ইসলামী ব্যাংকিং এর ইতিহাস পর্ব-৩

0
870

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ আসসালামু আলাইকুম। আশা করি আল্লাহর রহমতে সবাই ভাল আছেন। ১ম ও ২য় পর্ব নিশ্চয় আপনাদের ভাল লেগেছে। আজ আমরা জানব ইসলামী ব্যাংকিং এর ইতিহাস সংক্রান্ত বিষয়ের ৩য় পর্ব সম্পর্কে। আশা করছি সবার কাজে লাগবে। আর কথা না বাড়িয়ে চলুন ৩য় পর্বে।

ইসলামী ব্যাংকিং কার্যাবলী ও ইসলামী মোডসমূহঃ
যে কোনো আর্থিক বাজারের মূল কাজ হলো সম্পদ সঞ্চয়ীদের হাত থেকে সম্পদ গ্রহণ করে উদ্যোক্তাদের হাতে তা তুলে দেয়া। এ কাজটি দুইভাবে হতে পারে। প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে। প্রত্যক্ষভাবে তা হয়ে থাকে দেশের স্টক মার্কেটের মাধ্যমে। যেখানে উদ্যোক্তা কোম্পানির তাদের প্রয়োজনীয় মূলধনের জন্য শেয়ার ছাড়ে, এবং বিনিয়োগে আগ্রহীরা শেয়ার ক্রয় করেন।

ফলে সরাসরি বিনিয়োগকারীদের হাত থেকে উদ্যোক্তাদের হাতে মূলধন পৌঁছে যায়। একইভাবে এখানে বন্ড ও ঋণপত্রেরও ক্রয়-বিক্রয় হয়। মোটকথা এখানে সরাসরি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীর সংযোগ ঘটে।

আর পরোক্ষভাবে হয়ে থাকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এরা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ জমা নেয়। পরে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে তা উদ্যোক্তাদের হাতে তুলে দেয়। এ হিসেবে ব্যাংকগুলোকে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান বলা যায়।

ইসলামী ব্যাংকগুলোও একইভাবে এক শ্রেণীর কাছ থেকে অর্থ জমা গ্রহণ করে। অপর শ্রেণীর কাছে তা তুলে দেয়। সে হিসেবে ফান্ড সংগ্রহ ও ফান্ড ব্যবহার – এই দুটি কাজই ইসলামী ব্যাংকের মূল কাজ। এছাড়া এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ফান্ড পাঠানো, সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ ইত্যাদি তো আছেই।

সাধারণত ব্যাংকগুলো গ্রাহকের কাছ থেকে কয়েক রকম হিসাবে ফান্ড সংগ্রহ করে থাকে। সঞ্চয়ী, চলতি ও মেয়াদী। চলতি হিসাবের সারকথা হলো, গ্রাহক যখন ইচ্ছে তখন টাকা তুলতে পারবে, এবং এতে কোনো মুনাফা দেয়া হবে না। এক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকগুলো কারযে হাসানা বা ওয়াদীয়াহ চর্চা করে থাকে। যেন গ্রাহক ব্যাংককে কারযে হাসানা দিচ্ছে, বা টাকাগুলো ওয়াদিয়াহ হিসেবে রাখছে।

সঞ্চয়ী হিসাবটা অনেকটা চলতির মতোই, তবে গ্রাহক বড় অংকের জমা উত্তোলনের ক্ষেত্রে ব্যাংককে অবহিত করে নেয়। আর মেয়াদী হিসাবের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য জমা রাখে, এর মধ্যে সাধারণত উত্তোলন করা হয় না। এ দুটো ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকগুলো মুদারাবা ব্যবহার করে থাকে। অর্থাৎ গ্রাহক এখানে রাব্বুল মাল বা বিনিয়োগকারী, আর ইসলামী ব্যাংকগুলো মুদারিব বা উদ্যোক্তা। ব্যাংক পুনরায় তা বিনিয়োগ করে ব্যবসা করে মুনাফার নির্দিষ্ট হার গ্রাহককে দিবে।
ফান্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেক রকম ব্যবহার প্রচলিত আছে। সাধারণ গ্রাহকরা সাধারণত কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতে অর্থ নিয়ে থাকে।

যেমন, বাড়ি কেনা বা নির্মাণের জন্য। বাড়ী কেনার প্রয়োজনে কেউ অর্থ চাইলে ইসলামী ব্যাংকগুলো তার সাথে মুরাবাহা মুয়াজ্জালাহ চুক্তি করতে পারে। মুরাবাহা হলো ক্রয়মূল্য বা খরচ ও মুনাফার পরিমাণ উল্লেখপূর্বক বিক্রয় করা। আর মুয়াজ্জালাহ মানে মেয়াদী বিক্রয়, যেখানে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে ক্রয়মূল্য পরিশোধের সুযোগ থাকে। এক্ষেত্রে গ্রাহকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক প্রথমে বাড়িটি নিজের নামে ক্রয় করে ও হস্তগত করে। অত:পর গ্রাহকের কাছে খরচ উল্লেখপূর্বক অতিরিক্ত মূল্যে ও মুনাফায় তা বিক্রয় করে। গ্রাহক তা কিস্তিতে নির্দিষ্ট মেয়াদে পরিশোধের সুবিধা পায়।

মুরাবাহা ছাড়াও এখানে ডিমিনিশিং (ক্রমান্বয়ে হ্রস্বীকৃত) মুশারাকা ব্যবহার করা হয়। এ পদ্ধতির সারকথা হলো, বাড়িটি প্রথমে ব্যাংক ও গ্রাহকের যৌথ মালিকানায় কেনা হয়। অত:পর গ্রাহক ক্রমান্বয়ে ব্যাংকের অংশ ক্রয় করতে থাকে, এবং ব্যাংকের যে অংশ সে ব্যবহার করছে, তার বিনিময়ে পূর্ব নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধ করতে থাকে। গ্রাহকের মালিকানা একশ শতাংশ হয়ে গেলে বাড়িটি সম্পূর্ণ গ্রাহকের মালিকানায় চলে যায়। এ পদ্ধতিটির আরেকটি ব্যবহারও আছে। সেটি হলো, গ্রাহক প্রতি কিস্তিতে ব্যাংকের অংশের ভাড়া পরিশোধ করে যায়, তবে মালিকানা বৃদ্ধি পায় না। এভাবে একটি পর্যায়ে এসে ব্যাংক নামমাত্র মূল্যে গ্রাহকের কাছে তা বিক্রয় করে। এ পদ্ধতিটিকে এইচ.পি.এস.এম বা হায়ার পারচেজ আন্ডার শিরকাতুল মিলকও বলা হয়।

বাড়ী নির্মাণের প্রয়োজনে অর্থ লাগলে ইস্তিসনা চুক্তি করা যায়। এক্ষেত্রে ব্যাংক হবে সানি বা নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এবং গ্রাহক মুস্তাসনি বা বাড়ীর মালিক। ব্যাংক পুনরায় কোনো ডেভেলপার কোম্পানির সাথে ইস্তিসনা চুক্তি করবে, সেখানে ডেভেলপার কোম্পানি হবে সানি’ আর ব্যাংক মুস্তাসনি। অত:পর ব্যাংক সেই প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ ছাড় করবে এবং চুক্তির সময় অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান ব্যাংককে বাড়িটি বুঝিয়ে দিবে। তারপর ব্যাংকও গ্রাহককে তা বুঝিয়ে দিবে। এবং প্রথম চুক্তি অনুযায়ী, যা ব্যাংক ও গ্রাহকের মাঝে হয়েছে, গ্রাহক কিস্তিতে ব্যাংককে ইস্তিসনার মজুরী পরিশোধ করবে।

বাড়ী নির্মাণ ছাড়া সাধারণ গ্রাহক গাড়ী কেনার জন্য অর্থ চেয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে সাধারণত মুরাবাহা ব্যবহার করা হয়। কোথাও এইচ.পি.এস.এমও ব্যবহার করা হয়।

এছাড়া অন্য সকল খাতকে (শিক্ষা, চিকিৎসা) ব্যক্তিগত অর্থায়ন বলা যায়। সুদী ব্যাংকগুলো এক্ষেত্রে সুদভিত্তিক ঋণ প্রদান করতে পারে। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকগুলোর এ ক্ষেত্রে কারযে হাসানা (সুদবিহীন ঋণ) দেয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এজন্য সাধারণ ইসলামী ব্যাংকগুলো এতে উৎসাহী হয় না।

তবে মালয়েশিয়া এক্ষেত্রে তাওয়াররুক ও বাই ইনাহ ব্যবহার করে থাকে। বাই ইনাহ একটি সাজানো ক্রয়-বিক্রয়। যেখানে বিক্রেতা ক্রেতার কাছে একটি পণ্য বিক্রয় করে। এরপর ক্রেতা অধিক মূল্যে বিক্রেতার কাছে তা বিক্রয় করে। আসলে এটি ঋণের বিনিময়ে ঋণ, যার একটি পাশে অতিরিক্ত থাকে, আর এটাই সুদ। বাই ইনাহর হারাম হওয়ার ব্যাপারে মুসলিম উম্মায় তেমন কোনো মতপার্থক্য নেই।

তাওয়াররুক প্রাথমিকভাবে মুরাবাহার মতো। এর সারকথা হলো, ক্রেতা বিক্রেতার কাছ থেকে পণ্য একটি মূল্যে বাকীতে ক্রয় করার পর অতিরিক্ত মূল্যে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কাছে নগদে বিক্রয় করে। ক্রেতার নগদ টাকার ব্যবস্থা হয়ে যায়, যা সে মূল বিক্রেতাকে কিস্তিতে পরিশোধ করে। ইনাহ’র সাথে এর মূল পার্থক্য হলো, দ্বিতীয় বিক্রয়টি বিক্রেতাভিন্ন তৃতীয় ব্যক্তির সাথে সম্পাদিত হয়।

ক্রেতার দ্বিতীয় বিক্রয় যদি সাজানো না থাকে, এবং এটি যদি কোনোভাবেই প্রথম বিক্রেতার কাছে পণ্য ফেরত পৌঁছানোর উদ্দেশে না হয়, তাহলে এর বৈধতার পক্ষে মত আছে। তবে সাজানো হলে বা প্রথম পক্ষের কাছে পণ্য ফেরত পৌঁছানো এবং নিছক ঋণের বিনিময় উদ্দেশ্য হলে অনেকেই একে ইনাহ’র মতো হারাম গণ্য করেন। [১]

তাওয়াররুক ও ইনাহ ব্যাপক ব্যবহারের কারণে মালয়েশিয়াতে সুদী ব্যাংকগুলোর প্রায় সব লেনদেনেরই বিকল্প রয়েছে। তবে মুসলিম দেশগুলোর আপত্তির কারণে দেশটি সম্প্রতি বেশ কিছু পরিবর্তনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

ব্যক্তিগত খাত ছাড়া সরকার, বড় কোম্পানি ও বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকগুলো প্রয়োজন মতো শরীয়াহর আলোকে বিনিয়োগ উপায় উদ্ভাবন করে বিনিয়োগ করে থাকে। এজন্য স্বতন্ত্র বিভাগ রয়েছে, যারা শরীয়াহ বিভাগের সাথে আলোচনা করে কাজ করে থাকে। এক্ষেত্রে মুরাবাহা, ইজারা, মুদারাবা, মুশারাকা, সালাম বা ইস্তিসনার ব্যবহার হয়ে থাকে। আর আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সালাম বা ইস্তিসনা, নতুবা মুরাবাহার ব্যবহার বেশি হয়ে থাকে।

তবে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল চেতনা মুদারাবা-মুশারাকার মাঝে। যেখানে উভয় পক্ষ বিনিয়োগ করবে, বা এক পক্ষ বিনিয়োগ করবে এবং অপরপক্ষ তা ব্যবস্থাপনা করবে। মুনাফা উভয় পক্ষের মাঝে পূর্ব নির্ধারিত হারে বন্টিত হবে। আর ক্ষতি হলে প্রত্যেক পক্ষ মূলধন বিনিয়োগের হার অনুযায়ী তা বহন করবে।

মানুষের নৈতিক অধঃপতন, মিথ্যা ও খেয়ানতের ছড়াছড়ি, ইত্যাদি নানা কারণে বিশ্বব্যাপী এখনো মুদারাবা-মুশারাকার ব্যাপক প্রচলন লক্ষ্য করা যায় না। তবে আলোচনা চলছে, সচেতন বাড়ছে, গবেষণা হচ্ছে। আশা করা যায় সেদিন বেশি দূরে নেয় যেদিন মুদারাবা ও মুশারাকাই হবে যে কোনো বিনিয়োগে সর্বাধিক ব্যবহৃত পদ্ধতি।

চলবে……………………………………………………।

ভাল থাকবেন। আল্লাহ হাফিজ।

তথ্যসূত্রঃ
১. তাওয়াররুক ও ইনাহ’ বিষয়ে মুফতী তাকী উসমানী হাফিজাহুল্লাহর ‘কাযায়া ফিকহিয়্যাহ মুয়াসারাহ’ দ্রষ্টব্য।

Leave a Reply