মাদার।

নিজের অর্থের প্রতি মানুষের মায়া থাকাটা স্বাভাবিক, তবে অন্যের অর্থের প্রতি এই মায়ার উদ্রেক হলে তা হবে ‘লোভ’। ব্যাংকাররা অন্যের টাকার পাহারাদার, তাই এই টাকার প্রতি তাদের মায়া পড়ে গেলে তা হবে চূড়ান্ত ‘লোভ’, যা ব্যাংকার এবং ব্যাংক, উভয়েরই সর্বনাশের কারণ হয়। নিজের দীনতা ও অসততার পশুত্ব থেকে নিজেকে উন্নতশির রাখতে পারার সামর্থ্যই ব্যাংকারদের অন্যসব মানুষের চেয়ে আলাদা করে রাখে। একজন ব্যাংকারের সততার উচ্চতা হতে হবে সর্বশীর্ষে। সততার প্রশ্নে কোনো ব্যাংকার ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ নম্বর পেলেও পাস করেছেন বলা যাবে না। সততার স্কেলে ব্যাংকারের স্কোর ১০০-তে ১০০-ই হওয়া চাই। সততার প্রশ্নে যার দশমিক শূন্য এক শতাংশের ঘাটতি আছে, তার ব্যাংকার নয়, ব্যাংকের দারোয়ান হওয়ারও যোগ্যতাও নেই! ব্যাংকের যেকোনো পর্যায়ের কর্মীর সততার ভিত হতে হবে অভেদ্য-নিরেট-নিচ্দ্রছি।

কাদাতে হাঁটলে কৌশলে হয়তো কাদার স্পর্শ থেকে বেঁচে থাকা যায়; কিন্তু গড়াগড়ি খেলে গায়ে কাদা লাগবে না, এ কথা নিশ্চয় বলা যাবে না। ঠিক তেমনিভাবে একজন ব্যাংকার, যে সারা দিন টাকার বৃত্তে আবদ্ধ থাকেন, খুব সহজেই নিজের সততা বিসর্জন দিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু ব্যাংক খাতের ধারাবাহিক উত্থান বিবেচনা করলে অবশ্যই ব্যাংকারদের সততা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়। পাঠক, আপনি হয়তো হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপের উদাহরণ টেনে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। কিন্তু একবার ভেবে দেখেছেন কি রাস্তায় এক হাজার টাকার একটি নোট ফেলে দিয়ে পরক্ষণেই খুঁজতে গেলে আর সেই নোটটি ফিরে পাওয়া যায় না; অথচ ব্যাংকে এক হাজার টাকার একটি নোট নয়, একটি বান্ডিল অর্থাৎ ১০০টি নোট ভুলে বেশি দিয়ে এলেও তা ফেরত পাওয়া যায়। এই ব্যাংকাররা হলমার্ক, বিসমিল্লাহ কেলেঙ্কারির স্রষ্টা নন, তারা এসব কেলেঙ্কারির স্রষ্টাদের বলির পাঁঠা।

অসৎ হওয়ার সুযোগ না আসা পর্যন্ত আপনি আপনাকে সৎ দাবি করলেও তা শতভাগ সত্যি বলে ধরার সুযোগ নেই। আপনি এখনও সৎ কারণ আপনি হয়তো এখনও অসৎ হওয়ার কোনো সুযোগ পাননি, এখনও কোনো ঘুষের অফার পাননি, কিংবা যে অফার পেয়েছেন তা আপনাকে প্রভাবিত করতে পারেনি, কারণ ঘুষের টাকার অঙ্ক হয়তো নিতান্তই নগণ্য। ধরুন, আপনি ৫০ হাজার টাকা মাসিক বেতনের চাকরিজীবী। কেউ যদি কোনো কাজের স্পিড মানি হিসাবে আপনাকে ৫০ লাখ টাকা অফার করে, আপনি কী করবেন? নিজের দীর্ঘদিনের সততার অনন্য রেকর্ড ধরে রাখবেন, নাকি এই ঘুষের প্রস্তাবকে নিজের জীবনের পরশপাথর মনে করে নিজের পাঁচ লাখ টাকার ব্যক্তিগত দেনা শোধ, দুই মেয়ের বিয়ের খরচ বাবদ ২০ লাখ টাকার ফিক্সড ডিপজিট, বাকি ২৫ লাখে ঢাকা শহরে বিলাসী ফ্ল্যাট বুকিংয়ের সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখবেন? যদি আপনার উত্তর প্রথমটা হয়, তাহলে নিশ্চিত করেই বলা যায় সততার অগ্নিপরীক্ষায় আপনি পাস এবং এ পাস খুব বড় রকমের পাস।

যা বলতে চাচ্ছি তা হলো, সততার এমন অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার আগে কেউ ঢাক পিটিয়ে নিজেকে সৎ দাবি করলেও তাতে শতভাগ আস্থা রাখার অবকাশ নেই। কিন্তু ব্যাংকিং পেশায় হাজার হাজার ব্যাংকারকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এই সততার অগ্নিপরীক্ষা ছাড়াই। এরপরও গুটিকয়েক বিপথগামী ব্যাংকার ছাড়া সব ব্যাংকারই তাদের সততার অনবদ্য কৃতিত্ব বজায় রেখে এই পেশার অগ্রগতি এবং গ্রাহকদের আস্থা ধরে রেখেছেন। এই অনবদ্য রেকর্ডের জন্য ব্যাংকারদের পারিবারিক শিক্ষা, ধর্মীয় অনুশাসনই যে একমাত্র নিয়ামক ভূমিকা রেখেছে তা কিন্তু নয়; ব্যাংকারদের কর্মপরিবেশ, ভালো বেতন, আর্থিক প্রণোদনা, স্বীকৃতি, চাকরি নিরাপত্তা প্রভৃতিও প্রভাবক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ করা যাচ্ছে, ব্যাংকারদের পদোন্নতিসহ বিভিন্ন নিয়মিত আর্থিক সুবিধাদি বাতিল বা সীমিত করে দেওয়া হচ্ছে। যারা দিচ্ছে তাদের সংখ্যাও নগণ্য এবং যা দিচ্ছে তা আগের তুলনায় নিতান্তই কম। ব্যাংকারদের বেতন না বাড়ানো, উৎসাহ বোনাস না দেওয়া, পদোন্নতি আটকে রাখা এবং বিভিন্ন প্রণোদনার লাগাম টেনে ধরাটা কি এই পেশার মানুষদের সততার পক্ষে নিয়ামক হবে? রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে দুদকের এক অনুষ্ঠানে এ বছর ২৯ মার্চ অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘বেতন বাড়িয়েও সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতি কমানো যায়নি।’ তাহলে ব্যাংকারদের পদোন্নতিবঞ্চিত করে এবং আর্থিক প্রণোদনা কমিয়ে নিশ্চয় তাদের অধিকতর সততা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

ক্ষুধার্ত হলেই জিবে জল আসে না, জলের উদ্রেক তখনই হয়, যখন সুস্বাদু খাবারের সুঘ্রাণ নাকে লাগে এবং নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করে, অথবা ওই খাবারের আবেদনময় অবয়ব দৃষ্টিগোচর হয়। আবার উদরপূর্তি থাকলে খাবার যত সুঘ্রাণযুক্ত, আবেদনময় আর মুখরোচকই হোক না কেন, তা জিবে জল উৎপন্ন করতে পারে না। ব্যাংকিং ব্যবসায় ব্যাংকের সুনাম, গ্রাহকসেবার মান ও উন্নত প্রযুক্তি অবশ্যই ব্যাংকের সম্পদ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, যাদের দিয়ে এই ব্যবসা পরিচালিত হয়, অর্থাৎ ব্যাংকার তথা ব্যাংকারদের সততা এবং এই সততা ও সেবানিষ্ঠার ফলে অর্জিত গ্রাহক-আস্থাই হচ্ছে এই ব্যবসার সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাই ব্যাংকারদের যৌক্তিক এবং নিয়মিত আর্থিক ও অনার্থিক সুবিধাগুলো বহাল না রাখলে এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে ব্যাংকারদের নৈতিকতা স্খলনের ঝুঁকি থেকেই যাবে।

ভুলে গেলে চলবে না, ব্যাংকিং ব্যবসায় ব্যাংকাররা হচ্ছে একটি বহুতল ভবনের পিলারসম। তাই বিদেশি চৌকস প্রকৌশলীর আধুনিক ডিজাইন, নামকরা ব্র্যান্ডের সিমেন্ট আর শক্ত ইটের গাঁথুনি দিয়ে প্রয়োজনীয় পুরুত্বসমৃদ্ধ রড ব্যবহার না করে, কিংবা রডের বদলে উন্নত দেশি বাঁশ ব্যবহার করলে ওই ভবনের ভবিষ্যৎ সহজেই অনুমেয়। বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ব্যাংকারদের নজরের বাইরে রাখাটা এই খাতের গাঁথুনিকেও এমন দুর্বল করেই রাখবে। আরও স্পষ্ট করে যদি বলি, ব্যাংক খাতকে যদি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বাহন বলা যায়, তাহলে ব্যাংকাররা সেই বাহনের চালক; আর ব্যাংকারদের বেতন সেই বাহনের জ্বালানি; ব্যাংকারদের কর্মদক্ষতা, কর্মোদ্যোগ ও কর্মমানসিকতা সেই বাহনের চাকা; কর্মিবান্ধব উন্নত কর্মপরিবেশ সেই বাহনের চলার পথ; আর বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি, উৎসব ও উৎসাহ বোনাস, আর্থিক প্রণোদনা, যথাসময়ে পদোন্নতি প্রভৃতি সেই বাহনের পিরিয়ডিক সার্ভিসিং এবং ডেন্টিং-পেইন্টিং; আর ব্যাংকারের অসুখ-বিসুখে, পারিবারিক বিপদে কিংবা দুর্ঘটনায় পাশে দাঁড়ানো যেন দুর্ঘটনাকবলিত সেই বাহনটিকে মেরামত করে সারিয়ে নেওয়ার সঙ্গে তুলনা করা যায়। এই উপাদানগুলোর কোনো একটি অনুপস্থিত হলে বাহনটির চলা যেমন বাধাগ্রস্ত হয়, ঠিক তেমনি ব্যাংকারের উপরিউক্ত প্রণোদনার কোনোটির ঘাটতি থাকলে তার পারফরম্যান্সেও টান পড়ে। আমরা সবাই এখন খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক খাতের অনিয়ম-দুর্নীতির আলোচনা নিয়েই ব্যস্ত। একটি নিরাপদ, বিশ্বস্ত, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও প্রবৃদ্ধিশীল ব্যাংক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য এই আলোচনা অবশ্যই নিয়ামক। কিন্তু এই খাতের অনুঘটক ব্যাংকারদের উপেক্ষা করে কোনো সমাধানের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ রয়েই যায়।

কর্মীদের বেতন-বোনাসকে শুধু খরচ হিসেবে দেখা উচিত নয়, এসব খরচ ব্যাংকের জন্য বিনিয়োগও বটে। আমরা যদি জার্মানির ব্যাংকিং জায়ান্ট ডয়েচে ব্যাংকের কথা বলি, তাহলে দেখতে পাই, ডয়েচে ব্যাংক পরপর তিনবার লোকসান করার পরেও ২০১৭ সালের জন্য তাদের কর্মীদের ২০০ কোটি ইউরো বোনাস দিয়েছে, যা ২০১৬ সালের বোনাসের প্রায় চারগুণ। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের মতে এই বোনাস কর্মী ধরে রাখার জন্য ব্যাংকের বিনিয়োগ। যদিও নতুন বছর মানেই ব্যাংকারদের জন্য রাশি রাশি টার্গেটের বোঝা, তবুও বছরের শুরুতে এসব আর্থিক প্রণোদনা তাদের জন্য ঈদের আনন্দ নিয়ে আসে। ২০০৬ সালের শ্রম আইন অনুযায়ী, যেকোনো প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী সম্পত্তি এক কোটি টাকা বা তার বেশি হলে নিট মুনাফার পাঁচ শতাংশ পাবে কর্মীরা। এই পাঁচ শতাংশ অর্থের মধ্যে ৮০ শতাংশ সরাসরি ভাগ করে দেওয়া হবে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে। বাকি ২০ শতাংশের মধ্যে ১০ শতাংশ দিয়ে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে শ্রমিকদের জন্য আপৎকালীন ফান্ড ও বাকি ১০ শতাংশ জমা দিতে হবে সরকারের শ্রমকল্যাণ তহবিলে।

আমাদের দেশের ব্যাংক কোম্পানিগুলোও প্রতি বছরান্তেই নিট মুনাফার একটি অংশ তাদের কর্মীদের মধ্যে বণ্টন করে দিয়ে আসছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই সুবিধাটি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেক ব্যাংককর্মী। কিছু ব্যাংক অবশ্য মুনাফার নিম্নগতি সত্ত্বেও এই আর্থিক প্রণোদনা অব্যাহত রেখেছে। সরকারি ব্যাংকগুলো লোকসান করেও তাদের কর্মীদের বোনাস দিয়ে উৎসাহিত করছে। কিছু বেসরকারি ব্যাংকও এই বোনাস দিয়ে তাদের কর্মীদের চাঙা রাখার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে, হয়তো এই বোনাসের পরিমাণ ব্যাংকের আয় বিবেচনায় কম-বেশি হতে পারে। এসব প্রণোদনা একদিকে যেমন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্মীদের কর্মচাঞ্চল্য বাড়িয়ে তাদের উৎসাহিত করছে, অন্যদিকে যারা এসব বোনাস পাচ্ছেন না তাদের মধ্যে এক ধরনের বঞ্চনাবোধ তৈরি করছে। কারণ প্রেষণা তত্ত্বে আমরা দেখতে পাই, একজন কর্মী তখনই নিজেকে বঞ্চিত মনে করে, যখন সে দেখতে পায় যে, তার সমান গ্রেডের বা নিচের গ্রেডের অন্য কোনো কর্মী/কর্মীরা তার চেয়ে বেশি আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে; অথবা তার সমান কিংবা কম যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো কর্মী তার চাইতে দ্রুততম সময়ে তাকে অতিক্রম করে উচ্চতর পদে পদায়ন পাচ্ছেন।

আর এই বঞ্চনাবোধ কখনও কখনও মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতার জন্য দেয়, ফলে নিজেকে বঞ্চিত মনে করা সেই ব্যক্তিটি অসদুপায় অবলম্বনে তাড়িত হয়। এছাড়া কর্মজীবনে মানুষের মধ্যে অনেক কারণেই বঞ্চনাবোধ তৈরি হতে পারে। আপনি কিছু সুবিধা আগে ভোগ করতেন, কিন্তু বর্তমানে পাচ্ছেন না, তখনও আপনার নিজেকে বঞ্চিত মনে হবে। আবার কিছু প্রত্যাশা করে না পেলেও নিজেকে বঞ্চিত মনে হবে। যেমন- আপনি হয়তো প্রত্যাশা করছেন যে, আসছে বছরেই আপনি পদোন্নতি পাবেন; কিংবা নতুন বছরের শুরুতেই উৎসাহ বোনাস পাবেন, যা দিয়ে ক্রেডিট কার্ডের পাওনা সমন্বয় করবেন, কিংবা ধার করা পাওনা পরিশোধ করবেন। কিন্তু আপনার প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির যখন বিস্তর ফারাক লক্ষ করবেন, তখন নিশ্চিতভাবেই আপনার মনের আকাশে ঘন কালো মেঘ ভর করবে।

ব্যাংকারদের জন্য বিশেষ বা আলাদা কিছু করতে বলছি না, বলছি একটু বাড়তি কিছু করতে- ব্যাংকারদের স্বার্থে না হলেও ব্যাংক খাতের স্বার্থে। যেখানে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১৬ হাজার টাকা করার দাবি উঠেছে, সেখানে এখনও ব্যাংকের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ১৫ হাজার টাকা বেতনে গ্র্যাজুয়েটদের কাছ থেকে দরখাস্ত আহ্বান করা হয়। সাপোর্ট স্টাফ পদের কর্মীদের জন্য তা ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার মতো। বর্তমান বাজারে এই বেতনে চার-পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিবারের ভরণপোষণ, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়ালেখার ব্যয় নির্বাহ করা কতটা দুঃসাধ্য তা সহজেই অনুমেয়। আর আর্থিক টানাপড়েনে থাকা একজন কর্মী যেকোনো সময় অভাবের বলি হতে পারে। তাই ব্যাংকের বাইরের সিএসআর কার্যক্রমের পাশাপাশি ব্যাংকের ভেতরে নিজের কর্মীদের জন্য, বিশেষ করে নিম্ন বেতনভুক্তদের জন্যও সিএসআর কার্যক্রম নিশ্চিত করা গেলে তা প্রতিষ্ঠান এবং তার কর্মীদের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে।

শেষ কথা, অসৎ কিংবা দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়াটা কেবল ব্যক্তির মানসিকতার ওপরই নির্ভর করে না, বরং অসৎ বা দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগের সহজলভ্যতা এবং পরিস্থিতিরও একটা বিশাল ভূমিকা থাকে। সৎ বা নীতিবান হওয়ার ক্ষেত্রেও এই কথাটি সমানভাবে সত্য। একইভাবে ব্যাংকারদের অভুক্ত কিংবা রুগ্ণ রেখে ব্যাংক খাতকে সুস্থ করা যাবে না। তাই ব্যাংকারদের বেতন, বোনাস, পদোন্নতি, ছুটি, কর্মসময় ও কাজের প্রফুল্লতার মতো নিয়মিত বিষয়গুলোকে অনিয়মিত কিংবা গৌণ করে দেখা উচিত হবে না। ব্যাংকাররা সুস্থ হয়ে উঠলে ব্যাংক খাতও সুস্থ হয়ে উঠবে।

লেখকঃ মোশারফ হোসেন, ব্যাংক কর্মকর্তা

Leave a Reply