ঋণ/বিনিয়োগ অবলোপন (Write off) নীতিমালা সংক্রান্ত সার্কুলার

3
5101

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ বাংলাদেশে কার্যরত সকল তফসিলি ব্যাংক সমূহের ব্যবস্থাপনা পরিচালক/প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক জারিকৃত একটি সার্কুলার, যা আপনাদের জন্য তুলে ধরা হলো-

প্রিয় মহোদয়,

ঋণ/বিনিয়োগ অবলোপন (Write off) নীতিমালা।

ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক উন্নয়নে ব্যাংকগুলোর ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে। যথাযথ পর্যালোচনা ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে গ্রাহক/প্রকল্প নির্বাচন, ঋণ/বিনিয়োগ অনুমোদন ও মঞ্জুরী-পরবর্তী সময়ে নিবিড় মনিটরিংয়ের মাধ্যমে ঋণ/বিনিয়োগ-এর বকেয়া নিয়মিত আদায়করতঃ হিসাবের গুণগত মান বজায় রাখা প্রয়োজন। এতদসত্ত্বেও বিদ্যমান বিবিধ ঝুঁকির কারণে অনেক সময় ব্যাংকগুলোর ঋণ/বিনিয়োগ-এর একটি অংশের আদায় দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। প্রচলিত বিধান অনুযায়ী এ সকল হিসাব বিরূপ শ্রেণীকৃত বলে গণ্য হয় এবং এর বিপরীতে নির্ধারিত হারে সংস্থান (Provision) সংরক্ষণের প্রয়োজন হয়। এমতাবস্থায়, দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী থাকার পরও ব্যাংকগুলোকে ঐসকল ঋণ/বিনিয়োগ স্থিতিপত্রে প্রদর্শন করতে হয়। এর ফলে ব্যাংকের স্থিতিপত্রের আকার অনাবশ্যক স্ফীত হয়। এ প্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণপূর্বক ঐ সকল মন্দ ঋণ/বিনিয়োগ অবলোপন (Write off) করা হয়, যা একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি। অবলোপনযোগ্য ঋণ/বিনিয়োগ হিসাবসমূহ চিহ্নিতকরণ, অবলোপন পদ্ধতি, অবলোপন-পরবর্তী আদায় কার্যক্রম, অবলোপনকৃত হিসাবসমূহ ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) তে রিপোর্টিংসহ অবলোপন প্রক্রিয়ার বিষয়ে ইতোপূর্বে বিআরপিডি সার্কুলার নং ০২/২০০৩, ডিওএস সার্কুলার নং-০১/২০০৪ এবং বিআরপিডি সার্কুলার নং- ১৩/২০১৩ জারি করা হয়েছিল।

এমতাবস্থায়, দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা, আইনী কাঠামো যুগোপযোগী করার লক্ষে ঋণ/বিনিয়োগ-এর অবলোপন বিষয়ে নিম্নোক্ত নীতিমালা অনুসরণের নির্দেশনা দেয়া যাচ্ছেঃ

০১। অবলোপনযোগ্য ঋণ/বিনিয়োগ হিসাবসমূহ চিহ্নিতকরণঃ
যে সকল ঋণ/বিনিয়োগ হিসাবের বকেয়া দীর্ঘদিন আদায় বন্ধ রয়েছে ও নিকট-ভবিষ্যতে কোনরূপ আদায়ের সম্ভাবনাও নেই এবং যে সকল ঋণ/বিনিয়োগ হিসাব একাদিক্রমে ০৩ (তিন) বছর মন্দ/ক্ষতিজনক মানে শ্রেণীকৃত রয়েছে এরূপ ঋণ/বিনিয়োগ হিসাব ব্যাংকসমূহ অবলোপন করতে পারে। তবে, ব্যাংক নিজস্ব বিবেচনায় মৃত ব্যক্তির নিজ নামে অথবা তাঁর একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামে গৃহীত ঋণ/বিনিয়োগ হিসাব ঋণ-শ্রেণীমান নির্বিশেষে ও অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ অনুযায়ী মামলাযোগ্য না হলে মামলা দায়ের ব্যতিরেকে অবলোপন করতে পারবে। তবে একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির উপার্জনক্ষম উত্তরসূরী রয়েছে কিনা তা বিবেচনায় নিতে হবে। এক্ষেত্রে ঋণ/বিনিয়োগ অবলোপনের অন্যান্য সকল নির্দেশনা অনুসরণীয় হবে।

০২। ঋণ/বিনিয়োগ হিসাব অবলোপন পদ্ধতিঃ
ক) অবলোপনযোগ্য ঋণ/বিনিয়োগ এর বিপরীতে ব্যাংকের অনুকূলে বন্ধকীকৃত সম্পত্তি (যদি থাকে) নিয়মানুগভাবে বিক্রয়ের প্রচেষ্টা গ্রহণ, ব্যাংকে নিশ্চয়তা প্রদানকারী ব্যক্তি/ব্যক্তিবর্গের নিকট হতে পাওনা অর্থ আদায়ে সমর্থ না হলে উক্ত ঋণ/বিনিয়োগ অবলোপনের আওতায় আসবে।

খ) অবলোপনের জন্য নির্বাচিত ঋণ/বিনিয়োগ হিসাবসমূহের ক্ষেত্রে পূর্বে আইনগত ব্যবস্থা সূচিত না হয়ে থাকলে অবলোপনের পূর্বে অবশ্যই অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ অনুযায়ী মামলা দায়ের করতে হবে। তবে ক্ষুদ্র অংকের ঋণের ক্ষেত্রে মামলা করতে হলে মামলা খরচের পরিমাণ প্রায়শই ঋণাংকের চেয়ে বেশী হয়ে যায় বিধায় অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর আওতায় অত্যাবশকীয়ভাবে মামলাযোগ্য না হলে ২,০০,০০০/-(দুই লক্ষ) টাকা পর্যন্ত যে কোন অংকের অবলোপনযোগ্য ঋণ/বিনিয়োগ আদালতে মামলা দায়ের ব্যতিরেকে অত্র সার্কুলারের ২(গ) এর নির্দেশনা পরিপালন সাপেক্ষে অবলোপন করা যাবে।

গ) অবলোপনের পূর্বে সংশ্লিষ্ট ঋণ/বিনিয়োগ হিসাবের স্থিতি হতে রক্ষিত স্থগিত সুদ বাদ দেয়ার পর অবশিষ্ট ঋণস্থিতির সমপরিমাণ প্রভিশন সংরক্ষিত থাকতে হবে। এক্ষেত্রে অবলোপনের জন্য চিহ্নিত প্রতিটি ঋণ/বিনিয়োগ হিসাবের বিপরীতে রক্ষিত প্রভিশন পর্যাপ্ত না হলে ব্যাংকের চলতি বছরের আয় খাত বিকলন করে অবশিষ্ট প্রভিশন সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

ঘ) কোন ঋণ/বিনিয়োগ হিসাব আংশিকভাবে অবলোপন করা যাবে না।

ঙ) পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ব্যতিরেকে কোনো ঋণ/বিনিয়োগ হিসাব অবলোপন করা যাবে না।

০৩। অবলোপন-পরবর্তী আদায় কার্যক্রমঃ
ক) ব্যাংক কোম্পানী আইন, ১৯৯১ এর ২৮(ক) ধারা অনুযায়ী অবলোপনের পরও সংশ্লিষ্ট ঋণ/বিনিয়োগ-এর উপর ব্যাংকের দাবী বহাল থাকবে। ব্যাংক কোম্পানী অবলোপন-পরবর্তী সময়ে উক্ত অবলোপনকৃত ঋণ/বিনিয়োগ আদায়ের লক্ষে আইনগত প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে।

খ) অবলোপনকৃত ঋণ/বিনিয়োগ আদায়ের জন্য প্রত্যেক ব্যাংকে পৃথক debt collection unit গঠন করতে হবে।

গ) অবলোপনকৃত ঋণ/বিনিয়োগ হিসাবের বিপরীতে দায়েরকৃত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা কিংবা অবলোপনকৃত ঋণ/বিনিয়োগ হিসাবের বিপরীতে প্রাপ্য অর্থ আদায়ের জন্য বিআরপিডি সার্কুলার নং-০২/২০১৫ এর আলোকে প্রয়োজনে তৃতীয় পক্ষ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে নিয়োজিত করা যাবে।

০৪। অবলোপনকৃত ঋণ/বিনিয়োগ হিসাব রিপোর্টিং পদ্ধতিঃ
ক) অবলোপনকৃত ঋণ/বিনিয়োগ এর হিসাব একটি পৃথক লেজারে সংরক্ষণ করতে হবে এবং ব্যাংকের আর্থিক বিবরণীতে ব্যাংক-কোম্পানী আইন, ১৯৯১ এর ৩৮ ধারায় বর্ণিত তফসিলের ‘আর্থিক বিবরণী প্রস্তাতির নির্দেশনা’ অনুযায়ী রিপোর্ট করতে হবে।

খ) খেলাপী ঋণগ্রহীতার ঋণ/বিনিয়োগ অবলোপন করা হলেও সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতা তাঁর ঋণের দায় সম্পূর্ণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত যথানিয়মে খেলাপী ঋণগ্রহীতা হিসেবে চিহ্নিত হবেন। অবলোপনকৃত ঋণ/বিনিয়োগ এর হিসাবের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি)-তে BLW হিসেবে যথারীতি রিপোর্ট করতে হবে।

গ) ঋণ/বিনিয়োগ অবলোপন সংক্রান্ত তথ্য বিআরপিডি সার্কুলার নং-০৪/২০১২ তারিখঃ ২৫/০১/২০১২ এর নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের EDW portal ব্যবহার করে T_PS_Q_LNREC_RECOVERY টেমপ্লেট এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রেরণ করতে হবে।

০৫। অন্যান্য বিধি-নিষেধঃ
ক) অবলোপনকৃত ঋণ/বিনিয়োগ হিসাব পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন করা যাবে না। শুধুমাত্র Exit Plan এর আওতায় এরূপ ঋণ/বিনিয়োগ হিসাব এর পরিশোধসূচী নির্ধারণ করা যেতে পারে। তবে, উক্ত ঋণ/বিনিয়োগ হিসাবসমূহ শ্রেণীকরণের ক্ষেত্রে অত্র সার্কুলারের ৪(খ) এ বর্ণিত নির্দেশনা বলবৎ থাকবে।

খ) ব্যাংকের পরিচালক বা প্রাক্তন পরিচালক বা পরিচালক থাকাকালীন সময়ে ঐ ব্যক্তির নিজের/স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের (ব্যাংক কোম্পানী আইন, ১৯৯১ এর ২৭(২) ধারার ব্যাখ্যা অনুযায়ী) নামে গৃহীত ঋণ/বিনিয়োগ অবলোপনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ হতে পূর্বানুমোদন গ্রহণ করতে হবে।

গ) এই নীতিমালা জারির দ্বারা এতদসংক্রান্ত ইতোপূর্বে জারিকৃত সকল নির্দেশনা বাতিল বলে গণ্য হবে।

এ নির্দেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

আপনাদের বিশ্বস্ত

(এ,কে,এম, আমজাদ হোসেন)
মহাব্যবস্থাপক
ফোনঃ ৯৫৩০২৫২

• সার্কুলারটি দেখতে ক্লিক করুন এখানে

সূত্রঃ ব্যাংকিং রেগুলেশন এন্ড পলিসি ডিপার্টমেন্ট, বাংলাদেশ ব্যাংক
বিআরপিডি সার্কুলার নং: ১৭, তারিখঃ ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৮

3 মন্তব্যসমূহ

  1. সব কিছু বুজলাম, আমার প্রশ্ন হচ্ছে ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ঋণ অর্থাৎ ব্যাংক লোন কি সাধারণ মানুষ পাবে, আর এই ব্যাংক লোন দেওয়া চালু হবে কবে?

Leave a Reply