ইসলামী ব্যাংকের সংজ্ঞা

0
760

ইসলামী ব্যাংকিং (مصرفية إسلامية‎) বলতে ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক আর্থিক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে গড়ে উঠা ব্যাংক ব্যবস্থাকে বুঝায়। ইসলামী ব্যাংক দুটি মূলনীতির উপর প্রতিষ্টিত; যথাঃ লাভ ও লোকসানের ভাগ নেওয়া এবং সুদ লেনদেন নিষিদ্ধ। ইসলামী ব্যাংক এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যার উদ্দেশ্য হচেছ ব্যাংকিং ক্ষেত্রে ইসলামের অর্থনৈতিক ও আর্থিক নীতিমালার বাস্তবায়ন করা। ব্যাংকিং খাতে সুদের নির্মূল করে সুদবিহীন ব্যাংক ব্যবস্থা কায়েমে এই আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ব্যাংকের সংজ্ঞা থেকেই এ প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে উঠবে।

উৎপত্তিগত অর্থ
ইসলামী ব্যাংকিং যদিও ইসলামী ধারণা সে হিসেবে আরবি শব্দ مصرفي (মাছারিফ) হতে এই শব্দটি (ইসলামী ব্যাংক) উৎপত্তি লাভ করেনি। বরং ইংরেজি শব্দ Bank Etymology অনুযায়ী প্রাচীন ইতালীয় শব্দ Banca অথবা মধ্যযুগীয় ফরাসী শব্দ Banque থেকে এসেছে।

ইসলামী ব্যাংকের সংজ্ঞা
মালয়েশিয়ার ‘ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যাক্ট ১৯৮৩’ এর সূত্র অনুযায়ী ইসলামী ব্যাংকের সংজ্ঞা নিম্নরূপ-
Islamic Bank is a company which carries on Islamic Banking business . . . . Islamic Banking business means banking business whose aims and operations do not involve any element which is not approved by the religion Islam.
অর্থাৎ “ইসলামী ব্যাংক এমন একটি কোম্পানি, যা ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবসায় নিয়োজিত– ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবসা হচ্ছে এমন এক ধরনের ব্যবসা যার লক্ষ্য এবং কার্যক্রমের কোথাও এমন কোন উপাদান নেই যা ইসলাম অনুমোদন করেনি।
উপরে যে সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে তাতে ইসলামী ব্যাংকের সংজ্ঞার সাথে সাথে ইসলামী ব্যাংকিং এর সংজ্ঞাও দেয়া হয়েছে। তা হলো, ইসলামী ব্যাংকিং এমন এক ধরনের ব্যবসা, যার লক্ষ্য ও কর্মকাণ্ডের কোথাও এমন কোন উপাদান নেই, যা ইসলাম অনুমোদন করে না।

ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) সচিবালয় হতেও ইসলামী ব্যাংকের একটি সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। ১৯৭৮ সালে সেনেগালের রাজধানী ডাকারে অনুষ্ঠিত ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে দেয়া ইসলামী ব্যাংকের সংজ্ঞাটি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকসহ অন্যান্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ওআইসির সংজ্ঞাটি গ্রহণ করা হয়েছে। ওআইসি-এর দেয়া সংজ্ঞাটি হলো-
Islami Bank is a financial institution whose statutes, rules and procedures expressly state its commitment to the principles of Islamic Shariah and to the banning of the receipt and payment of interest on any of its operations.
অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংক এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যা তার মৌলিক বিধান ও কর্মপদ্ধতির সকল স্তরে ইসলামী শরীয়াতের নীতিমালা মেনে চলতে বদ্ধপরিকর এবং তার কর্মকাণ্ডের সকল পর্যায়ে সুদ বর্জন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

তা ছাড়া ইসলামী ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক সংস্থা International Association of Islamic Banks ইসলামী ব্যাংকের একটি সংজ্ঞা প্রদান করেছে। এ সংজ্ঞায় বলা হয়েছে-
The Islamic Bank basically implements a new banking concept, in that it adheres strictly to the ruling of the Islamic Shariah in the fields of finance and other dealings. Moreover, the bank which is functioning in this way must reflect Islamic principles in real life. The bank should work towards the establishment of an Islamic society; hence, one of its primary goals is the deepening of the religious spirit among the people.
অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংক মূলত একটি নতুন ব্যাংকিং ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেয়, যাতে তা ফাইনান্স এবং অন্যান্য কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়ার বিধিবিধান কঠোরভাবে মেনে চলে। অধিকন্তু, ইসলামী ব্যাংক এভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে বাস্তব জীবনে ইসলামী বিধিবিধানকে অবশ্যই প্রতিবিম্বিত করবে। ব্যাংককে একটি ইসলামী সমাজ বিনির্মাণ করার লক্ষ্যে কাজ করা উচিত এবং সে জন্য এর অন্যতম প্রাথমিক লক্ষ্য হলো জনগণের মধ্যে ধর্মীয় চেতনা গভীরভাবে প্রোথিত করা।

ইসলামী ব্যাংক সম্পর্কে ড. শাওকী ইসমাঈল সাহতা বলেন-
It is therefore, – – -imperative for an Islamic bank to incorporate in its functions and practices commercial investment and social activities, as an institution designed to promote the civilized mission of an Islamic economy.
অর্থাৎ কাজেই ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম ও প্রয়োগ রীতিতে বাণিজ্যিক বিনিয়োগ এবং সামাজিক কার্যাবলির সমন্বয় সাধন করা অত্যন্ত জরুরি, যেন এটি ইসলামী অর্থনীতির সুশীল লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটি প্রতিষ্ঠান রূপে কাজ করতে পারে।

ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ-এর মতে-
Islamic banking is essentially a normative concept and could be defined as conduct of banking in consonance with the ethos of the value system of Islam.
অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংকিং হলো একটি নীতিগত ধারণা এবং এটিকে ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে পরিচালিত ব্যাংকিং হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়।

উপরের সংজ্ঞাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ইসলামী ব্যাংকিং আর্থিক মধ্যস্থতার এমন একটি পদ্ধতি, যা তার লেনদেনে সুদ গ্রহণ ও সুদ প্রদান করে। এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বা ব্যাংকিং ব্যবস্থা এমনভাবে পরিচালিত হয়, যাতে ইসলামী অর্থনীতির উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হয়। এটি এমন এক ব্যাংকিং ধারার সৃষ্টি করে, যার লেনদেনের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো লাভ লোকসানের অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং একটি ন্যায়ানুগ ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতি কায়েম করা।

Leave a Reply