ব্যাংক ডাকাতির বিভিন্ন ধরণ

0
411

কাজটা অপরাধের, কিন্ত ‘ব্যাংক ডাকাতি’- শব্দটার মধ্যেই কোথাও যেন বুনো রোমাঞ্চ লুকিয়ে থাকে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সব হোমরা-চোমড়া ব্যক্তিদের টাকাপয়সা গচ্ছিত থাকে বিভিন্ন ব্যাংকে, আর তাই সেখানে ডাকাতি করতে পারলে বড় রকমের একটা দাও মারা সম্ভব খুব ভালোভাবেই। তবে কাজটা মোটেও সহজ কিছু নয়। ব্যপারটা যখন প্রচুর টাকা-পয়সার, ব্যাংক কর্তৃপক্ষও যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। তবে এই নিরাপত্তাব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অনেকবারই ডাকাতেরা লুটে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা, এরকম অনেক কেসের কোন সুরাহা হয়নি, সন্ধান মেলেনি ডাকাত দল কিংবা টাকা কোনটারই। এমন কিছু রহস্যজনক আর সিনেম্যাটিক ব্যাংক ডাকাতির গল্প নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন।

ম্যানেজারকে অপহরণ করে ব্যাংক ডাকাতি
লন্ডনের ওয়েস্টমিনিস্টার এলাকা, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান এটি। সার্বক্ষণিক পুলিশি প্রহরা থাকে। বৃটেনের প্রধানমন্ত্রীর অফিসও এই এলাকায়। আর এখানেই কিনা ডাকাতি করার পরিকল্পনা করেছিল একদল ডাকাত। শুধু পরিকল্পনা নয়, সফলভাবে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নও করেছিল তারা। সরাসরি হামলা চালিয়ে এই দুর্গে সুবিধা করতে পারবে না, বুঝে গিয়েছিল ডাকাতেরা। অস্ত্রের জোর নয়, এখানে তাই খাটাতে হয়েছিল বুদ্ধির জোর। আর সেকারনেই ডাকাতেরা কিডন্যাপ করেছিল ন্যাশনাল সিকিউরিটি ডিপোজিটের ম্যানেজারকে, ভয় দেখানো হয়েছিল, তার পরিবারকেও অপহরণ করা হবে। সময়কাল ২০০৬ সাল।

নাইটসব্রীজের সিকিউরিটি ইনচার্জেরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করছিলেন, কোথাও কোন গোলমাল নজরে পড়েনি কারো। কিন্ত পরিবারকে বাঁচাতে যে ভেতরের মানুষেরাই বাধ্য হয়ে বেইমানী করছে সেটা ধারণাতেও ছিল না কারো। ভেতরে ঢুকে সবাইকে জিম্মি করে বেঁধে ফেলেছিল ডাকাতেরা। প্রায় ৬৫ মিলিয়ন পাউন্ড (বর্তমান সময়ে যার মূল্যমান প্রায় ১২০ মিলিয়ন পাউন্ড) সমমূল্যের টাকা আর স্বর্নালঙ্কার ছিল ক্যাশ ভল্টে,পুরোটাই চুরি করে নিয়ে যায় লুটেরার দল। ঘন্টাখানেক পরে বাঁধন খুলে মুক্তি পায় এক নিরাপত্তাকর্মী, সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশে খবর দেয়া হয়, কিন্ত ততক্ষণে ডাকাতের দল হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। পরে অভিযান চালিয়ে এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে প্রায় ৩৪ জনকে আটক করেছিল পুলিশ, লুট হয়ে যাওয়া টাকার কিছু অংশও উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। তবে স্বর্ণগুলো উদ্ধার করা যায়নি। এই ঘটনার মূল হোতা ছিল ইতালীর প্লেবয় খ্যাত ভ্যালেরিও ভিকে। এই লোক তার জীবনে প্রায় পঞ্চাশটি ব্যাংক ডাকাতিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নিয়েছে বলে জনশ্রুতি আছে! এই লাইনের কিংবদন্তীই বলা চলে তাকে!

নর্দান ব্যাংকে ডাকাতি
আরও একবার ইংল্যান্ডেই একই কায়দায় ডাকাতি করেছিল একদল ডাকাত। তবে এই ঘটনাটাই আগে ঘটেছিল। ২০০৪ সালের বড়দিনের আগমূহুর্ত, আসন্ন ছুটি আর উৎসবের আমেজ সবার মধ্যে, জমানো কাজ সেরে রাখছে সবাই। ক্রিসমাসের ঠিক আগেরদিনই ঘটে গেল ঘটনাটা। ডাকাতদলের কয়েকজন সদস্য গিয়েছিল নর্দান ব্যাংকের দুটো শাখার ম্যানেজারের বাসায়, পিস্তলের মুখে দুটো পরিবারের সব সদস্যকে জিম্মি করে ফেলেছিল তারা। ম্যানেজারকে তারা পইপই করে বলে দিয়েছিল, একদম স্বাভাবিক আচরণ করে যাতে তাদেরকে ব্যাংকের লকার খুলে দেয়া হয়। দুই ম্যানেজার বাধ্য হয়েছিলেন এই অন্যায় দাবী মেনে নিতে। প্রায় ৪১ মিলিয়ন ডলার ডাকাতি করে পালিয়ে গিয়েছিল দুর্বৃত্তেরা। জিম্মিদের পরিবারের সদস্যদেরও ডাকাতির পরপরই মুক্তি দেয়া হয়ে গিয়েছিল। এই দলটার কোন খোঁজই আর বের করতে পারেনি পুলিশ, যেন ভোজবাজীর মতো মিলিয়ে গিয়েছিল ওরা। লণ্ডনের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের আনসলভড মিস্ট্রিগুলোর মধ্যে এটা একদম শীর্ষেই আছে।

চকলেট খাইয়ে ডাকাতি
এবিএম আম্রো ব্যাংক, ব্রাসেলস, বেলজিয়াম। কার্লোস হেক্টর ফ্লোমেনবাউম নামের এক ভদ্রলোক এই ব্যাংকের গ্রাহক হয়েছিলেন এক বছর আগে। লোকে ব্যাংকে টাকা লেনদেন করার জন্যে গ্রাহক হয়, আর ইনি ব্যাংক একাউন্ট খুলেছিলেন ডাকাতি করার পরিকল্পনায়। ব্যাংক ডাকাতির ইতিহাসে এমন নাটকীয় ঘটনা বোধহয় দ্বিতীয়টা আর ঘটেনি। কার্লোস একাউন্ট খোলার পর থেকে নিয়মিত ছোট ছোট ট্রানজেকশন করতে আসতেন ব্যাংকে, আর প্রতিবার আসার সময় ব্যাংকের সিকিউরিটি গার্ড থেকে শুরু করে ম্যানেজার পর্যন্ত সবার জন্যে চকলেট নিয়ে আসতেন। সবার সঙ্গেই দারুণ খাতির জমিয়ে ফেলেছিলেন তিনি, ব্যাংকের কর্মীরা ভীষণ পছন্দ করতো কার্লোসকে। সে যে নিপাট একজন ভদ্রলোক সেই ব্যপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না কারো। কিন্ত ভুলটা যখন ভাংলো সবার, তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। চকলেটের সঙ্গে চেতনানাশক ঔষধ মিশিয়ে নিয়ে এসেছিল কার্লোস, সেটা খেয়ে সবাই তলিয়ে পড়ে গভীর ঘুমে। সবার অজ্ঞান হওয়া নিশ্চিত করার জন্যে নাকি চেতনানাশক স্প্রে’ও নিয়ে এসেছিল কার্লোস। সেদিন ব্যাংক থেকে প্রায় একুশ হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের মুদ্রা আর স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যায় সে। পুলিশ হাজার চেষ্টা করেও ধরতে পারেনি কার্লোসকে, ইন্টারপোলও তার টিকির নাগাল পায়নি। একক প্রচেষ্টায় সংঘটিত সবচেয়ে বড় ব্যাংক ডাকাতি এটাই।

একবার না পারিলে দেখো শতবার
ইংল্যান্ডের ডাকাতেরা বাংলা কবিতা পড়ে না, তবে কবিতার এই লাইনটা ওদের কাজের সঙ্গে দারুণভাবে মিলে গিয়েছিল। ২০০৭ সাল, ইউরোপে তখন অনলাইন ব্যাংকিং শুরু হয়ে গিয়েছে, লেনদেন সবকিছু অনলাইনেই হয়। সেই অনলাইন ব্যাঙ্কিঙের ফাঁক গলে সার্ভার হ্যাক করে হ্যাকারেরা প্রায় তিনশো মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেয় সুমিতোমো ব্যাংক থেকে। একবার দুইবার নয়, টানা তেইশবার চেষ্টা করেছিল হ্যাকারেরা, প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছি। চব্বিশতমবারে তারা সফল হয়। বৃটেনের ইতিহাসে টাকার অঙ্কের হিসেবে এটাই সবচেয়ে বড় ব্যাংক ডাকাতি। কিছুদিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও একইরকম ভাবে প্রায় আটশো কোটি টাকা চুরি করেছে একদল হ্যাকার। ভেতরের কারো যোগসাজশেই ঘটেছে এই ঘটনাটা, চীনভিত্তিক হ্যাকারেরাই এই ঘটনার নেপথ্যে, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে এমনটাই। টাকা সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল শ্রীলঙ্কা আর ফিলিপাইনে। হ্যাকারেরা এই সুইফট কোডগুলো বের করে তা দিয়ে ফেডারেল ব্যাংক থেকে প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলার তাদের সুবিধামতো অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নিয়েছিল। কোন ব্যাংক থেকে সবচেয়ে বেশি টাকা চুরির তালিকায় এটির অবস্থান পঞ্চম।

সুড়ঙ্গ খুঁড়ে ব্যাংক ডাকাতি
সুড়ঙ্গ খুঁড়ে ব্যাংক ডাকাতির ইতিহাসটা নতুন কিছু নয়। বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘটেছে এই এই ঘটনা, টেকনিকটাও জানে অনেকেই। এদের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ডাকাতিটা সংঘটিত হয়েছিল ব্রাজিলে। ২০০৫ সালে সেদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় আড়াইশো ফুট দূরের এক কক্ষ থেকে মাটির নীচে দিয়ে সুড়ঙ্গ খোঁড়া হয়েছিল, সেই সুড়ঙ্গ এসে শেষ হয়েছিল ব্যাংকের ভল্টরুমে। শহরের কেন্দ্রস্থলে ব্যাঙ্কের পাশেই একটা কমার্শিয়াল বিল্ডিং ভাড়া নিয়ে সেটার নীচে থেকে সুড়ঙ্গ খুঁড়েছিল ডাকাতেরা। এক ধাক্কায় বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় সাড়ে পাঁচশো কোটি টাকা চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল লুটেরারা। পুরো প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন করতে প্রায় তিন মাস সময় লেগেছিল। আশ্চর্য্যের ব্যপার হচ্ছে, পুরো সুড়ঙ্গটাই ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত! চুরি যাওয়া টাকার সিকিভাগও উদ্ধার করা যায়নি। বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে সোনালী ব্যাংকেও এভাবে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে ডাকাতি করা হয়েছিল, একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছিল বগুড়ার ডাকাতেরাও। কিশোরগঞ্জের ডাকাতির মূল হোতা সোহেল ধরা পড়েছিল, বিশ লক্ষ টাকা বাদে বাকীটা উদ্ধারও করা হয়েছিল। মাস দুয়েক আগে ভারতের মুম্বাইতেও একইরকমের একটা ঘটনা ঘটেছে।

রক্ষক যখন ভক্ষক
১৯৯৭ সাল, আমেরিকা। ডানবার্ডের নিরাপত্তারক্ষীদের প্রধান ইন্সপেক্টর রবার্ট নিজেই চুরি করলেন প্রতিষ্ঠানের বিশাল অঙ্কের টাকা। নিরাপত্তাকর্মীদের একটা ছোট অংশকে লোভ দেখিয়ে এই কাজে প্রলুব্ধ করেছিলেন রবার্ট। আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ব্যাংক ডাকাতি এটা, কর্তৃপক্ষের দেয়া হিসেবে প্রায় উনিশ মিলিয়ন ডলার লুটে নিয়েছিলেন রবার্ট। পরে অবশ্য সাঙ্গোপাঙ্গ সহ ধরা পড়েছিলেন তিনি, টাকাও উদ্ধার হয়েছিল অনেকটাই। আবার আয়ারল্যান্ডের নর্দার্ন ব্যাংকে দুই ডাকাত রাতের বেলা সিকিউরিটি এজেন্সির পোষাক পরে ঢুকে গিয়েছিল, লুট করেছিল প্রায় চারশো কোটি টাকা। জড়িত সন্দেহে বেশ ক’জন গ্রেফতার হয়েছিলেন, তবে মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার আড়ালেই থেকে গিয়েছিলেন। টাকাও সবটা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

রেলগাড়িতে ব্যাংক ডাকাতি
ঘটনাটা বেশিদিন আগের নয়। ভারতের চেন্নাইয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের শাখা থেকে ট্রেনে করে তামিলনাড়ু পাঠানো হচ্ছিল প্রায় চারশো কোটি রূপি। সিনেমার গল্পের মতো করেই পথিমধ্যে চলন্ত ট্রেন থেকেই আটাশটি লোহার বক্সে ভরা টাকাগুলো গায়েব হয়ে যায়! সবগুলো বাক্স মিলিয়ে ওজন ছিল প্রায় তেইশ টন।ট্রেনের নিজস্ব নিরাপত্তারক্ষী তো ছিলই, তাদের সঙ্গে ছিল প্রায় একশো সদস্যের সশস্ত্র গার্ড। কিন্ত সর্ষের ভেতরেই হয়তো ভূত ছিল। নইলে এই বিশাল ওজনের এতগুলো বাক্সভর্তি এই পরিমাণ টাকা হাওয়া হয়ে যাওয়া সম্ভব নয় কোনভাবেই। ট্রেনের ছাদ গলিয়ে কামরা থেকে বাক্সগুলো ওপরে তুলে নেয়া হয়েছিল।

সিনেমায় দেখা ব্যাংক ডাকাতি আর বাস্তবের ব্যাংক ডাকাতি এক নয় কোনভাবেই। তবে বাস্তব কখনও কখনও চাপিয়ে যায় সিনেমাকেও। ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত এই ব্যাংক ডাকাতিগুলোর গল্প শুনলে এমনটাই মনে হতে বাধ্য।

কার্টেসিঃ সংগৃহীত

Leave a Reply