অর্থনীতির কান্ডারী ব্যাংকার বন্ধুদের জন্য

0

বর্তমানে বাংলাদেশে পুরা ব্যাংকিং সেক্টরের আমানত ১১ লক্ষ আটত্রিশ হাজার কোটি টাকার মত। মোট আমানতের ১০% টাকাও ব্যাংক মালিকদের ইক্যুইটি নাই।

তাহলে একবার ভাবুনতো আপনার চাকরিটা কে দিয়েছে! ব্যাংক মালিক নাকি আমানতকারী? নিশ্চয়ই আমানতকারী। এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য ব্যাংকের স্বাস্থ্য বড় হয়েছে। তার বড় স্বাস্থ্য দেখভালের জন্য এতো এতো কর্মীর প্রয়োজন হচ্ছে। তাহলে আরেকবার ভাবুনতো ব্যাংকের প্রকৃত মালিক কে? নিশ্চয়ই আমানতকারী।

আজ সেই আমানতকারীদের বড় বিপদ! তাদের টাকার দরকার। তাদের এখন আয় বন্ধ। কেউ জমানো টাকা তুলবে, কেউ মাস শেষে জমানো টাকার সুদ/ মুনাফা তুলবে, কেউ তার হিসাবে ঢুকা বেতন তুলবে। এভাবেই তাদের উনুন জ্বলবে। আর আপনি ব্যাংক বন্ধ রাখলে ৫/৬ কোটি ‘আমানতকারী’ নামক ব্যাংক মালিক টাকা তুলতে পারবে না। এতে তাদের উনুন জ্বলবে না। আমানতকারী বিপদে টাকা না পেলে ব্যাংকে টাকা রাখা বন্ধ করে দিবে বা কমিয়ে দিবে। এতে ব্যাংকের স্বাস্থ্য ছোট হবে। আর ছোট স্বাস্থ্য দেখভালের জন্য লোকজনও নিশ্চয়ই কম দরকার হবে!

ব্যাংকিং ব্যবসার উন্নয়নে প্রাচীন মহাজনদের বিরাট অবদান আছে। একটা স্লিপের বিনিময়ে জনগণ তাদের কাছে টাকা-পয়সা ও মূল্যবান জিনিষপত্র গচ্ছিত রাখতো। স্লিপটা এতোটাই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে, স্লিপটা উল্লেখিত টাকার মূল্যমাণ হিসেবে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে প্রাচীন গ্রীক, বেবিলন ও মিশরীয় সভ্যতায় ধর্মীয় উপাসনালয়কে কেন্দ্র করে ব্যাংকিং ব্যবসা পরিচালিত হতো। তাই এটাকে “উপাসনালয় ব্যাংকিং” ও বলতো।

ব্যাংকিং ব্যবসা টিকে থাকে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের উপর। এই বিশ্বাস ও আস্থা নষ্ট করা যায় না। জনগণ বিশ্বাস করে ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা চাইলেই সে যে কোন মুহূর্তে তুলতে পারবে।

ব্যাংক আমানতকে প্রধানত দুইটি ভাগে ভাগ করে। এক. তলবি আমানত। দুই. মেয়াদি আমানত। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে মেয়াদি আমানত বলে কিছু নাই। গ্রাহক চাইলে যে কোন আমানত যে কোন সময় তুলতে পারে। যে কোন সময় তার আমানত তুলতে পারবে, এই আস্থা ও বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে ব্যাংকিং শিল্প গড়ে উঠেছে, এর বিকাশ হচ্ছে, এবং বিকাশ হবে। এতে আস্থার সংকট তৈরি করা যাবে না।

শিল্প মালিক ও বড় বড় ব্যবসায়ীরা ব্যাংকে টাকা রাখে না। এরা ধার করে চলে। নিজের এক’শ টাকা থাকলে তিন’শ টাকার প্রোজেক্ট হাতে নেয়। এই আমানতকারীদের জমার টাকার উপর ভর করে। এখন এরাও ভালো থাকবে না। উৎপাদন বন্ধ। কাঁচামাল নষ্ট হচ্ছে। উৎপাদিত পণ্য বিক্রি হচ্ছে না। নষ্ট হচ্ছে। নতুন চাহিদা নাই। অর্ডার বাতিল হচ্ছে। কিছু কিছু অনিচ্ছাকৃত ঋণখেলাপী তৈরি হবে। সাথে সাথে স্বভাবজাত ঋণখেলাপীরা করোনা নামক একটা নতুন অজুহাত পাবে। এতে ব্যাংকের মুনাফা কমবে, খরচ বাড়বে, স্বাস্থ্য দুর্বল হবে। ব্যাংক খরচ কমানোর জন্য কৃচ্ছসাধন করবে। অনেকের কর্ম হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।

কভিড-১৯ এর কারণে পরিবর্তিত সংকটময় পরিস্থিতিতে যে সকল জরুরি সেবা-পরিসেবা চালু আছে তার মধ্যে ব্যাংক ও ব্যাংকারের দায় অনেক বেশি।৷৷। কারণ আমরা যাদের কাছ থেকে এতোদিন উপকৃত হয়েছি তাদেরকেই সেবা দিচ্ছি। দুইদিন আগেও আমাদেরকে আমানতকারীদের পিছনে পিছনে ঘুরতে হয়েছে। ডিপোজিটের জন্য। ডাক্তার, নার্স, পুলিশ, সেনাবাহিনী, প্রশাসন, সাংবাদিক ইত্যাদি যাদেরকে সেবা দিচ্ছে সরাসরি তাদের থেকে উপকারভোগী নয়। সরাসরি কাস্টমার সেবা শুধু ব্যাংকাররাই দিচ্ছে? না। মুদি দোকানদার, ফার্মেসি, সব্জি বিক্রেতা ইত্যাদি অনেক পেশার মানুষ দিচ্ছে।

কিন্তু শহীদদের রক্ত ভেজা বর্ণমালা দিয়ে নিজ পেশা, নিজ ব্যাংক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সরকারের সমালোচনায় এমন অশ্লীল কাব্য রচনা কোন পেশার মানুষ করেছে কি? আপনি সম্মান, স্বীকৃতি, ঝুঁকি ভাতা ইত্যাদি অনেক কিছু না পাওয়ার অজুহাত দেখাতে পারেন। কিন্তু এ সব আপনার অশ্রাব্য, অশালীন, অশোভন, ও শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণের বৈধতা দিতে পারে?

আপনি চাকরিতে ঢুকতে কর্মকর্তা/ কর্মচারীদের আচরণ বিধিতে স্বাক্ষর করেননি? করেছেন নিশ্চয়ই। কাজের প্রেশারে ভুলে গেছেন! আচরণ বিধির কথা ছাড়ুন। দেশের বিদ্যমান আইন কি বলে জানেন তো?

বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭(১) অনুচ্ছেদ ও ফৌজদারি দন্ডবিধি ২৯৪(খ) ধারা অনুসারে কোন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অশালীন ও শিষ্টাচার বহির্ভূত সমালোচনা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

২৬ মার্চের পর থেকে ব্যাংকিংকে যারা শুধু চাকরি ভাবছেন তাঁরা কষ্ট পাবেন। এটা পুরা জাতি তথা সমগ্র মহাবিশ্বের একটা যুদ্ধ। আর আপনি সেই যুদ্ধের অগ্র সেনানী! তারিখটা দেখুন না! ২৬ মার্চ! এটা স্বাধীনতা ঘোষনার তারিখ। এটা বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের প্রথম মুক্তিযুদ্ধ। এ যুদ্ধ হতে কেউ পালাতে চাইবে! কেউ অংশ নিতে না পারার বেদনার মনঃক্ষুণ্ন হবেন! সব যুগে, সব দেশে, সব দূর্যোগে সবাই যোদ্ধা হতে পারে না। সবার এ সৌভাগ্য হয় না।

আমাদেরতো ত্যাগের ইতিহাস আছে। ৫২ এর ভাষা শহীদের কথাটায় ভাবুন না। কি পাওয়ার লোভে জীবন দিয়েছিল? মুক্তিযুদ্ধের কথা মনে করুন না! একবার ভাবুনতো দেশটা স্বাধীন হতে না পারলে আজকের মুক্তি যোদ্ধারা কি তকমা পেতেন? দেশদ্রোহী! বিশ্বাসঘাতক! মৃত্যুদন্ড নিশ্চিত! তখন কি কেউ কোটা পাবে, ভাতা পাবে, সম্মান পাবে কল্পনাও করেছিল? তখনতো সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। আর আপনি ব্যাংকার এখন সরকারের সহযোগী হিসেবে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন। এখন সরকার আছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা আছে, আপনার নিজের প্রতিষ্ঠান আছে। এরা এখন আর্থিকভাবে অনেক সামর্থ্যবান। কেন আগাম ভাবছেন আপনার পাশে দাঁড়াবে না!

করোনার কারণে স্বাভাবিক ভীত হওয়াটা সচেতনতার লক্ষণ। হে তরুণ এটা সংগ্রাম, যুদ্ধ, চাকরি নয়! স্বাভাবিক ভয় পাওয়াটা যুদ্ধে কৌশলী ও সতর্ক হতে সাহায্য করে। তবে ভয়টা পিছিয়ে যাওয়ার জন্য নয়। প্রয়োজনে বয়স্ক ও নারী সহকর্মীকে বাসায় থাকার সুযোগ দিয়ে আপনি অফিস করুন না। ত্যাগের সুখ পৃথিবীর শ্রেষ্ট সুখ!

মনে করুন না যে ম্যাজিস্ট্যাট পাশে লাশের স্বজনবিহীন করোনায় মৃত ব্যক্তির জানাজা পড়াচ্ছেন তাঁরও পরিবার আছে, যে পুলিশ করোনা রুগীকে রাত তিনটায় খাবার পৌঁছে দিচ্ছে তাঁরও পরিবার আছে। যে নার্স করোনায় মৃত্যুশয্যার রুগীকে সেবা দিচ্ছেন তাঁরও পরিবার আছে। তাঁদেরও অনেক না পাওয়ার গল্প আছে। কিন্তু তাঁরা না পাওয়ার গল্পগুলো জনসম্মুখে বলছে না। কিংবা এতো অশ্লীল কাব্যময় ছন্দে বলে না! এতেই এদের পেশা আরো মহান হচ্ছে।

ব্যাংকিং পেশা প্রাচীন কাল থেকে সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও সম্মানিত পেশা ছিল। আজকে আমাদের নিজগুণে এর জৌলুশ নষ্ট হচ্ছে। আমরা নিজেরাই নিজের পেশাকে সম্মান করছি না। নিচে নামাচ্ছি। বেশ বিশ্রি ভাষায়! এ গ্রুপগুলোতে ব্যাংকারের বাইরের অনেকে আছে। আমরা আমাদের সম্মান নিলামে বিক্রি করছি। আর ভুল জায়গায়, ভুল মানুষের কাছে সম্মান খুঁজে বেড়াচ্ছি!

আবার বলছি, কাতার ও কুয়েত ব্যতীত বর্তমান করোনার তীর্থস্থান নিউইয়র্ক (যেখানে ৬০+% লেনদেন অনলাইনে হয়) পর্যন্ত ব্যাংক বন্ধ করার সাহস করতে পারেনি। যারা এখনো ব্যাংক বন্ধ করার জন্য দাবি তুলছেন, যারা জীবনের মূল্য চিন্তা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছেন তাঁদের একটাই বিকল্প পথ। চাকরিটা ছেড়ে দেন। বেঁচে থাকলে কত চাকরি! এ চাকরি আপনার জন্য নয়। এ চাকরিতে ঈদের আগের দিনও শ্রমিকের মজুরি দেওয়ার জন্য অফিস করতে হয়।

আসুন এ করোনায় ত্যাগের দৃষ্টান্তই হোক পেশার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উত্তম পাথেয়! সবাই যতদূর সম্ভব সতর্ক থাকুন, সুস্থ থাকুন।

বি.দ্রঃ অহ হে, সবাই বলবেন বাসায় বসে বসে লেকচার দেওয়া সহজ। সত্যিই আমি বাসায় বসে আছি। ট্রেনিং এ ছিলাম। স্থগিত। তবে করোনা মোকাবেলায় উপজেলা প্রশাসন স্বেচ্ছাসেবক টীম গঠন করেছে। আমি সে টীমের নাম দিয়েছি। ডাক পড়লে চলে যাব। আমারও ছয় মাস বয়সের একটা ফুটফুটে ছেলে আছে!

সোর্সঃ যোবায়ের হোসেন
সহকারী পরিচালক
বাংলাদেশ ব্যাংক

Leave a Reply