গ্রাহকবান্ধব ব্যাংকিং: ব্যাংকারদের ব্যাংকিং জ্ঞান ও নীতি-নৈতিকতার ভূমিকা

2
2360

মোশারফ হোসেন: বলা হয়ে থাকে অর্থকড়ির বিষয়ে গ্রাহকরা ঈশ্বরের পর তার ব্যাংকারের ওপরই আস্থা রাখেন। তাই স্বামীর যে অর্থের কথা স্ত্রী জানেন না, কিংবা স্বামীর পকেটে প্রতিদিন অবহেলায় পড়ে থাকা পাঁচ টাকা, ১০ টাকার নোটগুলো জমিয়ে স্ত্রীর সঞ্চয় করা যে লাখ টাকার খবর স্বামী রাখেন না, সেই টাকার খবর ব্যাংকার সাহেব ঠিকই জানেন! ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের বদৌলতে সৃষ্ট এ আস্থার ফলেই গ্রাহকরা নিজের কষ্টার্জিত টাকা, এমনকি সারা জীবনের সঞ্চয় সরল বিশ্বাসে ব্যাংকারের কাছে গচ্ছিত রেখে যান। জমাকৃত অর্থের গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তার পাশাপাশি কিছু মুনাফা বা লাভ পাবেন, কিংবা নির্ধারিত সময় পরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেনিফিট পাবেন- এটাই প্রত্যাশা। স্বপ্ন দেখেন- এককালীন প্রাপ্য এই টাকা দিয়ে মেয়ের বিয়ে দেবেন, ছেলেকে ডাক্তারি পড়াবেন, ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট কিংবা শহরে এক খণ্ড জমি কিনবেন। কিন্তু প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির হেরফেরে গ্রাহকের বিশ্বাসে প্রায়ই চিড় ধরে।

ব্যাংকারদের সঙ্গে গ্রাহকদের ভুল বোঝাবুঝির ঘটনা সবচেয়ে বেশি হয় তখনই, যখন গ্রাহকরা মেয়াদ পূর্তিতে ফিক্সড ডিপোজিট বা এককালীন জমা রাখা স্কিম হিসাব কিংবা মাসের পর মাস তিল তিল করে জমানো ডিপিএস-টি নগদায়ন করতে আসেন। প্রধান কারণ একটাই- হিসাব খুলে টাকা রাখার সময় বলা হয়েছে, ছয় বছর পর ১৩ লাখ টাকা ২৬ লাখ টাকা হবে, কিন্তু মেয়াদ পূর্তিতে গ্রাহককে দেওয়া হচ্ছে ২৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা অর্থাৎ গ্রাহকের প্রাপ্য ১৩ লাখ টাকা মুনাফার বিপরীতে ১৫ শতাংশ হারে আয়কর বাবদ এক লাখ ৯৫ হাজার টাকা এবং হিসাবের স্থিতির বিপরীতে আবগারি শুল্ক বাবদ ৯ হাজার টাকা কেটে দুই লাখ চার হাজার টাকা কম দেওয়া হচ্ছে। সংক্ষুব্ধ গ্রাহকের প্রশ্ন- ‘আমাকে দুই লাখ চার হাজার টাকা কম দেওয়া হচ্ছে কেন?’ ব্যাংকার: ‘আপনার মুনাফা ১৩ লাখ টাকার ১৫ শতাংশ হারে আয়কর বাবদ এক লাখ ৯৫ হাজার টাকা কাটা হয়েছে এবং ৯ হাজার টাকা কাটা হয়েছে আবগারি শুল্ক বাবদ।’ গ্রাহক: ‘আমার আয়কর আপনি দেওয়ার কে? আপনাকে আমার আয়কর দেওয়ার জন্য তো আমি নিয়োগ দিইনি! হিসাব খোলার সময় বলা হয়েছে কোনো কাটাকাটি হবে না, এখন আমাকে কম দিলেই কি আমি নেব?

এক বছর মেয়াদি এফডিআর হিসাব খোলা হয়েছিল ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে। কিন্তু তিন বছর পর গ্রাহক দেখলেন, মুনাফা পাচ্ছেন সাড়ে ৫ শতাংশ হারে! তার ওপর আবার আয়কর এবং আবগারি শুল্কের বাগড়া। কিছুতেই গ্রাহকের হিসাব মিলছে না। ব্যাংকারকে বললেন, ‘হিসাব খোলার সময় আমাকে বলেছেন, সাড়ে ১২ শতাংশ হারে মুনাফা দেবেন, আর এখন মাত্র পাঁচ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে মুনাফা দিচ্ছেন?’ ব্যাংকার: ‘আপনার সঙ্গে ব্যাংকের চুক্তি অনুযায়ী প্রথম ১২ মাস আপনি ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ হারেই মুনাফা পেয়েছেন। পরবর্তী দুবার নবায়নকালে ব্যাংকের আমানতের মুনাফার প্রচলিত যে হার ছিল, সেই হারেই আপনার এফডিআর হিসাবটি নবায়ন করা হয়েছে।’ গ্রাহক: ‘না, হিসাব খোলার সময় তো আমাকে এ রকম বলেননি।’ ব্যাংকার: ‘আপনাকে নিশ্চয় হিসাব খোলার সময় বুঝিয়ে বলা হয়েছে, আপনি হয়তো বুঝতে পারেননি, কিংবা ভুল বুঝেছেন; আর ব্যাংকের সঙ্গে করা চুক্তিমতো প্রথম ১২ মাস আপনাকে ব্যাংক ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ হারেই মুনাফা দিয়েছে। পরবর্তী দুই বছর ব্যাংক আপনাকে কোনো মুনাফা না দিলেও পারত, কিন্তু ব্যাংক আপনাকে বঞ্চিত না করে প্রচলিত এফডিআর হিসাবের জন্য প্রযোজ্য হারে আপনাকে মুনাফা প্রদান করেছে। কোনো ব্যাংকার আপনাকে ভুল বা মিথ্যা তথ্য কেন দেবেন?’

হ্যাঁ, এটাই প্রত্যাশিত। সাধারণ গ্রাহক, যারা জীবনের সব অর্জন কিংবা শেষ সম্বলটুকু ব্যাংকে রেখে যান, তাদের অনেকেই ব্যাংকের সার্কুলার বা সরকারি চার্জ। যেমন আয়কর, আবগারি শুল্ক ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা রাখেন না। তারা শুধু জানতে চান- এক লাখ টাকায় এক বছরে কত মুনাফা আসবে, কিংবা প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে রাখলে ১০ বছর পরে মোট কত পাবেন। এক্ষেত্রে ব্যাংকার যদি বুঝিয়ে বলতে ব্যর্থ হন, কিংবা গ্রাহককে প্রলুব্ধ করতে আয়কর, আবগারি শুল্ক, ব্যাংকের অন্যান্য কোনো চার্জ গ্রাহকের কাছে স্পষ্ট না করেন, তাহলে ব্যাংকার তিন দিক দিয়ে ক্ষতি সাধন করেন- এক. গ্রাহক নিজেকে প্রতারিত মনে করেন এবং ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদ ঘটান, দুই. মিথ্যাবাদী হিসেবে ব্যাংকারকে গ্রাহকের বদ-দোয়া নিতে হয়, তিন. সর্বোপরি নিজের ব্যাংকের সুনামের বারোটা বাজান। ব্যাংকারকে মনে রাখতে হবে, একজন গ্রাহক অসন্তুষ্ট হলে সে দ্বিতীয়বার আর এই ব্যাংকে আসবে না, ওই গ্রাহক তার পরিচিত কাউকে এই ব্যাংকে আসতে দেবে না। তাই ব্যাংকারের উচিত, গ্রাহককে স্পষ্ট করে সবকিছু বুঝিয়ে বলা। এটা ব্যাংকারের পেশাগত এবং নৈতিক দায়িত্বও বটে। ব্যাংক ঘোষিত মুনাফার ওপর কোনো কর্তন বা চার্জ প্রযোজ্য হলে নিট প্রাপ্যটাই গ্রাহককে স্পষ্ট করে দিতে হবে। পাশাপাশি কেউ যদি মেয়াদ পূর্তির আগেই হিসাবটি বন্ধ করতে চায়, তার কী বিধান তাও স্পষ্ট করে দিতে হবে। এফডিআর/স্কিম হিসাব মেয়াদান্তে উত্তোলন না করলে কী বিধান তাও বলে দিতে হবে। তা না হলে তিন মাস মেয়াদে করা এফডিআর ৯ মাস পর উত্তোলন করতে এসে গ্রাহক দেখবেন, বাকি ছয় মাসের জন্য কোনো লভ্যাংশ গ্রাহককে দেওয়া হয়নি। কারণ গ্রাহক হিসাব খোলার সময় স্বয়ংক্রিয় নবায়নের নির্দেশনা দেননি।

মেয়াদ পূর্তিতে ডাবল বেনিফিট স্কিম হিসাব নগদায়ন (উত্তোলন) করতে আসা এক গ্রাহক দেখলেন, লভ্যাংশের বিপরীতে ১৫ শতাংশ হারে আয়কর কাটা হয়ে গেছে। গ্রাহকের প্রশ্ন: ‘আমার এক কলিগের আপনার ব্যাংকেই তো আরেকটি ডাবল বেনিফিট অ্যাকাউন্ট ছিল, তার হিসাব থেকে নাকি আপনারা ১০ শতাংশ হারে আয়কর কেটেছেন, কিন্তু আমার বেলায় ১৫ শতাংশ কেন?’ ব্যাংকার: ‘আপনার কলিগ নিশ্চয় টিআইএনধারী।’ গ্রাহক: ‘আমিও তো টিআইএনধারী।’ ব্যাংকার : ‘সরি স্যার, হিসাব খোলার সময় আপনার টিআইএন সনদটি আমাদের কাছে জমা করেননি, তাই আপনার ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ হারেই আয়কর কাটা গেছে।’ গ্রাহক, অগ্নিশর্মা হয়ে বলে ওঠলেন, ‘হিসাব খোলার সময় তো আপনারা আমার কাছে টিআইএন সনদ চাননি। আমার আয়করের পাঁচ শতাংশ টাকা আপনার ব্যাংককেই পরিশোধ করতে হবে, আমি করব না।’ গ্রাহকের এই দাবি মানা না গেলেও দাবিটি একেবারেই অযৌক্তিক নয়। এখানেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকার তথ্য না দেওয়ার কারণে গ্রাহকের আর্থিক ক্ষতির দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না।

জনৈক আমানতকারী পাঁচ বছর মেয়াদি একটি মাসিক সঞ্চয়ী স্কিম হিসাব খুলে বিদেশে চলে গেলেন এবং নিয়মিতভাবেই কিস্তি চালিয়ে গেলেন। যথারীতি হিসাবটির পাঁচ বছর পূর্তি হলো, কিন্তু প্রবাসী সেই গ্রাহক তখনও প্রবাসেই অবস্থান করছেন। ব্যাংকারকে ফোনে বললেন, ‘স্যার আমার ডিপিএস-টি গত মাসে ম্যাচিউড হয়ে গেছে। কিন্তু আমি এখনও বিদেশে অবস্থান করছি; ডিপিএসের ১০ লাখ টাকা দিয়ে আমার স্ত্রীর নামে একটা এফডিআর অ্যাকাউন্ট করে দেওয়া যাবে?’ ‘না, না! আপনি না আসা পর্যন্ত আপনার ডিপিএসের টাকা উত্তোলন করা যাবে না’- ব্যাংকারের জবাব। প্রবাসী আরও দুই বছর পর দেশে এলেন। আর এই দুই বছরে একটি টাকাও অতিরিক্ত মুনাফা তাকে দেওয়া হয়নি। অথচ ডাকযোগে প্রবাসীর একটা আবেদন নিয়ে সহজেই ডিপিএসের ম্যাচিউর্ড অ্যামাউন্ট দিয়ে তার স্ত্রীর নামে এফডিআর হিসাব খুলে দেওয়া যেত, আর দুই বছরে প্রবাসী গ্রাহক আরও প্রায় লাখ দুয়েক টাকা অতিরিক্ত মুনাফা পেতেন। অন্য আরেক আমানতকারী ছয় বছরে দ্বিগুণ স্কিমে আমানত রেখে বিদেশ চলে যান। আট বছর পর বিদেশ থেকে এসে আমানত তুলতে গেলে ব্যাংক তাকে দ্বিগুণ টাকা দিল। মেয়াদোত্তীর্ণের পর আরও দুই বছর ব্যাংক আমানতের অর্থ খাটালেও গ্রাহককে একটি টাকাও বাড়তি দিল না। কারণ হিসেবে দেখানো হলো, স্কিমটি নবায়নযোগ্য ছিল না। আর এমনটা যদি সত্যিই ঘটে তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারকেই এর দায় নিতে হবে। কারণ গ্রাহকদের ব্যাংকিং জ্ঞান ওই পর্যায়ে যায়নি যে, তারা নিজ থেকেই এ বিষয়গুলো জানবেন। এক্ষেত্রে গ্রাহককে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ঠকানো হয়েছে বলেই ধরে নেওয়া হবে।

অনেক পণ্যের বিজ্ঞাপনের ঠিক নিচের দিকেই লেখা থাকে ‘শর্ত প্রযোজ্য’। আর এই শর্তটাই হচ্ছে গ্রাহকের সঙ্গে ছল করার একটা কৌশল। কিন্তু ছল না করেও ব্যবসা করা যায় এবং এ ব্যবসা টেকসই এবং বহুগুণে লাভজনক হয়। নিজের ছোট্ট একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার না করে পারছি না। জনৈক হিন্দু গ্রাহক যাকে আমি দাদা বলেই সম্বোধন করি। একদিন এসে বললেন, ‘স্যার, আমার এসএমই ঋণটি প্রায় শেষ হয়ে গেছে আর দুটির মতো কিস্তি বাকি আছে। কিন্তু স্যার, আমি ঋণটি আবার নিতে চাচ্ছি। তবে স্যার, এবার আগের চেয়ে কিছু টাকা বেশি দিতে হবে।’ আমি বললাম, ‘কত?’ দাদা: ‘স্যার, পাঁচ লাখ দিলেই চলবে।’ আমি জানতাম, দাদার (গ্রাহকের) দুটি মাসিক সঞ্চয়ী স্কিম আছে। তাই জিজ্ঞেস করলাম, ‘দাদা ডিপিএস দুটিতে কত টাকা জমা হয়েছে?’ ‘প্রায় সাত লাখ টাকার মতো’ দাদার উত্তর। বললাম, ‘দাদা, এসএমই ঋণ না নিয়ে ডিপিএসের বিপরীতে এসওডি ঋণ নিয়ে নেন।’ ‘কেন স্যার? এর আগেও পূর্ববর্তী ম্যানেজার স্যারের সময় দুইবার এসএমই ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেছি। এখন আপনি আমার ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না, আমার ডিপিএস থেকে অর্থাৎ আমার টাকা থেকেই আমাকে ঋণ দিতে চাচ্ছেন?’ ভারাক্রান্ত মনে দাদার জিজ্ঞাসা। বললাম, ‘দাদা এসএমই ঋণ নিলে আপনাকে ১৬ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে, সঙ্গে আছে প্রসেসিং ফি, ইন্স্যুরেন্স খরচ, সময় লাগবে মাস খানেক, দুইজন গ্যারান্টর লাগবে, বৌদিকেও জামিনদাতা হতে হবে। আর ডিপিএস এর বিপরীতে ঋণ নিলে আপনাকে আপনার ডিপিএসের সুদ হারের চাইতে, অর্থাৎ ব্যাংক থেকে আপনি যে হারে সুদ পাচ্ছেন তার চাইতে মাত্র ২ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি সুদ দিতে হবে। ডিপিএস এ আপনি সুদ পাচ্ছেন ৭ শতাংশ হারে, তাই আপনার এসওডি ঋণের সুদ হার হবে মাত্র ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ। কোনো প্রসেসিং ফি নেই, নেই কোন ইন্স্যুরেন্স চার্জ, লাগবে না কোনো গ্যারান্টর, বৌদির কোনো সইও লাগবে না। আর সময় লাগবে মাত্র ১ ঘণ্টা!’ দাদার মুখের বিস্ময় কে দেখে! অতি খুশিতে হাস্যোজ্জ্বল মুখে আমার হাত ধরে বললেন, ‘থ্যাংক ইউ স্যার। আপনার এই নিঃস্বার্থ পরামর্শ আমি মনে রাখব। স্যার, আমাকে তবে এসওডি ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।’ দাদা সত্যিই আমার পরামর্শের কথা স্মরণ রেখেছেন। পরিচিত বন্ধু-স্বজনকে এখন আমার ব্যাংকেই ব্যাংকিং করার সুপারিশ করেন এবং অনেকের সাথেই আমার পরামর্শের কথা শেয়ার করেন। দাদাকে এসএমই ঋণ না দেয়ার কারণে আমার ব্যাংক হয়ত কিছুটা আয় বঞ্চিত হয়েছে, কিন্তু গ্রাহকের অনেক বড় সাশ্রয় হয়েছে। ব্যাংক কিছুটা আয় বঞ্চিত হলেও দাদা আজ আমার ব্যাংকের একজন গুডউইল অ্যাম্বাসেডরের মতই কাজ করছেন। নিজের সকল ব্যাংকিং প্রয়োজনে তিনি আমার ব্যাংককেই বেছে নিচ্ছেন। বিনে পয়সায় রেফারেন্স মার্কেটার হিসাবে মার্কেটিং করছেন আমার ব্যাংকের। অনেক গ্রাহক এসে বলেন, ‘স্যার আমাকে অমুক দাদা পাঠিয়েছে, একটা অ্যাকাউন্ট করব, স্যার।’

ব্যাংকারের কর্মের ওপরই ব্যাংকের সুনাম-দুর্নাম, সাফল্য-ব্যর্থতা নির্ভর করে। এই জন্য ব্যাংকারকে তার ব্যাংকের প্রডাক্ট স¤পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখতে হবে। ব্যাংককেও সহজবোধ্য ভাষায় সার্কুলার এবং গ্রাহক নির্দেশিকা ডিজাইন করতে হবে। উল্লেখিত ব্যাংক মুনাফার সাথেই প্রযোজ্য আয়করের হার এবং পরিমাণ উল্লেখ করতে হবে। আয়কর কাটার আগে মুনাফার পরিমান এবং আয়কর কাটার পর মুনাফার পরিমাণ পাশাপাশি উল্লেখ করে দিতে হবে। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রেও সুদ বহির্ভূত প্রযোজ্য সকল চার্জ স্পষ্ট করে দিতে হবে। সুদ চক্রবৃদ্ধি প্রক্রিয়া, সুদ বকেয়া থাকলে আরোপিত জরিমানার পরিমাণ, সুদ কি ফিক্সড নাকি চেঞ্জেবল তাও বলে দিতে হবে। ঋণের বা ডিপিএস-এর কিস্তি মাসের কত তারিখের মধ্যে না দিতে পারলে জরিমানা হবে ইত্যাদিও বলে দিতে হবে।

প্রকৃতপক্ষে কোনো ব্যাংকের পণ্যই গ্রাহক বিরোধী নয়, কিন্তু ব্যাংকারের তথ্য দেয়া-না দেয়া, গোপন করা কিংবা মিথ্যা বা বিকৃত তথ্য দেয়ার কারণেই গ্রাহকরা বঞ্চিত হয়, ব্যাংকের সুনাম ক্ষুন্ন হয়। তাই গ্রাহকদের কোনো বিষয়ে অজ্ঞতার মাঝে রাখা উচিত নয়। ব্যাংকার খুব ভাল করেই জানেন, গ্রাহকের জিজ্ঞাসাগুলো কী, কিংবা গ্রাহক কোন বিষয়গুলো নিয়ে সংক্ষুব্ধ হতে পারেন। তাই ব্যাংকারের উচিত গ্রাহকের জিজ্ঞাসার অপেক্ষা না করে নিজ থেকেই গ্রাহককে এসব বিষয় স্পষ্ট করে দেয়া। আরও যেটা ব্যাংকগুলো করতে পারে তা হল, কোনো এফডিআর নবায়ন হলে স্বয়ংক্রিয় এসএমএস ব্যবস্থার মাধ্যমে নবায়নকৃত মুনাফার হার জানিয়ে দেয়া। তাঁর ডিপিএস, ডাবল বেনিফিট বা মাসিক মুনাফা ভিত্তিক স্কিমটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে এসএমএস, ফোন কল, পত্র মারফত বা ইমেইলে জানিয়ে দেয়া। ঠিক তেমনিভাবে মেয়াদ শেষে যেন গ্রাহকের আকাশ থেকে পড়ার মত অবস্থা না হয়, সেই জন্য আয়কর কিংবা আবগারি শুল্ক কর্তনের সাথে সাথেই এসএমএস নোটিফিকেশন এর মাধ্যমে গ্রাহককে জানিয়ে দিয়ে এসব চার্জ সম্পর্কে গ্রাহক-কে অবগত রাখা উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংক যেমনটি ঋণের সুদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বলেছে যে, যেসব মেয়াদি ঋণের সুদ হার (ইসলামী ব্যাংকের পরিভাষায় বিনিয়োগের ওপর মুনাফার হার) পরিবর্তনশীল সেক্ষেত্রে সুদ বা মুনাফার হার বৃদ্ধি করতে হলে তার যৌক্তিকতা তুলে ধরে গ্রাহককে এক মাস সময় দিয়ে নোটিশ প্রদান করতে হবে। তেমনিভাবে আমানতের সুদহার হ্রাস-বৃদ্ধিও গ্রাহকের জানার অধিকার আছে।

একটি ব্যাংকের গ্রাহক বান্ধব হয়ে ওঠার পিছনে আরো কিছু বিষয় নিয়ামক ভূমিকা পালন করে, যেমন- এক. একজন গ্রাহক তার ব্যাংকিং সেবাটি চট-জলদি, যখন-তখন, যেখানে-সেখানে, এমনকি কোনো ব্যাংকারের সাহায্য ব্যতিরেকেই আদায় করে নিতে পারে কিনা দুই. গ্রাহক তার জিজ্ঞাসার উত্তর এবং সমস্যার সমাধান তাৎক্ষণিক/যৌক্তিক সময়ের মধ্যে পান কিনা তিন. গ্রাহকের সন্তুষ্টি ব্যাংকের অগ্রাধিকার এবং গ্রাহকের অভিযোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় কিনা চার. ব্যাংকের সকল সেবা/পণ্যই ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ডিজাইন্ড হলেও গ্রাহকদের স্বার্থ সহায়ক কিনা পাঁচ. ব্যাংকের সকল মূল্যসংবেদনশীল তথ্য গ্রাহকের জন্য উন্মুক্ত কিনা ছয়. ব্যাংকের সকল সেবা/পণ্যই সহজবোধ্য কিনা সাত. ব্যাংকটি সকল ব্যাংকিং-উপযুক্ত মানুষের ব্যাংক কিনা আট. ব্যাংকের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার পাশাপাশি ব্যাংকারের সেবার মানসিকতা এবং মানবিকতা উন্নত কিনা।

যে দেশের ৯৮ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা, আর ৩০ শতাংশের ওপর মানুষ এখনও নিরক্ষর, সে দেশের ব্যাংকগুলোতে হিসাব খুলতে গেলে ইংরেজি ভাষায় লেখা হিসাব ফরম পুরণ করে হিসাব খুলতে হয়, যদিও অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার ফলে ব্যাংকগুলো বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় মুদ্রিত হিসাব ফরম তৈরি করেছে। কিন্তু ঋণ আবেদন ফরম এবং ঋণ অনুমোদন চিঠি এখনো অধিকাংশ ব্যাংকে ইংরেজি ভাষায় লেখা হয়। চার্জ ডকুমেন্টের ইংরেজি সমুহের অর্থ উদ্ধার করতে গেলে ব্যাংকারেরই চুল ছেঁড়ার অবস্থা হয়, গ্রাহকরা তো পড়ে দেখার সাহসই করেন না। বর্তমানে প্রযুক্তির সহজলভ্যতার বদৌলতে শিক্ষিত ও সচেতন গ্রাহকদের জিজ্ঞাসাগুলোও এখন অনেকটাই ইন্টারনেট তথা মোবাইল ফোন ভিত্তিক হয়ে গেছে। গ্রাহকরা এখন অনেক কিছুর জন্যই ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ঢুঁ মারতে পছন্দ করে। কিন্তু অনেক ব্যাংকের ওয়েবসাইট তথ্যবহুল নয়, আর হলেও বেকডেটেড তথ্য দেয়া থাকে, ওয়েবসাইট নিয়মিত হালনাগাদ করা হয় না। কিছু ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ইএমআই ক্যালকুলেটর দেয়া আছে, কিন্তু তা সুদের চক্রবৃদ্ধি বা ডাউনপেমেন্ট বিবেচনায় নিয়ে ইএমআই হিসাব করতে পারে না। অনেক ব্যাংকের নিজস্ব কোনো মোবাইল এ্যাপ বা ফেসবুক ফ্যানপেইজ নেই। ফলে ব্যাংকের বিভিন্ন অফার বা পরিবর্তন যেমন- সুদ হারের হ্রাস বা বৃদ্ধি গ্রাহকরা জানতে পারে না। শাখায় এসে একজন গ্রাহক যদি জানতে চায়, মাসিক ৫ হাজার টাকা ১০ বছর মেয়াদে সঞ্চয় করলে মেয়াদান্তে গ্রাহক নীট কত টাকা পাবেন। এই হিসাবটি ব্যাংকার গ্রাহককে যথাযথভাবে দিতে পারেন না, কারণ ব্যাংকার সাহেব ট্যাক্স ইফেক্ট বুঝাতে পারলেও আবগারি শুল্ক ইফেক্ট বুঝাতে পারেন না। কারণ সময়ের সাথে সাথে গ্রাহকের হিসাবের স্থিতি যেমন বাড়বে, ঠিক তেমনি আবগারি শুল্ক আদায়ের পরিমাণও বাড়বে। ম্যানুয়ালি বা ক্যাল্কুলেটর টিপে যদি হিসাব করে বলতে হয়, তাহলে মশা মারতে কামান দাগার মত অবস্থা হয়ে যাবে। ব্যাংকের সিবিএস, ওয়েবসাইট, মোবাইল এ্যাপ-এ এসব প্রোগ্রাম দিয়ে রাখা উচিত, যাতে ব্যাংকাররা গ্রাহকদেরকে সহজেই পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিয়ে বুঝাতে সমর্থ্য হন এবং গ্রাহকরা নিজেরাও নিজের কম্পিউটার বা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে সহজেই এসব জিজ্ঞাসার উত্তর খোঁজে নিতে পারেন। অর্থ্যাৎ ব্যাংকারের কষা অংকের ফলাফল এবং গ্রাহকের কষা একই অংকের ফলাফল যদি অভিন্ন থাকে, তাহলেই ব্যাংক এবং ব্যাংকার উভয়েই হয়ে ওঠবেন গ্রাহক বান্ধব। (নিবন্ধটি ২১ মে ও ২২ মে ২০১৮ তারিখে শেয়ার বিজ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে)

লেখক: ব্যাংকার
[email protected]

2 মন্তব্যসমূহ

  1. অসাধারণ লেখা, প্রত্যেক ব্যাংকারকেই আসলে এভাবে আপনার মত ভাবা উচিত.. কারণ বাংলাদেশের ব্যাংকাররা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী মূল্যায়িত হচ্ছে না.

    ধন্যবাদ আপনাকে সুন্দর একটি লেখা প্রকাশ করার জন্য…. ☺️ ☺️

Leave a Reply