ব্যাংকে গ্রাহকসেবাঃ ব্যাংকারদের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

0
2313

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ গ্রাহকসেবার শপথ নিয়ে ব্যাংকের চাকরিতে যোগদান না করলেও ব্যাংকার হওয়ার দিনকয়েকের মধ্যেই বুঝতে বাকি থাকে না, ব্যাংকার-গ্রাহকের রাজ্যে গ্রাহকরাই রাজা! কারণ মুনাফামুখী যেকোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকরাই প্রাণ এবং তারাই এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক বৃত্তের কেন্দ্র। আর ব্যাংক বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রবাদটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য। কোনো গ্রাহক নারাজ তো সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারের সর্বনাশ— বাংলাদেশ ব্যাংকের দৃষ্টিভঙ্গি এখন এমনটাই। তাই ব্যাংকিং পেশায় গ্রাহকসেবাই ব্যাংকারের একমাত্র ব্রত, গ্রাহক সন্তুষ্টিতেই ব্যাংকারের আত্মতুষ্টি। তথাপি গ্রাহকরা অনেক কারণেই ব্যাংকারদের ওপর রুষ্ট, যার কিছু যৌক্তিক আর কিছু আবেগী। তেমনই কিছু আবেগী অভিযোগ তুলে ধরলাম—

এক গ্রাহকের ব্যবসায়িক চলতি হিসাবে ৫০ হাজার টাকার একখানা চেক উপস্থাপিত হলো। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকার চেকখানা পোস্টিং দিতে গিয়ে দেখলেন যে, উপস্থাপিত চেকটি অনার করলে গ্রাহকের হিসাবে মিনিমাম ব্যালান্স থাকে মাত্র ১০০ টাকা, যা ব্যাংকের সার্কুলার পরিপন্থী এবং ব্যাংকিং সফটওয়্যার লেনদেনটি অ্যালাউ করবে না। আবার চেকটি ডিজঅনার হলেও গ্রাহকের সুনাম ক্ষুণ্ন হবে। ফলে বেচারা ব্যাংকার বিনয়ের সঙ্গে গ্রাহককে ফোন দিয়ে বললেন, ‘আপনার হিসাবে ৫০ হাজার টাকার একখানা চেক উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু মিনিমাম ব্যালান্স ১ হাজার টাকা থাকে না (ব্যাংকের সার্কুলার মতে চলতি হিসাবে মিনিমাম ব্যালান্স ১ হাজার টাকা থাকতে হবে) বলে আপনার হিসাবের চেকখানা অনার করা যাচ্ছে না। আপনি দয়া করে এক্ষুনি আপনার হিসাবে কমপক্ষে ৯০০ টাকা জমা করুন।’ গ্রাহক উত্তর দিতে সময় নিলেন না। বলিষ্ঠ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার হিসাবে কত টাকা ব্যালান্স থাকে?’ বেচারা ব্যাংকার হকচকিয়ে গিয়ে বললেন, ‘১০০ টাকা।’

গ্রাহকের উত্তর, ‘তাহলে কী সমস্যা? চেক পাস হওয়ার পরও তো আমার হিসাবে আরো ১০০ টাকা থাকে, তাহলে আমার চেক পাস হবে না কেন?’ ব্যাংকার নরম সুরে স্পষ্ট করে বললেন, ‘মিনিমাম ব্যালান্স ১ হাজার টাকা থাকে না বলে চেকখানা অনার করা যাচ্ছে না এবং কম্পিউটারও লেনদেনটি সম্পন্ন করতে দেবে না।’ গ্রাহক: ‘কম্পিউটার কে চালায়? আপনারাই তো চালান? সুতরাং পাস করিয়ে দেন!’ ব্যাংকার: ‘স্যরি, ভাই!’ গ্রাহক: ‘যদি হিসাবখানা বন্ধ করে দিই?’ অসহায় ব্যাংকার গ্রাহকের সঙ্গে আর পেরে উঠলেন না, তিনি ভাবলেন ম্যানেজার স্যার যদি একটু বুঝিয়ে বলেন, তাহলে হয়তো গ্রাহক বিষয়টি গুরুত্ব দেবেন এবং মেনে নেবেন। তাই বিষয়টি নিয়ে শেষ পর্যন্ত ম্যানেজার সাহেবের দ্বারস্থ হলেন। ম্যানেজার সাহেবও গ্রাহককে গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু একাট্টা গ্রাহককে যুক্তি দিয়ে কুপোকাত করতে পারলেন না। গ্রাহক আরো উচ্চবাক্যে বলে উঠলেন, ‘এত আইন দেখান কেন? এত আইন দেখান বলেই দিন দিন পিছিয়ে যাচ্ছেন।’ ম্যানেজার: ‘ভাই, সব ব্যাংকেই তো কিছু না কিছু আইন আছে।’ গ্রাহক: ‘না, সব ব্যাংকে আইন নাই। এবিসি ব্যাংকে (প্রকৃত ব্যাংকের নামটি উল্লেখ করা হয়নি) ১ টাকাও মিনিমাম ব্যালান্স রাখতে হয় না।’

বেশির ভাগ ব্যাংক শাখাতেই ক্যাশ ডিপার্টমেন্টে গ্রাহকদের চাপ একটু বেশি থাকে। কিন্তু গ্রাহকের সংখ্যা ও কাজের চাপের বিবেচনায় লোকবল অপ্রতুল। তার ওপর আছে বলা-কওয়া ছাড়াই রিলিভিং অফিসার না দিয়েই বদলি। ফলে তিনজনের ক্যাশ ডিপার্টমেন্ট হয়ে পড়ে দুজনের। অফিসার একজন কমে যাওয়ায় বাকি দুই ক্যাশ অফিসার হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেন না, বরং নিজ নিজ কাউন্টারের গ্রাহকদের সেবাদানের পাশাপাশি বদলি হয়ে যাওয়া কিংবা ছুটিতে থাকা কর্মকর্তার কাউন্টারের গ্রাহকদেরও সেবা দিতে হয়। কিন্তু টাইম মেশিনে বাধা ব্যতিব্যস্ত গ্রাহকদের সময় অনেক মূল্যবান। তাছাড়া প্রযুক্তি ও প্রতিযোগিতার বাজারে গ্রাহকের কাছে দয়া, করুণা বা যৌক্তিকতা প্রত্যাশা করাটা নেহাত বোকামি এবং অদক্ষতাও বটে। ত্বরিত গতিতে, বিনা অপেক্ষায়, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিজের সেবাটুকু বা প্রয়োজনটুকু আদায় করে নেয়াটা এখন প্রায় সব গ্রাহকেরই দৃষ্টিভঙ্গি। পাছে ব্যবসা হারায়, তাই ব্যাংকারেরও চেষ্টায় থাকে সর্বোচ্চ গ্রাহকসেবা।

তাই দুপরবেলায় প্রচণ্ড ভিড়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা উত্তপ্ত গ্রাহকের অপেক্ষা নাতিদীর্ঘ করতে অফিসারের পাশাপাশি একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ পিয়ন দিয়ে টাকা রিসিভ করাতে বাধ্য হলেন ব্যবস্থাপক। গ্রাহকদের মুখেও তুষ্টির ছাপ! কিন্তু সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পিয়নের মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে, ক্ষিধায় পেট চুঁ-চুঁ করছে! কিন্তু নিজের সামনে অপেক্ষমাণ গ্রাহকের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, ‘আচ্ছা উনার টাকাটা রিসিভ করেই খেতে যাই।’ এরপর দেখল, এ গ্রাহকের ঠিক পেছনেই বাবার বয়সী আরেকজন গ্রাহক, ‘উনার টাকাটা না নিয়ে কেমনে খেতে যাই!’ মুরুব্বির টাকা রিসিভ করে যেই চেয়ার ছেড়ে উঠতে যাবে অমনি পেছন থেকে নারীকণ্ঠ ভেসে এল, ‘ভাই, আমার বাচ্চাটাকে স্কুল থেকে আনতে হবে, আর ৫ মিনিট পর তার স্কুল ছুটি হবে।’ বেচারা পিয়ন উঠতে গিয়ে বসে পড়ল। ‘আচ্ছা দেন, আপনারটাই শেষ।’ না, পিয়ন বেচারা এর পরও উঠতে পারল না। অনুরোধের রিসিভ চলছেই।

বেলা পৌনে ৩টা বাজে। এবার পিয়ন বেচারা উঠেই পড়ল, ‘খেয়ে আসি, একটু অপেক্ষা করেন, প্লিজ!’ ৫ মিনিট পর জনৈক গ্রাহক বলে উঠলেন, ‘লাঞ্চের সময় টাকা রিসিভ বন্ধ থাকবে কেন?’ তার কণ্ঠে সুর মেলালেন আরেকজন, ‘এখন তো আর আমাদের দরকার নাই। এখন পরের ধনে পোদ্দারি পেয়ে গেছে। যখন ব্রাঞ্চ উদ্বোধন করে, তখন দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভিক্ষা করে টাকা সংগ্রহ করেছে, হিসাব খোলার জন্য হাতে-পায়ে ধরছে।’ ঘড়িতে তখন বেলা ৩টা বাজে। তৃতীয় আরেকজর নিকটস্থ ক্যাশ কাউন্টারের ব্যাংকারকে লক্ষ করে বলে উঠলেন, ‘আচ্ছা ভাই, উনার (পিয়ন) আসতে আর কতক্ষণ লাগবে?’ ব্যাংকার শান্তভাবে উত্তর দিলেন, ‘এই তো লাঞ্চ করে জোহরের নামাজ পড়তে যতক্ষণ।’ অধৈর্য গ্রাহক চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, ‘বেসরকারি ব্যাংকে লাঞ্চ করতে এত সময় লাগবে কেন?’

ফরেন রেমিট্যান্স নিতে আসা এক গ্রাহককে ব্যাংকার সাহেব বললেন, ‘ভাই, জাতীয় পরিচয়পত্রে যেভাবে স্বাক্ষর করেছেন, ঠিক তেমনিভাবে রেমিট্যান্স উত্তোলন ভাউচারে স্বাক্ষর করুন।’ গ্রাহক: ‘কেন? আমার চেহারা দেখে কি আমারে চেনা যায় না?’

একদিন এক ভদ্রলোক স্থানীয় একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে ম্যানেজার সাহেবের চেম্বারে প্রবেশ করে ৫০০ টাকার নোটের একখানা বান্ডিল দেখিয়ে বললেন, ‘স্যার এ বান্ডিলটা আপনার ব্যাংক থেকে আমাকে দেয়া হয়েছিল, কিন্তু সব নোটই মরচে ধরা। তাই বান্ডিলটা পরিবর্তন করে দিতে হবে।’ ম্যানেজার সাহেব বান্ডিলখানা হাতে নিয়ে দেখলেন, সত্যিই নোটগুলো মরচে ধরা নন-ইস্যু নোট (প্রচলনযোগ্য নয়)। আরো লক্ষ করলেন, বান্ডিলে ব্যাংকের নাম ও লোগোসংবলিত ফ্লাই লিফ প্যাঁচানো নেই এবং বান্ডিলের স্টেপলার পিনটি খুলে দ্বিতীয়বার মারা হয়েছে। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কত দিন আগে ব্যাংক থেকে এই টাকাগুলো নিয়েছিলেন?’

গ্রাহক: ‘প্রায় এক মাস আগে!’ ম্যানেজার: ‘দেখুন, এই বান্ডিলে ফ্লাই লিফ প্যাঁচানো নেই, সুতরাং এটি যে আমার ব্যাংকের বান্ডিল, তা বোঝার কোনো উপায় নেই। তাছাড়া বান্ডিলের পিনটি খুলে আবার প্রবেশ করানো হয়েছে। অন্যদিকে এ নোটগুলো প্রচলনযোগ্য নয় এবং আপনি এক মাস পরে এসে দাবি উত্থাপন করছেন, তাই পরিবর্তন করে দেয়া সম্ভব নয়। যদি আমার ব্যাংক থেকেই টাকাগুলো গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে টাকা গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে বললে বদলে দিতাম।’ গ্রাহক: “দেন মিয়া, এবিসি ব্যাংকে (প্রকৃত ব্যাংকের নামটি উল্লেখ করা হয়নি) গেলে ‘বাপ’ ডেকে চেঞ্জ কইরা দিব।’

গ্রাহক: ‘স্যার, আমি ঢাকায় আছি। চেকে সই করে আসতে ভুলে গেছি। আমি আগামীকাল এসে চেকে সই করে দেব। আমার ম্যানেজারকে ৫ লাখ টাকার একটা চেক দিয়ে পাঠাচ্ছি। চেকটি পাস করিয়ে টাকাটা দিয়ে দিয়েন।’ ব্যাংকার: ‘ভাই, সই ছাড়া চেক পাস হবে কী করে? তাছাড়া আগামীকাল যে আপনি বেঁচে থাকবেন বা সুস্থ থাকবেন, তার নিশ্চয়তা কী? স্যরি ভাই, অডিট আসলে সমস্যা হবে।’ গ্রাহক: ‘কী সমস্যা হবে? চাকরি চলে যাবে? আপনার মতো দু-চারজন অফিসারকে চাকরি দেয়ার ক্ষমতা আমার আছে।’

গ্রাহক: ‘স্যার, আমার ব্যাংকে আসতে একটু দেরি হবে। দয়া করে আমার ২০ লাখ টাকার অনলাইনটি পাস করে দেন, না হলে অনলাইনের টাইম থাকবে না; আর ঢাকায় আমার গাড়িতে মাল লোড হবে না। আমি বিকাল ৫টার মধ্যেই এসে টাকাটা জমা করে দেব।’ ব্যাংকার: ‘সমস্যা নাই, আপনি টাকা নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমি প্রয়োজনে বিকাল ৫টার সময় হেড অফিসে কথা বলে আপনার অনলাইনটি পাসের ব্যবস্থা করব।’ গ্রাহক: ‘আমার জন্য যদি একটু-আধটু ঝুঁকি না নেন, তাহলে তো আপনার ব্যাংকে থাকা সম্ভব নয়।’

চেকের বাহক: ‘স্যার, চেকটি আমার ভাইয়ের হিসাবের। ভুলে তারিখের ঘরে ২০১৭-এর স্থলে ২০২৭ লিখে ফেলেছে। আমার ভাই এখন অনেক দূরে আছে। দয়া করে টাকাটা দিয়ে দেন।’ ব্যাংকার: ‘স্যরি ভাই, ২০২৭ কেটে ২০১৭ করে দেন এবং তারিখের নিচে আপনার ভাইয়ের (অ্যাকাউন্টহোল্ডার) সই নিয়ে আসেন।’ বাহক: ‘স্যার, ২৭ কে ১৭ করে আমি সই দিলে চলবে না?’ ব্যাংকার: ‘না।’ বাহক: ‘আপনারা কি গ্রাহকসেবা দিতে বসেছেন নাকি হয়রানি করতে?’

প্রিয় গ্রাহক, আমি আমার ব্যাংকিং অভিজ্ঞতার অল্প কয়েকটি উদাহরণ টেনেছি মাত্র। সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংকই আইনসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং নিজস্ব সার্কুলার অনুসরণের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। এর পরও ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ব্যাংকাররা ব্যক্তিগত ঝুঁকি গ্রহণ করেও গ্রাহকদের সর্বোচ্চ ছাড় দেয়ার চেষ্টা করেন। তাছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক ও প্রতিটি ব্যাংকের নিজস্ব শক্তিশালী অভিযোগ ব্যবস্থাপনার বদৌলতে শাখা পর্যায়ে ব্যাংকারদের স্বেচ্ছাচারিতার খুব একটা সুযোগ নেই। এর পরও যদি মনে করেন, সত্যিই কোনো ব্যাংকার আপনাকে সেবাদানে হয়রানি করছেন, তাহলে আপনি সংশ্লিষ্ট শাখার ব্যবস্থাপককে অবহিত করুন (মৌখিক বা লিখিত আকারে), প্রতিকার না পেলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ‘অভিযোগ সেল’-কে অবহিত করুন। এতেও যদি কাজ না হয় তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্ট’ (এফআইসিএসডি)-এ অফিস চলাকালীন ও ছুটির দিন ব্যতীত যেকোনো দিনে ১৬২৩৬-এ ফোন করে অভিযোগ করুন। নিশ্চিত থাকুন, আপনি প্রতিকার পাবেন।

লেখক: মোশারফ হোসেন, ব্যাংক কর্মকর্তা।

Leave a Reply