করোনায় আয়কর রিটার্ন জমা দেয়া নিয়ে জটিলতা

0

এ কলাম লিখছি ৯ অক্টোবর। দেখতে দেখতে এ মাস চলে যাবে। আসবে নভেম্বর, যে মাস করদাতাদের জন্য দুঃস্বপ্নের। এর কারণ অনেক। সেসব কারণে যাওয়ার আগে একটা খারাপ খবর দিই করদাতাদের। যারা অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দেন, তারা এ বছর তা পারবেন না। অতএব সরকার ঘোষিত ২ হাজার টাকা ছাড়ের সুবিধা তারা পাবেন না। এ বিপত্তি ঘটেছে কারণ অনলাইন ব্যবস্থাটি অকার্যকর হয়ে গেছে। নিউজটি আপনি পড়ছেন ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশ-এ। যারা ব্যবস্থাটি চালু করেছিল, তারা কাজ না বুঝিয়ে দিয়েই নাকি স্বদেশে চলে গেছে। এর ধাক্কা সহ্য করতে হবে অনলাইন করদাতাদের। এদিকে নভেম্বর হচ্ছে শেষ মাস, যখন আয়কর রিটার্ন দেয়ার শেষ সীমা। এ মাসের ৩০ তারিখের মধ্যে অবশ্যই আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে। নইলে জরিমানা গুনতে হবে।

রিটার্ন দেয়ার জন্য সাধারণ করদাতাদের একটা সুবিধা ছিল। নভেম্বরের শেষ দিকে করমেলা অনুষ্ঠিত হয়। এটা বেশ কয়েক বছরের ঘটনা। সারা দেশে করমেলা হয়। কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায় হয়। সাধারণ করদাতারা এ মেলায় ঝুটঝামেলাহীনভাবে রিটার্ন জমা দিতে পারেন। এছাড়া ফরম পূরণেও তারা নানা সাহায্য-সহযোগিতা পান। এসব কারণে সারা দেশের হাজার হাজার করদাতা লাইন ধরে রিটার্ন দেন। এদের মধ্যে অনেকেই নতুন করদাতা। স্বেচ্ছাতেই তারা করের জালে ধরা দেন, কিন্তু এ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে এবার। এ মেলা কী হবে? অনলাইনে রিটার্ন জমা দেয়া বন্ধের পর কি করমেলায় রিটার্ন জমা দেয়াও বন্ধ হবে? বন্ধ হবে কি হবে না, তা এখন পর্যন্ত কেউ জানে না। কারণ ‘কভিড-১৯’ মহামারী।

সারা দেশ এখনো করোনার কবল থেকে মুক্ত হয়নি। এখনো অনেক মানুষ এ মহামারীতে মৃত্যুবরণ করছে। সরকার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে শীতকালে করোনার দ্বিতীয় দফা ঢেউ আসতে পারে। অতএব সবাই আবার সন্ত্রস্ত। করোনার নিয়মকানুন মানলে করমেলা হওয়া অসম্ভব। ‘পাবলিক গ্যাদারিং’ করোনায় বাঞ্ছনীয় নয়। অথচ করমেলা প্রকৃতপক্ষে করদাতাদের মেলাই বসে, আসে হাজার হাজার নর-নারী। দূরত্ব রক্ষা করে রিটার্ন জমা দেয়ার কাজটি কঠিনই বটে। এসব চিন্তা-ভাবনায় লোকমনে ধারণা, এবার করমেলা অনুষ্ঠিত নাও হতে পারে। তাহলে কি রিটার্ন জমা দিতে হবে না? নাকি রিটার্ন অফিসে অফিসে গিয়ে দিতে হবে। যে বিদ্যমান বিধি, তাতে করোনা হোক না হোক রিটার্ন জমা দিতেই হবে। এটা আইনি বাধ্যবাধকতা, যদি না সরকার অন্যরকম সিদ্ধান্ত নেয়। এ দুশ্চিন্তায় অনিশ্চয়তার মধ্যেও করদাতারা নানা কাগজপত্র জোগাড় করতে শুরু করেছেন।

আয়কর বিভাগে বার্ষিক আয়ের হিসাব দিতে হবে। আয়ের উৎস কী বলতে হবে। সেসব উৎসের প্রমাণপত্র দিতে হবে। প্রমাণপত্র হবে ব্যাংকের সার্টিফিকেট, নিয়োগদাতার সার্টিফিকেট অথবা সরকারের কোনো এজেন্সির কাগজপত্র। বহু ঝামেলাপূর্ণ কাজ। তারপর সম্পদ ও দায়ের হিসাব দিতে হবে। কত সম্পদ বাড়ল এবং তার উৎস কী এটা বলতে হবে। হিসাব দিতে হবে বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ, যাতায়াত, আপ্যায়ন ইত্যাদির। মুক্তি নেই। জীবনযাপনের পুরো চিত্র আয়নার মতো পরিষ্কার করে দিতে হবে। এসব খুবই ঝামেলার কাজ। সাধারণ করদাতারা এসব বোঝেন না। কয়েক পাতার রিটার্ন। জটিল রিটার্ন অনেকেই তা বোঝেন না। শুনেছি মন্ত্রীরা, সচিবরা তা আয়কর কর্মকর্তাদের দিয়ে করিয়ে নেন। এ সুবিধা তো সাধারণের নেই। এ অবস্থায় এবার বেশি বিপত্তিতে সাধারণ করদাতারা। এর মধ্যে আছেন অবসরপ্রাপ্ত, বয়স্ক, ভদ্রমহিলা ও সাধারণ অশিক্ষিত করদাতারা। তাদের প্রথম বড় সমস্যা আয়ের উৎস সম্পর্কে।

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশ (Banking News Bangladesh. A Platform for Bankers Community.) প্রিয় পাঠকঃ ব্যাংকিং বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশ এ লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

আমি এক বয়স্ক ভদ্রলোকের কথা জানি, তিনি তার সঞ্চয়পত্রের সুদের ওপর সার্টিফিকেট জোগাড়ের জন্য ব্যাংককে ফোন করেন। কারণ তিনি ঘর থেকে বেরোচ্ছেন না আজ ছয়-সাত মাস। একজন পরিচিত লোককে তিনি ব্যাংকে পাঠান। ব্যাংক বলছে এসব আমরা করি না। সঞ্চয়পত্র এখন প্রধান কার্যালয়ে কেন্দ্রীভূত। ওখান থেকে আনাতে হবে। তাগিদ দিতে দিতে শেষ পর্যন্ত ৮-১০ দিন পর সার্টিফিকেট আসে। সরল বিশ্বাসে তিনি তা ফাইলে রেখে দিলেন। এক সপ্তাহ পর তা খুলে দেখেন তাতে তার নাম নেই। নাম লেখা হয়েছে আরেকজনের। আবার ব্যাংক অফিসারকে বলা। শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়ে আসতে আরো ৮-১০ দিন চলে যায়। এসবই বয়স্ক লোকটাকে করতে হয়েছে ঘরে বসে, ঘরবন্দি অবস্থায় থেকে। বলা বাহুল্য যেসব বয়স্ক, সাধারণ করদাতার আয়ের উৎস একাধিক, তাদের সমস্যা আরো বেশি। স্বাভাবিক সময়ে এসব দৌড়াদৌড়ি করে জোগাড় করা যায়। শুধু বয়স্ক লোকদের নয়, অনেক করদাতারই এ সমস্যা। এটা বরাবরের সমস্যা। এবার করোনা মহামারীতে আরো অনেক বেশি।

মাঝে মধ্যে এসব দেখেশুনে ভাবি, অভিজ্ঞতার কথা শুনে ভাবি, এ রিটার্ন জমা দেয়া কি একান্তই জরুরি? বিশেষ করে ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের। এটা জমা না দিলে সরকারের রাজস্ব কি কমে যাবে? রাজস্বের হিসাবে কি বিশৃঙ্খলা দেখা দে্বে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুব বেশি নেতিবাচক বলে মনে হয় না। কারণ একটা নতুন ব্যবস্থার উদ্ভাবন। ব্যবস্থাটির নাম ‘ট্যাক্স ডিডাকটেড অ্যাট সোর্স’। এটা অগ্রিম আয়কর হিসেবে আদায় করা হয়। যেমন গাড়ির ‘ফিটনেস’ নবায়ন। এটি করা সম্ভব নয়, যদি না ফিটনেসের টাকা জমা দেয়ার সময় আয়করের টাকা দেয়া হয়। নিউজটি আপনি পড়ছেন ব্যাংকিং নিউজ বিডি ডটকম-এ। আগে ছোট ছোট ব্যক্তিগত গাড়ির অগ্রিম আয়কর ছিল ১৫ হাজার টাকা। এবার তা ২৫ হাজার টাকা। ধরা যাক সঞ্চয়পত্রের সুদের কথা। ব্যাংক বা ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান সুদের টাকা দেয়ার আগে অগ্রিম আয়কর কেটে নেয় সুদ থেকে। যাদের কর শনাক্তকরণ নম্বরই (টিআইএন) আছে, তাদের ক্ষেত্রে কাটা হয় ১০ শতাংশ। অর্থাৎ ১ হাজার টাকা সুদের ওপর ১০০ টাকা অগ্রিম আয়কর।

আর যদি ‘টিআইএন’ না থাকে, তাহলে অগ্রিম আয়কর ১৫ শতাংশ। একই অবস্থা ব্যাংকের মেয়াদি বা চলতি আমানতের। আমানতের ওপর যত সুদই পাওনা হোক না কেন, ব্যাংক যথারীতি অগ্রিম আয়কর কেটে নেয়। যারা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, তাদের আয়কর প্রতি মাসে নিয়োগদাতা কর্মচারীর বেতন থেকে কেটে নেয় এবং তা নিয়মিতভাবে সরকারের রাজস্ব বিভাগে জমা দেয়। ফলে বেতন-ভাতা প্রাপক কোনো কর্মচারীর পক্ষে কর ফাঁকি দেয়া সম্ভব নয়। ফাঁকি ধরা পড়লে নিয়োগদাতার জরিমানা। বেতন-ভাতায় এ ব্যবস্থা থাকার ফলে ব্যক্তিগত করদাতার একটা বিরাট অংশের আয়কর বিনা প্রচেষ্টায় আপসেই আদায় হয়। এজন্য রাজস্ব বোর্ডের কোনো খরচ নেই। তাদের কোনো ঝামেলা নেই। প্রশাসনিক জটিলতাও নেই। সুদ আয়ের মতো লভ্যাংশের ক্ষেত্রেও তাই। কোম্পানিগুলো লভ্যাংশের ওপর অগ্রিম আয়কর কেটে রাখে। শুধু এসব ক্ষেত্রে নয়, বস্তুতপক্ষে সরকারের বিরাটসংখ্যক সেবার ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়করের ব্যবস্থা আছে। জমি কিনলে অগ্রিম আয়কর দিতে হয়। কন্ট্রাক্টরি আয় হলে তার থেকে অগ্রিম আয়কর কেটে রাখা হয়। শুনেছি প্রায় ১০০ সেবার ওপর এ অগ্রিম আয়কর ব্যবস্থা চালু আছে। এটা মোটামুটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। এর দ্বারা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) উপকৃত। বিনা শ্রম, বিনা ঝামেলায় আয়কর আদায় হয়। একটি খবরের কাগজের প্রতিবেদনে দেখেছি অগ্রিম আয়কর হিসেবে ব্যক্তি করদাতাদের প্রায় ৯০ শতাংশের আয়করই আদায় হয়। বাকি থাকে ১০ শতাংশ।

এজন্য কি রিটার্ন জমা দেয়ার এত বড় কর্মযজ্ঞের দরকার আছে? যেখানে ব্যক্তিশ্রেণীর ৯০ শতাংশ লোকের আয়কর আয়ের উৎসেই আদায় হয়ে যাচ্ছে, সেখানে রিটার্ন জমা দেয়া একটা বিড়ম্বনা মাত্র। আরো কথা আছে। বিভিন্ন উৎস থেকে অগ্রিম আয়কর কেটে রাখার কারণে বিরাটসংখ্যক করদাতার প্রদত্ত আয়করের পরিমাণ বেশি হয়। অর্থাৎ তারা প্রতি বছর সরকারের যত পাওনা আয়কর, তার চেয়ে বেশি কর দিচ্ছেন। বলা হয় এসব কর পরবর্তী বছরের আয়করের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করা যাবে। কিন্তু ঘটনাটি প্রতি বছর ঘটলে এটা তো বার্ষিক একটা কর্মকাণ্ডে পরিণত হবে। এ অবস্থায় বিকল্প কোনো ব্যবস্থা উদ্ভাবন করা যায় কিনা, তা রাজস্ব বিভাগ ভেবে দেখতে পারে। আমার ধারণা, রিটার্নের ঝামেলা কমালে বা দূরীভূত করতে পারলে করদাতারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন। যে সময়টা রাজস্ব বিভাগের বাঁচবে, তা তারা অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবে। বিশেষ করে ভ্যাট ফাঁকি বন্ধ, বন্ডেড ওয়্যারহাউজের সুবিধার অপব্যবহার বন্ধ, নতুন করদাতা বের করা ইত্যাদি কাজে রাজস্ব কর্মকর্তারা মনোনিবেশ করতে পারেন। কাস্টমসও একটা ক্ষেত্র যেখানে সময় বেশি দিলে রাজস্ব বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সরকার এসব সুপারিশ ভেবে দেখতে পারে।

লেখকঃ ড. আরএম দেবনাথ, অর্থনীতি বিশ্লেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক। [প্রকাশিত এই লেখাটি লেখকের একান্তই নিজস্ব। ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশ লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখা ও মতামতের জন্য ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশ দায়ী নয়।]

Leave a Reply